নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শেরপা

দেখতে চাই ধরনী

মুনতাসির

আমি পাহাড়ে চড়ি,সাগরে ডুবি, পৃথিবী আমার প্রেম

মুনতাসির › বিস্তারিত পোস্টঃ

স্কাউটিং: মানুষ গড়ার নীরব বিপ্লব

২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩


"তুমি কোন প্যাট্রল?"

প্রশ্নটি শুনে আমি একটু হেসে ফেললাম। বহু বছর কেউ আমাকে এই প্রশ্ন করেনি।

"লায়ন প্যাট্রল," আমি বললাম।

ভদ্রলোকও হাসলেন। তিনি আমাদের স্কুলের অনেক আগের ব্যাচের। আমি স্কাউট হয়েছি ১৯৯০ সালে। তিনি স্কাউট ছিলেন ষাটের দশকে। আমাদের মাঝে প্রায় তিরিশ বছরের ব্যবধান। অথচ কয়েক মিনিটের মধ্যেই মনে হচ্ছিল, আমরা যেন একই সময়ের মানুষ।

এটাই হয়তো স্কাউটিংয়ের সবচেয়ে বড় বিস্ময়।

গতকাল ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের স্কাউট গ্রুপের হীরকজয়ন্তীতে ১৯৬৬ সালের প্রথম দিকের সদস্য থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্ম—ছয় দশকের মানুষ একত্র হয়েছিলেন। কেউ হলে উপস্থিত, কেউ পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে অনলাইনে যুক্ত। অনুষ্ঠান শেষে আমার মনে হচ্ছিল, আমরা একটি পুনর্মিলনীতে নয়, একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আমরা প্রায়ই স্কাউটিংকে একটি সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে দেখি। ক্যাম্প, ইউনিফর্ম, ব্যাজ, প্যারেড কিংবা জাম্বুরি—এসবই যেন এর পরিচয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, এগুলো আসলে বাহন। স্কাউটিংয়ের আসল কাজ অন্যত্র।

এটি মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করে।

আজকের বাংলাদেশে এই কথাটি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। কিন্তু বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা হয়তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। আমাদের পরিচিতির পরিধি বেড়েছে, কিন্তু সম্প্রদায় ছোট হয়েছে। আমরা একই শহরে থাকি, একই অফিসে কাজ করি, একই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করি; তবু একে অন্যের প্রতি আস্থা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

স্কাউটিংয়ের শিক্ষা এখানেই আলাদা।

আমি কখনো স্কাউটিংকে শুধু ক্যাম্পিং বা নেতৃত্ব শেখার জায়গা বলে মনে করিনি। আমরা শিখেছিলাম একসঙ্গে রান্না করতে, একসঙ্গে কষ্ট করতে, একসঙ্গে সমস্যার সমাধান করতে। শিখেছিলাম, নেতৃত্ব মানে সামনে দাঁড়ানো নয়; প্রয়োজনে সবার শেষে খাওয়া। শিখেছিলাম, নিজের কাজ শেষ হলেও দলের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব শেষ হয় না।

এই শিক্ষা বই থেকে আসে না। এটি আসে অনুশীলন থেকে।

স্কুলজীবনের কথা মনে পড়ে। বন্যায় দেশের কোনো অঞ্চল ডুবে গেছে—সংবাদটি পেলেই আমরা বেরিয়ে পড়তাম। ধানমন্ডি, সোবহানবাগ, মোহাম্মদপুর—বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজায় কড়া নেড়েছি। কেউ চাল দিয়েছেন, কেউ পুরোনো কাপড়, কেউ শুকনো খাবার, কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা। তখন আমরা কেউ প্রাথমিকের ছাত্র, কেউ বা একটু বড়। আমাদের হাতে ছিল না কোনো পরিচয়পত্র, কোনো তহবিল, কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা। ছিল শুধু স্কুলের স্কার্ফ আর মানুষের দরজায় গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস।

পরে আমরা বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ডেন্টাল ক্যাম্প করেছি, বৃক্ষরোপণ করেছি, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ক্যাম্প করেছি, রক্তদান কর্মসূচি করেছি। কখনো মিরপুর রোডের পাশে স্কুলের সামনের ফুটপাত ঝাড়ু দিয়েছি। তখন এগুলোর কোনো নাম ছিল না। এগুলো "প্রজেক্ট" ছিল না, "ইভেন্ট" ছিল না, "সামাজিক উদ্যোগ"ও ছিল না। এগুলো ছিল আমাদের কাছে স্বাভাবিক কাজ।

আজকের ভাষায় হয়তো এগুলোকে বলা হবে ভলান্টিয়ারিজম, সিভিক এনগেজমেন্ট কিংবা কমিউনিটি সার্ভিস। কিন্তু তখন এসব শব্দ আমাদের অভিধানে ছিল না। কোনো করপোরেট লোগো ছিল না, কোনো ফটোশুট ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়ার সুযোগও ছিল না। সংবাদপত্রে নাম ছাপানোর আকাঙ্ক্ষা ছিল না। কাজটি করা দরকার—এই বিশ্বাসটুকুই যথেষ্ট ছিল।

মজার বিষয় হলো, এটি কোনো প্রাগৈতিহাসিক সময়ের গল্প নয়। এটি নব্বইয়ের দশকের ঢাকা, আর নতুন শতকের শুরুর কথা। শহরটি তখনও আমাদের নিজের বলে মনে হতো। রাস্তায় ময়লা দেখলে মনে হতো, এটি আমাদেরই পরিষ্কার করা উচিত। কোথাও মানুষ বিপদে পড়লে মনে হতো, তাদের পাশে দাঁড়ানোও আমাদের কাজ। নাগরিকত্ব তখন আমাদের কাছে কেবল একটি পরিচয় ছিল না; ছিল একটি দায়িত্ব।

আমরা আজ এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সাফল্য ব্যক্তিগত, কিন্তু সংকটগুলো ক্রমেই সমষ্টিগত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের উপস্থিতি বেড়েছে, কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে পরিচয় কমেছে। স্বেচ্ছাসেবাও অনেক সময় প্রচারের ভাষায় মাপা হয়। অথচ একটি সমাজকে টিকিয়ে রাখে অন্য কিছু—পারস্পরিক আস্থা, দায়িত্ববোধ এবং প্রয়োজনে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস। এই অভ্যাস এক দিনে তৈরি হয় না; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠে।

পেছন ফিরে তাকালে বুঝি, এসব কাজ আমাদের কেউ বই পড়িয়ে শেখাননি। আমরা শিখেছি আমাদের অগ্রজদের দেখে। বড় ভাইরা যেমন করতেন, আমরাও তেমন করতাম। প্রশ্ন করতাম না, যুক্তি খুঁজতাম না; অংশ হয়ে যেতাম। পরে আমরা ছোটদের সেই একই শিক্ষা দিয়েছি। তারা আবার তাদের পরের প্রজন্মকে দিয়েছে।

এই উত্তরাধিকারই হয়তো স্কাউটিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। এখানে আদর্শ বক্তৃতা দিয়ে শেখানো হয় না; অনুশীলনের মাধ্যমে একজন মানুষের ভেতরে প্রবেশ করে। মূল্যবোধ মুখে মুখে নয়, মানুষে মানুষে ভ্রমণ করে।

হঠাৎ মনে হলো, আমি শুধু আমার বড় ভাইদেরই দেখছি না; আমি যেন সেই ধারাবাহিকতাকেই দেখছি, যা ১৯৬৬ সালে শুরু হয়েছিল এবং আজও থেমে যায়নি।

আজ বুঝি, সেই কাজগুলোর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল না একটি সফল ক্যাম্প বা কয়েক শ গাছ। সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া বিশ্বাস।

সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন সোশ্যাল ক্যাপিটাল বা সামাজিক পুঁজি। এমন এক সম্পদ, যার হিসাব জাতীয় বাজেটে থাকে না, কিন্তু যার অভাব একটি সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। যে সমাজে মানুষ একে অন্যকে বিশ্বাস করে, সেখানে সহযোগিতা সহজ হয়, স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ টিকে থাকে, সংকটে মানুষ দ্রুত একত্র হয়।

স্কাউটিং নীরবে সেই পুঁজিই তৈরি করে।

হীরকজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল, ষাট বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো ভবন নয়, কোনো ট্রফি নয়, কোনো স্মারকও নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, একজন মানুষ ষাট বছর পরেও আরেকজন মানুষকে শুধু একটি পরিচয়ে চিনতে পারেন—"আমি স্কাউট।"

আমরা আজ নতুন নতুন প্রযুক্তির কথা বলি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলি, স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলি। কিন্তু একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেবল প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না। তৈরি হয় এমন মানুষ দিয়ে, যারা একে অন্যকে বিশ্বাস করতে শেখে, মতের অমিল নিয়েও একসঙ্গে কাজ করতে পারে এবং কোনো প্রচার বা প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই সমাজের জন্য কিছু করতে প্রস্তুত থাকে।

সম্ভবত স্কাউটিংয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই। এটি শুধু ভালো স্কাউট তৈরি করে না। এটি এমন মানুষ তৈরি করে, যারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি সমাজের নীরব ভিত্তি হয়ে ওঠে।

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০

রাজীব নুর বলেছেন: স্কাউটিং ভালো।
স্কাউট থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। সবচেয়ে ভালো কাজ হচ্ছে- দেশের প্রতি টান জন্মায়।

২| ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৮

মুনতাসির বলেছেন: থ্যাঙক্ ইউ :)

৩| ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:২৯

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: ৯০ এর দশকে স্কাউটিং করেছি,
স্মৃতির পাতায় অনেক ঘটনা জমে আছে,
যা বলার পরিবেশ নাই ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.