নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

necropolis2utopia

ওমর _শরীফ

আরবান ডিজাইন কনসালটেন্ট

ওমর _শরীফ › বিস্তারিত পোস্টঃ

ঢাকা শহরের যানজট সমস্যা : চাই একজন এনরিকে পেনালোসা

০২ রা আগস্ট, ২০১৩ বিকাল ৪:২৪

বসবাসযোগ্য শহর গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে গণপরিবহন ব্যাবস্থার উপস্থিতি ও এর নেট ওয়ার্কের বিস্তৃতি। কেননা শহরের মূলমন্ত্র Communal living – এর মত Communal mobility একটি গুরুতবপূর্ণ ব্যাপার। কিন্তু ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে এই Common mobility – এর ধারনা হুমকির সম্মুখীন। একসময় শহরের বিস্তৃতি মানুষের পায়ে হাটা দূরত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। শহরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে প্রথমে রেল ও পরে মটর গাড়ীর কল্যাণে মানব বসতি একটি জায়গায় গন্ডিবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পরেছে। ফলে শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাবার জন্য মানুষ পায়ে হাটার পরিবর্তে যানবাহনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পরেছে । বর্তমান আধুনিক শহরের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে মানুষের পাশাপাশি গাড়িকে সংস্থান করা ।



ঢাকায় আরও ফ্লাইওভার করার পরিকল্পনা আছে এবং ২০৩৫ সালের মাঝে ঢাকা শহরকে সম্প্রসারিত করে পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে (প্রথম আলো ২৩ শে জুন ,২০১০ )৷ এটা ঠিক যে ঢাকা শহর সম্প্রসারণে নতুন রাস্তা তৈরী করার দরকার , কিন্তু যানজট নিরসণে শুধু নতুন রাস্তা বা এলিভেটেড হাইওয়ে তৈরী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নয় ৷ রাস্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া ৷ যানজট নিরসনের দরকার উপযুক্ত গণপরিবহন ব্যাবস্থা ( Public Transport System ) এবং একই সাথে রাস্তায় ব্যাক্তিগত যানবাহনের ( Private Vehicle ) সংখ্যা কমানো বা নিয়ন্ত্রণ করা ৷



অতীতে দেখা গিয়েছে যে যানজট নিরসণে নতুন রাস্তা বা ফ্লাইওভার তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে ব্যার্থ ৷ ফলাফল স্বরুপ অনেক শহরেই এলিভেটেড হাইওয়ে এবং এক্সপ্রেসওয়ে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে ৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে উত্তর আমেরিকার সানফ্রানসিসকো এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল শহরের কথা ৷ তদুপরি জলবায়ু পরিবর্তন ( Climate Change ) সংক্রান্ত সমস্যা এবং পরিবেশ দূষণ রোধেও রাস্তায় গাড়ীর সংখ্যা কমিয়ে ফেলা জরুরী ৷ যারজন্য উন্নত বিশ্বের অনেক শহরেই গাড়ী চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে তা পথচারী এবং বাইসাইকেল চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে ৷ সেইসাথে মানুষকে ব্যাক্তিগত গাড়ীর বদলে গণপরিবহন ( Public Transport ) ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে ৷ তাছাড়া যতই নতুন রাস্তা বা ফ্লাইওভার তৈরী করা হোক, ভবিষ্যতে সেটাও একসময় ধারণ ক্ষমতা অতিক্রম করে যাবে যদি না রাস্তায় গাড়ীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হয় ৷ রাস্তায় গাড়ীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা কমানোর সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ হচ্ছে এমন একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা যেটা হবে সহজলভ্য, আরামদায়ক এবং অবশ্যই ব্যক্তিগত যানবাহন থেকে সাশ্রয়ী এবং গতিশীল ৷



ঢাকার বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব করুণ ৷ সব রাস্তায় রিকশা চলেনা ৷ প্রয়োজনের তুলনায় বাসের সংখ্যা অপ্রতুল এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে মহিলা, শিশু ও বয়স্ক লোকের জন্য উপযুক্ত নয়৷ সি.এন.জি. চালিত অটোরিকশা বা ট্যাক্সিক্যাবের কথা না হয় বাদই দিলাম৷ এরা খুবিই দুষ্প্রাপ্য বস্তু এবং এদের ভাড়া সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে ৷ এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে ঢাকা শহরে ব্যক্তিগত গাড়ীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতেই থাকবে এবং ফলাফল স্বরুপ অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য ৷ আর্থিক এবং কারিগরী সক্ষমতা অর্জন করার সাথে সাথেই যানজট নিরসনে আমাদের ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড হাইওয়ে তৈরীতে মনোনিবেশ করতে হবে এমন কোনো কথা নেই৷ এর থেকে অনেক কম খরচে এবং বিকল্প পদ্ধতিতে যানজট নিরসন সম্ভব যা কিনা পরিবেশের উপরেও চাপ ফেলবে না ৷ দুঃখের বিষয় হচ্ছে মানুষ অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না ৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন বড় বড় শহর যে ভুল করেছিল অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে এতদিন পর আমরা সেই একই ভুলের দিকে ধাবিত হচ্ছি৷ মনে রাখতে হবে ” Cities Are For People, Not For Cars.” এ সম্পর্কে আমাদের নগর পরিচালনা ও প্রশাসন কার্যক্রমের সাথে জড়িত ব্যক্তিরাও বা কতখানি সচেতন?



কলম্বিয়ার বোগোতা ( Bogota, Colombia) শহরে যানজট নিরসনের লক্ষে ১৯৯৭ সালে জাপানী বিশেষজ্ঞরা শহর জুড়ে এলিভেটেড হাইওয়ে তৈরী করার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেন ৷ কিন্তু ১৯৯৮ সালে তৎকালীন নবনির্বাচিত মেয়র এনরিকে পেনালোসা (Enrique Penalosa) এই প্রকল্পে দ্বিমত পোষণ করেন ৷ কারণ আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি ছিল ব্যায়বহুল এবং তিনি এও বুঝতে পারেন যে শহর জুড়ে এলিভেটেড হাইওয়ে শহরের পরিবেশের জন্য মোটেই ভালো কিছু নয়৷ এতে করে রাস্তায় গাড়ীর সংখ্যা এবং একই সাথে বায়ু ও শব্দ দুষণ বাড়বে বৈ কমবে না৷ তার মতে, “A city can be friendly to people or it can be friendly to cars, but it can’t be both” ফলাফল স্বরুপ তিনি প্রকল্পটি বাতিল করে দিয়ে তার বদলে অনেক কম খরচে ব্রাজিলের কুরিটিবা ( Curitiba, Brazil) শহরের বাস ‌‌র‍্যাপিড ট্রানসিট সিস্টেমের আদলে ট্রান্সমিলেনিও (TransMileneo) নামে একটি বি.আর.টি. সিস্টেম (যেখানে বাস চলাচলের জন্য রাস্তার একটি নির্দিষ্ট লেন সংরক্ষিত থাকে এবং এই লেনটি অন্যকোন যানবাহন ব্যাবহার করতে পারেনা) চালু করেন। এর সফলতা বর্তমানে পৃথিবীর সব দেশেই উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ৷ কেননা পিক আওয়ারে সাধারন গাড়ি যখন ট্রাফিক জ্যাম আটকে থাকবে তখন এই সিস্টেমে চলাচলকারি বাস সংরক্ষিত লেন ব্যাবহার করে দ্রুত ও সহজেই তার গন্তব্যে পৌছাতে সক্ষম হবে। ফলে একসময় দেখা যাবে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমে এসেছে।



শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দক্ষ মানব সম্পদ তৈরীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন (প্রথম আলো ১২ই জুলাই,২০১৩)। কিন্তু শুধু দক্ষ মানবসম্পদ তৈরী করলেই হবেনা, এই দক্ষ মানবসম্পদকে দক্ষভাবে তার কর্মস্থলে পৌছে দেয়া প্রয়োজন, যেটি একটি দক্ষ গণপরিবহন ব্যাবস্থা ছাড়া সম্ভব নয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আহমেদাবাদ, দিল্লী, পুনে সহ আরও বেশ কয়েকটি শহরে বি.আর.টি. সিস্টেম চালু করা হয়েছে। ঢাকার যানজট নিরসনে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশি বিদেশী পরিবহন বিশেষজ্ঞদের জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে তৈরী S.T.P. প্রতিবেদনেও B.R.T. বা বাস ‌র‍্যাপিড ট্রান্সিট সিস্টেম এর কথা বলা হয়েছে (প্রথম আলো ৯ ই মে ,২০১০), কিন্তু আদৌ এর কোনো বাস্তবায়ন হবে কিনা কে জানে ?



মোঃ ওমর শরীফ

স্থপতি, আরবান ডিজাইন কনসালটেন্ট

[email protected]

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.