| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রাজিউল হাসান রাজু
খুব সাধারন একজন মানুষ আমি। স্বপ্ন দেখি সাধারন। সাধারন স্বপ্নের মাঝেই খুঁজে বেড়াই নতুনের ছোঁয়া।
১
মানুষ সবকিছুর জন্যে অপেক্ষা করতে পারে। প্রকৃতি পারে না। তাকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। আর না চললে পৃথিবীবাসী তা মেনে নেবে কেন? কনকনে শীতের মাঝে হঠাৎ বর্ষা শুরু হয়ে গেলে, মানুষ মানতে পারবে তা স্বাভাবিকভাবে? অবশ্য না মানলেও সমস্যা নেই। জীবজগত প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, প্রকৃতি নির্ভরশীল না। এখন চলছে গ্রীষ্মের ছুটি। ছুটির যৌক্তিকতা আছে। এই সময় ক্লাস চললে আম-কাঁঠালকে স্বপ্নেই খেতে হবে সকল ছাত্র-শিক্ষককে। আসলে গ্রীষ্মের ছুটিকে অন্য অর্থে বলা যায় আম-কাঁঠাল বিলাসিতা। তপু পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানটায় বসে আছে। এখানে আম-কাঁঠাল বিক্রি হয় না, চা-সিগারেট বিক্রি হয়। দোকানদারের নাম রতন। বাড়িতে এলে সকালের নাস্তা সেরে রতনের দোকানে এসে দুপুর পর্যন্ত বসে থাকা তপুর প্রতিদিনের কাজ। সে এখানে বসে যদিও চা-সিগারেট খেয়ে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে, আবার কখনও রতনের সাথে নিজে চা-সিগারেট বিক্রি করে সময় কাটায়, তবু এভাবে সময় কাটানোর পেছনে তার রয়েছে অন্যরকম উদ্দেশ্য। রতনের দোকানের সামনে দিয়েই নদী প্রতিদিন কলেজে যায়। আর যখন গ্রীষ্মের ছুটি চলমান থাকে, তখন কলেজ না থাকলেও তার বিভিন্ন স্যারের কাছে পড়ার সময় এই একই । এমনিতে সে বিকেলে প্রাইভেট পড়তে গেলেও, ছুটিতে এই কাজ সে সকালেই সেরে নেয়। আর চলার পথে তাকে একনজর দেখতেই তপু এভাবে বসে থাকে রতনের দোকানে।
নদী তপুর চাচাত বোন। ওদের বাসার একবাসা পরেই নদীদের বাসা। এই এলাকাটা একটা মফঃস্বল শহর এলাকা। মফঃস্বল শহরগুলোর মানুষদের একটা সমস্যা আছে। এরা ছোটখাটো ব্যাপারগুলোকেও অনেক বড় করে দেখে। তিলকে তাল বানাতে এদের চেয়ে পারদর্শী অন্যকোথাও পাওয়া ভার। অবসরে অন্যের সমালোচনায় মুখোর হয়ে থাকাটাই এদের বেশিরভাগের সময় কাটানোর বড় অস্ত্র। তাই বলে এখানের সবাই এমন, তা না। দুয়েকজন এমন মানুষও থাকে, যারা ফেরেশতার সাথে তুলনীয়।
দুই ভাইয়ের মাঝে তপু বড়, অপু ছোট। অপু এখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। বইয়ের পড়ার পারদর্শিতার চেয়ে তার বাহ্যিক জ্ঞানের পারদর্শিতা একটু বেশিই। আর তাই বড় ভাই তার পড়া নিয়ে বসুক, সেটা সে সাচ্ছন্দের সাথে গ্রহন করে না। তবে বাহ্যিক জ্ঞান বেশি থাকার কারণে, সে মনে মনে সন্দেহ করে তপুর মাঝে নদী সম্পর্কে কিছু একটা আছে। আর একারণেই সে বড় ভাইয়ের আশেপাশে থাকতে চায় সবসময়। কিন্তু বড়ভাইটা তার হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। খুব বেশি আশেপাশে ঘুরঘুর করলেই বই নিয়ে বসতে বলে পড়া ধরবে বলে। অপরদিকে নদী হল চরম বদরাগী একটা মেয়ে। তার আশেপাশে থেকে এই ব্যাপারে কিছু জানার চেষ্টা করলে নির্ঘাত এনকাউন্টার করে দেবে! একারনে সেদিকেও সে বেশি ঘেঁষতে পারে না।
এদিকে দুই বোনের মাঝে নদী ছোট। প্রীতি বড়। বিয়ে হয়ে গেছে তার বছর দুই আগে। দুলাভাই বড় সরকারী অফিসার। অতএব বাড়িতে তার একার রাজত্ব। প্রীতির বিয়ে হয়ে যাওয়ার আগে বড় বোনের সাথে দেখা করার নাম করে অন্তত তপু যখন তখন যাতায়াত করতে পারত সে বাড়িতে। কিন্তু এখন চাচা-চাচির সাথে দেখা করার পর আর সে বাড়িতে অকারণে পা দেয়ার কোন যুক্তি খুঁজে পায় না। আর তাই এভাবেই নদীর চলার পথে তার অবস্থান নিতে হয় একনজর দেখার জন্য। কিন্তু আজকাল তপু মনে মনে বড় হতাশ। কারন এই বদরাগী মেয়েটাকে কখনও ভালবাসার কথা জানান যাবে বলে মনে হয় না তার। বললে নির্ঘাত মেছাকার কিছু একটা করে বসবে। পাড়া-প্রতিবেশীর সামনে অপমান যে করবে না, সেটার কোন নিশ্চয়তা নেই। মেয়েটা খুব কম কথা বলে। সহজে সবার সাথে মেশে না। সৌন্দর্যের ব্যাপারেও তার বিশেষ অহংকার থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। এদিকে তপু ছাত্র ভাল হলেও এবং মিষ্টি চেহারার হলেও গায়ের রঙ ময়লা। মুখে দুয়েকটা বসন্তের দাগ থাকায় প্রথম দর্শনে তার চেহারার সৌন্দর্য ধরা পড়ে না। আজকালের ছেলেদের মত তার হাতে পায়ে তেমন কোন অতিরিক্ত ফোলা ফোলা মাংসপেশিও নেই, যা দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করবে সে। সবদিক বিবেচনায় রূপবতী নদীর মনের ঘরে ঠাই করে নেয়ার কোন বিশেষ কারন আপাতত তার নেই, আর কোনদিন থাকবে বলেও মনে হয় না। আর কথা হলে যেভাবে ভাইয়া বলে ডাকে নদী, তাতে সেখানে অন্যকিছু ভাবার প্রশ্নই আসে না।
২.
প্রতিদিনের মত আজও রতনের দোকানে বসে আছে তপু। তবে এখন সে ভেতরের দিকে। বেশ কিছু আগে নদী তার কোন এক স্যারের কাছে পড়ার উদ্দেশ্যে এই পথ ধরেই চলে গেছে। এখনই ফিরবে না। অতএব এই ফাঁকে দুই-চারটা সিগারেট টেনে নিলে কোন সমস্যা নেই। এই উদ্দেশ্যেই দোকানের ভেতরে এককোনায় এসেছে তপু সবার দৃষ্টির আড়াল হতে। ঢাকা শহরে ছেলেবুড়ো একসাথে সিগারেট খেলে কোন সমস্যা নেই। এতে করে কারোর প্রতি কোন বিরূপ মনোভাবও রাখে না। কিন্তু এটা মফঃস্বল শহর। এখানে কেউ যদি তপুকে সিগারেট টানতে দেখে, তাহলে এই ঘটনার সাথে আরও রঙ-চং মাখিয়ে তাকে পাক্কা নেশাখোর বানিয়ে দেবে মানুষ। রতন বাইরের মানুষের চালচলন দেখছে, আর রতনকে পাহারায় রেখে তপু আপন মনে সিগারেট টানছে।
“ভাইয়া!?” নদী চিৎকার করে উঠল বিস্ময়ে। তপু চমকে পেছনে তাকাল। নদী দোকানের ভেতর। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না, নদী এখানে কি করে। রতন কোনরকম কোন সংকেত দিল না কেন? এক ঝটকায় রতনের দিকে তাকাল তপু। প্রত্যুত্তরে একটু কাঁধ ঝাকিয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করল রতন। ঘটনার আকস্মিকতায় তপু এতটাই চমকে গেছে, হাতের সিগারেটটা ফেলতে ভুলে গেছে।
“তু-তু-তুই এ-এ-এখানে?”
“তুমি সিগারেট খাও!?” নদী সত্যিই বিস্মিত। সে ধূমপায়ীদের মোটেও সহ্য করতে পারে না। শুধু নদীই নয়, কোন এক অজানা কারণে বেশিরভাগ মেয়ে ধূমপায়ী ছেলেদের পছন্দ করে না। অবশ্য কিছু মেয়ে ধূমপায়ীদের শুধু পছন্দই করে না, নিজেরাও ধূমপান করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তপুর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু অনিতা নিজেই ধূমপান করে।
“একটু একটু।“ কথাটা বলেই তপু মাথা নিচু করে ফেলল। কোন ভালমানুষ চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়ে গেলে যেমন লজ্জায় তার মাথা নিচু হয়ে যায়, ঠিক এমনই অবস্থা হয়েছে এখন তপুর।
“আজ থেকে আর খাবা না। আর খেলে এভাবে আমার চলার পথে বসে থাকবা না। তোমার মুখ আমি দেখতে চাই না।“ যেমন আচমকা এসেছিল, ঠিক তেমনি আচমকা চলে গেল সে।
ঘটনার আকস্মিকতায় কথা বলতে ভুলে গেছে তপু। হয়তো নড়াচড়ার কথাও মনে নেই তার। বেশকিছুক্ষণ পর রতনের ডাকে তপুর হুঁশ ফিরল। আর সাথে সাথেই সে ছুটে যেয়ে রতনের গলা চেপে ধরল। রতনের অপরাধ তপুকে সে কেন জানায়নি নদীর আগমনের কথা।
অনেক কষ্টে রতন নিজেকে তপুর হাত থেকে রক্ষা করল। গলা ধরে সে কাশতে শুরু করল সাথে সাথেই। গলা চেপে ধরায় তার শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ একনাগাড়ে কেশে তারপর সে যা জানাল, তার সারমর্ম হলঃ নদী এসে সরাসরি রতনকে ইশারায় তপুর কথা জানতে চায়। রতন কিছু বলে ওঠার আগেই ভেতরের ধোঁয়া চোখে পড়ে নদীর। নদী দোকানের ভেতরে উঠতে যাবে এমন সময় যখন রতন তপুকে সাবধান করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন চোখ গরম করে মৌনভাবেই শাসিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে। নদীকে ভয় পায় না, এমন ছেলে এই তল্লাটে খুঁজে পাওয়া ভার। এর দুটো কারন। এক, নদী খুব বদরাগী স্বভাবের মেয়ে। আর দুই, নদীর বাবা বেশ প্রভাবশালী মানুষ। অতএব এই মেয়ে যত সুন্দরীই হোক, তার থেকে দূরে থাকাই সবাই নিরাপদ মনে করে।
৩.
রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ হল। ঘুম আসছে না তার। নদীর কাছে আজ সে অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে। নাইবা ভালবাসল নদী তাকে, তবু এমন ঘটনা ঘটা ঠিক হয়নি। প্রিয়জনের কাছে কে ছোট হতে পছন্দ করে? কে চায়, প্রিয়জন তাকে ঘৃণা করুক? মানব চরিত্র এমনই। ভালবাসার মানুষকে পাবে না জানলেও, সেই মানুষটার সামনে একটু হলেও ভাল হয়ে থাকতে চায়। একটু সঙ্গ চায় তার। নাহ! কাজটা একদম ঠিক হয়নি আজ! কে জানত, নদী যেতে না যেতেই আবার ফিরে আসবে! ধুর, মোটেও ঠিক হয়নি এটা! কাল থেকে সিগারেট খাওয়া বন্ধ। আর খেলেও এলাকার বাইরে যেয়ে খেতে হবে, রতনের দোকানে আর না।
বাড়ির ছাদে উঠে এসেছে তপু। আকাশ ভরা তারা আজ। একটা খোলা মাঠে একা চিত হয়ে শুয়ে যদি এক ধ্যানে তারাগুলো দেখা যেত, আরও ভাল লাগত হয়তো। আজ কেন যেন, কিছু একটা থেকে পালাতে ইচ্ছে হচ্ছে তপুর। ওই তো নদীর বাসা দেখা যাচ্ছে। এটা গল্প-উপন্যাস হলে এই ছাদ থেকেই নদীর জানালা দেখা যেত। কিন্তু কঠিন বাস্তবতায় এসব হয় না। মনের মাঝে কেমন যেন একটা ঝড় চলছে। তাড়না আসছে, কিছু একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছার। কিন্তু, কি সেই সিদ্ধান্ত? আর কিসের ব্যাপারেইবা সিদ্ধান্ত?
নির্বাক এক অস্বস্তি ঘিরে রেখেছে তপুকে। নিজের অজান্তেই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করল সে। একটা সিগারেট দুই ঠোঁটে চেপে ধরল। ম্যাচের জ্বলন্ত কাঠিটা সিগারেটের কাছে ধরে টান দিতেই জ্বলে উঠল সেটা। সিগারেটের আগুন চরম একটা জিনিশ। অনেক দূর থেকেই এই আগুন দেখা যায় আঁধারের মাঝে। কাল থেকে তপু এলাকার বাইরেই সিগারেট খাবে, সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু তবু অস্বস্তিটা কাটছে না তার ভেতর থেকে। নদীর সামনে দাঁড়ানোর মত সাহস আর নেই তার মাঝে। শহরের মেয়েরা ধূমপানকে সহজভাবে নিতে পারলেও নদী এখনও মফঃস্বলের মেয়ে। সে সহজভাবে নেবে না, নিশ্চিত। কোন মুখে দাঁড়াবে সে নদীর সামনে? কি না কি মনে করেছে মেয়েটা তাকে!
৪.
আজ ক’দিন তপু আর রতনের দোকানে যায় না। বাসা থেকে বেশ ফাঁকে একটা বাজার আছে। ওখানেই তার সময় কাটে। ওই এলাকায় তার বেশ কিছু বন্ধু আছে। তাদের সাথেই আড্ডা দিয়ে সময় কাটে তার। বাসা থেকে সকালের নাস্তা সেরে চোরের মত বের হয়। যথাসম্ভব নিজেকে লুকিয়ে এলাকা থেকে সরে পড়ে। আর একারণেই নদীর সাথে আর তার দেখা হয়নি সেদিনের পর। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পারতঃপক্ষে আর নদীর সামনে আর পড়বে না।
বাজারের কাছেই অপুর স্কুল। এখন তারও গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। কিন্তু তার বেশিরভাগ বন্ধু এদিকে থাকার কারণে সেও ক্রিকেট খেলতে সকাল-বিকেল এদিকেই আসে। বাসায় থাকলে ভাইয়ের সাথে কথা বলতে গেলেই বই নিয়ে আসতে বলে, তাই ধারেকাছে ঘেঁষে না। কিন্তু আজ এমন একটা স্থানে দেখা হয়েছে, সেখানে বই নিয়ে পড়তে বসানর মত কোন পরিস্থিতি নেই। বড় ভাই সিগারেট খায়, এটা সে জানে। এবং এতে তার কোনরকম কোন দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন নেই। উপরন্তু সে স্বপ্ন দেখে, একদিন ভাইয়ার মত বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, ভাইয়ার মত ভাব ধরে সিগারেট টানবে মনের সুখে।
“ভাইয়া?” তপুর একদম পেছনে দাঁড়িয়ে ডাকল অপু। পেছন ফিরে তাকিয়ে তপু নিজের ছোট ভাইকে দেখল ঠিকই, কিন্তু সেদিন নদীকে দেখে যেমন চমকে গিয়েছিল, তেমন চমকে উঠল না। তার এই বদভ্যাসের কথা অপু জানে আগে থেকেই। এখন তার এক হাতে একটা সিগারেট, আরেক হাতে এক কাপ চা।
“কি রে, এখানে কেন তুই?”
“ক্রিকেট খেলতে এসেছিলাম ভাইয়া।“
“হারলি, না জিতলি?”
“জিতেছি ভাইয়া। আমি হাফ সেঞ্চুরি করেছি আজ।“
“ভাল ভাল। যা বাসায় যা। বেশি দেরি হলে মা বকবে।“
“তুমি যাবে না?”
“আমি একটু পর যাব।“
“ভাইয়া, একটা কথা ছিল।“
“বল?”
“নদী আপু কাল তোমার খোঁজ করছিল।“ এমনিতেই গরমে ঘেমে অবস্থা কাহিল। তারওপর নদীর কথা শুনে তপুর এমন ঘাম দিল শরীরে, মনে হচ্ছিল লবনের অভাবে সে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়বে। নিজেকে সামলে সে অপুকে জিজ্ঞেস করল,“কি বলেছে?”
“জানতে চাইল, তুমি চলে গেছ কি না। আজ ক’দিন নাকি তোমাকে দেখা যায় না।“
“তুই কি বলেছিস?”
“আমি বলেছি, তুমি আছ। আজকাল বাজারেই বেশি আড্ডা দাও। রতন ভাইয়ের দোকানে তুমি বস না আর।“
“এখানে রতনের দোকানের প্রসঙ্গ আসল কেন?”
“বা রে, তুমি তো নদী আপুকে দেখার জন্য রতন ভাইয়ের দোকানে বসে থাকতে।“
“তোকে এ কথা কে বলেছে?” তপুর মেজাজ গরম করে অপুর এমন পণ্ডিতি দেখে, ধমকে উঠল।
“আমি সব বুঝি।“ ভয় পেলেও অপু কথাটা বলল।
“কি বুঝিস তুই?” তপু এবার ভালভাবেই অপুর দিকে ফিরেছে। উদ্দেশ্য কষে একটা থাপ্পড় লাগাবে। ভাইয়ের মনোভাব অপুও টের পেয়েছে। আর তাই সে দৌড় লাগাল। আর দৌড় লাগানর পূর্ব মুহূর্তে বলল,“তুমি নদী আপুকে পছন্দ কর, সেটা আমি জানি।“ এটুকু বলেই অপু গায়েব। রাগে গা জলছে এখন তপুর। হবে না দু’ফুট, ভাব ধরে ছয় ফুটের। আজ বাসায় যেয়ে আচ্ছামত সোজা করতে হবে বেয়াদবটাকে।
৫.
তপুর ছুটি শেষ। কাল সে ঢাকা ফিরবে। সকালের নাস্তা করেই বেরিয়ে পড়বে বাস ধরতে। ঢাকা পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যাবে। মায়ের কথাতেই বিকেলে বাইরে যাওয়ার পথে তপু নদীদের বাসায় গেল। উদ্দেশ্য চাচাচাচীর কাছে থেকে বিদায় নেয়া। বাসায় ঢুকতেই নদী সামনে পড়ল।
“কাল মনে হয় চলে যাচ্ছ?” নদীর গলা অসম্ভব শান্ত। সেদিনের সেই ঘটনার পর এভাবে কথা বলার কথা না নদীর।
“হুম। তুই বুঝলি কি করে?“
“তুমি বাড়ি আসার পর একবার আর চলে যাওয়ার আগে একবার করে আমাদের বাসায় আস বাবা-মার সাথে, সেটা আমি জানি। কখন যাবে?”
“সকালে।“
“কয়টার দিকে?”
“এই তো দশটার দিকে।“
“রতন ভাইয়ের দোকানে আর বস না কেন তুমি?”
“এমনি। বাজারে বন্ধুরা আড্ডা দেয়, ওখানেই যাই।“
“আগে তো যেতে না।“
“যেতাম না বলে ওরা রাগ করে। তাই ওদের সাথে প্রমিজ করেছি, এখন থেকে নিয়মিত ওখানেই আড্ডা দেব।“
“কাল একবার ঢাকা যাওয়ার পথে রতন ভাইয়ের দোকানে দাঁড়াতে পারবে?”
“কেন?”
“কাজ আছে।“ নদীর এই কাজের কথা শুনেই তপুর অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল। না জানি কি বলবে। সেদিন হয়তো ভালভাবে রাগটা ঝাড়তে পারেনি, কাল সেটার ষোলকলা পূর্ণ হবে। দাঁড়াবে তপু? নিজের মাঝে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সে। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার নদী বলে উঠল,“কি ভাবছ?”
“কিছু না।“
“তাহলে কাল দাঁড়িয়ো।“
“কি কাজ?”
“কালের কাজ, আজ জানতে চাও কেন?” নদী একটু রেগে উঠল।
“আচ্ছা, দাঁড়াব।“ অপ্রীতিকর ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেতেই তপু সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল।
“বাবা-মার সাথে দেখা করতে এসেছ?”
“হুম।“
“ভেতরেই আছে সবাই। চল।“
চাচা-চাচীর সাথে কথা বলেই বিদায় পর্ব শেষ করল সেদিন তপু। নদীর সাথে আর কথা হল না।
৭.
দশটা বাজতে আর মাত্র পনের মিনিট বাকি। এখনই না যেতে পারলে বাস মিস হয়ে যাবে। গত পনের মিনিট ধরে রতনের দোকানে সামনের বেঞ্চে বসে আছে তপু। নদীর কোন দেখা নেই। নাহ! আর পাঁচ মিনিট দেখবে, তারপর চলে যাবে, সিদ্ধান্ত নিল তপু।
“কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছ?” নদীর গলা শুনে তপু চমকে পেছনে তাকাল। প্রিয়জনের আগমন সবসময় এমন হয়, বুকের ভেতর আচমকা উত্তেজনার সৃষ্টি করে। রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে দেয় শরীরে। তা প্রিয়জন যত পুরনোই হোক, একই ঘটনা ঘটে সবসময়। তপুর মাঝেও একই উত্তেজনা চলছে এখন। কখন নদী এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে, জানেই না সে।
“এই তো মিনিট পনের।“ বেশ শান্তভাবেই জানাল তপু।
“স্যরি, তোমাকে দেরি করিয়ে দিলাম।“
“কি কাজ বল।“
কিছু না, তোমাকে একটা জিনিশ দেব।“
“কি?”
তপু জিজ্ঞেস করতেই নদী একটা ইনভেলপ বাড়িয়ে ধরল।
“এটা কি?”
“তোমার জন্য এটা। কিন্তু বাসে ওঠার পর খুলবে, তার আগে না।“ মিটিমিটি হাসছে নদী।
“কি আছে এতে?”
“সেটা তো বাসে উঠলেই জানতে পারবে। তাড়াতাড়ি যাও, তোমার বাস মিস হয়ে যাবে তো।“
নদীর তাড়ায় তপুর হুঁশ ফিরল। সে দ্রুত একটা রিক্সা ডেকে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাত্রা শুরু করল। রিক্সা ছাড়ার সময় একবার ক্ষণিকের জন্য ফিরে তাকাল নদীর দিকে। মেয়েটা একা দাঁড়িয়ে আছে। ওর চারপাশে কেমন যেন এক শুন্যতা বিরাজ করছে। শুভ্র মুখটা কেমন যেন লালচে হয়ে গেছে। গরমের কারণেই হয়তো। কিন্তু চোখ জোড়ায় কি যেন আছে। চোখ দুটো কি যেন বলতে চাইছে তার।
বাস ছাড়ার মিনিট দুয়েক আগেই তপু বাসে উঠে পড়েছে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিল সে বাসে। নদীর থেকে বিদায় নেয়ার পর এখন পর্যন্ত সে ঘোরের মাঝে ছিল। বাসটা যেন উড়ে চলেছে ঢাকার দিকে। তপু ধীরে ধীরে নদীর ইনভেলপটা খুলল। সেটা থেকে বেরিয়ে এলো কয়েক পাতার একটা চিঠি। পড়া শুরু করল সে।
কতক্ষণ কেটে গেছে জানা নেই তপুর। নেশাগ্রস্তের মত এরই মাঝে কয়েকবার পড়েছে সে চিঠিটা। এইমাত্র আরও একবার পড়ে শেষ করল। অবিশ্বাস্য লাগছে সবকিছু।বুকের ভেতর পাওয়ার আনন্দ আর বিরহের কষ্ট মিস্রিত এক অনন্য অনুভুতি। ইচ্ছে হচ্ছে এখনই বাস থেকে নেমে এক ছুটে নদীর সামনে যেয়ে দাঁড়াতে!
( সমাপ্ত )
©somewhere in net ltd.