| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এর আগে আমার দুটি লেখায় আমি লিখেছি হিজড়া সম্প্রদায়ের আড়ালে সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বন্ধ্যত্ব সম্পর্কে, আরেকটিতে গেয়েছি ছলনায় শিক্ত তবু দূর্বার নারী শক্তির জয়গান। আজকেও সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে কথা বলব, তবে আমার ভাষায়। সত্যি বলতে আমি কখনও এমন কিছু লিখি না যা আমার জীবনে সত্যকার অর্থে কখনও ঘটে নি। তাই আজকের লেখনিতে নিজের সেই অভিজ্ঞতার আলোকে সমাজকে ঠিক মূল্যায়ন নয়, সামাজিক সচেতনতার ভারে দায়ী করব ।
দুই ঈদের মধ্যে সব চে প্রিয় ছিল রোজার ঈদ বা ইদ-উল-ফিতর। পশু কুরবানি হয় বিধায় ঈদ-উল-আজহা অত একটা প্রিয় ছিল না। আর ঈদের সবচে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নতুন জামা কেন যেটি হবে সবার থেকে সেরা ও সেটিকে শেষ অবধি লুকিয়ে রাখা যাতে কেউ একই ডিজাইন যুক্ত জামা না কিনতে পারে। এবং দিন পনের আগে থেকে ঈদের আয়োজন শুরু হত। কিন্তু ঈদের দিন মন খারাপ হয়ে যেত। যেহেতু বন্ধুদের সাথে ঈদ হত না, নতুন জামা পড়ে ফেলার পর আর কোন কাজও অবশিষ্ট থাকত না। এর পর ঘুমিয়ে না হয় মেহমানদারি করে সময় যেত। প্রতি ঈদে মতিন আংকেল, আরজু আংকেল, বাবা আর বিশ্বনাথ আংকেলের মধ্যে প্রতিযোগিতা হত, কে কত খেতে পারে। সাধারণত মতিন আংকেল বিজয়ী হতেন।

খুব ছোট বেলায় ঈদ সকলের বাসায় বাসায় সীমাবদ্ধ ছিল। একটু বড় হবার পর অবশ্য দেখলাম ঈদে মানুষ বাইরেও ঘুরতে যায়। বিমানবন্দর সড়কে ছিল আড্ডা দেবার সেরা জায়গা। সেনানিবাসের পূর্বে খোলা জায়গা, ভীষণ বাতাস আর মুড়ি মাখা- ফুসকা।
ঈদে প্রতিবেশীর বাসায় খাবার নিয়ে যেতাম, আর কখনও কখনও পেতাম সালামী।)তখনও মানুষ কিপটে ছিল! :/ দিতে চাইত না। আর এখন কেউ তো দেয়ই না, উলটে আমাকেই দিতে হয়
তখন আমি খুব ছোট, হয়ত দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি। স্কুল থেকে আসতে দুপুর দুটো, তারপরে গোসল, খাওয়া শেষে মায়ের হাতে মাথা রেখে চোখ বুজে না ঘুমিয়ে শুধু ঘুমিয়ে থাকার ভান করাটা নিতান্ত কষ্টের বিষয় ছিল। তবু আমার দুষ্টু বুদ্ধি, প্রাণ চঞ্চলা ছোট্ট বোনটির আবাদারের জন্য কখনও কখনও জেগে থাকতাম। তো কোনভাবে মা ঘুমিয়ে পরলেই আমরা দু বোন দুপুর চারটেয় বেরিয়ে পড়তাম খেলার দ্রব্য সামগ্রী জোগাড় করতে। আমাদের ছোট বাসাটি হিন্দু পাড়ার মধ্যেই ছিল। অদূরে ঘোষ বাড়ির সামনে এক আকারে বিশাল, বয়সে প্রবীণ কাঠ-গোলাপ গাছ ছিল যার ডাল পালার কিয়দাংশ রাস্তার ওপরে চলে আসায় কিছু ফুল ঝরে পরে থাকত রাস্তার পাশে। (এই ঘোষ বাড়ির ছেলে আমার সতীর্থ ছিল পরবর্তীতে জেনেছি তবে আলাপ ছিল না, এখন আমেরিকায় থিতু হয়েছে। আর এই বাড়ির বউটি ছিল অতি সুন্দরী আর মিষ্ট-ভাষী। আর একটি বিদেশি কুকুর ছিল যেটিকে আমরা খুবই ভয় পেতাম। তবে ইচ্ছে করে নাকি জানি না, দিনের ঠিক ওই সময়টিতে কুকুরটিকে দেখতে পেতাম না ) তো আমরা সেই ফুল নিয়ে পরে যেতাম গলির পুরনো বাড়ির দেয়াল থেকে ইটের গুঁড়ো আনতে(রান্না বাটি খেলায় এই ইটের গুঁড়ো রং এর কাজ করত
) সন্ধায় আজানের শব্দ আর শাঁখের শব্দে কান ঝালা পালা।
এবারে আসি পুজো প্রসঙ্গে। ছোট ছিলাম বলে ভীড়ে দেখতে পেতাম না কিছু, বিধায় বাবার কাঁধে করে পুজোয় ঘুরতে হত। পাশে টাক বাবু কাকা, মোচ আংকেল আর রত্না আন্টির বাসায় যাওয়া হতই। নাড়ু আর লুচি-পুরি খেতে। মনে আছে মেলায় তখন বায়োস্কোপ আসত। বায়স্কোপের নেশায় আজও আমায় ছাড়ে নারে! ১ টাকায় দু বোন দেখতে পেতাম। সিনেমার কাহিনী বলত আর টিনের ছোট ছোট ছিদ্র যুক্ত বন্ধ পেটারায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিশ্চল ছবি দেখাত। ঐ ছিদ্র গুলিতে চোখ লাগিয়ে দেখতাম আর আজকের ঠিক মলম বিক্রেতাদের ঢঙ্গের বর্ণনা শুনতে পেতাম।
এবারে চতুর্থ শ্রেণীতে আসি। আমি যেই মিশনারি বিদ্যালয়ে পড়তাম সেটি নতুন বাসার কাছেই ছিল। চার্চটিও হাঁটা পথ। চার্চের ঘন্টার আওয়াজ কেন যেন খুব পবিত্র লাগত। যদিও বড্ড শব্দ! বিদ্যালয়ের দুজন সিস্টার আর এক জন মাদার এর কথা খুব মনে পড়ে। ছোট সিস্টার খুব উৎসব প্রিয়, দুষ্টু কাজে ওস্তাদ আর আমাদের দুঃসময়ের পরিত্রাণ কর্ত্রী ছিলেন। উনার সাথে দড়ি লাফও খেলেছি।
আরেকজন মাদার তেরেসা। একবার ক্লাস চলাকালীন আমার ভীষণ জ্বর, মাথা ঘুরিয়ে অজ্ঞান। মাদার ভীষণ আদর করে জ্ঞান ফেরান আর পরবর্তীতে আমার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সেবিকাকে দিয়ে বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।এই দুজনের কেউ আজ আর বেঁচে নেই!
এবারে আমার সবচে প্রিয় শিক্ষক সিস্টার লুসি, পড়াতেন সমাজ বিজ্ঞান। এত সুন্দর করে ছবির সাহায্যে পড়াতেন, মনেও থাকত মজাও পেতাম। কয়েক মাসের মধ্যে উনি অন্য দেশে চলে যান, অন্য একটি মিশনে। যাবার আগে অনেক কেঁদেছিলাম। উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কবে ফিরবেন। বলেছিলেন ৫ বছর পর ফিরবেন। হয়ত নাও ফিরতে পারেন। মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, দেখা হবে আবার! :’( পরবর্তীতে অন্য সিস্টারদের কাছেও উনার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতাম। ৫ বছর কেটে গেলেও উনি ফিরলেন না!
সময়ের নিয়মে জীবন এগিয়ে যায়। যাত্রাপথে কত মুখ চেনা হয়, কত স্মৃতি রেখে যায়... কলেজে পড়ি তখন। ক্লাস শেষে ফিরছি হেঁটে হেঁটে। আমার পরিচিত সব সিস্টাররাই বদলি হয়েছেন অথবা ঈশ্বর প্রিয় হয়েছেন। তাই যাত্রা পথে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কোন সিস্টারের দিকে ভালো করে তাকান হয় না আর। হঠাৎ চোখের কোণে কেমন পরিচিত মুখ দেখলাম বলে মনে হল। আমরা পরস্পর হতে প্রায় ১৫ কদম পেছনে চলে গিয়েছি প্রায়। মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো “সিস্টার লুসি!” পেছন ফিরতেই দেখি উনিও আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন। কাছে জেতেই জড়িয়ে ধরে বললেন “মাই চাইল্ড! আনিকা” উনাকে বলা হয়নি কতটা ভালবাসি। বলা হবেও না হয়ত।
একই ক্লাসে আমার সাথে পড়ত শিউলি। চাপা রং সুমিষ্ট গানের গলা, নিরহঙ্কারী অতি ভদ্র মেয়েটি স্কুলের মিশনারি হোস্টেলে থাকত। কলেজ জীবনেও ওর সাথে বন্ধুত্ব ছিল। জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ থাকা সত্ত্বেও আমি গিয়েছি বার কয়েক ওর হোস্টেলে। নিজের হাতে বানান খুব সুন্দর একটি কার্ড আমার হাতে দিয়ে বলেছিল অন্য এক মিশনারিতে চলে যাচ্ছে ও, হয়ত এটাই শেষ দেখা! আমাকে ভুলতে পারবে না কখনও, আমি যেন শেষবার দেখা করতে পরের সপ্তাহে একবার আসি। আমি গিয়েছিলাম। কিন্তু ও চলে গিয়েছিল ততদিনে। ওর সতীর্থরা বলছিল যাবার আগেও ও আমার কথা মনে করে সব সিস্টারদের লুকিয়ে যেখানে যাচ্ছে সেখানকার ঠিকানা রেখে গিয়েছে। নাহ খোঁজ নেওয়া হয় নি আর! বন্ধু হিসেবে খুব একটা ভাল নই আমি।
একবার রবিবারে ওদের সাথে চার্চে গিয়েছিলাম। পবিত্র রুটি খেয়েছি। সুন্দর সুন্দর ফুল সাজান বাগান, দেয়ালে দেয়ালে সুন্দর চিত্রাঙ্কন আর অসাধারণ নির্মাণ খুবই চমকপ্রদ লেগেছিল। পরে বড়দিনের উৎসবে প্রথম রং খেলেছিলাম।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার দেখা অন্যতম ভাল মানুষটির নাম সেঁজুতি। ক্লাসের সর্বোচ্চ নম্বরধারি। ওর ক্লাসনোট ছাড়া পাস করা অসম্ভব। অহংকার তো দেখিই নি, বরং নিজ থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সব সময়। ওর ভাল কাজগুলো কেমন যেন লোক চক্ষুর আড়ালে থাকে, পারলে আরো লুকিয়ে করে কাজগুলো। ওর জীবনের ইচ্ছে সন্ন্যাস ব্রত ধারণ। ওর কাছে জেনেছি বৌদ্ধ কোন ধর্ম নয়, এটা বুদ্ধ প্রণীত একটি জীবন ধারা। যে ধর্ম মানুষকে স্বর্গ নরকের চাইতে ছোট এই জীবনের বিশাল কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ধারণা ও উৎসাহ দেয়। ও বুদ্ধপূর্ণিমায় দাওয়াত দেয় নিয়মিত।
এই যে চারটি ধর্মের উৎসবের কথা বললাম তা না বলে আমি তো বলতে পারতাম রামুতে বৌদ্ধ মন্দির ধংসের কথা অথবা মায়ানমারে মুসলিমদের দুর্দশা, ফিলিস্তিনে ইহুদীর ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে দাঙ্গার কাহিনী, রাজশাহীতে কুয়োয় গরু ফেলে দাঙ্গার কথা কিংবা তালেবান, এই, এস এর হামলার কথা। কিন্তু আমি বলেছি সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়ার কথা, সেটি কিন্তু নিছক মুখের কথা নয়।
ধর্ম যার যার উৎসব সবার! আসুন যে যাই বিশ্বাস করি না কেন মানবতাকে ধর্ম করি। যার ঈশ্বর মানুষের মন। আত্মায় ঈশ্বরের বসবাস বলে আমি বিশ্বাস করি।
(ছবি সংগৃহীত )