| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কেল্টিক ও আইরিশ রূপকথায় আপেল
কোন্নলা এবং জাদুকরী আপেল।

জাদুকরী চুলের কোন্নলা (Connla of the Fiery Hair) ছিলেন কন্ন অব দ্যা হান্ড্রেড ব্যাটলস (Conn of the Hundred Battles) এর অন্যতম প্রিয় পুত্র। একদিন সামহাইন উৎসবের জন্য পিতা-পুত্র উসনা নামক পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলেন। তো সেখানে ছিল তীব্র শীত। কন্নলা হঠাৎ দেখতে পেলেন এক সুন্দরী তরুণী সেই শীতে হালকা পোষাকে তার সামনে আসছে কিন্তু তার শীত লাগছে না, তাকে মনে হচ্ছে বসন্তে আছে। অবাক হয়ে কন্নলা জিজ্ঞেস করতে লাগল সে কে, কোথা থেকে এসেছে? তো সেই তরুণী বললো সে এসেছে চিরঞ্জীবিদের দেশ থেকে। সেখানে মৃত্যু, ক্ষুধা, যুদ্ধ কিছুই নেই শুধু বসন্ত আর চির আনন্দ।
রাজা তখন কন্নলাকে জিজ্ঞেস করলো, সে কার সাথে কথা বলছে। কন্নলা বললো ঐ যে একজন সুন্দর তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। রাজা দেখতে পাচ্ছিলেন না। তখন হঠাৎ সেই তরুণিটির আওয়াজ শুনতে পেলেন এবং সেই তরুণিটি রাজাকে বলে সে কন্নলাকে ভালোবাসে এবং তাকে নিয়ে যাবে অমরত্বের দেশে। এই কথা শুনে রাজা ভয় পেয়ে গেলেন এবং পুরোহিতকে ডাকলেন যাতে সে মন্ত্র জপে ঐ পরীকে তাড়িয়ে দেয়।
মন্ত্র পাঠ করায় পরীটির আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে আসছিল এবং যাবার সময় পরীটি একটি আপেলে ফেলে যায় এবং কন্নলা সেটি দ্রুত কুড়িয়ে নিয়ে লুকিয়ে ফেলে। পরবর্তী একমাস সে এই আপেল ছাড়া আর কিছু খায়নি। সে যখন আপেল খেত, সাথে সাথে আপেলটি আবার পূর্ণ হয়ে যেত।
একমাস পরে পরীটি আবার আসে। এবং ফিসফিস করে কন্নলাকে ডাকে। রাজা শুনে ফেলে পুরোহিতকে ডাকে। তখন মেয়েটি রাজাকে বলে তারা মৃত্যুকে ভয় পায় না। কারণ তারা অনেক আগেই মারা গেছে। পুরোহিতও এই কথায় সম্মতি দেয়, তখন রাজা কন্নলাকে বলে কি করবে? কন্নলা বলে সে তার পরিবারকে সবথেকে বেশি ভালোবাসে কিন্তু মেয়েটিকেও তার খুব পছন্দ হয়েছে। তখন পরীটি বলে আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। সূর্য ডোবার আগেই আমরা পৌঁছাতে পারব এবং মানানান ম্যাক লির-এর রাজ্যে ভোজ শেষ করে নারী ও কুমারীদের দেশে চলে যাব, সেখানেই গড়ে তুলব আমাদের ঘর।"
তারপরে হঠাৎ মেঘের ভেতর থেকে একটি নৌকা ভেসে আসে এবং কন্নলা ও পরীটি সমুদ্রের ওপর দিয়ে অস্তগামী সূর্যের দিকে যাত্রা করে।
মানানান ম্যাক লির এর রুপালি গাছ
সমুদ্রের দেবতা মানানান-এর কাছে তিনটি সোনার আপেলসহ একটি রুপালি গাছের ডাল ছিল। এই ডালটি নাড়া দিলে এমন এক জাদুকরী সুর তৈরি হতো, যা শুনলে যে-কোনো অসুস্থ বা আহত মানুষ ব্যথামুক্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত।
আলভান দ্বীপের গল্প
প্রাচীন সেল্টিক বিশ্বাস অনুযায়ী, আভালন কোনো সাধারণ দ্বীপ ছিল না। এটি ছিল কুয়াশায় ঢাকা এক অদৃশ্য বা অন্য জগতের (Otherworld) অংশ, যেখানে সাধারণ মানুষ চাইলেই পৌঁছাতে পারত না। প্রাচীন সেল্টিক বিশ্বাস অনুযায়ী, আভালন কোনো সাধারণ দ্বীপ ছিল না। এটি ছিল কুয়াশায় ঢাকা এক অদৃশ্য বা অন্য জগতের (Otherworld) অংশ, যেখানে সাধারণ মানুষ চাইলেই পৌঁছাতে পারত না। আভালন দ্বীপের শাসনভার ছিল আর্থুরিয়ান উপকথার বিখ্যাত জাদুকরী মরগান লে ফে (Morgan le Fay) এবং তার আট বোনের হাতে। এই ৯ বোন চিকিৎসার জাদুবিদ্যা, রূপ পরিবর্তন (Shape-shifting) এবং আকাশে ওড়ার ক্ষমতায় পারদর্শী ছিলেন। তারা এই দ্বীপে এক গোপন জাদুকরী আশ্রম পরিচালনা করতেন।
ক্যামলনের যুদ্ধে (Battle of Camlann) রাজা আর্থার জয়ী হলেও মর্ড্রেডের আঘাতে তিনি মৃত্যুর মুখে পতিত হন। তার একটি বিখ্যাত একটি জাদুর তরবারি ছিল যার নাম ছিল এক্সকালিবার। হ্রদের দেবী তাকে এই তরবারিটি দিয়ে ছিলেন। তিনি তার সেনাপতির মাধ্যমে সেটি দেবীর কাছে ফেরত দেন। তার অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। এরপরই কুয়াশার বুক চিরে হ্রদে একটি রহস্যময় কালো নৌকা এসে হাজির হয়। সেই নৌকায় ছিলেন রাজা আর্থারের বোন ও শক্তিশালী জাদুকরী মরগান লে ফে (Morgan le Fay) এবং তার আরও কয়েকজন জাদুকরী সঙ্গী। তারা কাঁদতে কাঁদতে রক্তাক্ত রাজা আর্থারকে নৌকায় তুলে নেন এবং তাকে সুস্থ করার জন্য কুয়াশায় ঘেরা রহস্যময় দ্বীপ 'আভালন'-এর উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে মরগান লে ফে তার জাদুকরী ক্ষমতা দিয়ে আর্থারের ক্ষত সারিয়ে তোলেন।
সেল্টিক লোককথা অনুযায়ী, রাজা আর্থার কিন্তু মারা যাননি। তিনি আভালন দ্বীপের এক গোপন গুহায় গভীর ঘুমে মগ্ন আছেন। যখনই ব্রিটেনের ওপর চরম বিপদ নেমে আসবে, তখনই তিনি আবার জেগে উঠবেন, তরবারি 'এক্সকালিবার' (Excalibur) হাতে নিয়ে ফিরে আসবেন নিজের রাজ্য রক্ষা করতে।
সাধু কোনোরিনের পুনর্জন্ম

কোনোরিন ছিলেন ব্রিটানি অঞ্চলের একজন সাধু। লোককথা অনুযায়ী, একদল ডাকাতের হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। মৃত্যুর পরে সাধু কোনোরিনের আত্মা একটি আপেল ফলে রূপান্তরিত হয়। কোন এক কুমারী মেয়ে সেই আপেল খেয়ে ফেলার সাথে সাথে গর্ভবতী হয়ে পড়ে এবং তার ঔরষ থেকে সাধু কোনোরিনের পুনর্জন্ম হয়।
আব্রাহামিক ধর্ম ও মধ্যপ্রাচ্যে আপেল
ইডেন গার্ডেনের নিষিদ্ধ ফল

ঈশ্বর আদম ও হওয়াকে সৃষ্টি করার পরে জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করেন। কিন্তু ইবলিস শয়তান তাদেরকে সাপের রূপ ধারণ করে প্ররোচিত করে এবং তারা ফলটি ভক্ষণ করে। সাথেসাথে তারা উলঙ্গ হয়ে যান এবং মলত্যাগের চাপ অনুভব করেন এবং ঈশ্বর তাদের বেহেশত থেকে বিতাড়িত করেন। আদম ফলটি খাবার সময় নিষেধাজ্ঞার কথা মনে পড়ায় গলায় চেপে ধরেছিলেন। এজন্য গলার উঁচু অংশটিকে Adam apple বলা হয়।
আপেল কীভাবে নিষিদ্ধ ফল হলো?
বাইবেলের কোথাও 'আপেল' শব্দটির উল্লেখ নেই, সেখানে কেবল 'ফল' (Fruit) বলা হয়েছে। তবে ল্যাটিন ভাষায় 'মন্দ বা পাপ' শব্দটিকে বলা হয় "Malus", আর 'আপেল' শব্দটির ল্যাটিন অনুবাদও "Malus"। চতুর্থ শতাব্দীতে যখন বাইবেল ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়, তখন এই শব্দসামঞ্জস্যের কারণে মানুষের মনে নিষিদ্ধ ফল হিসেবে আপেলের ধারণা গেঁথে যায়। পরবর্তীতে মধ্যযুগীয় বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের চিত্রকর্মে নিষিদ্ধ ফল হিসেবে আপেলকে দেখানোর পর এটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
আরব্য রজনীতে আপেল।

একদিন রাতে বাগদাদের খলিফা হারুন-অর-রশিদ এক ধীবরকে মাছ না পাওয়ার হতাশায় বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখতে পান। তখন খলিফা তাকে বলেন সে যদি তার সঙ্গে গিয়ে দাজলা নদীতে জাল ফেলে তবে প্রথমবারে যা পড়ে তার বিনিময় মূল্য হিসেবে ১০০ দিরহাম দিবে। কিছু না পেলেও দিবে। জাল ফেলার পরে মাছটাছ কিছু না উঠে একটি সিন্দুক উঠে। খলিফা সেটি প্রাসাদে নিয়ে এসে খুলে দেখে একটা সাদা বোরকা এবং টুকরো টুকরো করা একটি মেয়ের মৃত দেহ।
তৎক্ষনাত খলিফা তার উজির জাফরকে ডেকে বললেন তিন দিনের ভেতর খুনিকে বের করতে না হলে তাকে নির্বংশ করে দিবে। তিনদিন শেষ হয়ে এলে খলিফা সিদ্ধান্ত নেন জাফরকে মৃত্যুদণ্ড দিবেন। সারা শহরে ঢোল পিটিয়ে ফরমান জানিয়ে দেয়া হলে মৃত্যুদণ্ড দেখতে লোকজন জড়ো হলে দণ্ডের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এক লোক দৌড়ে এসে বাদশা’র সামনে উপস্থিত হয় এবং বলে সেই আসামি। তখন আরেক বৃদ্ধ এগিয়ে বলে যে সেই আসামি আগের লোক মিথ্যে বলছে। এরপরে সে যুবক লোকটিকে বলে আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি আমিই বরং মারা যাই; তুমি বাঁধা দিও না।
তখন যুবক চিৎকার করে বলে যে সেই আসল খুনি। এবং সে তার খুনের গল্প বলে। তার স্ত্রী মারাত্বক অসুস্থ হওয়ায় রুচি নষ্ট হয়ে যায় ফলে সে আপেল খেতে চাইলে সে আপেল খুঁজতে বেরোয় কিন্তু তখন আপেলের সিজন না থাকায় সে বাজার তন্নতন্ন করে খুঁজেও না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যায়। পরের দিনও কোথাও আপেল না পেয়ে সিদ্ধান্ত নেয় বসরার বাজারে যাবে। সেখানে যেতে আসতে প্রায় পনেরো দিনের পথ। যাই হোক সেই বাজারে সে তিনটি আপেল পায় এবং বিবির জন্য নিয়ে আসে। পরের দিন বাজার থেকে ফিরে আসার সময় দেখতে পায় এক নিগ্রো একটি আপেল নিয়ে খেলতে খেলতে যাচ্ছে। তখন লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করে সে আপেল কোথায় পেয়েছে। নিগ্রো লোকটি জবাব দেয় এক মহিলার সঙ্গে তার প্রেম আছে সেই দিয়েছে এবং বাড়ির ঠিকানা বল্লে তা লোকটির বাড়ির ঠিকানার সঙ্গে মিলে যায়। নিগ্রোটি আরো বলে তার প্রেমিকার জামাই নাকি ১৫দিন ধরে এই আপেল কিনে আনছে তার বিবির জন্য। তৎক্ষনাত সে বাসায় এসে তার বিবিকে হত্যা করে সিন্দুকে ভরে গোপনে নদীতে ডুবিয়ে দেয়।
বাসায় ফিরে দেখে তার ছেলে ভয়ে কাঁদছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে যে সে তার মায়ের শয্যা থেকে একটা আপেল চুরি করে নিয়ে খেলা করতে ছিল তখন এক নিগ্রো তাকে মেরে আপেলটি নিয়ে গেছে তাই সে কাঁদছে। তখন লোকটি আফসোস করে হায় সে বিনা কারণে তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে। তখন খলিফা ক্ষিপ্ত হয়ে উজিরকে বলে সেই নিগ্রোকে ধরে আনতে না হলে তাকে শূলে চড়াবে। আবারও মৃত্যুর মুখোমুখি হলে উজির জাফর হতভম্ব হয়ে গেল। মনের দুঃখে সে তার ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করতে গেলে তার পকেটে একটি আপেল পায় তার মেয়ে বলে যে তাদের গৃহভৃত্য আবারও রেহান তাকে আপেল দিয়েছে। তখন রেহানকে জিজ্ঞেস করলে রেহান বলে সে খুকুমনির জন্য আপেলটি নিয়ে এসেছে একটি বাচ্চা ছেলের কাছ থেকে। তখন তাকে বন্দী করে খলিফার দরবারে নিয়ে গেলে ঘটনা শুনে বাদশাহ অবাক হন। নিগ্রোটি ছিল বোকা কোন কথার নিগ্রো কি হয় কারণে জ্ঞানবুদ্ধি তার ছিল না। তাই খলিফা আরেকটি হত্যার নিরীহ হত্যার মুখোমুখি হতে চাইলেন না তাই তাকে মাফ করে দিলেন।
চলবে...
©somewhere in net ltd.