| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রাজিউল হাসান রাজু
খুব সাধারন একজন মানুষ আমি। স্বপ্ন দেখি সাধারন। সাধারন স্বপ্নের মাঝেই খুঁজে বেড়াই নতুনের ছোঁয়া।
১.
সবাই মাথা উঁচু করে তাকিয়ে আছে। টাওয়ারের মাথাটা কত উঁচুতে, সেটাই হয়তো নিরুপনের চেষ্টায় আছে। এই টাওয়ারের উচ্চতা কতটুকু, এদের কেউই তা জানে না। জানার বয়সও এটা নয়। কিন্তু এই অজানা জিনিসটাকেই তারা জয় করতে এসেছে। ঝোঁকের মাথায় সবাই চলে এসেছে।
এখানে সবাই বলতে, ওরা চারজন। রাকিব, শফিক, জিহাদ আর সজল। সবগুলোই নবম শ্রেণীর ছাত্র। একই স্কুলে পড়ে। প্রতিদিনের মত আজকেও একই নিয়মে স্কুলে যাচ্ছিল রেললাইনের পাশের রাস্তাটা ধরে। গল্প হচ্ছিল, হাসি-ঠাট্টা চলছিল চলার সাথে তাল মিলিয়েই। হঠাৎই তর্ক বেঁধে গেল সবার মাঝে। সবাই নিজেকে প্রচণ্ড সাহসী বলে দাবি করে বসল তর্কের সূত্র ধরেই। কিছুক্ষণ এভাবেই হট্টগোলের মাঝে কেটে গেল; কিন্তু কোন সমাধানে পৌঁছাতে পারল না কেউই। কোন সমস্যায় শফিকের দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করার এক অনন্য ক্ষমতা আছে। আজকেও সে একটা সমাধান দিয়েছে। যে স্টেশন এলাকার ওই উঁচু মোবাইল ফোন টাওয়ারের মাথায় উঠতে পারবে, সে-ই সবচেয়ে বেশি সাহসী।
মানব জীবনের বিভিন্ন কালের মাঝে কিশোর কালটা আজীবন দুর্বোধ্য। বড় হয়ে কে বীর হবে আর কে কাপুরুষ হবে সেটা ভবিষ্যতের ব্যাপার, কিন্তু কিশোর বয়সে সবাই জয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। গুটি কয়েক কিশোর বাদে বাকি সবাই নিজেকে ছোট হতে দেখতে পছন্দ করে না। এসময় আবেগটা যেমন থাকে খুব চোখা, ঠিক তেমনি যেকোনো কিছুতে নিজেকে শ্রেষ্ঠ দেখার প্রবনতাও থাকে প্রচণ্ড মাত্রায়। এমনই একটা কারণে এখন ওরা সবাই টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে। স্কুলে যাওয়া আজকের মত স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। এখন সবাই পাদদেশে দাঁড়িয়ে টাওয়ারের মাথা সন্ধান করছে। বেশ নির্বিঘ্নেই পৌঁছে গেছে তারা পাদদেশে। সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার সময় কারোর মাথায় ছিল না, কি করতে যাচ্ছে; কিন্তু এখন একটুখানির জন্যে হলেও হুঁশ ফিরেছে সবার। সবার মনেই ভয় বাসা বেঁধেছে। তথাপি কেউ মুখ খুলছে না; পাছে বন্ধুর কাছে ছোট হয়ে যেতে হয়, কাপুরুষ বলে বিবেচিত হতে হয়, সে ভয়ে।
টাওয়ারটার উচ্চতা আড়াইশ ফুটের ওপরে। এই কিশোর সমাজ তা জানে না। তারা যা জানে, তা হল, অনেক উঁচু এই টাওয়ার। শফিকই প্রথমে এগিয়ে গেল। টাওয়ারটা চার পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে অনেক বড় এলাকা জুড়ে। তারপর ধীরে ধীরে যত উঁচু হয়েছে, তত তার মাথা চোখা হয়ে এসেছে। আর ঠিক মাঝ দিয়েই উঠে গেছে মই আকারের একটা সিঁড়ি। প্রতি পঞ্চাশ ফুট পর পর একটা করে পাটাতন আছে, আরোহণকারীর কাজের সুবিধার্থে এবং বিশ্রাম নিতে। শফিক সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করল। তার পিছু পিছু অন্য সবাই এগিয়ে গেল, যদিও ভয়ে শফিকসহ সবার গলা শুকিয়ে গেছে। এই টাওয়ার থেকে পড়ে গেলে ছাতু হয়ে যাবে সবাই, এটা ওদের জানা। তবু কেউ আপত্তি করতে পাচ্ছে না, কিশোর বয়সের অহমের কারণে।
যাত্রা শুরু হয়ে গেছে সবার। সবার আগে শফিক, তারপর রাকিব, এরপর সজল আর সকল কাজের মত এখানেও যথারীতি সবার পেছনে জিহাদ। সবার নজর এখন ওপর দিকে। প্রথম পাতাতনে পৌঁছে সবাই বসে পড়ল। একটু বিশ্রাম নেবে সবাই। নিচের সবকিছু বেশ ছোট হয়ে এসেছে। দৃষ্টিসীমা বেড়ে গেছে বেশ দূর পর্যন্ত। ফুরফুরে বাতাস শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার ওঠা শুরু করল সবাই।
দ্বিতীয় পাটাতনে পৌঁছে জিহাদ থেমে গেল। সে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে। তার স্থুল দেহ থেকে দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ছে এখন। শুভ্র চেহারায় রক্ত জমে লাল হয়ে গেছে। নাহ! আর পারবে না সে!
জিহাদের আপত্তি এবং তার পরিস্থিতি দেখে তাকে দ্বিতীয় পাটাতনে রেখেই বাকি তিনজন আবার এগিয়ে চলল টাওয়ার জয়ের পথে। এবার একটানে মাঝে একটা পাটাতন রেখে চতুর্থ পাটাতনে উঠে এলো ওরা। এসেই তিনজন বসে পড়ল। হাঁপিয়ে গেছে। একটু বিশ্রাম নিতে হবে। আর এরই মাঝে ঘটল একটা বিপত্তি।
অনেক উঁচু স্থান থেকে হঠাৎ নিচে তাকালে কেমন যেন মাথা চক্কর মেরে ওঠে। অনেকে বলে উঁচু স্থানের কোনায় কখনও যেতে নেই। গেলে নাকি শয়তান বা ভুতে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় সুযোগ বুঝে। এখানে শয়তান বা ভুতে কোন দায় নেই। আসল ব্যাপারটা হল, উঁচু স্থান থেকে নিচে তাকালে হঠাৎ মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। আর এটাই অনেকে সহ্য না করতে পেরে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে বসে এবং এভাবেই ঘটে দুর্ঘটনা। এখন হয়তো অনেকেই বলবেন, মাথা চক্কর দেয় কেন? আমি ভাই বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞ না। আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে যা আসে, সেটাই আমি বলব ব্যাখ্যা হিসেবে। আমরা যখন কোন উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন একটা সমতলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকি। ভূপৃষ্ঠের মত এখানেও অভিকর্ষ আমাদেরকে সমান তালে মাটির দিকে আকর্ষণ করতে থাকে। কিন্তু যখন উঁচু সমতলের কোনায় আমরা পৌছাই এবং নিচে তাকাই, তখন আমাদের মাথা আর ভূপৃষ্ঠের মাঝে আর কোন বাঁধা থাকে না। আমরা অনেকেই হয়তো জানি, আমাদের দেহের সবচেয়ে ভারি অংশ আমাদের মস্তিষ্ক। চাঁদে নাকি ভারি জুতা না পরে গেলে অভিকর্ষের প্রভাবে মানুষের মাথা চলে যাবে নিচে আর পা চলে যাবে ওপর। অবস্থাটা এমন দাঁড়াবে, যেন কাউকে গাছে উল্টো করে ঝোলান হয়েছে। উঁচু স্থান থেকে যখন নিচে তাকান হয়, তখন অভিকর্ষ বাধাহীনভাবে আমাদের দেহের সবচেয়ে ভারি অংশটাকে আকর্ষণ করতে পারে। আর এতেই আমাদের মস্তিষ্কে স্নায়বিক চাপ বৃদ্ধি পায়, আমাদের মাথা চক্কর মারে। চতুর্থ ধাপে এসে সজলেরও অনেকটা এমনই ঘটল। বিস্রামের ফাঁকে নিচের দ্রিশ্য দেখতেই সে একবার উঁকি দিয়েছিল হাতের ওপর ভোর করে। আর এতেই তার মাথা চক্কর মেরে ওঠে। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায় সে। পড়ে না গেলেও ইজ্জতের ফালুদা বানিয়ে ফেলে নিজের অজান্তেই। সজলের চিৎকার চেচামেচির মাঝেই
রাকিব আর শফিক আবিষ্কার করল, প্যান্ট ভিজে গেছে সজলের। এই বিপদের মাঝেও এমন হাসি পেল ওদের, চেপে রাখা কঠিন হয়ে পড়ল। তবু কোনরকমে সজলকে ঠাণ্ডা করে, তাকে ওই চতুর্থ পাটাতনে বসিয়ে রেখেই ওরা আবার উঠতে শুরু করল। এবং শেষ পর্যন্ত মগডালে তারা পৌঁছুল।
জয়ের নেশাকে বর্ণনা করা সম্ভব হলেও জয়ের আনন্দকে কখনও কোন ভাষায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। আসলে আবেগ জিনিসটাকে কোনক্রমেই ভাষায় ব্যাখ্যা সম্ভব না। দুজনেই এখন এভারেস্ট জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা। টাওয়ারের মাথায় দাঁড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। আধ কিলোমিটার দূরের ওদের স্কুল ভবনটাকে মনে হচ্ছে মুরগীর বাসা। অথচ চারটা বিল্ডিঙের সমন্বয়ে নির্মিত স্কুল ক্যাম্পাসের মাঝের যে মাঠটা আছে, ওটা কখনও কোন অপরাধে ড্রিল স্যার চারবার দৌড়ে চক্কর মারার নির্দেশ দিলে দেড় চক্কর দিয়েই হাঁপিয়ে যায় সবাই। চারপাশের সবকিছু একদম ছোট লাগছে; মনে হচ্ছে, খেলনা বাড়িঘর, খেলনা গাড়ি।
কিছুক্ষণ জয়োল্লাস করে আবার শফিক আর রাকিব নিচে নামতে শুরু করল। চতুর্থ পাটাতন থেকে সজলকে সাথে নিয়ে যখন ওরা দ্বিতীয় পাটাতনে পৌঁছল, জিহাদকে আর খুঁজে পেল না। ভয় পেয়ে গেল সবাই। ব্যাটা পড়ে-টোড়ে যায়নি তো! ব্যাপার আবিষ্কার করতেই নিচের দিকে তাকিয়ে জিহাদকে সবাই খুঁজতে যেয়ে খুঁজে না পেলেও আবিষ্কার করল মূর্তিমান আতঙ্ককে। রাকিবের বাবা দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক টাওয়ারে নিচে। তাকিয়ে আছেন ওদের দিকেই। কোন বাক্য ব্যয় না করে সবাই নামতে শুরু করল। প্রথমে মাটিতে নেমে এলো শফিক, তারপর সজল। রাকিব একটু ধীরে নামছে। এবং বাকিরা নেমে একপাশে চোরের মত সরে দাঁড়াচ্ছে। রাকিবের বাবা এখনও চুপ। উনি রাকিবের অপেক্ষায় আছেন।
রাকিব মাটিতে পা রেখেই ঝেড়ে দৌড় লাগাল কোনদিকে না তাকিয়েই। পেছন থেকে শুধু দুবার তার কানে ভেসে এলো, বাবা তার নাম ধরে ডাকছেন জোরে জোরে!
২.
রেলস্টেশনের বর্তমান প্লাটফর্মটা পাকিস্তান আমলে নির্মিত। ব্রিটিশ আমলে বর্তমান স্টেশনের আউট সিগন্যালের কাছাকাছি একটা স্থানে প্লাটফর্ম ছিল। ওটা পরিত্যাক্ত হয়েছে সেই পাকিস্তান আমলেই। জায়গাটা এখন ভুতুড়ে টাইপ। সচরাচর এদিক দিয়ে কেউ যাতায়াত করে না। নির্জন এবং ঘন জঙ্গলে পরিনত হয়েছে স্থানটা যত্নের অভাবে। বড় কোন অপরাধ করে পালানোর প্রয়োজন হলে, রাকিব সরাসরি এখানেই চলে আসে। আজও এসেছে। তারপর থেকে সারাদিন চুপচাপ বসে ছিল একটা ডোবার পাশে। নির্জনতার কারণে রাকিবের স্থানটা খুব ভাল লাগে। ভূতের ভয় তখনও তাকে খুব ভাল করে স্পর্শ করে সারেনি। স্পর্শ না করার অন্যতম কারন হল, তার বাবা-মা। প্রতিটা বাবা-মা বা দাদা-দাদি তাদের উত্তরসূরিকে বাল্যবয়সে ভুত-প্রেতের গল্প শুনিয়ে ছোট্ট মাথাটা এমনভাবে ভরে দেয়, যার কারণে মাথা বড় হওয়ার সাথে সাথে ভূতের ভয়টাও মানুষের মাঝে বড় হতে শুরু করে। কিন্তু রাকিবের বাবা-মা কখনই তাকে ভূতের গল্প শোনানি। তাদের একমাত্র যুক্তি, যে জিনিসের কোন অস্তিত্ব নেই, সে জিনিসের কোন গল্প শোনার কোন দরকার নেই। আর একারণেই এসব ব্যাপারে রাকিবের ভয়ডর একটু কম।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হবে হবে। এমন সময় শফিক কোত্থেকে যেন দৌড়ে এলো। হাঁপাচ্ছে সে। শফিককে দেখেই রাকিব বুঝতে পেরেছে, কিছু একটা সংবাদ আছে।
“কি রে, কি খবর?” উৎসুক হয়ে জানতে চাইল রাকিব।
“বাড়ি চল।“
“বাবা সোজা বানিয়ে ফেলবে।“
“না কিছু বলবে না। সারা এলাকা তোকে খুঁজে না পেয়ে একটু আগে আমাকে বলেছে কাকু, তুই বাড়ি ফিরলে তোকে কিছু বলবে না কেউ।“
“সত্যি?”
“হ্যা, সত্যি। এখন চল তাড়াতাড়ি। জায়গাটা ভাল না। সন্ধ্যে হয়ে গেলে খবর আছে।“
“আরে ধুর, রাখত! চল যাই, বাসায় যাই।“
দুই বন্ধু বাসার পথ ধরল।
৩.
বাবা কথা দিয়েছেন, বাসায় ফিরলে কিছুই বলা হবে না। বাবা এক কথার মানুষ। বাবা যেহেতু কিছু বলবে না, অতএব মাও কিছু বলবে না। তবু বাসায় ঢুকতে যেয়ে রাকিবের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে গিয়েছিল ভয়ে। আজ একে স্কুল ফাকি দিয়েছে, তার ওপর এমন এক অপরাধ করেছে, যার কোন ক্ষমা হওয়া উচিত না। কিন্তু বাসায় ঢোকার পর থেকে কেউ কিছু বলেনি। একদম স্বাভাবিকভাবেই চলছে সব। একটু আগে খাবারের ডাক এসেছে। কিন্তু রাকিবের খেতে যেতে ভয় হচ্ছে।
ডাইনিঙে যেতেই দেখা গেল বাবা আগেভাগেই এসে বসে গেছেন। চোরের মত মাথা নিচু করে রাকিবও বসে পড়ল। খাবার চলছে। মাঝ পথে হঠাৎ বাবা বললেন, “যদিও কথা দিয়েছি, কিছু বলব না, তবু আমার কিছু ব্যাপার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমি কি জিজ্ঞেস করব?”
বাবার এই এক কথাতেই রাকিবের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। ভয়ে খাবার আর তার গলা দিয়ে ঢুকতে চাইল না। চোখের সামনে ভেসে উঠল তার কি কি দণ্ড হবার সম্ভাবনা আছে, সেগুলো। কোনরকমে উত্তর করল সে, “হুম।“
“টাওয়ারে উঠেছিলে কেন?”
“সাহস পরীক্ষা করতে।“ তোতলাতে তোতলাতে রাকিব জানাল।
“মানে?” বাবা আসলেই অবাক হয়ে গেছেন এবং তিনি তার কণ্ঠ আর চেহারায় সে বিস্ময় ঢাকতে পারলেন না।
“আমাদের মাঝে তর্ক বেঁধে গিয়েছিল। সবাই নিজেকে সবচেয়ে বেশি সাহসী দাবি করছিলাম। এই সমস্যার সমাধান করতেই ওখানে গিয়েছিলাম।“ একটু সহজ হয়ে এলেও জড়তা এখন যায়নি রাকিবের। এদিকে রাকিবের উত্তর শুনে বাবা একদৃষ্টে রাকিবের দিকে তাকিয়ে আছেন। চেহারায় স্পষ্ট বিস্ময়। কিছু বলছেন না। হয়তো তিনি হারিয়েছেন নিজের কৈশোরে।
“কোথায় পালিয়েছিলে?”
“বলব না।“
“জিতল কে সাহস পরীক্ষায়?” বাবা বেশ গম্ভীর হয়ে আছেন এখন। তার চেহারা থেকে বিস্ময় কেটে গেছে।
“আমি আর শফিক।“
“তোমাদের টাওয়ারে চড়ার কথা আমি জানলাম কি করে?”
“জানি না।“ রাকিব মাথা নিচু করেই আছে এখনও।
“জানতে ইচ্ছে হচ্ছে না?” বাবার এহেন প্রশ্নে রাকিব শুধু মাথা ওপর নিচ করে সায় জানাল।
“জিহাদ বলেছে।“ বাবার এই কথা সত্যিই রাকিবের জন্য একটা ধাক্কা। এক ঝটকায় মাথা উঁচু করে তাকাল সরাসরি বাবার দিকে। বাবা মিটিমিটি হাসছেন। রাকিবের এখন রাগে গা জ্বলছে। মীরজাফর জিহাদ শালা জিততে না পেরে এভাবে ফাঁসিয়ে দিয়েছে!
“বন্ধু চিনে রাখ।“ বাবার খাওয়া শেষ। কথাটুকু বলেই তিনি চেয়ার থেকে উঠে গেলেন।
এই ঘটনার বহুদিন পর যৌবনে এসে একদিন রাকিব জানতে পেরেছিল, সে অপরাধ করে কোথায় পালাত সেটা বাবা জানতেন। কারন নিজের কৈশোরে ওই একই স্থান তিনিও ব্যাবহার করতেন পালানোর কাজে। কিন্তু কেন তিনি রাকিবকে সারা এলাকা খুঁজে হয়রান হতেন, যখন জানতেনই কথার রাকিবকে পাওয়া যাবে? রাকিবের এমন প্রশ্নের জবাবে বাবা শুধু স্মিতভাবে হেসেছিলেন একটু। উত্তর করেননি কিছু। কিছু প্রশ্নের আসলেই খুব সম্ভবত কোন উত্তর থাকে না।
৪.
আমার মতে, বয়েজ স্কুলের ধারে কাছেও হয়তো শয়তান ঘেঁষতে চায় না। এই কিশোরগুলো এমনই তেঁদড় হয়, কখন যে শয়তানের ওপর শয়তানি করে বসবে, সেটার কোন নিশ্চতয়তা নেই!
আজ টিফিন পিরিয়ডে পেন ফাইট খেলাটা বেশ জমে উঠেছে। রাকিব একটু আগেই তার গেম শেষ করেছে। আর করবেইবা না কেন? অস্বচ্ছ কলমের পেছনের ফুটো দিয়ে যে চিকন লোহার শিক ঢুকিয়ে আনে, তাকে হারাবে এমন সাধ্য কার? আজ সাইয়িদও একই কাজ করে এসেছে রাকিবের বুদ্ধিতে। সাইয়িদ ছেলেটা বদরাগী কিন্তু মাথামোটা টাইপ। বুদ্ধি কম, আর কি। কোন এক কারণে সে ক্লাসের কাউকেই খাতির না করলেও রাকিবকে খুব খাতির করে। রাকিবের গেম শেষ হওয়ার কিছু পরেই সাইয়িদ জিহাদের হাতে ধরা পড়ল। শুরু হয়ে গেল তুমুল ঝগড়া। রেগেমেগে এক শেষ হয়ে সাইয়িদ ছুটে এলো রাকিবের কাছে জিহাদকে কিভাবে শায়েস্তা করবে, সে বুদ্ধি নিতে।
টাওয়ারের ঘটনায় এমনিতেই ভেতরে ভেতরে চরম চোটে ছিল রাকিব জিহাদের ওপর কিন্তু কোন সুযোগ পাচ্ছিল না শায়েস্তা করার। আজ একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। সে সায়িদের কানে কানে কিছু কথা বলল। কথাগুলো শুনতে শুনতেই সায়িদের রাগ মিলিয়ে যেয়ে চেহারা আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। এক দৌড়ে সে আবার ঢুকে গেল ক্লাস রুমে। রাকিব আর শফিক এতক্ষণ ক্লাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। সে এখনও জিহাদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা সজল বা শফিক, কাউকেই বলেনি। রাগটা মনের মাঝে পুষে রেখেছিল এই ক’দিন। সাইয়িদ চলে যেতেই রাকিব সব খুলে বলা শুরু করল শফিককে।
ঘটনা যখন শেষ করে এসেছে রাকিব বর্ণনা করতে করতে, ঠিক এমন সময় ক্লাসের ভেতর বেশ শোরগোল শোনা গেল সবার। রাকিব এবং শফিক দৌড়ে ক্লাসে ঢুকে গেল, কি ঘটেছে দেখতে। ক্লাসে ঢোকা মাত্রই শফিক থ বনে গেল। বিস্ময়ে তার মুখ হা হয়ে গেছে। ঘোর কেটে যেতেই একটু হেসে শফিক রাকিবের কাঁধে হাত রাখল। বিশ্বাসঘাতকতার উচিত সাজা দিয়েছে রাকিব, মনে মনে স্বীকার করল সে। এদিকে জিহাদের চার হাত-পা চারজন চেপে ধরেছে, সে টেবিলের ওপর শুয়ে এদিক ওদিক নড়ে শক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে রক্কা করার চেষ্টা করছে। চিত হয়ে পড়ে আছে জিহাদ টেবিলের ওপর। প্যান্টের জিপার খোলা। পুরুষাঙ্গ বেরিয়ে আছে তার। আর সাইয়িদ একটু পর পর সেই পুরুষাঙ্গটাতে কলম দিয়ে টোকা দিচ্ছে আর আনন্দে লাফিয়ে উঠছে। শুধু সাইয়িদই না, তার সাথে আনন্দে লাফিয়ে উঠছে পুরো ক্লাসের সবাই।
টিফিন পিরিয়ড শেষ না হতেই জিহাদকে ছেড়ে দেয়া হল। সে কোন এক ফাঁকে স্কুল থেকে পালাল বলৎকারের লজ্জায় এবং পরবর্তী এক সপ্তাহ স্কুল আর বন্ধুদের থেকে নিজেকে দূরে রাখল। এক সপ্তাহ পর সর্বপ্রথম রাকিবের সাথে দেখা করে কানে ধরে ক্ষমা চেয়েছে আর জীবনে বেঈমানি করবে না প্রতিজ্ঞা করে। জিহাদ জানত এমন উদ্ভট বুদ্ধি একমাত্র রাকিবের মাথা থেকেই বের হতে পারে। এরপর রাকিবের সহায়তাতেই ধীরে ধীরে জিহাদ তার হারানো সম্মান ফিরে পেল।
সমাপ্ত
©somewhere in net ltd.
১|
২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ৮:৪১
বিদ্রোহী ভৃগু বলেছেন: বয়েজ স্কুলের ধারে কাছেও হয়তো শয়তান ঘেঁষতে চায় না। এই কিশোরগুলো এমনই তেঁদড় হয়, কখন যে শয়তানের ওপর শয়তানি করে বসবে, সেটার কোন নিশ্চতয়তা নেই!
তাইতো দেখা গেল!!!!
আর মনে পড়ে গেল জাঙ্গিয়া না পরার কারণে এক বন্ধুকে পুরো ক্লাশে ন্যংটো করে ঘুরানোর কথা
বেচারা বেঞ্চের আড়াল করে করে সারা ক্লাশ দৌড়ে অবশেষে ওয়াদা করে প্যন্ট ফেরত পেয়েছিল
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম