| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
‘আমি তোমার চোখের আলো হবো’! অদ্ভুত নিরবতা নেমে এলো তখন পৃথিবীতে। বাইরে মায়াবী শীতল এক সন্ধ্যা। সেদিকে তাকালাম। সুর্য ডুবে যাচ্ছিলো। পাখিরা নীড়ে ফিরছিলো। ‘যেহেতু তোমাকে আমি ভালোবাসি’ বললাম আমি।
‘এখন কি সন্ধ্যে হয়ে গেছে?’ বললো সে।
‘হ্যা। হয়েছে। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তাই আমার আর কোন সুযোগ নেই। আমি পিছু ফিরতে পারবোনা’।
‘আকাশটা নিশ্চয়ই অনেক সুন্দরভাবে সেজেছে?’
‘তা সেজেছে। দেখো কেমন লোহিত আলো ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে আকাশে। আর কেমন নির্জনতা চারিদিকে। মানুষের সুউচ্চ কথাও যেন শীতল স্রোতের মতো ধ্বনি তোলে বয়ে চলে। আমি লজ্জিত। যা বলছিলাম..... হ্যা। আমার জীবন এখন আমার কাছে নেই। আমি বিকিয়ে দিয়েছি তোমার কাছে। জীবন এমন এক বস্তু যা দু’বার বিকানো যায়না’।
‘সন্ধ্যেটা অদ্ভুত। হ্রদের জলে কেমন নিস্তরঙ্গ শান্ত মগ্নতা। ........ ‘কিন্তু আমি তোমাকে চাইতে পারিনা। আমার চোখ নেই। তাই আমার আর সুযোগ নেই। তুমি চলে যেতে পারো। তোমার জন্য শুধু আলো আর আলো’।
‘কিন্তু আমি তোমার আলো হবো’।
চুপ করে গেলো সে।
নিস্তব্দতা জমে বরফ হয়ে গেলো যেন। কিছু ভাবছে যেন সে। এবং তা হতে উদ্ভুত হবে শান্তি আর সুনিশ্চিত জবাব। ‘হ্যা। আমি তোমাকে সে সুযোগ দেব’।
কিন্তু না সে নিরবে হেটে গেলো ভেতরে। যাওয়ার সময় তার কম্পিত পদযুগল এটা ওটার সাথে ঠোক্কর খেলো। শেষ পর্যন্ত তার হাতের ছোঁয়া লেগে ভেঙে গেলো একটা ফুলদানী। তাতে ছিলো দু’টো রক্ত গোলাপ। চুর্ণবিচুর্ণ ফুলদানীটা আমার চোখে ভগ্ন হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে রইলো।
কিন্তু রক্তগোলাপগুলো কি অক্ষত?
বিমুঢ়ের মতোন দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। জানালা দিয়ে শীতল হাওয়া এসে ভরিয়ে দিচ্ছিলো ঘরটাকে। আমি জানালা দিয়ে নির্জন পৃথিবীর দিকে তাকালাম। অদ্ভুত এই সন্ধ্যা। কেমন লালমেঘ আকাশে।
সমস্ত প্রাণের সাথে সাথে সমস্ত আকাশ, পৃথিবী কাঁদছে।
কার যেন পায়ের শব্দ শুনলাম। ফিরে তাকালাম না। হঠাৎ যদি কান্না পেয়ে বসে।
‘রাত্রি হয়ে যাচ্ছে?’ বললো কেউ।
ফিরে না তাকিয়েই বললাম,- ‘হ্যা। হয়ে যাচ্ছে’।
‘সমস্ত কিছু অন্ধকার হয়ে যাবে?’
‘হ্যা। হয়ে যাবে’।
‘আপনাকে চলে যেতে হবে। আপু কাঁদছেন। আপনাকে চলে যেতে বলেছেন’।
‘হ্যা। আমি চলে যাবো’।
তবুও আমার যেতে মন চাইলোনা। সমস্ত জীবনের কান্না আমি এখানে দাঁড়িয়ে কাঁদবো।
‘কিন্তু আপনি যাচ্ছেন না। বাড়িতে আর কেউ নেই। আপনার চলে যাওয়া উচিত’।
‘হ্যা। আমি যাচ্ছি’।
ফিরে যাবো বলে আমি আমার সমস্ত চেতনাকে বললাম চলো ফিরে যাই। কিন্তু লক্ষ লক্ষ আর্তনাদ মথিত সুর বললো-‘না, না’।
তবুও, আমার শরীরটাকে মুচড়ে তুলে আমার মুখটাকে প্রস্থান পথের দিকে টেনে আনলাম। এখানে আর কোন স্পন্দন নেই, অনুভূতি নেই।
ভাঙ্গাকাঁচগুলো তুলে আনছিলো নেথিয়া। তাকালাম তার মুখের দিকে। বেদনার এই এক লোভ। পৃথিবীর সমস্ত বস্তু ও প্রকৃতিতে সে আনন্দের প্রতিবিম্ব খুঁজে ফেরে।
তাকালাম ওর মুখের দিকে। তাকালাম ওর উন্মত্ত সৌন্দর্যের দিকে। যেন নেথিয়াই ধরে আছে আমার প্রেমাস্পদের সৌস্পদ। কিংবা এখন আবির্ভুত হয়েছে এই রুপ ধরে।
তন্ময় হয়ে উঠেছিলাম। উভয়েরই এক রুপ যেন। একই অবয়ব। তবুও উভয়েরই বেদনার রুপ পৃথক। কোন মিল নেই।
নেথিয়া একবার আমার দিকে মুখ তুলে তারপর মাথা নিচু করে বলতে লাগলো-‘যাচ্ছেন না যে। রাত হয়ে এলো। থেকে কি লাভ?’
মাথা নিচু করে হাটতে লাগলাম। ‘আপু আপনার জন্য ফুল দু’টো দিতে বলেছেন’।
‘না, ফুল লাগবেনা’।
‘কেন লাগবে না? এই ফুলের পাঁপড়িগুলো শুকিয়ে গেলে আপনি বইয়ের পাতায় সংরক্ষন করবেন। তারপর একদিন ভুলে যাবেন। মানুষ তো ভুলেই যায়। তারপর কোন এক এমন বিষন্নতা ঘেরা সন্ধ্যায় ভালো লাগবে না। আপনি হয়তো বই উল্টাতে থাকবেন আনমনে। হঠাৎ শুকনো কালচে হয়ে যাওয়া স্মৃতির মত পাঁপড়িগুলো ঝরে পড়বে। আপনার হঠাৎ স্মৃতি মনে পড়বে। এক ভুলে যাওয়া অভিশপ্ত স্মৃতি, এক বেদনা ও আনন্দের স্মৃতি। এক ভালোবাসা ও হারানো সুরের গান হয়ে হৃদয়ের তারে তারে এক নিঃসঙ্গ টঙ্কারে বেজে যেতে থাকবে। হয়ত আপনার ভালো লাগবেনা। হয়ত মনে হবে কি গভীর এক ভুলের জগতে ডুবে গিয়েছিলাম। ভালোবাসার মোহ এক চমৎকার অন্ধতা ছিলো মাত্র। আর কিছু নেই। সংসারের মায়াজালে মনে হবে কোন একদিন না ঘটে যাওয়া এক বিভীষিকা’।
‘কিন্তু স্মৃতি কোথায়?।
বেড়িয়ে পড়লাম। স্মৃতি নেই। আমি তাকে ভালোবাসি এর চেয়ে বড় বিস্মৃতি কোথায়? ফুলগুলো তো ও দেয়ার জন্য বলবেনা। সমস্ত কিছুকে ও অস্বীকার করেছে।
নেমে এলাম পৃথিবীতে।
রাত্রি হয়ে এসেছে। নক্ষত্ররা তাদের নির্দিষ্ট স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছে। চাঁদটা তার নিজের মতোন আলো ছড়াচ্ছে।
শীতল হাওয়ায় উড়ছিলাম আমি। কুয়াশা বয়ে যাচ্ছিলো। শিশিরে ভিজে গেছে পথের ঘাস। সমস্ত আকাশ প্রেমের বেদনায় কাঁদছে। হয়তোবা কেউ কাঁদছেনা। আমার প্রানের স্পন্দন এইসব।
তাকে দেখতাম প্রায়ই রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আকাশ দেখতে। পাখিদের, নক্ষত্রদের উড়াউড়ি দেখতে। এমনভাবে কি কেউ আকাশ দেখেছে? কারো চোখের গভীরে কি এমন পুঞ্জীভূত শাদা মেঘের বিচ্ছুরিত সৌন্দর্যের চ্ছটা লেগেছে?
তাকে দেখার পর দু’টো বছর কেটে গেছে।
শহরের সবচেয়ে নোংরা বাড়িটাতে আমি থাকি। সবচে’ নোংরা কক্ষে আমার বাস। বিকেল হলে এই শহরের জীর্ণ অট্রালিকাগুলো দেখতে দেখতে হাঁটি।
শহরের একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ রয়েছে। প্রত্যেকটা বাড়িরও রয়েছে অদ্ভুত ঘ্রাণ।সেই ঘ্রাণ শুঁকে চোখ বন্ধ করে আমি কোনটা কোন বাড়ি বলে দিতে পারি।
এখন কিছু হয়নি আমার। সামান্য টাইপিস্টের কাজ। যন্ত্রের খটখট শব্দে মাথা ধরে। আবার শব্দহীনতায়ও মাথা ধরে।
মাঝে মাঝে সন্ধ্যের পর ঝুপড়ি ঘরে বসে মদে চুর হই। জুয়ায় হেরে হেরে ফতুর হয়ে যাই।
পোষাকে ছিরি নেই। রুক্ষ চুল। অবিন্যস্ত। কর্কষ মুখ। অমার্জিত কন্ঠস্বর। প্রানের আবেগও সৌষ্ঠবহীন।
তাই দু’টো বছর আমার অতিক্রান্ত হয়েছে অব্যক্ত বেদনায়। একটু একটু করে সঞ্চয় করেছি সাহস।
তারপর একদিন দুরু দুরু বক্ষে গিয়েছিলাম ওকে ভালোবাসা জানাতে। ও আসেনি। আমার ভাষ্যকার ছিলো নেথিয়া। নেথিয়া এসে জানিয়েছিলো আমাকে ও ভালোবাসে। আমার প্রতি তীব্র অনুরাগ আছে।
আমার হাসিতে সে প্রানের আবেগে উদ্বেলিত হয়ে উঠে।
আমার আহ্বানে সে সমদ্রের মতোন কল্লোলিত হয়ে উঠে।
আমার গানে সে হয়ে উঠে নাইটিঙ্গেল।
আমার ভালোবাসায় রক্ত গোলাপ।
কিন্তু এসব তো সত্যি নয়। এসব তো নেথিয়ারই বানানো কথা।
আমি তার মুখে সব শুনতে চাই। আমার চোখে চোখ রেখে সে বলবে এসব।
কিন্তু সে আর আসে না।
আজ এলো। এবং সমস্ত কিছু চুর্ণ করে দিলো সে।
আমার হৃদয় করুণাদ্র হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু সে প্রত্যাখ্যান করলো। সে জানালো তার দৃষ্টি নেই। তাতো বেশ ভালোই। খুশী হয়ে উঠেছিলাম আমি।
শহরের সবচেয়ে নোংরা বাড়িটাকে সে দেখতে পারবেনা। দেখতে পারবেনা নোংরা কক্ষটা। নোংরা মানুষটাকে। পৃথিবীর আদিগন্ত নোংরা ইতিহাস এবং বাস্তবতাকে।
কিন্তু সে প্রত্যাখ্যান করলো।
আকাশের দিকে তাকালাম। কেমন সৌন্দর্যহীন আকাশ। কেমন নিরব রহস্যময়।
শীতল হাওয়াটা গুমড়ে গুমড়ে যাচ্ছিলো। নদীটা বয়ে যাচ্ছিলো বিলাপে বিলাপে।
সমস্ত কিছু মিথ্যা।
দু’টুকরো রুটি। পোঁকা কাঁটা পোশাক।
মিথ্যা হয়ে উঠলো সূর্যহীন নোংরা অন্ধকার কক্ষটা।
ফিরতে ইচ্ছে করছিলোনা। কিন্তু শুন্য ধোঁয়াটে মস্তিষ্কটা আমাকে নিজের অন্ধকার কক্ষান্তরে নিয়ে এলো।
ঘরে ফিরে শুয়ে পড়লাম আমি।
ছাতের দিকে তাকালাম। মাকড়শার ঝুলে অন্ধকার।
আমার জানালায় আকাশ নেই, নক্ষত্র নেই, চাঁদ নেই।
একটা ছুড়ি নিয়ে চোখের চারিদিকে ঘুরালাম। কিভাবে ছুড়িটা দিয়ে গেঁথে ফেলবো চোখ! কেমন আর্তচিতকারে আমি অন্ধ হয়ে যাবো।
তারপর হাসবো আমি। বলবো- তোমার অন্ধকারের সঙ্গী হয়ে গেলাম আমি।
হাসিতে ফাটিয়ে দেবো আকাশ, পৃথিবী, নিসর্গকে।
মহাপ্রলয় এসে যাবে।
ছুড়িটা নিয়ে শক্ত করে ধরলাম। তারপর চোখের পাতাটা স্পর্শ করা মাত্রই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। ছুড়িটা আমার বুকে চেপে ধরলাম।
‘তোমাকে ভালোবেসে আমার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গেছে। আমার কোন সাহস নেই, আমি চরম ব্যর্থ’।
হু হু হাওয়ায় সমস্ত শীতলতা আরো আঁধারে ঘনীভুত হয়ে গেলো। চেতনার ভেতরে সমস্ত কিছু মিথ্যে বলে ডেকে গেলো এক নাইটিঙ্গেল।
০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০০৮ ইং
©somewhere in net ltd.
১|
০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:২৫
মাহবুবুল আজাদ বলেছেন: এখন সময় নেই পরে এসে পড়ব।