| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
দুর্নীতি সব সময় মন্ত্রিসভায় জন্ম নেয় না, কেননা তার বীজ অনেক আগেই ফুটপাতে পড়ে থাকে
দুর্নীতিকে আমরা প্রায়শই একটি বৃহৎ, জটিল ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখি, যা কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ বা বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—একটি সমাজে মানুষ দৈনন্দিন ছোটখাটো নিয়মগুলো কতটা মেনে চলে এবং এই ছোট নিয়ম ভঙ্গ বড় নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্র তৈরি করে কি না?
ঢাকার রাস্তায় দাঁড়ালেই এই দৃশ্য চোখে পড়ে। কেউ নির্বিকারভাবে ফুটপাতে থুথু ফেলে দিলেন। তিনি রিকশাচালক হতে পারেন, আবার কেতাদুরস্ত চাকুরিজীবী বা ধর্মপ্রাণ কোনো মানুষও হতে পারেন। কেউ বাসের জানালা দিয়ে, কেউ সরকারি দপ্তরের সিঁড়িতে, কেউ হাসপাতাল, রেলস্টেশন বা বাসস্ট্যান্ডে—এমন কোনো জায়গা যেন নেই যেখানে এমনটা দেখা যায় না।
আবার একটি মোটরসাইকেল নির্লিপ্তভাবে ফুটপাতের ওপর দিয়ে চালিয়ে যাওয়া, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়া কিংবা একটি বাস রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা, প্লাস্টিকের বোতল বা খাবারের প্যাকেট ফুটপাতে বা খালে ফেলে দেওয়া—সব যেন দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
এসব আচরণকে আমরা প্রায়ই ‘ছোটখাটো অসুবিধা’ বলে উড়িয়ে দিই। কিন্তু এগুলো আসলে আমাদের সামাজিক নিয়ম বা ‘সোশ্যাল নর্ম’-এর অবস্থার জ্বলজ্বলে সূচক। সামাজিক নিয়ম হলো সেই অদৃশ্য চুক্তি, যা আইনের অনুপস্থিতিতেও মানুষকে একে অপরের সঙ্গে সহাবস্থান করতে সাহায্য করে। আইন সব সময় উপস্থিত থাকে না, কিন্তু সমাজ চলে; কারণ মানুষ ধরে নেয় যে অন্যরাও কিছু মৌলিক নিয়ম মেনে চলবে।
এই কারণেই রাস্তা, ফুটপাত, গণপরিবহন বা জনপরিসরের অন্যান্য স্থান একটি সমাজের নাগরিক সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষাগার। যখন এখানে ছোট নিয়ম ভাঙা স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং কোনো সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, তখন একটি বিপজ্জনক সংকেত ছড়িয়ে পড়ে: নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক নয়, সুবিধামতো ভাঙা যায়।
সমাজবিজ্ঞানে এই ধারণাটি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত। ডাচ গবেষক কিস কাইজার, সিগওয়ার্ট লিন্ডেনবার্গ ও লিন্ডা স্টেগের ২০০৮ সালের বিখ্যাত গবেষণা ‘দ্য স্প্রেডিং অব ডিজঅর্ডার’, যা সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়; সেখানে দেখা যায় যে যখন কোনো পরিবেশে ছোট বিশৃঙ্খলা যেমন গ্রাফিতি, আবর্জনা বা ভাঙা জানালা দৃশ্যমান হয়, তখন মানুষ অন্য নিয়মও বেশি ভাঙতে শুরু করে। যেমন—আবর্জনা ফেলা বা অন্যের সম্পত্তি নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এটি অনেকটা চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করে।
এই ধারণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আরেকটি তত্ত্ব হলো ‘ব্রোকেন উইন্ডো’ তত্ত্ব। এই ধারণাটি ১৯৮২ সালে জেমস কিউ. উইলসন এবং জর্জ কেলিং ব্যাখ্যা করেন। তাঁদের মতে, ছোট বিশৃঙ্খলা অমীমাংসিত থাকলে তা বড় অপরাধের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। যদিও এই তত্ত্ব নিয়ে কিছু সমালোচনা রয়েছে, তবুও দৃশ্যমান বিশৃঙ্খলা যে নিয়মভঙ্গের সামাজিক সংকেত দেয়, এই ধারণাটি বহু গবেষণায় সমর্থিত।
বাংলাদেশে এই ছোট নিয়মভঙ্গের দৃশ্য অত্যন্ত সাধারণ। ঢাকা বা অন্যান্য শহরে থুথু ফেলা, লিটারিং, ট্রাফিক আইন অমান্য করা—যেমন লেন না মানা, সিগন্যাল ভাঙা বা অবৈধ পার্কিং নিয়মিত ঘটনা। ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে জরিমানা নিয়ে দরকষাকষি বা ঘুষ দেওয়ার প্রবণতাও অনেক ক্ষেত্রে এই সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব আচরণ শুধু দৈনন্দিন অসুবিধা নয়, এগুলো একটি বৃহত্তর সমস্যার লক্ষণ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত দুর্নীতি ধারণা সূচক অনুযায়ী ২০২৫ সালে ১০০-তে বাংলাদেশের স্কোর ছিল মাত্র ২৪। এতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫০তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। দেশে দুর্নীতিকে প্রায়ই সর্বব্যাপী বা ‘এন্ডেমিক’ সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। প্রশাসনিক স্তরে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বহু ক্ষেত্রেই সাধারণ অভিজ্ঞতা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বড় দুর্নীতির পেছনে কি ছোট নিয়মভঙ্গের সংস্কৃতি কোনো ভূমিকা রাখে না?
যখন রাস্তায় থুথু ফেলা বা আবর্জনা ফেলা কোনো সামাজিক লজ্জা বা প্রতিক্রিয়া ছাড়াই ঘটে, তখন মানুষ ধীরে ধীরে ধরে নেয় যে নিয়ম ভাঙায় কোনো শাস্তি বা খরচ নেই। সেই সঙ্গে জন্ম নেয় দায়মুক্তির অনুভূতি। এই মানসিকতা যখন প্রশাসনিক স্তরে পৌঁছায়, তখন ঘুষ নেওয়া বা ফাইল আটকে রাখা অনেকের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম তাঁর বই ‘মেকিং ডেমোক্রেসি ওয়ার্ক’-এ দেখিয়েছেন যে, শক্তিশালী গণতন্ত্র ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান অনেকাংশেই নির্ভর করে সামাজিক আস্থা ও নাগরিক সংস্কৃতির ওপর। যেসব সমাজে জনপরিসরকে সম্মান করা হয়, সেখানে আইন মানার সংস্কৃতিও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকে। অন্যদিকে যদি সমাজে এই ধারণা তৈরি হয় যে সবাই নিয়ম ভাঙছে—ট্রাফিক আইন অমান্য করছে, ঘুষ দিচ্ছে বা যত্রতত্র আবর্জনা ফেলছে—তাহলে একা সৎ থাকা অনেকের কাছে বোকামি মনে হতে পারে।
এই যুক্তি অর্থনীতিতেও দেখা যায়। যখন কোনো সমাজে মানুষ মনে করে যে অন্যরা নিয়ম মানছে না, তখন ব্যক্তিগতভাবে নিয়ম মানার প্রেরণা দ্রুত কমে যায়। অর্থনীতিবিদরা একে ‘কালেক্টিভ অ্যাকশন’ সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। প্রত্যেকে জানে যে নিয়ম মানা সবার জন্য ভালো, কিন্তু যদি সবাই নিয়ম ভাঙে, তাহলে একা নিয়ম মানা ব্যক্তির কাছে তা অযৌক্তিক মনে হতে পারে।
এইভাবে ছোট নিয়ম ভঙ্গের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে একটি মানসিক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে নিয়ম মানা ব্যতিক্রম হয়ে যায় এবং নিয়ম ভাঙা হয়ে ওঠে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। একটি আচরণ প্রথমে সীমিত পরিসরে দেখা যায়, তারপর ধীরে ধীরে তা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে এবং একসময় তা নতুন সামাজিক মানদণ্ডে পরিণত হয়।
ফলে সমস্যাটি কেবল আইন প্রয়োগের নয়; এটি সামাজিক প্রত্যাশার প্রশ্ন। মানুষ প্রায়ই নিয়ম মানে কারণ তারা বিশ্বাস করে অন্যরাও তা মানবে। যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন আইনের শক্তি একা যথেষ্ট হয় না। এখানেই জনপরিসরের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাস্তা, ফুটপাত, গণপরিবহন বা সরকারি অফিসের সামনে মানুষের আচরণ আসলে একটি সমাজের সামাজিক আস্থার সূচক। যে সমাজে মানুষ রাস্তার আবর্জনা তুলে ডাস্টবিনে ফেলে, ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলে এবং জনপরিসরকে নিজের সম্পদের মতো ব্যবহার করে, সেখানে নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়। এই আস্থাই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে।
অন্যদিকে যেখানে জনপরিসরকে কেউ নিজের বলে মনে করে না, সেখানে রাষ্ট্রকেও অনেক সময় দূরের ও বিচ্ছিন্ন একটি কাঠামো বলে মনে হয়। তখন আইনকে দেখা হয় একটি বাধা হিসেবে, সহযোগিতার নিয়ম হিসেবে নয়। এই কারণেই অনেক উন্নত সমাজে নাগরিক শৃঙ্খলা কেবল আইন দিয়ে নয়, সামাজিক লজ্জা ও পারস্পরিক নজরদারির মাধ্যমেও বজায় থাকে। কেউ যদি প্রকাশ্যে আবর্জনা ফেলে বা ট্রাফিক নিয়ম ভাঙে, তখন অন্যরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই সামাজিক প্রতিক্রিয়াই নিয়মকে শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশের মতো দ্রুত নগরায়ণের সমাজে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগর ঘনত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক নিয়মের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কিন্তু যদি নাগরিক সংস্কৃতি একই গতিতে বিকশিত না হয়, তাহলে বিশৃঙ্খলা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে থুথু ফেলা, লিটারিং বা ট্রাফিক নিয়ম ভাঙা কেবল পরিচ্ছন্নতার বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। এগুলো একটি গভীরতর সামাজিক সংকেত। এগুলো দেখায় আমরা জনপরিসরকে কতটা গুরুত্ব দিই এবং নিয়মকে কতটা সম্মান করি।
একটি সমাজের চরিত্র তার বড় রাজনৈতিক ঘটনায় নয়, বরং দৈনন্দিন ছোট আচরণে প্রকাশ পায়। ফুটপাতের থুথু, রাস্তার আবর্জনা বা ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা আলাদাভাবে তুচ্ছ মনে হলেও, একসঙ্গে এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—আমরা কি নিয়মকে সত্যিই সম্মান করি, নাকি সুবিধামতো ব্যবহার করি?
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শুরু হয়তো এই ছোট প্রশ্নের উত্তর খোঁজা থেকেই। কারণ নাগরিক সংস্কৃতি যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে আইনও শক্তিশালী হয়। আর যদি নাগরিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়, তাহলে সবচেয়ে কঠোর আইনও অনেক সময় কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
দুর্নীতি সব সময় মন্ত্রিসভায় জন্ম নেয় না, কেননা তার বীজ অনেক আগেই ফুটপাতে পড়ে থাকে।
প্রকাশিত : বিডিনিউজ২৪.কম view this link
©somewhere in net ltd.