| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি, ভূমি ব্যবস্থা ও ভূমি জরিপ প্রসঙ্গ
পঞ্চম পর্ব
ভূমি জরিপ বন্ধ যে কারণে
সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের সাথে আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও ত্রিপুরার সীমান্ত রয়েছে ১ হাজার ২৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে আসামের সাথে ২০২ কিলোমিটার, মেঘালয়ের সাথে ৪৪৩ কিলোমিটার, মিজোরামের সাথে ৩১৮ কিলোমিটার এবং ত্রিপুরার সাথে ৮৫ কিলোমিটার। কাগজে-কলমে আসামের সাথে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ১১০২ থেকে ১১০৭ এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৩ কিলোমিটার ছাড়া বাকি সীমান্ত চিহ্নিতকরণের কাজ সম্পন্ন বলে দেখানো হয়েছে। মেঘালয়ের সাথে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ১০৭১ থেকে ১৩৩৮ পর্যন্ত পুরো সীমান্তই চিহ্নিত দেখানো হয়েছে। মিজোরামের সাথে অনিস্পন্ন দেখানো হয়েছে ৮ কিলোমিটার সীমান্ত। আর ত্রিপুরার সাথে ৩৬ কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিতকরণের কাজ অনিষ্পন্ন রয়েছে বলে দেখানো হয়। তিনটি জেলার গহীন অরণ্যে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সীমানা চিহ্নিতকরণ কাজও বন্ধ রয়েছে। যার সুফল ভোগ করছে ভারত। ভারত এসব সীমান্ত এলাকায় সেনাক্যাম্প স্থাপন থেকে শুরু করে ভারী যানবাহন যাতায়াতের জন্য কংক্রিটের রিংরোড পর্যন্ত বানিয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ শান্তি চুক্তির সূত্র ধরে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবির ক্যাম্প পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়েছে। এতে করে এই অঞ্চলের অধিকাংশ দুর্গম সীমান্তই অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সরকার অনেক ছাড় দিয়ে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ভূমি জরিপ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমার বাধার কারণেই। জনসংহতি সমিতি নেতারা বলেছেন, শান্তিচুক্তিতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের পরই আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শক্রমে ভূমি জরিপ চালানোর কথা রয়েছে। এটি না করেই পাহাড়ে জরিপ চালানো হলে তা চুক্তির পরিপন্থী হবে। আর এটি কোনোভাবেই পার্বত্যবাসী মেনে নেবে না। তারা সরকারকে শান্তিচুক্তি অনুযায়ী প্রথমে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ সংশোধন এবং পার্বত্য ভূমি কমিশনকে কার্যকর করে কমিশন কর্তৃক পার্বত্যাঞ্চলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চলে জরিপ চালানোর উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেন।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আশির দশকে দুই জরিপ কর্মকর্তাকে অপহরণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার ব্যাপক নিরাপত্তার প্রস্তুতি নিয়েই জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্ত সন্তু লারমার বাধার কারণে সব পন্ড হয়ে যায়। অথচ দেশের মোট ভূমির এক-দশমাংশ পার্বত্য এলাকায়। এখানে কোনো জরিপ না হওয়ায় মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান ও দাগ নম্বর নেই। এই এলাকায় জমির চৌহদ্দি ও পরিমাণ দিয়ে মালিকানা ঠিক করায় প্রতিদিনই জমি সংক্রান্ত বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। একই কারণে সেখানে বাড়ছে বাঙালি-পাহাড়ি অস্থিরতা।
জানা গেছে, শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে পাহাড়ে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ২০ জন। ঘরবাড়ি পুড়েছে এক হাজারেরও বেশি। লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে অসংখ্য।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্যনুযায়ী, ১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) রেগুলেশন জারি করা হয়। এ আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী একই বছর পার্বত্য চট্টগ্রামশাসন বিধিমালা জারি হয়। এ বিধিমালার ৩৪ বিধি অনুযায়ী পার্বত্য জেলাগুলোতে ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে। ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন এবং ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পার্বত্য তিন জেলার জন্য প্রযোজ্য না হওয়ায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে কখনই ভূমি জরিপ হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে জরিপ কাজ চালানোর জন্য ১৯৮৫ সালে ‘ভূমি খতিয়ান (পার্বত্য চট্টগ্রাম) অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। এ আইনে সেখানে জরিপের বিধান রাখা হয়েছে। এর আলোকেই ১৯৮৬ সালে প্রথম জরিপ শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে পুরো পার্বত্য এলাকায়ই জরিপের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া মৌজায় জরিপ চলাকালে দু’জন কর্মকর্তাকে অপহরণ করা হয়। ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও তাদের উদ্ধার করা যায়নি। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ১৯৮৮ সালের ১২ অক্টোবর পার্বত্য এলাকার ভূমি জরিপ ও রেকর্ড প্রণয়নের কাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সরকার। চলবে...
তথ্যসূত্র:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম বাজার ফান্ড রুলস ১৯৩৭
৩. পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি- প্রথম খন্ড: মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, প্রথম প্রকাশ জুন ১৯৬৯
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-১৯৯৭
৫. খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ (সংশোধিত ১৯৯৮)
৬. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮
৭. রাংগামাটি/খাগড়াছড়ি জেলা তথ্য বাতায়ন
৮. বাংলাদেশের নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী: রামকান্ত সিংহ, জুন ২০০২
৯. বাংলাদেশের উপজাতিদের আইন: রামকান্ত সিংহ, প্রথম প্রকাশ ২০০৩
১০. ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, মোঃ আব্দুল কাদের মিয়া
১১. পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বরিোধ: প্রক্ষোপট ও শান্তির সম্ভাবনা- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সরোয়ার হোসনে, এইচডিএমসি,পিএসসি
১২. চাকমা রাজার গোপন ইতিহাস, সৈয়দ ইবনে রহমত
১৩. পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে করনীয়- মেজর ফারুক (অবঃ)
১৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে -মেহেদী হাসান পলাশ
১৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- মেহেদী হাসান পলাশ
১৬. বাংলাদশে জেলা গ্যাজেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ১৯৭৫
©somewhere in net ltd.