নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নিজস্ব ভাবনা চিন্তা নিয়ে আমার ভার্চুয়াল জগত!

এস.এম. আজাদ রহমান

মানুষ

এস.এম. আজাদ রহমান › বিস্তারিত পোস্টঃ

একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা

২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩২


একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা
শুধু ২১ আগস্টের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলাই নয- বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে ১৯৮৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত মোট একুশবার। কখনো নিজের বাসভবনে, কখনো জনসভার মঞ্চে, আবার কখনো তাঁর গাড়িবহরের ওপর। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রনায়ককে এতবার হত্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে—এমন নজির আধুনিক বিশ্বে বিরল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিদেশে অবস্থানের কারণে বোন শেখ রেহানাসহ প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দেশে ফেরার পর থেকেই তাঁর জীবন যেন এক অবিরাম সংগ্রামে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮১ সালের মে মাসে স্বদেশের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই একের পর এক আঘাত নেমে এসেছে তাঁর ওপর।

দেশে ফেরার সেই বছরেই ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসীরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। রাজনীতি-বিশ্লেষকদের মতে, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যাকে বারবার হত্যার চক্রান্তে মেতে উঠেছে একটি অপশক্তি- একাত্তরের পরাজিত শক্তি, পঁচাত্তরের ঘাতক চক্র এবং দেশি-বিদেশি মৌলবাদী গোষ্ঠী। তাদের লক্ষ্য একটাই- তাঁকে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্নকে মুছে ফেলা।

অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুনের ভাষায়- "শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে পিতার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে চেয়েছেন। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁকেই বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। শেখ হাসিনাকে হত্যা করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার সুগভীর চক্রান্ত থেকেই এসব হামলা।" তিনি আরও বলেন, "তাদের লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের ধারাকে পদানত করা। শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে না পারলে এই ধারাকে দমন করা সম্ভব নয়। বাকি সবাইকে হয়তো তারা কিনে নিতে পারে, কিন্তু শেখ হাসিনাকে নয়- তাই তাঁকে হত্যা করতেই হবে তাদের। শেখ হাসিনা যেন এক ফিনিক্স পাখি- বারবার ভস্মীভূত হয়েও নিজের পূর্ণ মহিমায় জেগে উঠেছেন।"

জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা আজও সক্রিয় শেখ হাসিনাকে হত্যার চক্রান্তে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শরিফুল হক ডালিমসহ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত ১৬ জন সদস্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে সামরিক অভ্যুত্থানের চক্রান্ত করেছিলেন- উইকিলিকসে প্রকাশিত সৌদি আরবের এক গোপন বার্তায় যা উঠে আসে। হংকং প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ইসরাক আহমেদ এই পরিকল্পনায় অর্থায়ন করেছিলেন বলেও ওই বার্তায় উল্লেখ রয়েছে।

একটি একটি করে সেই ভয়াল রাত-দিনগুলো

একুশবার মৃত্যুকে হার মানিয়ে যিনি আজও দাঁড়িয়ে আছেন

একুশবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যিনি প্রতিবারই ফিরে এসেছেন—তাঁর এই বেঁচে থাকা নিছক ভাগ্যের খেলা নয়, এ যেন এক অবিনশ্বর সংকল্পের জয়গাথা। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে, কতবার তাঁকে থামানোর চেষ্টা হয়েছিল, আর কতবার তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়েছিলেন

একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: শেখ হাসিনার ওপর হামলার ঘটনাপঞ্জি
১৯৮১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে অন্তত একুশবার হামলা বা হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। নিচে তারিখ অনুসারে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো।

১. ২৪ জানুয়ারি, ১৯৮৮- চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আটদলীয় জোটের মিছিলে পুলিশ ও বিডিআরের গুলিবর্ষণে সাতজন নিহত ও চুয়ান্ন জন আহত হন।

২. ১১ আগস্ট, ১৯৮৯ - ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে রাতে সশস্ত্র হামলাকারীরা গুলি ও গ্রেনেড হামলা চালায়।

৩. ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৯১- গ্রিনরোডের পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে গাড়ি থেকে নামার পরপরই গুলি ও বোমা হামলা হয়।

৪. ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৪ - ঈশ্বরদী ও নাটোর রেলস্টেশনে প্রবেশের সময় তাঁকে বহনকারী ট্রেন লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।

৫. ৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৫ - শেখ রাসেল স্কয়ারের কাছে জনসভায় ভাষণদানকালে তাঁর ওপর গুলি চালানো হয়।

৬. ৭ মার্চ, ১৯৯৬ - বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশে বক্তৃতার পর একটি মাইক্রোবাস থেকে মঞ্চ লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়, আহত হন কুড়িজন।

৭. ১৯৯৭ সাল - ইন্টার এশিয়া টিভির মালিক শোয়েব চৌধুরী তাঁকে ও তাঁর পুত্র-কন্যাসহ একত্রিশ জনকে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে ই-মেইল পাঠান।

৮. ২০ জুলাই, ২০০০ - গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থল ও হেলিপ্যাডের কাছে ছিয়াত্তর কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল।

৯. ২৯ মে, ২০০১ - খুলনার রূপসা সেতু উদ্বোধনস্থলে বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল, যা গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করে।

১০. ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০০১ - সিলেটে জনসভাস্থল থেকে পাঁচশ গজ দূরে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে দুজনের মৃত্যু হয়।

১১. ৪ মার্চ, ২০০২ - নওগাঁয় বিএমসি সরকারি মহিলা কলেজের সামনে গাড়িবহরে হামলা হয়।

১২. ৩০ আগস্ট, ২০০২ - সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে গাড়িবহরে হামলা হয়।

১৩. ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০০২ - সাতক্ষীরার কলারোয়ায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে হামলা চালানো হয়।

১৪. ২ এপ্রিল, ২০০৪ - গৌরনদীতে গাড়িবহর লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।

১৫. ২১ আগস্ট, ২০০৪ - আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে সংঘটিত ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা, যাতে প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর কান ও চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৬. ১৬ জুলাই, ২০০৭ — ১/১১ তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ সাবজেলে আটক রাখে; এ সময় খাবারে বিষ মেশানোর অভিযোগ ওঠে।

১৭. ১১ জুন, ২০০৮ - এগারো মাস কারাবাসের পর প্যারোলে মুক্তি পান।

১৮. ২৭ জুন, ২০০৯ - আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী কারাগারে বিষ প্রয়োগের চক্রান্তের অভিযোগ প্রকাশ করেন।

১৯. ২০১১ সাল - শ্রীলঙ্কাভিত্তিক একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে হত্যাচুক্তির অভিযোগ ওঠে।

২০. ডিসেম্বর, ২০১১ - ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যার লক্ষ্যে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার অভিযোগ পাওয়া যায়, যা বাস্তবায়িত হয়নি।

২১. ৭ মার্চ, ২০১৫ - সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার পথে কারওয়ানবাজারে গাড়িবহরে বোমা হামলার চেষ্টা হয়।

আজ সেই একুশ আগস্ট: রক্তাক্ত ইতিহাসের এক অমোচনীয় অধ্যায়
আজ ২১ আগস্ট- বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর বেদনার দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে চালানো হয়েছিল ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। মুহূর্তের মধ্যে সমাবেশস্থল পরিণত হয়েছিল রক্তাক্ত প্রান্তরে। ঝরে গিয়েছিল বহু প্রাণ, আহত হয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। শেখ হাসিনা সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর শরীর ও শ্রবণশক্তিতে গুরুতর আঘাতের ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াতে হয়েছে দীর্ঘদিন।

কিন্তু ২১ আগস্টের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো এখানেই- সেদিন শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা হয়নি; একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে, একটি রাজনৈতিক ধারাকে এবং তার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।

একুশবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো একজন মানুষের জীবনের দিকে ফিরে তাকালে তাই ২১ আগস্টকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সেই দীর্ঘ পথের একটি ভয়ংকর অধ্যায়- যে পথে বারবার এসেছে গুলি, বোমা, গ্রেনেড, ষড়যন্ত্র ও মৃত্যুর হুমকি।

তবু প্রতিবারই তিনি ফিরে এসেছেন।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস—যাঁকে বারবার থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তিনিই বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। কখনো ক্ষত নিয়ে, কখনো শোককে সঙ্গী করে, কখনো রাজনৈতিক প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে।

একুশটি মৃত্যুচেষ্টা- আর একুশ আগস্ট তার সবচেয়ে রক্তাক্ত প্রতীক।
আজকের এই ২১ আগস্টে তাই প্রশ্নটি শুধু—কতবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, তা নয়। প্রশ্ন হলো, একটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেন একজন মানুষকে বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে? সেই হামলাগুলোর পেছনে কারা ছিল, কী ছিল তাদের উদ্দেশ্য এবং ইতিহাসের আদালতে তাদের ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়িত হবে—তার উত্তর সময়ই আরও স্পষ্ট করে দেবে।
২১ আগস্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কখনো শুধু তারিখের সমষ্টি নয়। কিছু তারিখ রক্ত দিয়ে লেখা থাকে, কিছু ক্ষত প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে।

২১ আগস্ট তেমনই একটি দিন।
আজ সেই ভয়াল দিনের স্মৃতিতে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আহতদের প্রতি সহমর্মিতা এবং ইতিহাসের কাছে একটি অঙ্গীকার- সত্যকে বিস্মৃত হতে দেওয়া যাবে না।

কারণ ইতিহাসের পাতায় কিছু মানুষকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্নকে মুছে ফেলা যায় না।
২১ আগস্ট তাই শুধু একটি তারিখ নয়- এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অমোচনীয় ক্ষত, এক রক্তাক্ত স্মৃতি এবং মৃত্যুকে বারবার অতিক্রম করে ফিরে আসা এক দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.