| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি, ভূমি ব্যবস্থা ও ভূমি জরিপ প্রসঙ্গে
তৃতীয় পর্ব
এই বিধিমালায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে ওই এলাকার বাসিন্দাদের নাগরিক অধিকার বঞ্চিত আশ্রিত জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া তাদের ভূমি অধিকার ছিল না। উপজাতীয় কারবারিদের শুধু যাযাবর জুম চাষের পাঁচসালা বিলি ব্যবস্থা ও বন্য প্রাণী রক্ষণাবেক্ষণের ভার দেয়া হয়। বাঙালিদের দেখাদেখি খুবই সামান্য সংখ্যক উপজাতীয় হালচাষ রপ্ত করে। বিধিমালায় স্পষ্ট করে লেখা ছিল উপজাতীয়রা পঁচিশ বিঘা জমি ব্যাবহার করতে পারবে, কিন্তু জমির মালিক হতে পারবে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ প্রতিনিধি লর্ড কর্ণওয়ালিশ কর্তৃক ভারত উপমহাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা কার্যকরী থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন উপজাতীয় প্রধানকে জমিদারি স্বত্ব দেয়া হয়নি। শুধু সার্কেল চীফ বা রাজা খেতাব দিয়ে তাদের খুশি রাখা হয়েছিল। সার্কেল চীফ বা রাজার ক্ষমতা ছিল কেবল খাজনা আদায় করার। তখনকার সময় এর আর্থিক মূল্য থাকলেও এখন সেই মূল্য নামে মাত্র। নামে মাত্র মূল্যের সেই খাজনা এখনও রাজপরিবার আদায় করেন।
পার্বত্য এলাকা ‘নন-রেগুলেটেড এরিয়া’ বা ‘অনিয়ন্ত্রিত’ এলাকা হিসেবে ঘোষিত হয়, যেখানে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ব্যাতিত কেউ প্রবেশ করতে কিংবা বসতি স্থাপন করতে পারবে না। উপজাতীয়রা পঁচিশ বিঘা জমি ব্যাবহার করতে পারবে, কিন্তু মালিক হতে পারবে না। বিচারালয়ে কোন উকিল থাকবে না। সার্কেল চীফ (রাজা), হেডম্যান ও কারবারিরা থাকবে। দরকার হলে উপজাতীয়রা বিনা পারিশ্রমিকে সরকারি কর্মকর্তাদের চাহিদা মোতাবেক কাজ করে দিতে বাধ্য থাকবে। সার্কেল চীফ (রাজা), হেডম্যান এমনকি কারবারিরাও তাঁর অধীনস্থ উপজাতীয়দের খাটাতে পারবে কোন পারিশ্রমিক না দিয়েই। এই বিধিগুলো সাধারন পাহাড়িদের উপকার করবে, নাকি এলিটদের?
পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-উপজাতি বাঙালিদের দেয়া হয় হাট-বাজারের দায়িত্ব (সূত্রঃ শরদিন্দুর চাকমা, মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম)। এ জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ক্ষুদ্র পরিমান উন্নয়ন হয়েছে, দেশের অন্যান্য অংশের সাথে যেই ক্ষুদ্র হলেও তাল মিলিয়ে চলতে ফিরতে পারছে এই অঞ্চল, তার প্রায় সিংহভাগ কৃত্তিত্ব বাঙালিদের। আইনী দিক বিবেচনায় বলতে হয়, ১৯২০ সালে স্বয়ং ব্রিটিশ সরকার উপজাতীয় কুকীদের নিয়ন্ত্রনে এনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক্সক্লুসিভ এরিয়া ঘোষণা দিয়ে সেখানে বহিরাগতদের আগমন প্রক্রিয়া সহজ করেছিল। এই বিধিমালা যারা প্রনয়ন করেছিল তারাই এই বিধিমালার মধ্যে যেই বিশেষ বিধিটির প্রতি বর্তমানে পাহাড়ি নেতাদের প্রচন্ড আগ্রহ তা বাতিল করেছিল। এমনকি পাকিস্তান সরকার সাধারন পাহাড়িদের স্বার্থে এই বিধিমালাই একবার বাতিল করেছিল, পরে বিভক্তি আনয়নের জন্য এটি আবার চালু করে।
পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর রাঙ্গামাটি/খাগড়াছড়ি/বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ১৯৮৯ (১৯৮৯ সনের ১৯, ২০ ও ২১নং আইন) সংশোধিত রাঙ্গামাটি/খাগড়াছড়ি/বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ (১৯৯৮ সনের ৯, ১০ ও ১১নং আইন) কার্যকর হওয়ার পর ৬৪ ধারায় (শান্তি চুক্তির খ খন্ডের ২৬ ধারা) পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট ভূমি সংক্রান্ত যে কোন ক্রয়-বিক্রয়, পরিবর্তন বা অধিগ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশান ১৯০০ কার্যকর থাকায় ভূমি সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করে। ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে অত্র এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় এবং ভূমি সমস্যাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের জন্য সবাই নিজ জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে আগ্রহী হলে বিভিন্ন জায়গায় জাতিগত সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।চলবে...
তথ্যসূত্র:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম বাজার ফান্ড রুলস ১৯৩৭
৩. পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি- প্রথম খন্ড: মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, প্রথম প্রকাশ জুন ১৯৬৯
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-১৯৯৭
৫. খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ (সংশোধিত ১৯৯৮)
৬. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮
৭. রাংগামাটি/খাগড়াছড়ি জেলা তথ্য বাতায়ন
৮. বাংলাদেশের নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী: রামকান্ত সিংহ, জুন ২০০২
৯. বাংলাদেশের উপজাতিদের আইন: রামকান্ত সিংহ, প্রথম প্রকাশ ২০০৩
১০. ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, মোঃ আব্দুল কাদের মিয়া
১১. পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বরিোধ: প্রক্ষোপট ও শান্তির সম্ভাবনা- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সরোয়ার হোসনে, এইচডিএমসি,পিএসসি
১২. চাকমা রাজার গোপন ইতিহাস, সৈয়দ ইবনে রহমত
১৩. পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে করনীয়- মেজর ফারুক (অবঃ)
১৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে -মেহেদী হাসান পলাশ
১৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- মেহেদী হাসান পলাশ
১৬. বাংলাদশে জেলা গ্যাজেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ১৯৭৫
©somewhere in net ltd.