নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

রাজিউলের পাগলামি

রাজিউল হাসান রাজু

খুব সাধারন একজন মানুষ আমি। স্বপ্ন দেখি সাধারন। সাধারন স্বপ্নের মাঝেই খুঁজে বেড়াই নতুনের ছোঁয়া।

রাজিউল হাসান রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

বিবর্ণ আকাশ

২৮ শে জানুয়ারি, ২০১৩ বিকাল ৫:৩৯





১.

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। কথাটা কি আসলেই সত্যি? নাকি শুধুই কথার কথা? হয়তো সত্যি, হয়তো না। ত্রপার খুব মন খারাপ। রাত অনেক গভীর হয়ে গেছে, তবু ঘুম আসছে না। মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। শুধু বিশ্বাস থাকলেই যেকোনো কিছু মেলে না। পরম কাঙ্ক্ষিত কিছু পেতে ভাগ্যের জোরটাও অনেক লাগে। নিজেকে তার খুব দুরভাগ্যবতী মনে হচ্ছে।



চেহারাটাও ঠিক ভাবে দেখা হয়নি তার। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর গ্যাঞ্জাম চলছিল। ছাত্ররাজনীতি একটা সময় জাতির শক্তির উৎস থাকলেও, এখন তা হয়ে গেছে রাজনৈতিকদলগুলোর শক্তির উৎস। একটা সময় এই ছাত্রদের সাহসে সাহসী হয়ে বাঙ্গালী ভাষার জন্য জীবন বাজি রেখেছে, গন অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবনের মায়া ত্যাগ করে ঝাপিয়ে পড়েছে; কিন্তু আজ কোথায় সেই নৈতিকতা? ছাত্ররা এখন আর অন্যের দুঃখে দুঃখী হয় না। রাজনীতিতে যেভাবেই প্রবেশ ঘটুক, একটা পর্যায়ে ক্ষমতা সবার নেশায় পরিনত হয় আর যেকোনো ভাবে অর্থ হাতানো অভ্যাসে পরিনত হয়। সামনে নির্বাচন। আর তাই রাজনৈতিকদলগুলো এখন মরিয়া। আর তাদের সমর্থনে মাঠে ময়দানে হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বেপরোয়া ছাত্ররা। এদের এখন বাছ-বিচার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। বুঝতেই পারে না, দলগুলো তাদেরকে শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।



সেদিন কি করে যেন আচমকা দুই গ্রুপের ছাত্রদের মাঝে শুরু হয়ে গেল ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া। আর বিপক্ষের কাউকে যেখানেই পাওয়া যাচ্ছে, পিটিয়ে আধমরা করে দিচ্ছে দুই গ্রুপেরই সবাই। এসবের মাঝে সাধারন ছাত্রছাত্রীরাও মাঝে মাঝে হয়ে যাচ্ছিল বলির পাঁঠা। ত্রপা সবে ক্লাস শেষ করে বাইরে এসেছে বাসায় চলে যাবে বলে। সাথে বন্ধুরাও ছিল। ঠিক এমন মুহূর্তে শুরু হয়ে গেল মারামারিটা। চোখের পলকে ত্রপার বন্ধুবান্ধবরা নিজেকে বাঁচাতে যে যেখানে পারল গা ঢাকা দিল। ত্রপাও হয়তো একই কাজ করত; কিন্তু সে সুযোগ সে পেল না। কোত্থেকে একটা ঢিল এসে তার কপালে লাগল খুব জোরে। মাথা ফাটল, কি ফাটল না, দেখার সময়ও পেল না। সাথে সাথেই প্রচণ্ড আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। জ্ঞানহীন অবস্থায় কতক্ষণ কাটিয়েছে জানে না। যখন জ্ঞান ফিরতে শুরু করল, অনুভব করল, একটা রিক্সায় সে। তার সাথে আরও একজন আরোহী আছে। আরোহীটা বার বার তাড়া দিচ্ছে রিকশাওয়ালাকে দ্রুত কোথাও যেতে। অর্ধ চেতন অবস্থাতেই ত্রপা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কিছুপরেই আবার জ্ঞান হারাল।

আবার যখন জ্ঞান ফিরল, নিজেকে আবিষ্কার করল একটা ক্লিনিকে। পাশে মা আর বাবা দাঁড়িয়ে। মাথায় তার ব্যান্ডেজ। সে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু মাথা চক্কর দিয়ে উঠল সাথে সাথেই। ডাক্তার এবং বাবা-মা তাকে উঠতে মানা করে দিল।



হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় ত্রপা জেনেছে, একটা যুবক তাকে নিয়ে এসেছিল চিকিৎসার জন্য। যখন সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ডাক্তারের জরুরি তত্ত্বাবধানে, ঠিক সেই সময় যুবক ত্রপার ব্যাগ হতে তার ফোন বের করে সেখান থেকেই ফোন করে বাসায় খবর জানায়। এরপর ডাক্তারের কাছে ত্রপার সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেছে সে। আর কখনও ফেরেনি।

প্রথম প্রথম ত্রপা সেই যুবক কে, সেটা নিয়ে মাথা ঘামাত খুব। বন্ধুদের কাছে বারবার জিজ্ঞেসও করেছে, তাকে কে উদ্ধার করেছিল। কিন্তু কারোর কাছেই কোন সন্তোষজনক জবাব পায়নি। পরিচয় জানার আকাঙ্ক্ষা কবে যে ভালবাসায় রুপান্তরিত হয়েছে, জানেই না ত্রপা। এখন সে শুধু যুবককে জানতেই চায় না, সাথে তাকে পেতেও চায় সারাজীবনের জন্য। কিন্তু কোথায় সে? কি তার ঠিকানা? দেখতে কেমন সে?



২.

ক্যাম্পাসে একটা নতুন রোমিও জুটেছে ত্রপার। অন্যসব রোমিওর চেয়ে এই ছেলেটা একটু খতরনাক টাইপের। নাম রিফাত। ছাত্ররাজনীতির একজন সক্রিয় ছোটখাটো নেতা। ত্রপা ক্যাম্পাসে ঢোকার পর থেকে ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ত্রপার পিছু লেগেই থাকে। তার রাজনৈতিক ছোট ভাইরা ত্রপাকে ইতোমধ্যে ভাবি বলে ডাকা শুরু করে দিয়েছে। রিফাত জুটে যাওয়াতে ত্রপার অবশ্য একটা উপকারই হয়েছে। ভয়ে অন্যসব রোমিও তার পিছু ছেড়ে দিয়েছে। জীবনের মায়া কার না আছে! রিফাত সম্পর্কে সবারই একটু আধটু জানা আছে। এমনিতে সে গায়ে পড়ে কারোর সাথে লাগতে যায় না, কিন্তু তার পায়ে পা লাগিয়ে কেউ বাধিয়ে দিলে বা তার কেউ কোন ক্ষতি করতে চাইলে ইহধামই ত্যাগ হয়ে যাওয়ার একটা সমূহ সম্ভাবনা জেগে ওঠে দুঃসাহসীর।



কিন্তু রিফাত নিজেই একটা আতঙ্ক, যন্ত্রনা ত্রপার জন্য। প্রথম প্রথম সে নিজেও রিফাতকে ভয় পেত; কিন্তু ছেবলামির কারণে সে ভয় কোথায় হারিয়েছে ত্রপা নিজেই জানে না। এখন রিফাত সামনে আসলেই বিরক্ত লাগে। সে এখন ত্রপার জীবনে মূর্তিমান যন্ত্রনা!

আজ ত্রপা ক্লাস শেষ করে যেই বের হয়েছে, সাথে সাথে রিফাত সামনে হাজির। হাসি মুখে জানতে চাইল,“ কেমন আছ?”

“জি ভাল। আর কিছু?” বিরক্ত নিয়ে উত্তর করল ত্রপা।

“না। তুমি ভাল আছ, এটুকুতেই আমি সন্তুষ্ট।“ দাঁতাল হাসি দিল রিফাত। ত্রপা সাথে সাথে পাশ কাটিয়ে চলে গেল রিফাতের। এদিকে ত্রপার সাথে বাকি বন্ধু-বান্ধবি যারা ছিল, তাদের তো একাকার অবস্থা। এদের মাঝে পণ্ডিতের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিফাত আর কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো, সেটা ঘটেই যাবে। কিন্তু সে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল না। ত্রপা চলে যেতেই সেও হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে ঠিকই পণ্ডিতকে হাতের ইশারায় একটু খানি জ্বালিয়ে গেল।



নাম তার আব্দুর রহিম। কিন্তু বন্ধুরা ডাকে পণ্ডিত বলে। একে সে বাঁচাল শ্রেণীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষ, তার ওপর যেকোন কিছুতেই জ্ঞান দেয়ার একটা প্রবনতা সবসময় থাকে। একারণেই এমন নাম দিয়েছে বন্ধুরা। কিন্তু তার মুখ বন্ধ হয়ে যায় রিফাত সামনে পড়লেই। যমরাজ যদি সামনে আসে তাহলেও হয়তো এতটা ভয় পাবে না পণ্ডিত, যতখানি রিফাতের ক্ষেত্রে ঘটে।



৩.

কেউ হাঁটু দিয়ে নিচ থেকে, কেউ কনুই দিয়ে আবার কেউ লাথি-ঘুসি কষিয়ে শায়েস্তা করছে ছেলেটাকে। মার খাওয়া ছেলেটার নাম কায়সার। তার অপরাধ, সে ত্রপার ওড়না ধরে টান দিয়েছে আজ।



ক্লাসে দেরি হয়ে গেছে বিধায় দ্রুত রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে ত্রপা ক্লাসের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। পথিমধ্যে হঠাৎ ওড়নায় টান অনুভব করে পেছন থেকে। ফিরে দেখে কায়সার ওড়না টেনে ধরে হাসছে। এটাও ত্রপার একজন রোমিও। আর সব রোমিও রিফাতের ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিলেও, কায়সার নেয়নি। নেবে কেন? সে কি রিফাতের চেয়ে কম কিছু? রিফাতের বিরোধী গ্রুপের একজন কর্মী সে। বয়সে রিফাতের চেয়ে ছোটই হবে। কিন্তু এখনই ধরাকে সরা জ্ঞান করতে চায়। এমতাবস্থায় চিৎকার দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার মত খুঁজে পেল না ত্রপা। ফলাফলে কেউ এগিয়ে না এলেও কায়সার ওড়না ছেড়ে দিল। ত্রপা সাথে সাথে ক্লাসে চলে গেল। আর এখবর চেলাদের কানে কানে রিফাতের কানে গিয়ে পৌঁছল। আর যায় কোথায়! মহারাজা সৈন্য-সামন্তদের যেখানে থেকেই পারা যায় কায়সারকে জীবিত অথবা মৃত তার সামনে হাজির করতে নির্দেশ দিয়ে বসল। ছাত্র রাজনীতিতে ছোটভাইরা সবসময় বড় ভাইদের নির্দেশের জন্য মুখিয়ে থাকে। নির্দেশ দেয়ার কিছু সময়ের মাঝেই দেখা গেল চার-পাঁচজনে মিলে কায়সারকে ধরে আনছে, সাথে উত্তম-মধ্যমও চলছে।



মার চলার এক ফাঁকে কায়সার হঠৎ রিফাতের পা জড়িয়ে ধরল ক্ষমা পাওয়ার আশায়। ইতোমধ্যে সে তার অপরাধ জেনে গিয়েছে। রিফাত অন্য জিনিস। সে সহজে কাউকে ধরে না, আর ধরতে পারলে সহজে ছাড়ে না। অতএব ক্ষমা আর পাওয়া হল না কায়সারের। মারের একটা পর্যায়ে কায়সার সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তখন আবার রিফাতসহ বাকি সবাই তাকে তুলে নিয়ে দ্রুত হাসপাতালের পথ ধরল।



হাসপাতালে ডাক্তার কায়সারকে দেখেই আঁতকে উঠলেন। আশ্চর্য হয়েই বলে উঠলেন,“ ইস! কেমন করে হল?”

“আমরা মেরেছি।“ নিরুত্তাপ গলায় জানাল রিফাত।

“কেন?” ডাক্তার সাহেব আরও বিস্মিত হয়ে গেছেন।

“মেয়েদের ওড়না ধরে টান মারে। মারব না তো কি আদর করব?” এবার একটু ঝাঁঝ নিয়েই জানাল রিফাত। সাথের বাকি সবাই চুপচাপ কথা শুনছে তার। শেষ জবাবে ডাক্তারের চেহারাও একটু কঠিন হয়ে উঠল। সে একটু গম্ভীর হয়ে বলল,“তাহলে মেরে আবার চিকিৎসা করাতে এনেছেন কেন? আর তাছাড়া দেশে ইভ টিজিঙের আইন আছে, পুলিশে দিলেও তো পারতেন।“

“আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? দেশের প্রতিটা জনগনের অন্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। ও অপরাধ করেছে, একারনে মার খেয়েছে। তাই বলে বিনা চিকিৎসায় রাস্তায় ফেলে দেব? আর বললেন না, পুলিশে দিতে? ওখানে দিলে তো ওর জীবনেরই বারটা বেজে যাবে। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারই করে দেবে। সামান্য একটা ওড়না টানের জন্য এত বড় সাজা কি হওয়া উচিত তার? তাই আমরাই সাজা দিয়ে দিলাম। জীবন থাকতে আর এমন কাজ করবে না শিক্ষা হয়ে থাকলে আবার জীবনটাও নষ্ট হল না ওর। নেন, আর কথা না বলে দ্রুত চিকিৎসা দেন। দেখছেন না, রক্ত পড়ছে?”



ডাক্তার কিছুক্ষণ বিভ্রান্তভাবে তাকিয়ে থাকলেন রিফাতের দিকে। কি বুঝলেন, তিনি নিজেই জানেন। তারপর দ্রুত হাতে চিকিৎসা শুরু করলেন।



৪.

ডাক্তারের হাতে কায়সারকে সোপর্দ করে রিফাত সোজা এসে ত্রপার সাথে দেখা করল। আজ এমনিতেই সকাল থেকে কায়সারের কারণে মনের অবস্থা ভাল ছিল না, তার ওপর এখন রিফাত সামনে, মেজাজটা আরও গেল বিগড়ে। তবু সে চুপ করেই থাকল।

“কায়সার আর কখনও তোমার ওড়না ধরে টান দেবে না।“ সেই পুরনো দাঁতাল হাসি রিফাতের মুখে।

“কেন মেরে ফেলেছেন নাকি তাকে?” ত্রপার কণ্ঠে, চেহারায় বিরক্তি ছড়িয়ে পড়ল।

“ছি ছি, কি বল। আমি জীবনে মশা-মাছিই মারি নাই, মানুষ মারতে যাব কেন?”

“তাহলে কি করেছেন তাকে?”

“ধরে এনে ছ্যাচা দিয়ে দিয়েছি। এখন হাসপাতালে। কাটাগুলোতে ডাক্তার চিকিৎসা দিচ্ছে। দু-চারদিন লাগবে ঠিক হতে।“ আবার সেই ভুবন ভোলান হাসি রিফাতের মুখে।

“আপনি আমার সামনে থেকে চলে যান। আর কখনও আমার সামনে পড়বেন না।“ রাগ সামলাতে না পেরে ত্রপা চিৎকার করে বলে উঠল।

“সত্যি?” রিফাতের হাসি হারিয়ে গেছে। চেহারায় এখন কষ্ট আর অবিশ্বাস। ত্রপার কথা সে বিশ্বাস করতে পাচ্ছে না।

“হ্যা সত্যি। আপনার দুটো পায়ে পড়ি, আমাকে ক্ষমা করে দেন।“

“আচ্ছা, আর কখনও সামনে আসব না। পেছন থেকে তোমাকে দেখব।“

“তাও দেখবেন না। আপনি আমার ত্রিসীমানায় থাকবেন না। আপনাকে আমার অসহ্য লাগে।“



মাথা নিচু করে রিফাত চলে গেল। কিছুই বলল না আর। ত্রপা তাকে আর কখনও সামনে আসতে মানা করেছে। ব্যাপারটা এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না তার। চলার পথে তাই হয়তো একবার পেছন ফিরে তাকাল। ত্রপার চোখে তখনও আগুন ঝরে পড়ছে। রিফাত আবার মাথা ঘুরিয়ে নিল। চলে গেল দৃষ্টিসীমার বাইরে।



৫.

চারিদিকে খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমে শোনার পর কেউই সহজে বিশ্বাস করতে পারেনি। এক কোথায় অসম্ভব বিশ্বাস করা। তবু সত্যি। ত্রপাও শুনল। সাথে সাথে স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল তার সামনে থেকে রিফাতের শেষ চলে যাওয়ার দৃশ্যটা। সেদিন বিকেলেই রিফাত পৃথিবী ছেড়েই চলে গেছে!



ত্রপার কাছে অপমানিত হয়ে রিফাত একা একাই হাঁটছিল রাস্তা ধরে। কখন যে বেখেয়ালে গলি টাইপ একটা রাস্তায় ঢুকে গেছে, নিজেই জানে না। হঠাৎ একটা গুলির আওয়াজ হল। সাথে সাথে লুটিয়ে পড়ল রিফাত। মুখ কুঁচকে গেছে। প্রচণ্ড ব্যাথায় কথা বলার চেষ্টা করেও পারল না। ক্ষণিকের জন্য অদৃশ্য কিছুর প্রতি হাত বাড়ানোর চেষ্টা করল হয়তো বাঁচার শেষ আশা নিয়ে। তারপরেই সব শেষ হয়ে গেল। নিথর হয়ে গেল দেহটা। যে একসময় কাউকে মারধর করলে বা তার চোখের সামনে আহত বা অসুস্থ অবস্থায় কেউ পড়ে থাকলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হত, সে আজ এক অজানা গলির মাঝে বিনা চিকিৎসায় আততায়ীর গুলিতে মারা পড়ল। গুলিটা সোজা হৃদপিণ্ড ভেদ করে চলে গেছে।



কিছুটা আনমনেই হাঁটছিল পথ সে। হঠাৎ জুনিয়র একটা ছেলেকে বাচ্চাদের মত কাঁদতে দেখে থমকে দাঁড়াল। ত্রপাকে দেখে ছেলেটাই কথা বলে উঠল কাঁদতে কাঁদতে,“খুশি হইছেন না। আর কেউ আপনারে জ্বালাইব না। রিফাত ভাই আর আপনার সামনে দাঁড়াইব না। আপনারে কেউ ডিস্টার্ব করলেও সে কিছু বলবে না।“



ছেলেটার কান্না দেখে ত্রপার চোখেও জল এসে গেছে। সে আজ কাঁদছে এমন একজনের জন্য যাকে কালই সামনে আসতে নিষেধ করেছিল পরম ঘৃণায়। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল ত্রপা,“কি বলছ এসব!”

“কতবার যে ভাইরে বলছি, ভাই বইলা দেন, ভাই বইলা দেন। না সে কিছুতেই বলবে না। বিনিময়ে কি পাইল? শুধুই আপনের ঘৃণা।“ ছেলেটা আপন মনেই কথা বলছে কান্না ভেজা গলায়।

“কি বলবে সে আমাকে?” ত্রপার ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।

“কি বলব মানে? সবাই জানে, আপনে এমন একজন রে খোঁজেন, যে আপনারে বাচাইছিল। রিফাত ভাইই ছিল সেই মানুষ। কিন্তু সে কখনই বলে নাই, আমাদেরকেও বলতে মানা করছিল।“

ত্রপার পায়ের নিচের মাটি সরে যেতে শুরু করেছে। একই শুনছে সে? এই রিফাতই তাকে বাঁচিয়েছিল! কেন বলেনি সে কখনও তা? উত্তর মিলল রিফাতের শোকে আপন মনে কথা বলে চলা ছেলেটার কাছেই।

“ভাই বলতো, দেখ, আমি যদি বইলা দেই, ও তো এমনিতেই চলে আসবে। তাহলে কি হবে? ওর জীবন বাচাইছিলাম বইলাই তার প্রতিদান নেয়া হয়ে যাবে না? আমি কি এতটা স্বার্থপর হইতে পারি, বল? ত্রপা যদি আমার হয়, তাইলে এমনিতেই হবে। ও রাজি হলেই আমি ওরে জানায়ে দেব, সে যারে খোঁজে, আমিই সে।“



ত্রপার চোখে এখন বন্যা বইছে। কখন যে কান্নায় আপন মনে কথা বলা ছেলেটার কাছে থেকে চলে এসেছে নিজেই জানে না! কোথায়, কোন পথে চলছে, তাও জানে না। বুকের ভেতর কষ্টগুলো আর থাকতে চাইছে না। দুমড়ে মুচড়ে পাজর ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে! চোখের সামনে বারবার রিফাতের মাথা নিচু করে চলে যাওয়ার দৃশ্য, চলে যাওয়ার পথে একবার করুন চোখে পেছন ফিরে তাকানোর দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছে! বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। বিশ্বাসের জোরেই হয়তো এসেছিল সে জীবনে, আবার তাকে নিজের ভুলেই হারিয়ে ফেলেছে ত্রপা।



ঝাপসা চোখে আকাশের পানে চাইল একবার। হয়তো রিফাতকে খুঁজতেই আকাশের বুকে দৃষ্টি মেলল সে। মরে গেলে নাকি মানুষ আকাশে চলে যায়! একদল পাখি উড়ে যাচ্ছে অজানা কোথাও। সবই ঠিক আছে আকাশে। তবু আকাশটা আজ খুব বিবর্ণ!



সমাপ্ত

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৮ শে জানুয়ারি, ২০১৩ সন্ধ্যা ৬:২০

শূন্য পথিক বলেছেন: বিবর্ণ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.