| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আজকের যুগান্তর পত্রিকার একটি খবর হয়তো আমাদের অনেকেরই চোখ এড়িয়ে গেছে ।
কোন অপরাধে দণ্ডিতকে সাজা প্রদান করার ক্ষেত্রে শুধু অপরাধটি বিবেচনায় রেখে সাজাপ্রদান করা হয়না । বরং তার সামাজিক অবস্থান , অপরাধটি প্রথম অপরাধ কিনা তাও যাচাই করা হয় । আর সমাজে কোন ব্যক্তিই একা বা বিচ্ছিন্ন না , তার সাথে জড়িয়ে থাকে তার পরিবার । অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় মামলার আসামী ঐ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি । ফলে আসামীর কারাদণ্ড হলে ঐ পরিবারটির অবস্থা কি হবে তা খুব সহজেই অনুমেয়।কিছুদিন আগে পত্রিকায়ও পড়েছিলাম ভারতে এই ধরণের একটি জেল রয়েছে যেখানে কয়েদীরা সব দিনের বেলায় নিজের বাড়িতে , মাঠে ঘাটে গিয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম করে , হাটবাজারে বেচাকেনা করে আর সন্ধ্যা হলেই জেলে নিজেদের সেলে ফিরে যায় । ঐ ব্যাপারটা কিন্তু ভিন্ন । কিন্তু পরিবারে ও সামাজিক পরিবেশে রেখে লঘু অপরাধে আদালত কতৃক দণ্ডিত অপরাধীকে পুনর্বাসনের ব্যাপারটা কিন্তু বাংলাদেশের একটি আইনেই রয়েছে। আইনটি কিন্তু মোটেও নতুন নয়। এটি প্রবেশন অধ্যাদেশ ১৯৬০ নামে পরিচিত ।বাংলাদেশে সবচেয়ে কম চর্চিত আইনগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এই প্রবেশন আইন ।
কয়েকটি বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতির কথা চিন্তা করুন............
১। খুব নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম সারিতে জায়গা করে সদ্য ভর্তি হওয়া প্রথম বর্ষের কোন মেধাবী ছাত্র যে কিনা নিজেই খুব দরিদ্র একটি পরিবার থেকে উঠে এসেছে , হঠাৎ কিছু রেডি ক্যাশের লোভে প্রক্সি পরীক্ষা দিতে যেয়ে ধরা পড়লো। ম্যাজিস্ট্রেট তাকে ১ বছরের কারাদণ্ড দিলেন। অতপরঃ.....................
২। এক পুরিয়া গাঁজাসহ একজন রিকশাচালক গ্রেফতার হলেন। তাকে দেয়া হল ৬ মাসের কারাদণ্ড । এই রিকশাচালক পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি এখন কারাগারে। অতপরঃ...........................
৩। গ্রামের দুই প্রতিবেশীর মাঝে ছাগলের গাছের পাতা খাওয়া , জমির আইলের সীমানা দিয়ে বিবাদ । ঝগড়া , হাতাহাতি এবং মাথা ফাটাফাটি.........। ব্যাপার গড়ালো থানা পুলিশ কোর্টকাচারি পর্যন্ত। বাদী ও বিবাদী দুজনেই পূর্ণবয়স্ক ও সমাজে সজ্জন হিসেবে পরিচিত। রাগের মাথায় মাথা ফাটিয়ে অন্যায় হয়েছে সেটা নিজেরাও বুঝতে পারছেন। কিন্তু গ্রাম্য রাজনীতির কারণে ঘটনা এতদুর গড়িয়েছে মীমাংসা করাও সম্ভব না। আবার ঘটনার নানাবিধ শক্তপোক্ত সাক্ষীও আছে। অতঃপর...............
এই ব্যক্তিগুলোর এমন ছোটখাট বিভিন্ন ধরণের লঘু অপরাধ বিবেচনার পাশাপাশি তাদের সার্বিক ভবিষ্যৎ এর কথা বড় পরিসরে চিন্তা করে দেখুন আর এবার বলুন আপনি কি রায় দেবেন? বাংলাদেশে শাস্তি প্রদানমূলক বিচার ব্যবস্থার সাথে সংশোধনমূলক বিচার ব্যবস্থার এই মিসিং লিংকটি পূরণ করে প্রবেশন আইন বা প্রবেশন অধ্যাদেশ ১৯৬০ । এই আইনের আওতায় প্রথমবারের মতো লঘু অপরাধে অভিযুক্ত অপরাধী দোষ স্বীকার করলে আদালত অভিযুক্তকে দেয় দণ্ড স্থগিত রেখে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি প্রদান করেন এবং ১ থেকে ৩ বছরের জন্য একজন সমাজকর্মীর (১ম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা যিনি প্রবেশন অফিসার হিসেবে পরিচিত) অধীনে আচার আচরণ পর্যবেক্ষণে রাখেন । এই সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তির আচরণ সন্তোষজনক হলে তাকে আর সাজাভোগ করতে হয়না। পর্যবেক্ষণকালীন সময়টা আসলে জামিনের মতোই । এ সময়ে তিনি কাজকর্ম করতে পারেন এবং নিজের পরিবারেই থাকতে পারেন।
প্রবেশন ব্যবস্থার উৎপত্তি ও ইতিহাসঃ
প্রবেশন শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ "Probatio" থেকে যার আক্ষরিক অর্থ হল পরীক্ষাকাল । বহু বছর আগে ১৮৪১ সালে ফিলাডেলফিয়ার জন অগাস্টাস নামের একজন সু মেকার একজন মাতালকে শাস্তি না দিয়ে আচরণ সংশোধনের একটি সুযোগ দেয়ার বিষয়ে আদালতের বিচারকের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন । বিচারক বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন । শর্ত ছিল মদ্যপান করে আর কখনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যাবেনা । মাতাল শুধরে গিয়েছিলো ।
১৮৫৮ সাল পর্যন্ত এই সু মেকার ১৯৪৬ জন ব্যক্তিকে এইভাবে শর্তসাপেক্ষে মুক্ত করেছিলেন । এদের মধ্যে কয়জন শর্ত ভঙ্গ করেছিলেন , জানেন? মাত্র ১০ জন । শতকরা হিসেবে এটি মাত্র ০.৫১% । এই ঘটনা অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত তাৎপর্য বহনকারী । কেননা আমেরিকায় বিচার ব্যবস্থা ১৮৮৫ সালেও ডাকাতি ও হত্যার মতো অপরাধে জেমস আরসেন নামের ১০ বছর বয়সী একটি শিশুকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো এবং ১৮৫৭ সালে এই মার্কিন মুলুকের সুপ্রিম কোর্টই কালো মানুষরা নাগরিক হওয়ার যোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছিলো । এটা হচ্ছে সেই সময় যখন অপরাধের কারণ ঐসময় জন্মগত বা বংশগত বলে মনে করা হতো । সিজার লম্ব্রোসো নামের একজন অপরাধ নৃতত্ত্ববিদ এই ধারণাকে ১৮৭৮ সালে ল'আমো ডিলিনকেন্টে রচনার মাধ্যমে রীতিমতো তত্ত্বে রুপ দেন ।
বলাই বাহুল্য তাঁর প্রচারিত তত্ত্ব বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিলো । লম্ব্রোসো বিশ্বাস করতেন অপরাধীর শারীরিক গঠন সাধারণ মানুষদের থেকে আলাদা। এইসব ঘটনা ঘটার বহু আগে একজন অপরাধী যে উপযুক্ত সামাজিক পরিবেশ পেলে সংশোধনের মাধ্যমে পরিবারে ও সমাজে পুনর্বাসিত হতে পারে এমন ধারণা রীতিমত কল্পনারও অতীত ছিল।এইসব ঘটনার অন্ততঃ এক দশক আগে সংশোধনমূলক এই প্রবেশন বিচারব্যবস্থার উৎপত্তি ছিল বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে অত্যন্ত যুগান্তকারী পদক্ষেপ । এভাবেই একজন সু মেকারের হাত ধরে জন্ম নেয় সংশোধনমূলক বিচার ব্যবস্থার বা প্রবেশন পদ্ধতির আর এই মুহূর্তে গুগল সার্চ বলছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগস্ট/২০১৮ পর্যন্ত ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ প্রবেশন রয়েছেন । (সুত্রঃ prijonpolicy.org)। সুতরাং বোঝাই যায় অপরাধীদের উপর জন অগাস্টাস সাহেবের এই এক্সপেরিমেন্ট বৃথা যায়নি ।
প্রবেশন ব্যবস্থার খুঁটিনাটিঃ
প্রবেশনের মুল কথাটাই হচ্ছে ফলোআপ বা নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা । উন্নত বিশ্বে প্রবেশনে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির আচার আচরণ ফলোআপের জন্য অনেক ব্যাপার স্যাপার আছে। ওখানে কতৃপক্ষ চাইলে গুরুতর কোন অপরাধে অভিযুক্ত প্রবেশনারের হাতে বা পায়ে জিপিএস ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারে , স্বভাবজাত অপরাধীদের নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করতে পারে , আপনার ঘরবাহির , কাজের জায়গা , সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার একটিভিটি পর্যন্ত মনিটর করতে পারে। লঘু প্রকৃতির অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এত কড়াকড়ি হয়না। এই ধরণের অপরাধীকে হয়তো ১০০/২০০/৩০০ ঘণ্টা কোন স্বেচ্ছাসেবামূলক সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করতে হয়। মাদকাসক্তি বা রাগ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণমূলক কোন কাউন্সিলিং কোর্সে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ করতে হয়। মার্কিন তারকা লিণ্ডসে লোহান এই ধরণের কোর্স প্রায়ই করে থাকেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রবেশন পেতে হলে কয়েকটি নুন্যতম কিছু শর্ত পালন করতে হয়ঃ
১। আসামীকে দোষ স্বীকার করতে হবে। যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা এই যে আইনজীবীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েই হোক বা দোষ স্বীকার করলে কি জানি কি হয় এমন মনোভাবের কারণে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় আসামী স্বেচ্ছায় দোষস্বীকার করেছেন এমন ঘটনা রীতিমত বিরল।
২। আসামীর বিরুদ্ধে পূর্বের কোন অফিসিয়ালি রেকর্ডেড অভিযোগ/মামলা থাকলে আসামী প্রবেশন পাবেন না ।
৩। আসামীকে আদালত প্রদত্ত শর্তপালন করতে হবে। শর্তগুলো হতে পারে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে আদালতের অনুমতি ছাড়া যাওয়া যাবেনা , নির্দিষ্ট সময় পরপর কতৃপক্ষের কাছে হাজিরা দিতে হবে।
৪। শর্ত ভঙ্গ করলে আসামীকে স্থগিত করা সাজা ভোগ করতে হবে । প্রবেশন দেয়া মানে কিন্তু সাজা মাফ না। আসামী দোষ স্বীকার করলে তাকে আদালত একটি সাজা দেন কিন্তু দণ্ডটি স্থগিত করে রাখেন । শর্ত দেয়া হয় ১/২/৩ বছর আসামী আদালতের পর্যবেক্ষণে থাকবেন । এর মধ্যে তিনি আদালতের দেয়া কোন শর্ত ভঙ্গ করতে পারবেন না। করলে তাকে এই স্থগিত দণ্ডটি ভোগ করার জন্য কারাগারে যেতে হবে।আদালতের শর্তগুলো ঠিকঠাক পালন করা হচ্ছে কি না এই বিষয়গুলো বাংলাদেশে সমাজসেবা অধিদফতরের একজন জেলা পর্যায়ের প্রবেশন কর্মকর্তা (প্রবেশনারি না শিক্ষানবিশ নয় কিন্তু) দেখভাল করেন।
প্রবেশন দেয়া হয় সর্বোচ্চ ১ থেকে ৩ বছরের জন্য আর প্রবেশন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য। দণ্ডবিধির কোন কোন ধারার অপরাধের ক্ষেত্রে প্রবেশন দেয়া যাবে তা প্রবেশন অধ্যাদেশেই উল্লেখিতে আছে। তবে সহজ কথায় বলা যায় যে পুরুষের ক্ষেত্রে যেসব অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন শাস্তির বিধান আছে সেসব ক্ষেত্রে প্রবেশন সুবিধা দেয়া যাবেনা । আর মহিলাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন শাস্তিযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে প্রবেশন মঞ্জুর করা যাবেনা । প্রবেশন দেয়াই হয় সাধারণত লঘু প্রকৃতির অপরাধের ক্ষেত্রে আর প্রবেশন দেয়া না দেয়া পুরোটাই আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা ।প্রবেশন একমাত্র প্রথম শ্রেণীর আদালতগুলোই মঞ্জুর করতে পারে। যেমনঃ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত , সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত , চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এগুলো হলো প্রথম শ্রেণীর আদালত । প্রবেশন ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করে থাকে সমাজসেবা অধিদফতর । সমাজসেবা অধিদফতরের অধীনে প্রতি জেলায় একজন প্রবেশন অফিসার কর্মরত আছেন যার মাধ্যমে এই প্রবেশন ফলোআপ সংক্রান্ত কাজগুলো হয়ে থাকে । এছাড়াও প্যারালিগাল ও জেজেএস এর মতো কিছু সংস্থাও বাংলাদেশে জেলায় জেলায় প্রবেশন নিয়ে কাজ করছে।
এটা সত্য যে প্রবেশন নিয়ে বাংলাদেশে কোন বড় ধরণের গবেষণামূলক কাজ হয়নি । কেননা এ সংক্রান্ত তথ্যবহুল কোন প্রবন্ধ বা আর্টিকেল কোথাও তেমন একটা চোখে পড়েনা । কোনধরণের প্রচার প্রচারণা ছাড়াই চলছে প্রবেশন সংক্রান্ত কাজ । এ বিষয়ে যথাযথ ডকুমেন্টেশন না থাকার কারণে সাধারণ মানুষজন বিচারব্যবস্থার এই সংশোধনমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে জানেনা বললেই চলে ।
©somewhere in net ltd.