নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

রাজীব নুর

আমি একজন ভাল মানুষ বলেই নিজেকে দাবী করি। কারো দ্বিমত থাকলে সেটা তার সমস্যা।

রাজীব নুর › বিস্তারিত পোস্টঃ

জীবনের গল্প- ৮৪

২৪ শে জুলাই, ২০২৩ রাত ২:২৫

ছবিঃ আমার তোলা।

আমি একটা ভাঙ্গা কূলা।
ভাঙ্গা কূলা সমাজে কোনো কাজে লাগে না। এই সমাজ তো দূরের কথা, নিজের পরিবারের জন্য কোনোদিন কিছু করতে পারি নাই। এখন আমি যে মেসে থাকি সেই মেসের ভাড়া দিতে পারি অনেক মাস ধরে। শূন্য পকেটে সারাদিন ঘুরে বেড়াই ক্ষুধার্থ পেটে। আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমাদের একটা ছেলে আছে। আর কিছু দিন পর ছেলের বয়স হবে তিন বছর। কতদিন আমি আমার ছেলেটাকে দেখি না। আদর করি না। কোলে নিই না। খুব কষ্ট হয়। হঠাত আব্বা মারা গেলো করোনায়। আমার ভাইয়েরা ঝগড়া করে আমাকে বাসা থেকে বের করে দিলো। পড়ে গেলাম বিশাল বিপদে। করোনার কারনে চাকরি হারালাম। ভাই বোনদের হাতে পায়ে ধরেও তাদের মন যোগাতে পারলাম না।

বউ বাচ্চা নিয়ে একটা ভাড়া বাড়িতে উঠলাম যাত্রাবাড়ির দিকে।
নোংরা বাসা। অনেক গুলো ভাড়াটিয়া। একটা মাত্র বাথরুম। বাথরুমে টিপ কল নেই, চাপকল। রান্না ঘর নোংরা। অনেক গুলো পরিবার একটা চুলায় রান্না করে। আমার বউ এই পরিবেশে এসে অসুস্থ হয়ে গেলো। তার বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো। আমি অনেক চেষ্টা করেও স্ত্রী আর পুত্রকে ভালো রাখতে পারছি না। শূন্য পকেটে সারাদিন ঘুরে বেড়াই একটা চাকরির জন্য। এক আকাশ ক্ষুধা ও ক্লান্তি নিয়ে রাতে বাসায় ফিরি। স্ত্রী আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে একটা ভালো খবর শোনার আশায়। দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো ক্ষুধার কষ্ট। অভাব মানুষকে অনেক নিচে নামিয়ে দেয়। অথচ আমাদের নজরুল বলেছেন, হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছো মহান। এটা একদম ভুল কথা। আমার ছেলেটা আপেল খেতে চায়, লাল খেলনা গাড়ি কিনতে চায়। ক্ষুধা, অভাব, অপমান, অবহেলা এবং প্রিয় মানুষের জন্য কিছু করতে না পারার কষ্ট আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।

একদিন আমার শ্বশুর মশাই এসে তার মেয়ে ও নাতীকে নিয়ে গেলো।
এরপর থেকে আমি মেসে থাকি। শ্বশুর মশাই আমাকে তিন মাস সময় দিয়েছিলো। নিজের অবস্থা পরিবর্তন করার জন্য। আমি একটা কাজের জন্য সমস্ত পরিচিত মানুষদের কাছে গিয়েছি। তাঁরা কেউ আমাকে কাজ দেয়নি। কেউ কেউ তো আমার সাথে দেখা পর্যন্ত করেনি। কাউকে ফোন দিলে কেউ আমার ফোন ধরে না। আজন্ম একজন ব্যর্থ মানুষ আমি। আমি রমনা পার্কে ক্ষুধা নিয়ে বসে থাকি। কাঁদি। কান্না ছাড়া আর কি করার আছে আমার? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি রমনা পার্কে বসে থাকি। রমনা পার্কের প্রতিটা গার্ড আর হকার এবং ভিক্ষুক আমাকে চিনে ফেলেছে। এদের কেউ কেউ আমাকে খাতির করে। আমার সাথে গল্প করে, চা খাওয়ায়। যেদিন রমনা পার্কের গেট বন্ধ থাকে আমি হাঁটতে হাঁটতে পুরান ঢাকায় চলে যাই। নাজিরা বাজারে খাবার গুলোর দোকানে লোভীর মতো তাকিয়ে থাকি। খাবারের গন্ধে মাথা নষ্ট হয়ে যায়। ইচ্ছা করে এক প্যাকেট খাবার নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাই।

যে ভাই ও বোনরা আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলো, বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে তাদের কাছে যাই।
তাঁরা কেউ আমার সাথে কথা বলে না। আমি মার কাছে যাই। মা অসুস্থ। শুধু চেয়ে থাকে। কোনো কথা বলে না। মাকে বলি, আমি খুব ভাল আছি। তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমার স্ত্রী আর পুত্র ভালো আছে। বেশ ভালো একটা চাকরি পেয়েছি। সেলারি ভালো। সকালে অফিসের গাড়ি এসে আমাকে নিয়ে যায়, আবার বিকেলে অফিসের গাড়ি আমাকে বাসায় দিয়ে যায়। মা চুপ। শুধু তাকিয়ে থাকে। আমার ভাবী আমাকে ফ্রিজ থেকে বাসী খাবার বের করে দেয়। সেটাই হাসি মুখে খেয়ে নিই। খাবার গুলো ওভেনে গরম করে দিলে আরাম করে খেতে পারতাম। ফিরে আসার সময় ভাবী আমাকে আমার ভাইদের পুরোনো শার্ট প্যান্ট দেয়। সেগুলো আমি হাসিমুখে গ্রহন করি। আর ভাবীর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হই। ভাবী জানতে চায়- আমরা কেমন আছি? বলি, খুব ভালো আছি। ভাবী আমাকে খুচরো কিছু টাকা দেয়। গুনে দেখি সব মিলিয়ে ৪৭ টাকা। একটা আপেল দেয়, একটা মালটা দেয় আমার ছেলের জন্য। আপেল আর মালটা আমি রাস্তার ভিক্ষুককে দিয়ে দেই।

আমি যে মেসে থাকি সেটা একদম দরিদ্র শ্রেনীর মেস।
তবে ওয়াইফাই আছে। মেসে আমার সাথে থাকে ভ্যানগাড়িতে করে সবজি বিক্রেতা, ফল বিক্রেতা আর দুজন ড্রাইভার। মেসের খাবার অতি নিম্মমানের। মেসে শুধু রাতে রান্না হয়। আমার বিছানা চুলার কাছে। অত্যাধিক গরম। গরমে ঘুম আসে না। সারারাত ছটফট করি। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে ফুটপাতে গিয়ে ঘুমাই, এত গরম আর মশার কামড় সহ্য হয় না। দিনের বেলা মাঝে মাঝে এসি মসজিদে গিয়ে বসে থাকি। একজন ভিক্ষুকও আমার চেয়ে ভালো আছে। এত মানবেতর জীবন আর ভালো লাগে না। আমার সময় কাটে না। বই পড়বো যে আমার কাছে কোনো বই নেই। বই কেনার টাকাও নেই। অনেক রাস্তায় দেয়ালে দৈনিক পত্রিকা সেঁটে দেয়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো পত্রিকা পড়ি। একটা লাইনও বাদ দেই না। আমার হাতে অনেক সময়। ইচ্ছা করলে মোবাইলে কিছু বই ডাউনলোড করে নিতে পারি। কিন্তু আমার মোবাইলের অবস্থা ভালো না। স্কীন ভাঙ্গা। অবশ্য এই মোবাইল আমার না। ফল বিক্রি করে জুলহাস ভাই, তার। তার মোবাইল থেকেই আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। টাইপ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। কিন্তু আমার ধৈর্য্য আছে। তিনদিন ধরে লিখছি। লেখাটা শেষ হচ্ছে না। ইদানিং আমার চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ছোট ছোট লেখা বুঝতে বেগ পেতে হয়। ৫০ টাকা ভিজিট দিয়ে ফার্মগেট খামারবাড়ি ইস্পাহানী চক্ষু হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তার চশমা দিয়েছেন, চোখের ড্রপ দিয়েছেন। টাকার অভাবে চশমা আর ড্রপ কিনতে পারিনি।

যখন ছোট ছিলাম, তখনও কষ্টে ছিলাম।
আব্বা ভীষন গরীব ছিলো। অনেক গুলো ভাইবোন। আমাদের নিজেদের কোনো জমি ছিলো না। আব্বা অন্যের জমি চাষ করতেন। আব্বার কষ্ট দেখে আমি আব্বাকে সাহায্য করতে জমিতে নেমে যেতাম। আব্বা বলতেন, তুমি স্কুলে যাও। স্কুলে কি যাবো? প্রাইমারী স্কুল। খালি পায়ে স্কুলে যেতাম। স্কুল ব্যাগ ছিলো। ছেঁড়া ময়লা জামা পড়তাম। সারাক্ষণ ক্ষুধা আর ক্ষুধা। গ্রামে ধনী পরিবার গুলোর অনেক কাজ কর দিতাম। তাঁরা ভালো খাবার খেতে দিত। সেগুলো না খেয়ে বাসায় নিয়ে যেতাম, যেন সব ভাই বোন মিলে খেতে পারি। ইচ্ছা ছিলো বড় হয়ে চাকরি করবো। অনেক টাকা ইনকাম করবো। আর ভালো ভালো খাবার কিনে ইচ্ছা মতো খাবো। বড় বড় মার্কেটে ঘুরে বেড়াই। আমার বয়সী অনেক ছেলে ইচ্ছা মতো কেনাকাটা করছে। তাঁদের চোখ মুখে দুঃখ কষ্টের কোনো ছাপ নেই। তাদের দেখে আমার ভালো লাগে। মানুষের হাসিমুখ দেখতে আমার সব সময় ভালো লাগে। রাস্তায় যখন আমার ছেলের বয়সী কাউকে দেখি, তখন আমার খুব কষ্ট হয়। ভীষন কষ্ট হয়। ইচ্ছা করে ছুটে চলে যাই ছেলের কাছে। শ্বশুরের সাথে ঝগড়া করি। আমার স্ত্রীর কথা ভেবে আমি খুব অবাক হই। সে আমার একটা খোজ পর্যন্ত নেয় না। একবার আমার স্ত্রীর জ্বর হয়। আমি সারারাত তার মাথার কাছে বসে ছিলাম। মাথায় জলপট্রি দিয়েছি।

সবচেয়ে কষ্ট হলো আমি জানি না আমার স্ত্রী কেমন আছে?
আমার ছেলেটা কেমন আছে? রাতে নাকি আমি ঘুমের মধ্যেও কান্না করি। ছেলেটার জন্য বুকের মধ্যে অনেক কষ্ট হয়। প্রায়ই শ্বশুর বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। যদি এক পলকের জন্য স্ত্রী আর ছেলেকে দেখতে পাই। চিন্তায় চিন্তায় আমি অসুখ বাধিয়ে ফেলেছি। টাকার জন্য ডাক্তার দেখাতে পারি না। আয়নার দিকে তাকিয়ে আমি নিজেকে চিনিতে পারি না। চাপা ভেঙ্গে গেছে, গায়ের রঙ কালো হয়ে গেছে। প্রথম দেখাতেই যে কেউ আমাকে বলবে হিরুঞ্চি। অথচ আমি মাদকসেবি নই। আমি মাদকের বিরুদ্ধে। আমাদের এলাকায় যারা মদ, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা বিক্রি করে তাদের নাম ঠিকানা লিখে থানায় দিয়েছিলাম। ফলাফল শূন্য। মাঝে মাঝে রাস্তায় পরিচিত মানুষদের সাথে দেখা হয়ে যায়। তাঁরা কেউ আমাকে সময় দেয় না। ব্যস্ততার ভান করে চলে যায়। গতমাসে আমার সাবেক সমস্ত বন্ধুরা স্টার হোটেলে একসাথে সকালে নাস্তা করেছে। আমাকে তাঁরা ডাকেনি। কিন্তু আমি তাদের এই গেট টুগেদারের খবর জানি। তাঁরা কেন আমাকে ডাকবে? তাদের স্ট্যাটাস আর আমার স্ট্যাটাস তো এক নয়। দরিদ্র ও অভাবী লোককে কেউ ভালোবাসে না। বাইরের লোক তো দূরের কথা, নিজের ভাইবোনরাও ভালোবাসে না।

আমি একজন এমনই ব্যর্থ মানুষ একটা চাকরি জোয়াড় করতে পারলাম না।
রিকশা তো চালাতে পারি না। মাটি কাটতে পারি না। ভিক্ষা করতে পারি না। ভ্যানগাড়ীতে করে সবজি বিক্রি করতে পারি না। আমার নজর হলো উঁচু। যদিও আমার জীবনে কোনো সফলতা নেই। ইচ্ছা করে সকালে আয়রন করা জামা কাপড় পরে, ঝকঝকে জুতো পড়ে অফিসে যাই। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরবো। সারাদিন অফিসে ব্যস্ত থাকবো। মিটিং থাকবে। পরিশ্রম করতে আমার কোনো সমস্যা নাই। মাস শেষে সেলারি ঢুকে যাবে একাউন্টে। সেই টাকা দিয়ে উন্নত জীবনযাপন করবো। ঘুরে বেড়াবো, শপিং করবো, দাওয়াতে যাবো, আড্ডা দিবো, ছেলেকে নিয়ে শিশুপার্কে যাবো, টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখবো। দাবা খেলবো। এভাবেই তো বহু মানুষ জীবনযাপন করছে। ছুটির দিনে রাতা জেগে সিনেমা দেখব। শুনেছি 'লাইফ ইজ বিউটিফুল' অসাধারন একটা মুভি। 'ফরেস্ট গাম্প' মুভিটা নাকি চমৎকার একটা মুভি। আর 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' মুভিটা নাকি এমনই এক মুভি দশবার দেখলেও বিরক্ত লাগবে না। আল্লাহ চাইলে আমার জীবন বদলে যেতে সময় লাগবে না। আমি অপেক্ষা করি। অপেক্ষা করতে আমার ভালোই লাগে। আর যদি জীবন না বদলায় তাহলে ক্ষতি নেই। সব আল্লাহর ইচ্ছা।

সেদিন রাতে বৃষ্টি হয়েছিলো।
গরম ছিলো না। খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখেছি। আমার ভালো একটা চাকরি হয়েছে। আমার স্ত্রী আর ছেলে আমার কাছে ফিরে এসেছে। আমরা দুই রুমের ছোট একটা বাসা ভাড়া নিয়েছি। আমি সকালে অফিস চলে যাই। স্ত্রী সারাদিন ঘর সংসারের কাজ করে। দুপুরে ফোন করে স্ত্রী জানতে চায় আমি খেয়েছি কিনা। আমি বলি, আমার চিন্তা বাদ দাও। আমি খেয়ে নিবো। তুমি আমাদের ছেলেকে সামলায়। আমি সন্ধ্যায় বাসায় এসে দেখি আমার স্ত্রী চা নাস্তা রেডি করে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি নুডুলস খেয়ে হাতে চায়ের কাপ নেই। নিজেকে একজন সুখী মানুষ বলে মনে হয়। ছুটির দিনে স্ত্রী আর বাচ্চাকে নিয়ে বেড়াতে বের হই। ডিনার বড় কোনো রেস্টুরেন্টে করি। স্ত্রীকে অবাক করে দিয়ে তাকে একটা চুন্ডি শাড়ি কিনে দেই। ছেলেকে কিনে দেই একটা লাল গাড়ি। সহজ সরল সুন্দর একটা জীবন কি আল্লাহ আমাকে দেবেন না? আমি তো পাপী মানুষ নই। সারা জীবন সৎ থেকেছি। কারো ক্ষতি করিনি। মানুষকে ভালোবেসেছি। তবে কেন আমি একটা সুন্দর জীবন পাবো না? আমার আল্লাহর উপর ভরসা আছে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.