নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের নাম ভালোবাসা।

Always with beauty.

নাসরিন সুলতানা

আমি একজন শিক্ষক।

নাসরিন সুলতানা › বিস্তারিত পোস্টঃ

ছোট গল্প-৪ : মা

২৮ শে মে, ২০১৪ রাত ৮:১৫

মা

নাসরিন সুলতানা



মাকে দেখার জন্য তাকি একাই চলে এসেছে ঢাকা থেকে। মা তো আর মানুষ নেই ; চামড়ায় আবৃত একটা জীবিত কংকাল। মাকে দেখার সাথে সাথে রাজ্যের সব কান্না এসে জমেছে তাকির বুক, গলা, নাক আর চোখে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ফোন এল আতিকের। তাকি কান্না জড়িত কণ্ঠে হ্যালো বলল।

: পৌঁছেছ ?

: হিঁম।

: কাঁদছ কেন ?

তাকি কথা বলতে পারছে না। আতিক বলল , মা কেমন আছে ?

: ভালো।

: তাহলে কাঁদছ কেন ?

: রাখি।

: কী হয়েছে , তাকি ?

তাকি ফোন রেখে দিল। মায়ের পাশে উপুড় হয়ে পড়ে বুকের ওপর একটা হাত রেখে জোরে জোরে কাঁদতে থাকল সে। তার মা বললেন , কাঁদছ কেন ? আমি তো আছি। যাদের মা নাই ?



মা ভাত খেতে পারেন না। খুব বিনয়ের সাথে তাকিকে বলেন , মনু , রাগ কইরো না , আমি গিলতে পারি না।

চোখের পানি পড়ে যায় তাকির। মা , আপনি কী খাবেন ?

: কিছু না।

: আপনি কী গিলতে পারেন ?

: আমার কিছু খাইতে ইচ্ছা করে না , মনু।



তাকি একটা ব্লেন্ডার মেশিন কিনে আনে। মাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করে। মা খেতে পারেন না। চা চামচের এক চামচ খান। পানি , হরলিক্স বা শরবত এক চুমুক। একবারে একটার বেশি ট্যাবলেট খেতে পারেন না। সারা দিন একটু পর পর খান।

তাকির বুকটা ভেঙে যেতে থাকে। কাজের মহিলা ক্যাথেটার পরায়। মা ব্যথায় উহ করে ওঠেন।



আতিক তাকিকে বলেছে মাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে। ভালো ডাক্তার দেখানো যাবে। তাকির কাছে থাকলে তার মনটাও ভালো থাকবে। তাকি আতিককে ধন্যবাদ জানাল। সে একজন ডাক্তারের কাছে গিয়ে ক্যাথেটার পরানো শিখে নিল। ডাক্তার তাকে হাত ধোয়ার নিয়ম শিখিয়ে দিল। তাকি জানত না যে হাত ধোয়ার আবার বিশেষ একটা নিয়ম আছে। সারা জীবন সবাইকে দেখেছে সাবান মেখে হাত কচলে ধুয়ে ফেলতে। প্রতিটা জায়গায় ছ’বার করে ঘষা দিতে হয় এবং তারপরে হাত একেবারে জীবানুমুক্ত হয়ে যায় এ কথা সে কোনো দিন শোনেনি। মাকে ক্যাথেটার পরানোর জন্য এটা শিখতে পেরে সে খুব খুশি।



তাকি মাকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। তার ভাবি ওষুধের ঝুড়িটা নিয়ে বসল তাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য। এক সময় বলল , মেট্রিল খাওয়াবে তিন বেলা।

: কেন ?

: তাহলে আর পেট খারাপ হবে না।

: পেট খারাপ কোথায়, ভাবী ? আমি আসার পরে তো এক দিনও পায়খানা হয়নি। কিছু তো খায় না, পায়খানা আসবে কোত্থেকে ?

: মাঝে মাঝে এ রকম হয়। আবার পেট খারাপও হয়। আর এটা হচ্ছে প্রস্রাব কমানোর জন্য।

: প্রস্রাব কমাব কেন ?

: বার বার ক্যাথেটার পরিষ্কার করতে যদি তোমার ইচ্ছা না করে।

তাকি একটা নিশ্বাস ফেলল। তার মা কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন। প্যানে বসলে পা ব্যথা হয়ে যায় তাই তার ভাই মায়ের জন্য কমোট বসিয়েছিলেন। এখন আর কমোটে বসার শক্তিও তার নেই। তার জন্য চেয়ার কেনা হয়েছে। নিচে বালতি থাকে। সেই চেয়ার আর বালতি নিয়েই ঢাকায় রওনা হল তাকি। মাকে চেয়ারে বসিয়ে দুজনে তুলে নিয়ে গেল।



মাকে ডাক্তার দেখানো হল। মেট্রিল তো দূরের কথা , তিন বেলা তিন চামচ করে এভোলাক খেতে দিলেন। প্রতিদিন একটা ছোট বলের মতো পায়খানার দলা পড়ে পেট থেকে। একদম শুকনো। পাথরের মতো শক্ত।



আতিক তাকিকে না জানিয়ে মাকে বলল , মা , আপনি তো বাড়িতে থাকেন না , জমি জমা দিয়ে কী করবেন ?

: কী আর করব ?

: বিক্রি করে ফেলেন।

: কেন ?

: এত জমি দিয়ে কী করবেন ? আট-দশ বিঘা বিক্রি করে ব্যাংকে টাকা রাখেন।

: না , সেটা বোকামি। ব্যাংকের টাকার চেয়ে জমি থাকাই ভালো।

: আমি চাই আপনি জমি বিক্রি করে টাকাটা তাকির নামে ব্যাংকে রাখেন।

: আল্লাহ্ ! কী বল ? সবার হক নষ্ট করে একজনকে দেওয়া যায় ?

: কেন যাবে না ? আপনার ছেলেরা তো আপনাকে কোনো টাকা-পয়সা দেয় না।

: ওরা তো দিতে চায় , তাকি নিতে চায় না।

: তাকি মিথ্যা বলে। যারা একটা ফোন পর্যন্ত করে না তারা টাকা দিতে চায় আমি বিশ্বাস করি না।



মা এসব কথা তাকিকে বলেননি। শুধু জিজ্ঞেস করেছেন , ওরা ফোন-টোন করে না ?

: ভাইয়ারা ?

: হিঁম।

: না, মা, কার সাথে কথা বলবেন ? আমি দিয়ে দিচ্ছি।

: কারো সাথে না। এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।

তাকি ফোন ডায়াল করে মাকে বলল, মা , বড় ভাইয়ার সাথে কথা বলেন।

: তুমি বল, আমার ইচ্ছা করে না।

: না, আপনার বলতে হবে। আজকে আপনি আপনার তিন ছেলের সাথেই কথা বলবেন।



সেদিন তাকির মা তার ছেলেদের সাথে কথা বললেন। ফোন রাখার আগে সবাইকেই বললেন , দোয়া কইর , পারলে মাঝে-মধ্যে ফোন কইর। এ কথা শুনে তাকি গোপনে চোখের পানি মুছেছে। আবার মায়ের অগোচরে ভাইদেরকে ফোন করে বলেছে, মাকে সপ্তাহে এক দিন ফোন করবেন। যদি না পারেন তবে পনের দিনে একবার করবেন। মা অপেক্ষায় থাকে, জিজ্ঞেস করে।



তাকির বড় ভাই আসলো তার মা’র সাথে দেখা করতে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগেই শাশুড়ির সাথে ফোনে কথা বলে। তাকি চোখের পানি ফেলে।



আতিক তার শাশুড়ীকে সহ্য করতে পারে না। তাকি বোঝে , কিছু বলে না। আতিক বলেই ফেলল , এত বড় বাসা আমাদের লাগে না। মাকে তার ছেলেদের কাছে পাঠিয়ে দাও। ছোট বাসা নেব , ভাড়া কম হবে।

: তাতে তোমার কী ? ভাড়া কি তুমি দাও ? মা’র জন্য তুমি একটা টাকাও খরচ কর না।

: তোমার টাকা আর আমার টাকা কি আলাদা ?

: মা আমার কাছে থাকবে এর চেয়ে বেশি কিছু আমি জানি না।

: তোমার দুই ভাই শাশুড়ী আর এক ভাই শ্বশুরকে তুলেছে বাসায়। তুমি তোমার মাকে তুলেছ। তোমরা কি নতুন নিয়ম চালু করতে চাও নাকি ?

: আমার ভাবীরা কেউ চাকরি করে না। তারা যদি তাদের মাকে রাখতে পারে আমি কেন পারব না ?

: আমি তো তোমার ভাইদের মতো পাঠা না।

: আস্তে বল, প্লিজ। মা শুনতে পেলে কষ্ট পাবে।

: শুনবে না, সে ঘুমাচ্ছে। শোনার আগেই তাকে পাঠিয়ে দাও। আমার বাসায় আমার মাকে রাখব।

: রাখ। আমি তো নিষেধ করছি না। তাতে মাকে পাঠাতে হবে কেন ? আমি নিজেই তো আম্মাকে বলেছি আমার কাছে থাকতে। সে তো বাড়ি ছেড়ে আসতে চায় না।

: তোমার মা চলে গেলে তোমার টাকাগুলো জমা থাকবে। সেগুলো আমাদেরই কাজে লাগবে।

: আল্লাহ্র ওয়াস্তে থাম। নিজেকে আর ছোট করো না।

: মানুষ চাকরিজীবি মেয়ে বিয়ে করে কিসের জন্য ? যে মানুষটা সংসার, বাচ্চা কিছুই ঠিকমতো দেখতে পারে না, ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরে, হাসিমুখে স্বামীর সাথে একটা কথাও বলতে পারে না, এই সংসারে তার প্রয়োজনটা কী ?

: তোমার কোনো প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই।

: শুক্রবার তুমি তাকে নিয়ে যাবে। যদি না যাও শনিবার আমি তোমার বড় ভাইকে ফোন করব।

: ফোন করতে হবে না। আমাকে একটা সপ্তাহ সময় দাও। আমিই নিয়ে যাব।



বুদ্ধ পূর্ণিমার আগের দিন তাকি চাকরিটা ছেড়ে দিল, আতিককে জানাল না। পরের দিন তাকি তার মাকে নিয়ে রওনা হবে। সকাল বেলা আতিকের এক এডভোকেট বন্ধু এবং তাকির এক ম্যাজিষ্ট্রেট বাসায় এল। আতিক তাদেরকে দেখে অবাক। তাকি তাদেরকে চা-নাস্তা দিল। তারা খেল। তার পরে এডভোকেট কাগজ-পত্র বের করল। আতিককে বলল , এখানে সাইন কর।

: কেন ?

: ভাবী তোর বাসা থেকে আমাদের সামনে নেমে যাবে, তোর কোনো কিছুই সে নিয়ে যাবে না। আমরা সাক্ষী।

: বুঝলাম না।

: যার মাকে তুই তোর নিজের মা মনে করতে পারিসনি সে চলে যাওয়ার পরে তুই যে তার নামে চুরির মামলা দিবি না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

: আমাকে এভাবে অপমান করার মানে কী ?

ম্যাজিষ্ট্রেট বলল , অপমান নয় ; অবিশ্বাস।

: কিন্তু কেন ?

: আপনি কি কিছুই বুঝতে পারছেন না ?

: না।

: আপনাকে বুঝতে হবে না। আপনি সাইন করুন।

: আমি সাইন করব না।

: বেশ।

ম্যাজিষ্ট্রেট এডভোকেটকে বলল , চলুন।

এডভোকেট আতিককে বলল , তুই কি বোকা ? বল তো ! উনি তো এখনই গিয়ে তোর নামে মামলা করবে, তুই জানিস ? আমি তোর বন্ধু, তোর বউ আমাকে নিয়ে এসেছে। তার যদি কোনো অন্যায় থাকত সে কি আমার কাছে যেত ? উনি একজন ম্যাজিষ্ট্রেট, উনি কি তার বন্ধু হত ?

: কোথায় সাইন করতে হবে ?

এডভোকেট দেখিয়ে দিল।



গ্রামের বাড়িটা সাত বছর তালা দেওয়া ছিল। তাকি তার মাকে নিয়ে যাবে বলে তার মেজ ভাই পরিষ্কার করিয়ে রাখল। তাকি লোকজন ডেকে বাড়ির চেহারা পরিবর্তন করে ফেলল। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে দেখে তাকির মা অনেক সু¯থ হয়ে গেলেন। তাকি সবাইকে জানিয়ে দিল, আমার মা যতদিন পৃথিবীতে আছেন আমি ততদিন আমার মা’র কাছেই থাকব। আমার মা নিজের হাতে এই বাড়ি বানিয়েছে। এই বাড়ির আলো-বাতাসেই আমার মা’র মৃত্যু হবে এবং তার মৃত্যুর সময় তার একটা মাত্র সন্তান তার কাছে থাকবে। সেই সন্তানটা আমি। এই কথাটা আতিকের কানে গেল। সে তাকিকে ফোন করল। তাকি বলল, মাকে একা ফেলে আমি তোমার কাছে যাব এটা তুমি কী করে ভাবলে ? আমি ঐসব অমানুষের মতো না যারা স্বামী বা স্ত্রীর ভয়ে মাকে দূরে ঠেলে দেয়। মা’র চেয়ে আপন কেউ নেই। কোনো শারীরিক, মানসিক, সামাজিক বা আর্থিক কারণে মাকে আমি ফেলতে পারব না।

: আমি একা কিভাবে থাকব ?

: তুমি যদি একা থাকতে না পার তাহলে আমাদের বাড়িতে এসে থাক। এখানে থাকা-খাওয়ার কোনো সমস্যা নেই।



রচনা- ২৫.৫.২০১২

প্রকাশ- জুন, ২০১২



মন্তব্য ৫ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৫) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে মে, ২০১৪ রাত ১:৩৫

খেয়া ঘাট বলেছেন: +++++++++

২| ২৯ শে মে, ২০১৪ ভোর ৫:২০

সকাল হাসান বলেছেন: ++++++++

৩| ২৯ শে মে, ২০১৪ সকাল ৯:২২

আজীব ০০৭ বলেছেন: +++

৪| ২৯ শে মে, ২০১৪ দুপুর ১:৩৭

এহসান সাবির বলেছেন: ভালো লিখেছেন।

৫| ৩০ শে মে, ২০১৪ রাত ৮:৪৮

নাসরিন সুলতানা বলেছেন: ধন্যবাদ, ভাইয়া, দোয়া করবেন।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.