| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আটকে থাকা ড্রয়ারটা হ্যাঁচকা টানে খুলতে ই ঝুর ঝুর করে ঝরে পরল কয়েকটি চিঠি চৈত্রের ঝরা পাতার ই মতো ।আর একটু হাত বাড়াতে ই আর ও এবং আর ও । আশ্চর্য ! এগুলোর কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল শান্তা । কোলের উপর রেখে এগুলো নাড়তে নাড়তে পুরানো দিনের গন্ধ পাচ্ছিল সে। অনেকটা যেমন শতাব্দী প্রাচীন পরিতাক্ত কোন খানদানি বাড়ি ঘুরে ফিরে দেখতে গিলে হয় । এইযে তাদের দেউড়ী , ওই যে পুজা মণ্ডপ ,অতিথিশালা আর ও কত কি । অতঃপর ঘুরতে ঘুরতে রঙমহল। খুব স্পষ্ট হয়ে ই যেন কানে বাজতে থাকে ঝুম ঝুম ঝুমুরের বোল। একটা একটা করে চিঠি খোলে শান্তা । প্রতিটি চিঠির উপর L.NO.1,20,35 এভাবে সিরিয়াল নাম্বার লেখা । কত ছল চাতুরীর আশ্রয় নিতে হয়েছিলো এগুলোর জন্য । বান্ধবীর নামে চিঠি আসে , উপরে সাংকেতিক নাম। তবুও না হারানোর ব্যাবস্থা স্বরূপ এই সিরিয়াল নাম্বার । পরতে ইচ্ছা করে না চিঠি গুলো । অথচ এই চিঠি গুলো কিভাবে তার ঘুম কেড়ে নিত। নেহা যেদিন এনে দিত , খাম না খলা পর্যন্ত সে কি উত্তেজনা । কোন ক্লাশ এ ই বসত না মন । কখনো কখনো তাই স্যার এর বকুনি । এক চিঠির প্রান শক্তি নিয়ে ই যেন আর এক চিঠি পর্যন্ত অপেক্ষা। আহা কি দিন গুলো ই গেছে সেদিন। এই চিঠি গুলো আজ এতো বচর পর শান্তাকে বিচলিত করার কোন কথা নয় । সে দিন গুলো আজ দারুন ভাবে বাসী হয়ে গেছে । তবু জীবনের খাতা থেকে কোন পাতা ই ছিঁড়ে ফেলা যায় না। এ সত্য টি আজ আবার অনুভব করল শান্তা। তখন কত তার বয়স - চৌদ্দ কি পনের । ভুল করার ই বয়েস । হ্যাঁ , ভুল ই সে করেছিলো। কোন কিছু না বুঝে কথা দিয়েছিল ছেলেটিকে। ষোল সতেরতেই মনে হচ্ছিল , সিদ্ধান্ত নিতে বোধ হয় ভুল হয়ে গেল । মনের মধ্যে প্রতিনিয়ত সংশয়ের কাঁটা বিদ্ধ হতে লাগল। আসলে এক ধরনের মমত্ববোধ থেকে ই সম্পর্কের সূত্রপাত। কিশোরীর সেই নিষ্কলুষ সারলে্যর নিয়েছিলো ছেলেটি। বয়স শিক্ষা এবং আর ও কিছু ব্যাপারে সে চমৎকার গল্প ফেঁদেছিল। শান্তা পা দিয়েছিল সেই ফাঁদ এ।
মা টের পেলেন এক সময়। প্রথমে শাসন পরে স্নেহ, কত কি উপায়ে তিনি চাইলেন মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে । কারণ তিনিও জানেন ছেলেবেলা থেকে ই কথা দিয়ে রাখা শান্তার এক সহজাত প্রবৃত্তি। এখন ও শান্তার কানে বাজে মা"র সেই ব্যাকুল স্বর , "শান্তা কথা দিয়েছিল। কিন্তু সেটা কি তোর কথা দেবার বয়স ছিল ?"
রাজশাহী ভার্সিটি তে ভর্তি হয় শান্তা। অকৃপণ প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে নিজেকে আর ও অনুভব করতে শেখে। সে নিশ্চিত বুঝতে পারে তার সাথে কিছুতে ই আর এক পথে হেঁটে চলা সম্ভব নয় । এমনি সময়ে ই একটা বই তে স্মরণীয় বাণী সে পড়ে, ভুল কখনো ফুল হয়ে ফোটে না । আজ শিক্ষা, কর্ম,সংসার -সকল ক্ষেত্রে ই সফল শান্তা , যতটা সফল হওয়া সম্ভব। প্রমিথিউসকে একবার বলবার চেষ্টা করছিল তার সেই সব দিন গুলোর কথা।প্রমিথিউস কেবল বলেছিল , কি বললে ? চৌদ্দ- পনের বছর বয়সের কথা? ওসব শুনে কাজ নাই। ও বয়সে যদি তুমি আমাকে ও কথা দিতে , তবে তাতে ও আমার আস্থা থাকতো কিনা কে জানে !
মানুষটির গভীরতায় থৈ পায় না শান্তা। নিজের কাজে যখন মগ্ন থাকে , মনে ই হয় না দুনিয়ার কোন কিছু তাকে স্পর্শ করে । আবার সে-ঈ যখন দোলার সাথে খুনসুটি করে। বাপ বেটির খেলা দেখে হেসে খান খান হয়ে যায় শান্তা । শান্তার ব্যাপারে তার কোন অহেতুক কৌতূহল নেই । সে জানে বাধন হীন বন্ধনে মনকে জরানোর মন্ত্র। শান্তা মাঝে মাঝে গল্প করে প্রমির সাথে। অন্যরকম গল্প । আচ্ছা প্রমি , এই যে আমি যেখানে খুশি চলে , গান গাই, ঘুরে বেরাই, দোলা তো সবসময় আমার সাথে থাকে ও না । , তোমার কি কখনো কোন সংশয় জাগে না ?
শান্তার নাকের ডগায় তর্জনী ঠেকিয়ে প্রমিথিউস বলেছিল এক চমৎকার কথা । খাঁচার দ্বার আটকে রেখে বুঝবা কি করে পাখি পোষ মানল কি না ? সে যদি উড়ে যেতে চায় তবে সোনার শিকলের আর প্রয়োজন কি ? এ জন্যেই ওকে ভালবাসতে পারে শান্তা। নইলে স্বামী বলেই কি কাউকে ভালোবাসা যায় ? সে তো হতে পারে কেবল মানিয়ে চলা, অভ্যাসের ব্যাপার। যেমন সংসারের আর পাঁচজনের সাথে মিলে থাকা,কর্মক্ষেত্রে বস এর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্তান।স্বামীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আরও বেশি প্রেম ঢেলে দিতে না পারার কষ্ট নিল হয় শান্তার অন্তর। এই অতিপ্তি অকে কাঠোর করে তোলে। হাত বাড়িয়ে দেয় সে।অনেকদিন পর বাবার বাড়িতে এসে নিজের ফেলে যাওয়া জিনিস গুলো নরাছরা করতে গিয়া ওই চিঠি গুলো ঝরে পরল।খুব অবাক লাগল শান্তার। কত অদর করে জিনিস যে আমার জমিয়া রাখি। ওসব যখনই কেবলই আমাদের সময় এর মনোযোগ নষ্ট করে।
সবগুলো চিঠি জড়ো করে একটি মাত্র দিয়াশলাই এর কাঠি দিয়ে সে ওগুলো জ্বালিয়ে দিলো। চিঠিগুলো ছাই হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে শান্তার মনে হলো জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন কঠোর হতেই হয়। যেমন সে হয়েছিলো অনেক বছর আগে। ভাগ্যিস সেইদিন ছেলেটা তার লোভাতুর স্বার্থপরতার কথা লিখেছিলো চিঠিগুলো তে। ওই রূপ যদি প্রকাশ হতো আরো পরে?? নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছিলো তাই। তাদের সেই তথাকথিত সম্পরকের গায়েও সেদিন সে আগুন জ্বেলেছিল। এ আগুন ধ্বংসের নয়, শুদ্ধির। পাহাড়ীরা যেমন আগুন জ্বেলে জঞ্জাল সব পুড়িয়ে ফেলে, তারপর সেখানে জেগে ওঠে নতুন ফসলের সম্ভাবনার অঙ্কুর।
©somewhere in net ltd.