নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আস্ সালামু আলাইকুম্

আনাড়ী রন্ধন শিল্পীর ব্লগ B-)। ব্লগের বাজে-মানহীন লেখাগুলোর মাস্টার পিস দেখতে চাইলে এই ব্লগারের পোষ্ট গুলো পড়ে দেখতে পারেন। কথা দিচ্ছি, নিরাশ হবেন না। B-)

নীল-দর্পণ

নগণ্য একজন মানুষ। পছন্দ করি গল্পের বই পড়তে, রান্না করতে। খুব ইচ্ছে করে ঘুরে বেড়াতে। ইচ্ছে আছে সারা বাংলাদেশ চষে বেড়ানোর।

নীল-দর্পণ › বিস্তারিত পোস্টঃ

পাঠানুভূতি: শ্যামা ট্রিলজি!

১১ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২৭


গজেন্দ্রকুমার মিত্র'র শ্যামা ত্রয়ী উপন্যাস পড়তে বসে এমন বিক্ষিপ্ত অনুভূতি হবে চিন্তাও করিনি। প্রথম খন্ড, কলকতার কাছেই পড়তে বসে শ্যামার স্বামী নরেন্দ্রর স্বভাব চরিত্র পড়তে পড়তে কতবার যে বইটি ছুড়ে ফেলেছি আর পড়বোনা ভেবে তার হিসেব নেই! সুশ্রী, সতীসাধ্বী কিশোরিটির কপাল কিনা এমন অমানুষের সাথে গিয়ে জুটলো! হিন্দু সমাজে তখন মেয়েদের বিয়ে একবারই হতো অথচ ছেলেরা দ্বিতীয় বিয়ে করলে বা রক্ষিতা পুষলে  উল্লেখযোগ্য কোন ক্ষতি ছিলনা ।
পড়তে পড়তে অসংখ্য বার আমাকে তৎকালীন সমাজ আর এখনের সাথে তুলনা করতে হয়েছে! ফলাফলে দেখলাম সময়টাই কেবল গড়িয়েছে, পরিবর্তন তেমন কিছুই হয়নি। জগত সংসারে অন্যায়, অনাচার, অপরাধ তখনো যেমন ঘটতো এখনো ঘটছে।
শ্যামার আমৃত্যু সংসার, ছেলে মেয়ে নাতি নাতনী থাকলেও একাই যুদ্ধ করে কেটেছে। সংসারে স্বামীর উদাসীনতা, গালমন্দ, আর বাজে স্বভাব সত্বেও তার জোর ছিল শাঁখা সিদুর অক্ষত আছে। যখন স্বামী নামক ব্যক্তিটি দুনিয়া ছেড়ে গেল শাঁখা সিদুর হারানো ছাড়া আর কোন ক্ষতি শ্যামার হয়নি। কারন মানুষটি কালে ভদ্রে এসে তার অপকার ছাড়া তেমন উপকার করেনি! 
তারই জমজ বোন উমার কপালটিও হয়েছিল অভাবনীয়! রূপে, গুণে, গড়নে অতুলনীয় মেয়েটির স্বামীও জুটেছিল বটে রূপবান তবে সে ছিল পতিতায় আসক্ত! বিয়ের রাতেই বালিকা বধুটিকে এই বিশ্রী সত্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। স্বামী নামক সুপুরুষটিই অকপটে জানিয়েছিল বটে! নানান ঘাতপ্রতিঘাতের মোকাবেলা করে কৈশোর, যৌবন শেষ করে এক জীবন যুদ্ধ করে যায় উমা মায়ের সাথে থেকে। স্বামী নামক মানুষটি যখন তার ভালোবাসার(!) মানুষ হারিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়ে তখন উমা তাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে এক রাতের বেশি সময় নেয় না! অথচ অপরূপা সুন্দরী, অনন্যগুণের অধীকারী এই মানুষটিকে এক মুহুর্তের জন্যেও ছুঁয়ে দেখার চিন্তা করেনি শরৎ। শেষ সময়ে আশ্রয় দিলেও, সেবা করলেও পণ ছিল শরতের ভাত খাবে না তাই তার কোন খরচ বিশেষ করে খাবার খরচ গ্রহন করেনি উমা। আমৃত্যু এই পণ রক্ষা করেছে।
জীবন সায়াহ্নে দুজন কিছুদিন এক সাথে সুন্দর কাটালেও কথায় আছে না , 'বিধাতার কাছেও সেই সুখ যেন সইল না' তেমনটিই ঘটেছে উমা শরতের জীবনে। নইলে মৃত্যুপথযাত্রী ভাগ্নী জামাইয়ের জন্যে ফল কিনে ফেরার পথে ট্রামে কাটা পড়ে কেন মরবে! করতো না হয় শেষ জীবনে কিছুদিন দুজনে সংসার! বাস্তবিকই চোখ ভরে পানি এসেছিলো উমার মৃত্যুতে, এমনি পানি এসেছিলো রাসমনি; উমার মায়ের মৃত্যুতেও। হয়ত রাসমনির মৃত্যু নয় সেদিন উমার জন্যেই কষ্টে পানি এসেছিলো চোখে।

৩টি উপন্যাসের মূল চরিত্র শ্যামা হলেও কেন যেন শ্যামার দূর্দশা, দূর্ভোগে এতটা কষ্ট হয়নি যতটা অন্যদের জন্যে হয়েছে।
আরো একবার চোখ ভরে পানি এসেছিলো, কষ্টে কিছু সময় থম মেরে ছিলাম, সেটা হল অভয়পদ; শ্যামার কন্যা মহাশ্বেতার স্বামীর মৃত্যুতে।
অভয়পদর কথা না বললে অন্যায় হয়। কেননা এই উপন্যাসে দেবতা সমতুল্য একজন মানুষ অভয়পদ। হতদরিদ্র শ্বাশুড়ীর সংসারে কখন কী প্রয়োজন নিজ গরজে যোগান দিয়েছে শ্বাশুড়ী না চাইতেই। জগত সংসারে এখনো এমন বিবেচক মেয়ে জামাই কিংবা মানুষ কদাচিত ই মেলে। অভয়পদ সংসারে সকলের সুবিধা অসুবিধা দেখেছে, সকলের প্রয়োজন মেটাতে উদয়াস্ত খেটেছে কিন্তু নিজের অন্তর বা শরীরকে দিয়েছে কেবল জীবন বাঁচাতে যতটুক না হলেই নয় ততটুকু।
অসাধারন এই মানুষটিও জীবনে করেছিল বড়একটি ভুল, জীবন দিয়ে যার মাশুল গুনেছে। লোভে পড়ে চড়া সুদে টাকা খাটায়, যা একদিন আসল সহ-ই মারা পড়ে। বাকী জীবন এই চিন্তায় , প্রায়শ্চিত্ত করে দিন কাটায়। অভয়পদ'র শেষ সময়টা যেন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মনের কষ্ট আর চোখের পানিতে কিছু সময় পড়তে পারিনি।

জগতসংসারে কেবল পাওয়ার মাঝেই যে ভালোবাসার পূর্ণতা পায় না বরং মনের মানুষকে না পেয়েও এক জীবন ভালোবেসে কাটিয়ে দেওয়া যায় তার প্রমান স্বর্নলতা আর অরুনের ভালোবাসা।
অভয়পদ-মহাশ্বেতার মেয়ে কেবল মা বাবারই একমাত্র মেয়ে বলে নয় বরং কাকাদেরও মেয়ে না থাকায় পুরো বাড়ীতে সকলের মধ্যমনি। বাবা কাকাদের অতি আদরে বড় হয় স্বর্নলতা।
ভাগ্যের ফেরে মা বাবাকে হারিয়ে স্বর্নদের বাড়ীতে আশ্রয় পায় স্বর্নলতার মেজো কাকি প্রমীলার বোনের ছেলে অরুন। মুখচোরা অরুনকে কেউ ডেকে না খাওয়ালে খেতে পর্যন্ত বসতো না। বকপটু, কর্মচঞ্চলা স্বর্নলতাই অরুনকে ডেকে খেতে দিতো অধিকাংশ দিন।
ভালোবেসে ফেলে অরুন বালিকা স্বর্নকে কিন্তু নিজের অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল তাই মুখ ফুটে কখনো বুঝতে দেয়নি। স্বর্নর বিয়ের দিন বাড়ী ছেড়ে চিরদিনের মত চলে যায় অরুন। কিন্তু সর্বদা খোঁজ রাখে। তাইতো যখন মরতে বসেছিলো টিবি রোগে, স্বামীও দিন গুনছিলো স্বর্নলতার মৃত্যুর তখন দেবতার মত উপস্থিত হয় অরুন। স্বর্ন তো দূরে থাক ওর স্বামীর কল্পনারও বাইরে খরচ করে দূরের হসপিটালে নিয়ে চিকিতসা করিয়ে সুস্থ করে তোলে।
মাসের পর মাস দু'জনে কাছাকাছি থেকে স্পষ্ট হয় তাদের ভালোবাসার। দুজনের বললে ভুল হয়, অরুনের ভালোবাসা চিরকাল একই রকম ছিল কিন্তু স্বর্ন বুঝলো, নতুন করে নিজেকে জানলো।
আবেগে সংসার , সন্তান ছাড়তে চাইলেও বাস্তবতা বোঝায় অরুন। আমৃত্যু স্বর্ন'র অপেক্ষায় থাকবে আশ্বাস দিয়ে তাকে নিজ সংসারে পাঠায়। যেদিন স্বর্নলতার বাস্তবিক অর্থেই কোন পিছুটান থাকবে না, সন্তানরা সংসারী হবে সেদিন নাহয় তাদের অসম্পূর্ণ ভালোবাসা সম্পূর্ন করবে।

হয়তো বইটির শেষ অবদি একটু অপেক্ষায় ছিলাম অরুন-স্বর্নর ভালোবাসার পূর্ণতার কিন্তু তা হয়নি। ভেবে দেখলাম এটাই বরং বাস্তবতা, এটাই আমাদের জীবন।

আরো একটি অপূর্ন ভালোবাসা ছিল , রতন-কান্তি। নৈতিকতার অবক্ষয়, লোভের কাছে পরাজয় সকল সমাজে সকল সময়ে ছিল, নয়তো টাকার লোভে ব্রাক্ষ্মন বাবা কেন নিজের সুন্দরী  মেয়েকে বিয়ে না দিয়ে বাড়িতে খদ্দের ডেকে আনবে! যত অভাব ই হোক, কোন বাবা এমন কাজ করবে! হ্যাঁ তখনো এমন মানুষ ছিল! আর তাইতো সুন্দরী তরুনী রতন একপ্রকার কষ্টে, অভিমানে প্রাণ থাকতে নিজ বাড়ীর বাইরে আর পা রাখেনি। টাকার বিনিময়ে নিজেকে বিক্রিই করে গেছে কিন্তু মনের যত্ন কেউ করেনি। তারই আশ্রিত কিশোর বয়সী কান্তি যখন আস্তে আস্তে পূর্ণ বিকশিত হতে থাকে দূর্ভাগ্যজনক ভাবে রতন প্রেমে পড়ে যায় তার!  অসম প্রেমের নির্মম  পরিনতি চূড়ান্ত হয় রতনের আত্নহত্যা ও কান্তির বেঁচে মরে যাওয়ার মাধ্যমে!
কার দোষ ছিল এখানে , কান্তি? না, সে অবুঝ কিশোর ছিল তথাপি নিজেকে যথাসম্ভব সংযত করার চেষ্টা করে গেছে। অধ্বঃপতন হয়েছিল রতনের বাবার!

সুখ দুঃখ মিলিয়ে জীবন, কিন্তু শ্যামা'র এ কেমন জীবন! মেয়ে বিধবা হল, নাতনী বিধবা হল, ছোট্ট ছেলে রেখে নাতনী মারা গেলো অথচ শ্যামা কী দীর্ঘ এক দূর্ভোগের জীবন যাপন করে গেল! একটি মানুষের জীবনে এত দূর্ভোগ, এত দূর্যোগ কেন আসবে! অবশ্য আমাদের আসপাশে এখনো শ্যামা'রা বাস করে। কেবল সময় গড়িয়ে সেকাল থেকে একালে পড়েছে, চরিত্রগুলো এখনো বাসকরে আমাদের মাঝে।




*** বাংলা সাহিত্যে ত্রয়ী উপন্যাসের মাঝে গজেন্দ্রকুমার মিত্র'র এই উপন্যাস তিনটি অন্যতম। খুব অনিয়মিত পাঠক আমি। এত বড় বড় ৩টি বই ৭-১০ দিনে পড়ে শেষ করতে পারবো সেই ভরসা নিজের উপর ছিল না কিন্তু বই হাতে নিয়ে বুঝতে পারলাম একটা মোহে পড়ে গেছি আমি! কীভাবে যেন নিজের রোজকার কাজের মাঝে সুযোগ করে পড়েছি! শান্তি পাচ্ছিলাম না শেষ না হওয়া অবদি। অসংখ্যবার রেখে দিতে চেয়েও পারিনি। মনে হচ্ছিলো এ তো আমার চারপাশেরই অনেক কিছুর কথা! সেকাল-একাল মিলিয়ে অন্য এক জগতে বিচরন ছিল। বাস্তবে ফিরে এলেও ঘোর থেকে বের হতে পারছি না তাই নিজের সামান্য অনুভূতি প্রকাশ করে বসা।
অনেকেই হয়ত আছেন যারা এই উন্যাসত্রয় পড়েছেন, আমার অনুভূতি বা ভাবনার সাথে মিল নাও হতে পারে তাদের। বিনীত ভাবে বলছি আমি কোন রিভিউ লিখতে বসিনি, রিভিউ লেখার যোগ্যতা আমার নাই। আমি আমার অনুভূতি প্রকাশ করতে বসেছি, আমার মাথা থেকে শ্যামাকে বের করতে চেয়েছি। আমি বেরিয়ে আসতে চেয়েছি শ্যামার জগত থেকে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.