| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এমন বাংলাদেশ তো আমরা চাইনি!
------------------------------------
একটি সময় ছিল, যখন জুলাই আন্দোলনের তরুণদের নিয়ে দেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা ছিল। মানুষ তাদের মধ্যে দেখেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন এবং একটি সুন্দর বাংলাদেশের সম্ভাবনা। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই তরুণরাই একদিন দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কিন্তু এত অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই প্রত্যাশার জায়গায় কেন অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও ঘৃণা তৈরি হলো? কেন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু তরুণ আজ সাধারণ মানুষের বিরাগভাজন হয়ে উঠেছেন? কেন একজন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমানকে এমন বক্তব্য দিতে হচ্ছে যে, একজন ছেলেকেও মানুষ বিশ্বাস করে না, মানুষ ঘৃণা করে?
এটি কি কেবল কয়েকজন তরুণের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়?
একটি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের সমর্থন। অথচ আন্দোলনের পর যদি সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষের বিরুদ্ধে মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারি, ছিনতাই, খুন কিংবা ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবেই। যারা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে কেন এমন অভিযোগ উঠছে?
অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সব জুলাই আন্দোলনকারী এক নয়। যারা সত্যিকার অর্থে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। কিন্তু আন্দোলনের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তারও কোনো দায়মুক্তি থাকা উচিত নয়।
এখানেই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়ের প্রশ্নটি সামনে আসে।
একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া সরকারের কাজ ছিল আন্দোলনকারী তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। কিন্তু সরকারের সময়কালে সংঘটিত মব সহিংসতা, দখলদারি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হয়েছে, সেই প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে।
কোনো অপরাধের দায় ব্যক্তির। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অপরাধ প্রতিরোধ করা, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এবং কোনো রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের ঢাল হতে না দেওয়া। সরকার যদি এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই ব্যর্থতার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি আন্দোলন-পরবর্তী তরুণদের একটি অংশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে, অথবা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের অভিযোগে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়ে থাকে, তাহলে তার জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আজকের এই পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আন্দোলনের সাহসকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আগামী দিনে দেশে অন্যায়, দুর্নীতি কিংবা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন হলে তরুণেরা কি রাজপথে নামতে সাহস পাবে? সাধারণ মানুষ কি তাদের পাশে দাঁড়াবে?
মানুষ যদি মনে করে আন্দোলনের পরিণতি হলো দখলদারি, সন্ত্রাস, প্রতিহিংসা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো ন্যায়সংগত আন্দোলনও জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
জুলাই আন্দোলনের তরুণদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ছিল তারা হবে মানবিক, দায়িত্বশীল, ন্যায়পরায়ণ ও দেশপ্রেমিক। তারা হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক, নতুন অন্যায়ের জন্মদাতা নয়।
একটি আন্দোলন কখনো কয়েকজনের অপরাধের কারণে পুরোপুরি বিচার করা যায় না। একইভাবে একটি আন্দোলনের পবিত্রতা দেখিয়ে অপরাধীদেরও রক্ষা করা যায় না।
ড. ইউনূসের সরকারের কাছে প্রশ্ন যে তরুণদের ঘিরে একদিন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে আজ কেন এত অভিযোগ? তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব কার ছিল? রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দায়িত্বে থেকে সরকার কী করেছে? আর যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার কোথায়?
মনে রাখতে হবে, আন্দোলন করে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হলে প্রয়োজন সততা, মানবিকতা ও ন্যায়বিচার।
জুলাইয়ের তরুণেরা ঘৃণার প্রতীক হোক, এটি আমরা চাই না। তারা আবার মানুষের আস্থা ফিরে পাক, সেটিই হওয়া উচিত প্রত্যাশা। কিন্তু সেই আস্থা ফিরবে অপরাধের বিচার, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে। দেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আন্দোলনও কারও অপরাধের লাইসেন্স নয়।
বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল, নতুন করে আরেকটি অন্যায়-অবিচারের অধ্যায় নয়।
©somewhere in net ltd.