নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শেরপা

দেখতে চাই ধরনী

মুনতাসির

আমি পাহাড়ে চড়ি,সাগরে ডুবি, পৃথিবী আমার প্রেম

মুনতাসির › বিস্তারিত পোস্টঃ

তরুণ ভোটার এবং পলিটিক্যাল জেনারেশনালিজম

২৮ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪৯


বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে কাজ করেছে এবং করে থাকে। এটা আমার কথা নয়, প্রতিষ্ঠিত সত্য। ছাত্রসংসদ নির্বাচন প্রায়ই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে বেশ কিছু ফ্যাক্টরের উপর এর ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোকে অনেকাংশেই একটি কন্ট্রোলড বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সম্পন্ন করা যায়, বা করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এখানে আমি ইলেকশন ডক্টরিং-এর কথা বলছি না। বলছি ভৌগোলিক পরিসীমা, ভোটার সংখ্যা এবং সর্বোপরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতার কথা।

২০২৫ সালের ছাত্রসংসদ নির্বাচন শিবিরের উত্থানের পরিসংখ্যানগত প্রমাণ হাজির করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত জোট প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে, যেখানে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৫% ভোট দেয়। একইভাবে, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবির-সমর্থিত প্যানেলগুলো বিপুল আসন জয় করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬টির মধ্যে ২৪টি পদ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সব হল নির্বাচনে তাদের আধিপত্য দেখা যায়। কোথাও কোথাও ভোটার উপস্থিতি ৮০%-এর কাছাকাছি ছিল—যা ছাত্রসমাজের উচ্চ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়।

এই আধিপত্য একটি প্রশ্ন সামনে আনে: বিএনপির চেয়ে জামায়াতে ইসলামী (জেআই) কেন এগিয়ে?

বিশ্লেষণে কয়েকটি কারণ উঠে আসে। প্রথমত, হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর দমনের মুখেও জামায়াতের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং তৃণমূল নেটওয়ার্ক তাদের একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, জামায়াত—যাদের ঐতিহাসিকভাবে সীমিত নির্বাচনী সাফল্য ছিল (যেমন ২০০৮ সালে মাত্র ৪.৭% ভোট)—তাদের "দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি" এবং পদ্ধতিগত সংস্কারের আহ্বানের মাধ্যমে তরুণদের মন জয় করেছে। অনেক তরুণ জামায়াতের "ভিশন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা"কে বিএনপির চেয়ে উন্নত মনে করছেন এবং এই সমর্থনকে কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং তাদের সুশৃঙ্খল কর্মপদ্ধতির ফল হিসেবে দেখছেন।

দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এমন তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে, যারা আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদ এবং বিএনপির অকার্যকারিতায় হতাশ হতে পারেন বা হয়েছেন। বিগত দেড় দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বলার মতো কোনো নির্বাচন হয়েছে কি না তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন আছে, তেমনি অংশ নিতে না পারার কারণে যে ধরনের হতাশা কাজ করতে পারে, তাও তরুণদের “ওল্ড-স্কুল” পলিটিক্স থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার মানসিকতা তৈরি করতে পারে। এখানে সাধারণ ভোটার বা ছাত্রীছাত্ররা হয়তো নিজেদের ভোটদানের বিষয়টাকে “গুরুত্বহীন” বলে ধরে নিতে পারেন, সেটা যে কোনো কারণেই হোক। এই “গুরুত্বহীনতা”-র অনুভূতি অনেকটা বাটারফ্লাই ইফেক্টের সম্ভাবনা রাখে।

বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে, এই প্রবণতা কার্ল মানহাইমের ‘জেনারেশনস অ্যান্ড আইডিওলজি’-র মতো মৌলিক বা সেমিনাল কাজের আলোকে “পলিটিক্যাল জেনারেশনালিজম” বা রাজনৈতিক প্রজন্মবাদের তত্ত্বের সঙ্গে মিলে যায়। ২০২৪-পরবর্তী তরুণ প্রজন্ম—যারা হাসিনা সরকারের পতনের নেতৃত্ব দিয়েছিল—তারা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয়কেই দুর্নীতি ও পরিবারতান্ত্রিক নেতৃত্বের “পুরোনো ধাঁচের” রাজনীতির অবশিষ্টাংশ হিসেবে মনে করে। এ ধরনের মানসিকতার উদাহরণ আমরা নানান গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্রে দেখেছি।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা একটি শূন্যস্থান তৈরি করেছে। অন্যদিকে বিএনপির অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর (যেমন জামিয়াত উলামায়ে ইসলাম) সাথে জোট গঠন তরুণদের সন্দেহ পুরোপুরি দূর করতে পেরেছে কি না, তার উত্তর ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়। ‘সাউথ এশিয়ান ভয়েসেস’-এর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন শিবিরের জয়কে “ধর্মীয় জাগরণ” নয়, বরং প্রথাগত ক্ষমতার কাঠামো থেকে স্বায়ত্তশাসনের ভোট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

যদি আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে তাকাই—যদিও তা বাস্তব রাজনীতির সম্পূর্ণ প্রতিফলন নয়—তবু এটি যে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তরুণরা (এখনও ছাত্র) বিএনপির “মধ্যবয়সী ভোটার বেস”-এর চেয়ে জামায়াতের “সংস্কারমুখী এবং দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি”-র দিকে ঝুঁকে যাওয়ার উদাহরণ ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলো। এই তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ ৩০ বছরের নিচে। তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাহক। ছাত্রনির্বাচনের ফলাফল যদি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত হয়, তাহলে জামায়াতকে তারা আদর্শিক নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি মাধ্যম হিসেবে যদি দেখে থাকে, তবে তার যৌক্তিকতা বের করার দায় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বর্তায়।

২০২৬ সালের নির্বাচনে আনুমানিক ২ - ৩ কোটি নতুন ভোটার যুক্ত হবেন, যাদের বড় অংশই জেন-জি। তারা ২০১৮ সালের পর (শেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন) প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের ১২.৮ কোটি ভোটারের মধ্যে ৫.৫৬ কোটির বেশি ভোটারের বয়স ৪০-এর নিচে, যা তরুণদের উপস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

ঐতিহাসিক তথ্য এই ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট করে: ভোটার উপস্থিতি ২০০৮ সালে ৮৭% (একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন) থেকে ২০২৪ সালে বিএনপির বর্জন ও আওয়ামী লীগের একাধিপত্যের মুখে মাত্র ৪০%-এ নেমে এসেছিল। আইডিইএ (ওউঊঅ)-র মাপকাঠি অনুযায়ী, কম ভোটার উপস্থিতি প্রায়ই বৈধতার সংকটের সাথে সম্পর্কিত, যা ২০২৪ সালে দেখা গিয়েছিল, যেখানে ৫২টি নির্বাচনী এলাকায় উপস্থিতি ৩০%-এর নিচে ছিল।

যদি নতুন ভোটাররা ভোটদানে বিরত থাকে—হয়তো ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-জামায়াত জোট বা বিএনপির ইসলামপন্থী সংশ্লিষ্টতার কারণে মোহভঙ্গের ফলে—তবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। পিপ্পা নরিসের মতো গবেষকদের নির্বাচনী অখণ্ডতা বিষয়ক কাঠামো অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন গণতন্ত্রে ভোটার উপস্থিতি ৫০ - ৬০% এর নিচে হলে তা জনম্যান্ডেটের গুরুত্ব কমিয়ে দেয় এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করে। স্বল্প অংশগ্রহণে নির্বাচিত সরকার “জনসাধারণের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন” থেকে বঞ্চিত হতে পারে, যা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

পরিসংখ্যানগতভাবে, মিশর এবং তিউনিসিয়ার তুলনামূলক গবেষণার প্রেক্ষিতে দেখা যায়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে তরুণদের ভোটার উপস্থিতি কম হলে আন্দোলনের ঝুঁকি ২০ - ৩০% বেড়ে যায়।

এর ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিক্ষোভ ত্বরান্বিত হতে পারে, কারণ অমীমাংসিত সমস্যাগুলো অসন্তোষ বাড়িয়ে দেয়। ফলে অর্থনৈতিক সংকট, মানবাধিকার ইস্যু বা শাসনসংকটের মতো প্রশ্নগুলো আবারও রাস্তায় রাজনীতিকে উস্কে দিতে পারে।

তরুণদের জামায়াতমুখী প্রবণতা—বা আরও সঠিকভাবে বললে, “বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি”-র দিকে ঝোঁক—একটি গভীর প্রজন্মগত বিচ্ছেদের স্পষ্ট সংকেত। এটি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার ক্রমাগত ক্ষয়ের প্রতিফলন, যেখানে হতাশা, শাসনসংকট এবং নতুন বিকল্পের অন্বেষণ একসঙ্গে মিলেমিশে একটি নতুন রাজনৈতিক স্রোত তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ এখন এক সূক্ষ্ম মোড়ে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, স্বচ্ছতা ও আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া এই চক্র ভাঙা অসম্ভব। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়—এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। তরুণদের এই অপরিসীম শক্তি কি গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের রূপ নেবে, নাকি নতুন অস্থিরতা ও বিভাজনের বীজ বপন করবে? উত্তরটা নির্ভর করছে তাদের হাতে ধরা ভোটের কালির রঙে।

প্রকাশিত: যায়যায়দিন ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ বিকেল ৪:৪২
লিংক : Click This Link

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.