নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

লেখালেখি আমার পেশা নয় আমার নেশা

নালু

নালু › বিস্তারিত পোস্টঃ

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং আমাদের ভালোবাসা

১০ ই জুন, ২০১৭ দুপুর ১২:২৪

টেলিভিশন হলো চোখের চুইংগাম। যদি কোনকিছু দেখারও না থাকে তবুও টিভি থেকে চোখ সরানো দায়। আমাদের বাসার লোকজন কারো টিভি দেখার তেমন একটা অভ্যাস নাই কিন্তু তারপরও সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১-২ টা পর্যন্ত টিভি চলে। শুধু তাই নয় পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বা আড্ডার সময়ও টিভি অন থাকে। গল্পের মাঝে আচমকা নিরবতা নেমে আসলে সেই ফাঁকে টিভিতে চোখ রেখে নতুন কোন টপিক বা গল্পের বাকিটা শুরু করা যায়। আরেকটু বিষদভাবে বলতে গেলে টিভি আমাদের জীবনের সাথে আমাদের অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে রয়েছে। বর্তমানে বয়োজৈষ্ঠ্য মানুষের বিশাল একটা অংশ তাদের অবসর সময় কাটান টিভি দেখে। আমাদের মা-চাচীদের সন্ধ্যার পর বা অবসর সময় কাটানোর জন্য তাদের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম থাকে টেলিভিশন। টেলিভিশনের মাধ্যমেই সমাজ-সংস্কৃতি এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পরে। একটা দীর্ঘ সময় আমাদের সেই বিনোদনের চাহিদা এবং দেশের সমাজ-সংস্কৃতি তুলে ধরার কাজটি এককভাবে করে গিয়েছে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)।

জাতীয় গণমাধ্যমের দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান টেলিভিশন নামে কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ টেলিভিশন নামে সাদা-কালো সম্প্রচার শুরু করে। ১৯৮০ সালে বিটিভি প্রথম রঙিন প্রচারণায় যায়। বর্তমানে দেশের প্রায় শতকরা ৯৭ ভাগ এরিয়া বিটিভি সম্প্রচারের আওতাভুক্ত এবং অনুষ্ঠানমালার প্রায় শতকরা ৯২ ভাগ নিজস্বভাবে নির্মাণ করে থাকে।

বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে বিটিভির দর্শকসংখ্যা নেই বললেই চলে। বর্তমানে দেশে ২৬টি বেসরকারী চ্যানেল তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সেই সাথে আরো ১০টি নতুন বেসরকারী চ্যানেল সম্প্রচারের অপেক্ষায় রয়েছে। এতো চ্যানেলের ভীরে বিটিভি আজ চাপা পরে আছে পর্বতের নীচে। ১৯৯৮ সালে এটিএন বাংলা প্রথম বিনোদন নির্ভর বেসরকারী চ্যানেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তার আগ পর্যন্ত বিটিভি-ই ছিল দেশবাসীর একমাত্র বিনোদন মাধ্যম এবং দর্শক চাহিদা মেটাতেও সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে এতো চ্যানেল থাকা সত্ত্বেও দর্শক চাহিদা পূরণ হচ্ছেনা, হচ্ছেনা বলাটা ঠিক হবেনা বরং পূরণ করতে পারছেনা। কোয়ালিটি থেকে কোয়ান্টিটির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে যার ফলে অনুষ্ঠানমালার এই করুণ দশা!! যেখানে বিটিভি তার আপন বৈশিষ্ট্য এখনো বজায় রেখে চলেছে। এর পেছনে মূল কারণ হতে পারে বেসরকারী চ্যানেলগুলো পরিচালিত হয় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আর বিটিভি পরিচালিত জনকল্যাণমূলক বা জনসচেতনতা বৃদ্ধির এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে। বিটিভি আমাদের কাছে শুধু একটি চ্যানেল নয় আমাদের ইমোশন, আমাদের স্মৃতি, আমাদের শৈশব, আমাদের ইতিহাস।

সম্প্রতি বিটিভি বিতর্কে জড়িয়েছে ইফতার টাইমের ১১ মিনিট পূর্বে আযান দেওয়ার ইস্যুতে। এই বিষয়টি নিয়ে অনেকে অনেক কটুকথা, হাসা-হাসি, ব্যাঙ্গ, সমালোচনা এবং গালিগালাজও করে চলেছেন সমানে। কেউ কেউ বলেছেন কতজনই বা বিটিভি দেখে? আবার বলেছেন এইজন্যই কেউ বিটিভি দেখেনা। আমার প্রশ্ন হলো, যদি অতি নগন্য সংখ্যক মানুষই বিটিভির দর্শক হয় তবে গালিগালজ করা বা সমালোচকদের সংখ্যাটা এতো বিশাল কেন?? যারা সমালচনা করে যাচ্ছেন এবং বিভিন্ন আজেবাজে মন্তব্য করে যাচ্ছেন তারা কি আদৌ সেদিনের ঘটনার স্বীকার হয়েছেন? সমালোচনার ঝড়টা সবচেয়ে বেশী দেখা গিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে এবং অনলাইন পত্রিকাগুলোয়। এবার একটা যুক্তিতে আসা যাক, আমাদের দেশে যারা অনলাইন দুনিয়ায় মেতে থাকেন তারা আদৌ বিটিভিতে ভুলেও চোখ রাখেননা। তার মানে তারা না দেখেই বা অনলাইন পত্রিকার নিউজ দেখেই তাদের মহান মুখবাণী দেওয়া শুরু করেছেন। বেশীরভাগ অনলাইন পত্রিকাগুলো চটকদার নিউজ প্রদানে সিদ্ধহস্ত এবং পাঠক আকর্ষনে তারা মিথ্যার আশ্রয় নিতেও পিছু পা হয়না। আমরা নিজেদের অতীত যেমন খুব সহজে ভুলে যায় এবং সামান্য ত্রুটির কারনে তার সকল গৌরব ও সাফল্য নিমিষেই পদদলিত করি। তেমনি বহুসংখ্যক চ্যানেলের ভীরে বিটিভির অবদান এবং সাফল্য আমরা ভুলতে বসেছি বরং একটু সুযোগ পেলে ছেড়ে কথা বলি না।

দেশ স্বাধীন হয়েছে বহু বছর হলো কিন্তু বিটিভি এখনো স্বাধীন হতে পারেনি। যখন যেই দল ক্ষমতায় এসেছে তখন তারা রিমোটের মতো বিটিভিকে ব্যাবহার করেছে এবং এখনো করে চলেছে। বাসার টিভির রিমোট যার দখলে থাকে তার পছন্দানুযায়ী প্রোগ্রাম বাকি সবাইকে গিলতে হয়। যার ফলে বর্তমানে অনেক বাসায় নানা ধরণের চ্যানেলের চাপে রুম প্রতি টিভির প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিটিভি-র শত সুযোগ এবং যথেষ্ট ব্যবহারযোগ্য সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তার উন্নয়নের মাত্রা ধীরগতি। কারণ, ক্ষমতাশীল দলের প্রচার-প্রচারণা ছাড়াও তাদের হাজারটা বাধা-বিপত্তি এবং নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। এতোকিছু সামাল দিয়ে যেকোন চ্যানেলে পক্ষেই টিকে থাকা মুশকিল, সেখানে বিটিভি এখনো টিকে আছে সেটাই বিশাল। কিছু প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে এখনো বিটিভি কোয়ালিটি ধরে রেখেছে। সচেতনতামূলক ফিলার বা ডকুমেন্টারি প্রচারের দায়িত্ব বিটিভির পাশাপাশি অন্যান্য প্রাইভেট চ্যানেলগুলোরও নেওয়া উচিৎ ।

৯০-এর দশকের কথা মনে পরে যখন সমগ্র দেশে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল বিটিভি। এন্টেনা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চ্যানেল আনতে হতো সেই সাথে ছিল লোডশেডিং এর ভয়। ভালো কোন অনুষ্ঠান শুরু হবার মুহুর্তেই কারেন্ট চলে যেত তখন কি যে কষ্ট লাগতো তা বলে বুঝানো সম্ভব না। সপ্তাহে একদিন সিনেমা দেখাতো, নাটকগুলোও ছিল সাপ্তাহিক সেই দিনগুলো আমাদের উৎসবমুখর থাকতো। আমাদের সময় বিটিভির অনেক জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল ইত্যাদি নামক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান যা আজও বিটিভির দখলেই। ঈদ উপলক্ষে এবং বছরের মাঝখানে ইত্যাদি নিয়ম করে প্রচারিত হতো। যেদিন ইত্যাদি প্রচার হতো সেদিন রাস্তা-ঘাটে শুনশান নিরবতা বজায় থাকতো মানুষজন অফিস-আদালত এবং বাইরের কাজ সেরে অনুষ্ঠান শুরুর ১ ঘন্টা আগেই বিটিভি খুলে বসে থাকতো। বাকের নামক চরিত্রের জন্য ঢাকার রাস্তায় আন্দোলনে নেমেছিল দর্শক সেটাও বিটিভির প্রচারিত নাটক। তেমনি আরো শত শত প্রোগ্রাম বিটিভি প্রচার করে শতকোটি দর্শককে মাতিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে এতো চ্যানেলের ভীরে সেই সঙ্গে বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণায় কোন চ্যানেলেই বেশিক্ষণ চোখ রাখা দায়। এখন বিনোদন সময় অতিক্রান্ত হয় এক চ্যানেল থেকে আরেক চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে।

ভালোবাসি বিটিভিকে, টিকে থাকুক বিটিভি, টিকে থাকুক সকল ক্ষমতাবানদের ভীরে।।

তানভীর জনি
গবেষক, নাগরিক টিভি


মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.