| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কালো পায়রা
বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র, নানানভাবে নতুন জিনিষ শিখেছি দিবারাত্র
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে তীব্র ও রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে লিপ্ত হয় উপমহাদেশের দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী সহোদরা পাকিস্তান ও ভারত। এক পর্যায়ে ভারতের মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি সাধিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় তাশখন্দে ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারী তৎকালীন সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সেই কোসিজিনের আমন্তণে গিয়ে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি দস্তখৎ করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী।
কিন্তু চুক্তি সইয়ের কিছুক্ষণ পরে তাশখন্দেই হঠাৎ মারা যান শাস্ত্রী। পরদিন বিরল রাষ্ট্রাচার দেখিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর লাশবাহী কফিন নিজ নিজ স্কন্ধে তুলে বিমানে তুলে দেন আইয়ুব খান ও কোসিজিন।
এটা ছিলো বাস্তব ঘটনা। কিন্তু তাশখন্দ থেকে হাজার হাজার মাইল পূর্বে অবস্থিত এই বঙ্গাল মুল্লুকে তখন ছড়িয়ে পড়েছিলো অন্য কথা। সেটা হচ্ছে, পাঁচ ফুটের কিছু বেশি উচ্চতার ক্ষীণকায় শাস্ত্রী আসলে মারা গেছিলেন ছয় ফুটের অধিক উচ্চতার বিরাটদেহী আইয়ুব খানের হাতের চাপে দম ছেড়ে দিয়েছেন! গুজবটা যে শেষমেশ কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলো, তার প্রমাণ হিসেবে ছোটবেলায়ও আমি অনেকের সিরিয়াস আলোচনায় এই কথা শুনতে পেতাম।
আর ভারতে ছড়িয়ে পড়ে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। আজো এই বিষয়ে জোরালো তর্কবিতর্ক সেখানে চলে। খোদ শাস্ত্রীর স্ত্রী ললিতা দেবী, পুত্র অনিল শাস্ত্রী এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সামনে আনেন। ললিতা শাস্ত্রী দাবী করেন শাস্ত্রীর লাশের ঊর্ধাংশ নীল হয়ে গেছিলো। কেবল তাই নয়, কোন ময়নাতদন্ত না হলেও কেন শাস্ত্রীর পেটে কাটাছেঁড়া দেখা গেছিলো, এই জিজ্ঞাসা শাস্ত্রীর মৃত্যুকে ঘিরে ঘনীভূত হওয়া ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে জোরদার করে। আর একে আজো জাগরুক রেখেছে শাস্ত্রীর মৃত্যু সংক্রান্ত তামাম দস্তাবেজ ভারত সরকার কতৃক কঠোর গোপনীয়তার সাথে আটকে রাখা।
ভারতের প্রতিটা গোষ্ঠী নিজ নিজ গণ্ডিতে থেকে এই শাস্ত্রীর মৃত্যুর পেছনের রহস্যের ব্যাখ্যা দেন। যেমন, কুসুম কুসুম থেকে তীব্র মুসলিম বিদ্বেষী ভারতীয়রা তাশখন্দে উচ্চ বর্গের ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর খাবার প্রস্তুতের জন্য কেন তাঁর ব্যক্তিগত খাদেম রাম নাথের বদলে সোভিয়েত ইউনিয়নে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ত্রিলোক নাথ কাউলের বাবুর্চি জান মোহাম্মদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো, তার জবাবেই শাস্ত্রীর মৃত্যু রহস্যের খোলাসা হওয়া, না হওয়া নিহিত বলে মনে করে। বামপন্থীরা মনে করে শাস্ত্রীর খুনের ব্যাপারে আমেরিকার হাত আছে।
কেউ কেউ তো এমনও বলেন, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে গুম হওয়া সুভাষ চন্দ্র বসুকে খুঁজে পেয়েছিলেন, এবং তাঁকে ভারতে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে কেউ পাকিস্তানের কথা এক্ষেত্রে বলে না!
কিন্তু লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু ঘিরে হওয়া যাবতীয় আলোচনায় অনিবার্যভাবে দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোন কোন হাত থাকার কথা আলোচিত হয়। ইনিয়েবিনিয়ে এর জন্য দায়ী করার চেষ্টা করা হয় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসেরই একটি গোষ্ঠীকে। এটার পেছনেও বাস্তব কারণ আছে।
১৯৬৪ সালে ১৭ বছর ভারত শাসন করার পর মৃত্যু হয় জওহরলাল নেহরুর। তিনি এমন একজন শক্তিশালী নেতা ছিলেন, যিনি একাধারে দেশ ও ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকারী ছিলেন। নেহরুর মৃত্যুর পর তাঁর সম্ভব্য উত্তরসূরী হিসেবে শাস্ত্রী আলোচনায় থাকলেও আলোচনা হচ্ছিলো নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ও প্রভাবশালী নেতা মোরারজি দেশাইয়ের নাম। কিন্তু এদের সম্ভাবনাকে দরকিনার করে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী হন।
কিন্তু এই ডামাডোলে প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে পার্টির কব্জা ছুটে যায়। কংগ্রেস চলে যায় তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি কে কামরাজের নেতৃত্বাধীন একটি অহিন্দীভাষী উপদলের নিকট, যা 'সিন্ডিকেট' নামে খ্যাত। কামরাজ ছাড়া এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের নেতা অতূল্য ঘোষ, অন্ধ্রের নেতা নীলম সঞ্জীব রেড্ডি, বোম্বাইয়ের এস কে পাতিল এবং তৎকালীন মহীশুর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এস নিজলিঙ্গপ্পা।
এই সিন্ডিকেট সেসময় কিং মেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। নেহরুর মৃত্যুর পর কামরাজ লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে এই ভেবে সমর্থন দেন যে, ছোটখাটো গড়নের শাস্ত্রী নরম লোক হওয়ায় দলের পাশাপাশি সরকারও সিন্ডিকেটের প্রভাবে চলবে। অর্থাৎ সামনে উত্তর ভারতের একজন শিখণ্ডীকে রেখে অহিন্দীভাষী নেতাদের উপদল সিন্ডিকেট ভারতের আসল মালিক-মোখতার হবে
কিন্তু অচিরেই দেখা গেলো শাস্ত্রী আমার মতো! অর্থাৎ চলনেবলনে নম্রতা আর আনুগত্যের ভাব থাকলেও তিনি আসলে শক্ত লোক। উনিশ মাস প্রধানমন্ত্রীত্ব করে যখন তিনি তাশখন্দ গেলেন, তখন ভারতের খাদ্য সংকটের উপর তিনি নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে ফেলেছেন। এমনকি একটি যুদ্ধে ফলপ্রসূ উপায়ে দেশের নেতৃত্বও দিয়েছেন।
ছোট ব্যক্তি থেকো সহসা বড় নেতায় পরিণত হওয়া লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর নেতৃত্বের দ্যুতিতে কেবল সিন্ডিকেটের প্রভাবই ফিকে হয়ে যাচ্ছিলো না, পাশাপাশি নেহরুর কন্যা হিসেবে ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বে যাবার পথ ইন্দিরা গান্ধীর জন্যও ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। ইন্দিরাকে শাস্ত্রী তাঁর ক্যাবিনেটে তথ্যমন্ত্রী হিসেবে ঠাঁই দিলেও উভয়ের সম্পর্ক ছিলো শীতল। এরই সূত্রে ইন্দিরা গান্ধীকে ব্রিটেনে ভারতের রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়ে দেয়ার কথা ভাবছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রী।
কিন্তু এই সময়ে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু পুরো দৃশ্যপটকেই বদলে দেয়। শাস্ত্রীর লাশ তাশখন্দে থাকতেই ইন্দিরা গান্ধী একের পর এক মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর পক্ষভূক্ত করতে শুরু করেন। সিন্ডিকেট আরেকবার মোরারজি দেশাইকে নিরাশ করে এবার ইন্দিরা গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করে দেয়। দ্বিতীয়বারের মতো ব্যক্তি চিনতে ভুল করেছিলো তারা। সিন্ডিকেট ভেবেছিলো রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ এবং স্বভাবে অন্তর্মুখী ইন্দিরার কাঁধে নুন থুয়ে তারা বরই খাবেন!
১৯৬৮ সাল নাগাদ ইন্দিরা গান্ধী সিন্ডিকেটকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত এবং অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলেন। এরপরের ইতিহাস তো এখনো চলমান!
আমার এই দীর্ঘ লেখায় দুটি বিষয় উঠে আসে। প্রথমত, গুজব উপমহাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ চাইলেই গুজবকে বরতরফ করে মেকি পিউরিটান সাজতে পারবেনা। সেক্ষেত্রে সে ব্যর্থ হবে।
দ্বিতীয়ত, এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আর ষড়যন্ত্র কার্যত একে অপরের সম্পূরক এবং পরিপূরক। ফলে এসব ষড়যন্ত্র বিশ্লেষণে আমাদের সাবধান না হয়ে উপায় নেই। সরল এবং হেঁড়ে ধারণার বশবর্তী হয়ে কোন উল্টাপাল্টা বা হঠকারী কদম ফেলে ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে গেলে বিপদ অনিবার্য...!
©
ছবি-
১। তাশখন্দে আলোচনারত লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ও আইয়ুব খান। নেতার শারীরিক বৈশিষ্ট যে দেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ, তা শাস্ত্রীর দিকে তাকালে উপলব্ধি হয়। তাঁর খর্বাকৃতি, ক্ষীণ আওয়াজ পরোক্ষভাবে তাঁকে ক্ষমতাসীন হতে সাহায্য করে। কারণ এগুলোর নিরিখে ভাবা হয়েছিলো তিনি দুর্বল ও স্বভাবে অনুগত। একই কারণে আইয়ুব খান ভেবেছিলেন এমন দুর্বল প্রধানমন্ত্রী থাকায় ভারতের নিকট থেকে জম্মু কাশ্মীর ছিনিয়ে নেয়ার এখনই সুবর্ণ সুযোগ। চীনও এই সুযোগে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়, পাছে তা ভারতের ছোট উচ্চতার প্রধানমন্ত্রীকে রাজনৈতিক এবং মানসিকভাবে নাস্তানাবুদ করে ফেলবে।
২। তাশখন্দ চুক্তি দস্তখতের পর ত্রিপক্ষীয় মোসাফা করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সেই কোসিজিন। শাস্ত্রীর পেছনে তাৎপর্যপূর্ণ মুখভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে।
চতুর ভুট্টোর মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো যেন, তখন তিনি নিরাশা ও ক্ষোভ লুকানোর চেষ্টা করছেন। এই অভিনয়টা তিনি করেছিলেন স্বীয় রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে। এর অংশ হিসেবে তিনি ফিরে গিয়ে আইয়ুব খানের সরকার থেকে বের হয়ে যান। দেশময় সফর করে তাশখন্দ সমঝোতাকে আইয়ুব খানের অদক্ষতা বলে ঘোষণা করে এবং নিজেকে আইয়ুবের অদক্ষতার শিকার বলে জাহির করে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে নিজেকে এবং নিজের দল পিপিপিকে খুব ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
৩। ১৯৬৬ সালের ১১ জানুয়ারী তাশখন্দ বিমানবন্দরে প্রয়াত লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর লাশ কাঁধে তুলে বিমানের দিকে যাচ্ছেন আইয়ুব খান এবং অ্যালেক্সেই কোসিজিন। এই ঘটনাকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম নায়াব এক প্রটোকল হিসেবে দেখা হয়ে থাকে।

১২ ই আগস্ট, ২০১৮ বিকাল ৫:৫১
কালো পায়রা বলেছেন: আগেরটায় ঝামেলা হওয়ার কারনে নতুন আইডিতে আসতে হল।
©somewhere in net ltd.
১|
১২ ই আগস্ট, ২০১৮ বিকাল ৩:০৭
বিজন রয় বলেছেন: ব্লগে স্বাগতম।
শুভ ব্লগিং।