নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

রাজিউলের পাগলামি

রাজিউল হাসান রাজু

খুব সাধারন একজন মানুষ আমি। স্বপ্ন দেখি সাধারন। সাধারন স্বপ্নের মাঝেই খুঁজে বেড়াই নতুনের ছোঁয়া।

রাজিউল হাসান রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

রানা

৩১ শে জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১২:০৪



১.

আকাশটাতে আজ যেন তারার মেলা বসেছে। রাশি রাশি তারা মিটিমিটি জ্বলছে পুরোটা আকাশ জুড়ে। কে বলে, চাঁদ ছাড়া আকাশটাকে ছন্নছাড়া লাগে? খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে আছি আমি এই মুহূর্তে। ঝিরঝির মাতাল হাওয়া বইছে। কোত্থেকে যেন হাসনাহেনা ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। বাতাসের সাথে গন্ধটা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। খোলা মাঠে একা নিরবে চিত হয়ে শুয়ে আজ আকাশের পানে তাকিয়ে থাকলে হয়তো আরও ভাল লাগত।



আমি রাকিব। রাকিব আল দ্বীন। একা নিরবে দাঁড়িয়ে আছি ছাদের এক কোনায়। আকাশের তারাগুলোকে মনে হচ্ছে একেকটা পিয় মুখ। জীবন চলার পথে একজন মানুষ কতই না মানুষের সাথে পরিচিত হয়, কাছে আসে! এই পরিচিত মানুষদের মাঝে অনেকেই হয়ে দাঁড়ায় প্রিয় মানুষ। আকাশের একটা তারা বেশ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। ওই তারাটাকে আমার মনে হচ্ছে রানা। কিছুক্ষণ থেকেই এমন মনে হচ্ছে!রানা-আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বন্ধু। ময়মনসিংহ ফুলবাড়িয়ার ছেলে।



প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হওয়ার কয়েকদিন পরের ঘটনা। আমার কলেজ বন্ধুদের মাঝে একা আমি চান্স পেয়েছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাকিরা কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কেউ জাহাঙ্গীরনগর, কেউ বুয়েট-মেডিক্যাল; এভাবেই ছড়িয়ে পড়েছিলাম সবাই। ক্লাসে কেউ পরিচিত ছিল না আমার। একারণেই প্রথম দিকে ক্লাসে খুব একটা মন বসত না। সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থানে কার মন বসে! তবে দু-দিন না যেতেই একটা জায়গায় মন বসে গেল। ক্যাম্পাস গেটে রফিক মামার চায়ের দোকানে। রফিক মামা বড্ড আন্তরিক একজন মানুষ। ব্যবসার খাতিরেই হোক বা আন্তরিকতা, উনার সাথে কথা বলার পর অনেককেই দেখেছি রেগুলার কাস্টমার হয়ে যেতে। একদিন ক্লাস শেষে রফিক মামার দোকানে বসে আরামসে চা আর সিগারেট চালাচ্ছি, ঠিক এমনই একসময় একটা ছেলে এসে বসল। মামাকে চায়ের অর্ডার দিল। ছেলেটাকে আমার একটু চেনা চেনা লাগছিল, তাই কিছুক্ষণ খেয়াল করলাম তাকে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না।



“তুমি ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের না?” কেন ছেলেটাকে পরিচিত লাগছিল, সে নিজেই পরিস্কার করে দিল এই প্রশ্ন করে।

“হুম, তুইমিও না?”

“হুম। আমি রানা। আজ তোমার পেছনের বেঞ্চে বসেছিলাম আমি।“

“খেয়াল করিনি হয়তো। আমি রাকিব।“ অপ্রতিভ অবস্থায় উত্তর করলাম আমি। আবার চা আর সিগারেটে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা চালাতেই সে আবার বলে উঠল,“যাই বল বন্ধু, তোমার ঠোঁটে সিগারেট মানায় না।“

“মানে?” আমি একটু অবাকই হয়েছি আচমকা এমন মন্তব্যে।

“সিগারেট খাও কতদিন?”

“এই তো বছর খানেক।“

“পারলে ছেড়ে দাও বন্ধু। এখনও তোমার ঠোঁট অনেক লাল আছে। এই রঙ নষ্ট হয়ে গেলে ভাল লাগবে না।“ রানার কথায় অপ্রস্তুত হয়ে হাসি দিলাম একটা। তারপর চায়ের ফাঁকে ফাঁকে আরও কিছুক্ষণ গল্প করে দুজন দুদিকে পা বাড়ালাম। যে যার বাসায় যাব এখন।



কয়েকদিন যেতে না যেতেই আমাদের দুজনের ব্যাপক ভাব জমে উঠল। সে সবসময় দাবি করত, আমি তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। কিন্তু কেন যেন এই দাবিটা আমি কখনও করতে পারতাম না। আসল কথা, আমি কোনদিন কাউকেই সবচেয়ে কাছের বন্ধু বলে দাবি করতে পারিনি।

ধীরে ধীরে আমাদের একটা বন্ধু সার্কেল গড়ে উঠল। সবাই সমমনা না হলেও, বেশ জমে উঠল আমাদের আড্ডা, ক্লাস, একসাথে রফিক মামার দোকানে চায়ের কাপে ঝড় তোলা। এদিকে কয়েকদিন হল, রানা আমাকে গুরু বলে ডাকা শুরু করেছে। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, গুরু বলে ডাকে কেন, কিন্তু সদুত্তর পাইনি কখনও। জানতে চাইলে হেসে বলতো, ভাল লাগে তাই ডাকি।



২.

রফিক মামার দোকানে বসে আছি আমি আর রানা। তার মুখে লাজুক হাসি। সকাল থেকেই কি যেন বলবে বলে উসখুস করছে, কিন্তু কিছু একটা বাঁধার কারণে বলতে পাচ্ছে না। ক্লাস শেষে সবার থেকে আড়াল করে সে-ই আমাকে ডেকে এনেছে রফিক মামার দোকানে। হৃদয়ঘটিত একটা ব্যাপার ঘটে গেছে বুঝতে পাচ্ছি, কিন্তু কোথায় হোঁচট খেল এই সরল সোজা মানুষটার হৃদয়, সেটাই বুঝতে পাচ্ছি না! ধৈর্যহারা হয়ে আমি তাই জিজ্ঞেস করে বসলাম,“কি রে রানা, কি হয়েছে তোর? এমন মেয়েদের মত লাজুকলতা হয়ে আছিস কেন?”

“গুরু, আমার মৃত্যু হয়েছে।“ ও, বলতেই ভুলে গেছি, আমার এই বন্ধুটি একটু আধটু কাব্যচর্চা করত, অতএব, তার কথায় একটু হেঁয়ালি থাকাটাই স্বাভাবিক।

“ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। তা কবে, কখন, কিভাবে মারা গেলি?”

“গুরু, দেহটা জীবিত, তবে আমার হৃদয় আর আমার কাছে নেই। অন্য কারোর হয়ে গেছে। দেহে যদি হৃদয় না থাকে, তাহলে আমার মৃত্যু হয়েছে না, বল?” অতি কঠিন যুক্তি। আমার বন্ধু রানা আসলেই তাহলে মারা গেছে। তার হৃদয় আর তার কাছে নেই।

“তা, কে কেড়ে নিল তোর হৃদয়?”

“মিলি।“

“মিলি!” আমি অত্যাশ্চর্য হয়েছি। মিলি আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী এবং অহংকারী মেয়ে। বড়লোক বাপের মেয়ে হলে যেমন হয়, আর কি। আমি মনে মনে আসলেই রানাকে মৃত দেখতে পাচ্ছি। যেখানে ভালবাসার সাত রঙের রংধনু দেখার কথা আমার, সেখানে নিকষ আঁধার ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।



মিলি সুন্দরী, স্মার্ট। যেকোনো ছেলের মাথা ঘুরিয়ে ফেলার ক্ষমতা তার আছে। তাই বলে আমাদের মত মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেদের জন্য মিলি-রা সবসময় আকাশের চাঁদ। ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, সারা জীবন শুধু দেখেই মুগ্ধ হতে হবে। আমি রানাকে বাস্তবতায় আনার অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু সে কিছুতেই কিছু মানল না। সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, মিলিকে সে ভালবাসে, ভালবাসবে আজীবন এবং মিলিকে পেতে আমার সাহায্য তার চাই-ই চাই। উপায়ন্তর না দেখে আমি রাজি হলাম। গোপনে খোঁজ লাগালাম মিলির ব্যক্তিগত তথ্য জানার জন্য।



৩.

মিলির ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে গতরাতে খবর পেয়েছি, মিলি অন্য এক রাজকুমারকে ভালবাসে। রাজকুমারিরা রাজকুমারদেরকেই ভালবাসে। রাজকুমারটা মিলির পারিবারিক আত্মীয়। এই খবরটা পাওয়ার পর থেকেই রানার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছি সেই রাত থেকে, কিন্তু ব্যাটার কোন খোঁজ নেই। ফোন অফ পাচ্ছি রাত থেকেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সব সুযোগ সুবিধা পেলেও এখনও প্রধান সুবিধাটাই পাইনি। আবাসন সুবিধা। ছাত্রছাত্রিদেরকে ভাড়া বাসা, সাবলেটে অথবা মেসে থেকে পড়ালেখা চালাতে হয়। আমি তখন থেকে এখন অব্দি ধানমন্ডীতেই থাকি, রানা থাকত মৌচাক।



ইতোমধ্যে ক্লাসের সবার কাছে আমি পরিচিত হয়ে উঠেছি। ভাল ছাত্র হিসেবে পরিচিতি না পেলেও ফাঁকিবাজ ছাত্র হিসেবে বেশ নাম ডাক হয়ে গেছে আমার। রানার জন্য গরম খবরটা হজম না করতে পেরে দ্রুত সকালের ঘুমের মায়া ত্যাগ করে আমি ক্যাম্পাসে হাজির হলাম। ডিপার্টমেন্টে যেয়ে রানাকে খুঁজে পেলাম সেমিনার রুমে। সেমিনার রুমে ঢুকে আমি চরম অবাক হলাম। রানা আর মিলি লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত তবে মাঝে মধ্যেই বেশ হাস্যরস চলছে। রানা অবশ্য এই পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে আমাদের সার্কেলের সবার ঐকান্তিক চেষ্টাতেই। ক্লাসে স্যার লেকচার দেয়ার পর আমাদেরকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিতেন। আমরা সবাই একটা কাগজে নিজেদের প্রশ্ন লিখে ধরিয়ে দিতাম রানার হাতে। আর সে তখন বিজ্ঞের মত একের পর এক প্রশ্ন করে যেত। এতে করে সবাই ভাবল, সে স্যারের লেকচার শোনা অবস্থায় প্রশ্নগুলো নোট করেছে, এখন প্রশ্ন করছে। ক্লাস টেস্টের সময় যে যেভাবেই পারতাম, রানার যেটুকু অসম্পূর্ণ থাকত উত্তর করতে, সেটা আমাদের খাতা খুলে পার করে নিতাম। এভাবেই একাধারে কয়েকটা ক্লাস শেষে দেখা গেল, পুরো ক্লাস রানাকে ভাল ছাত্র হিসেবে বেশ সমীহ করতে শুরু করেছে। আর মিলির চোখও পড়েছে তার ওপর। কিন্তু এত দ্রুত এরা এত নিকটে চলে আসবে, ভাবিনি! ওদের বিরক্ত না করে চুপচাপ বেরিয়ে এলাম সেমিনার থেকে।



ভেবেছিলাম, ক্লাস শেষে ঠাণ্ডা মাথায় রানাকে বোঝাব। কিন্তু সেটাও হল না। দেখলাম, স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে না যেতেই রানা বই-খাতা হাতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর দিকে হাঁটা দিয়েছে। সাথে মিলিও আছে। পেছন থেকে তবু হাঁক দিলাম,“ওই কই যাস?”



“গুরু, স্যারের অ্যাসাইনমেন্টটা কমপ্লিট করতে হবে। লাইব্রেরি যাই।“ দাঁতাল একটা হাসি দিল রানা। সেই হাসিতে মিশে ছিল নিখাদ সরলতা আর স্বতঃস্ফূর্ততা। বাঁধা দেয়ার মত কোন জোর মনের ভেতর থেকে পেলাম না। ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে আমি আমার পথ ধরলাম।



এভাবেই কেটে গেল মাসখানেক। রানা এখন আর আমাদের সাথে খুব একটা সময় দেয় না। সে এখন সিরিয়াস স্টুডেন্ট। নোট কালেকশন, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি, সবকিছুতেই মিলি রানার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ইতোমধ্যে। আমিও নিজের ভেতর থেকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, মিলির একটা ভালবাসার রাজকুমার আছে। মানুষের মন পরিবর্তন হতে সময় লাগে না। হয়তো মিলিও বুঝতে পেরেছে নিজের ভুল, হয়তো সে এখন রানাকেই চায় ইত্যাদি ইত্যাদি চিন্তা করে আমার আর রানাকে কিছু বলা হল না।



৪.

ইয়ার ফাইনাল শুরু হতে আর কয়েক দিন বাকি আছে। সবাই এখন লেখাপড়ায় নিমগ্ন। সারা বছর আমার মত যে ছেলেটা ক্লাস ফাঁকি দিয়েছে, সেও এখন বই ছাড়া বাথরুমে যায় না। আমিও ভাল হয়ে গেলাম দিন কয়েকের জন্য। নিয়মিত ক্যাম্পাসে যাচ্ছি, ল্যাব ক্লাস করছি, থিওরিটিক্যাল ক্লাস করছি। ব্যস্ততার মাঝে কখন যে সময় কেটে যাচ্ছে বুঝতেই পাচ্ছি না। কেউ কারোর দিকে খেয়াল রাখার সময় নেই আর। এমনই একদিন ক্যাম্পাসের ক্লাস শেষ করে রফিক মামার দোকানে বসে আমি চা আর সিগারেট খাচ্ছি। মনে মনে সিদ্ধান্ত, চা-সিগারেট খেয়েই বাসায় ফেরত যাব। এমন সময় রানা এসে পাশে বসল।



“গুরু, গাড়ি তো আর চলে না।“

“মানে?”

“মানে, মিলি তো বন্ধু হয়েই আটকে গেছে। আর তো সামনে বাড়তে পারি না!”

“গত ছয়মাস কি করলি গাধা?” খেকিয়ে উঠলাম আমি।

“কেন, আমার আর মিলির নোট কালেকশন করছি, অ্যাসাইনমেন্ট করছি!” সরল জবাব রানার।

“প্রপোজ করিস নাই?”

“কিসের প্রপোজ গুরু?”

“তুই যে মিলিকে ভালবাসিস, সেটা জানিয়েছিস?”

“না।“ মুখ গোমড়া করে ফেলল রানা।

“না বললে বুঝবে কি করে সে, তুই ওকে ভালবাসিস?”

“একটা উপায় বলে দাও না গুরু, প্লিজ।“

“মাফও চাই, দোয়াও চাই তোমার কাছে। একটু বন্ধুত্ব হতেই যে খেল দেখালে তুমি মামা। আমি আর তোমার সাথে নেই। আমাদেরকে চেনই না তুমি কাজ হয়ে গেলে।“

“এই যে কানে ধরছি গুরু, এরপর আর এমন ভুল হবে না।“ রানা সত্যি সত্যিই কানে ধরে আছে। মনে মনে ভাবছি, মিলির প্রনয়ের কথা বলে দেব কি না। নাহ! বলাটা ঠিক হবে না। সরল সোজা ছেলেটা আঘাত পাবে।

“ওকে। তোমাকে ক্ষমা করা হল। এতদিন যখন অপেক্ষা করছিস, আরও ক’টা দিন কর। ইয়ার ফাইনালটা শেষ হোক, তারপর একটা ব্যবস্থা নেব।“ ভেবেচিন্তে এই মুহূর্তে এমন জবাব ছাড়া আর কিছুই পেলাম না আমি। রানাও মহাখুশি। তারপর আমাকে জোর করে আরে কাপ চা খাইয়ে নিজের পথ ধরল সে বিদায় নিয়ে।



৫.

ইয়ার ফাইনাল শেষ হয়ে দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে দিন দশেক হল। রানার কেসটা এখনও ঝুলে আছে। তবে আজ একটা কিছু হবেই। রানা আমাদের বুদ্ধি মোতাবেক মিলিকে প্রপোজ করবে। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ দেখার প্রত্যাশায় আমরা সবাই। এলোও সে সময়। আমাদের ক্যাম্পাসের মাঝে প্রশাসনিক ভবনের সামনে একটা ছোট্ট শহীদ মিনার আছে। ওটার সামনে দাঁড়িয়েই রানাসহ আমরা সবাই অপেক্ষা করছিলাম। মিলি ক্লাস শেষ করে গেটের অভিমুখে যাওয়ার সময়েই রানা ডাকবে এবং প্রপোজ করবে, এমনই প্ল্যান আমাদের। প্ল্যান অনুযায়ী রানার হাতে এখন শোভা পাচ্ছে একগুচ্ছ লাল গোলাপ। মিলি এবং তার দলকে দেখা গেল দূর থেকেই। আমার হৃদয়ে হাতুড়ি পেটানোর আওয়াজ শুরু হয়ে গেল পটভূমিতে মিলির আগমনের সাথে সাথেই। রানার কি অবস্থা একটু হলেও আঁচ করতে পারলাম। তাকিয়ে দেখি, বাকি বন্ধুদের চেহারাও পাংশু হয়ে গেছে। আমি রানার কাঁধে হাত রেখে ইশারায় সামনে বাড়তে বললাম।



আমি আর রানা এখন রফিক মামার চায়ের দোকানে। আমার হাতে একটা সিগারেট। রানা চুপচাপ বসে আছে।

“গুরু, একটা সিগারেট খাব।“ প্রায় এক কি দেড় ঘণ্টা গুম মেরে থাকার পর রানা কথা বলল।

“সিগারেট খাওয়া সাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।“একটু আগে রফিক মামা এক কাপ চা দিয়েছে। হাতে ধরা সেই কাপের দিকে তাকিয়েই গম্ভীর মুখে কথাটা বললাম আমি।

“তবু খাব।“

আমি একটা সিগারেট দিতে বললাম রফিক মামাকে। রানা সিগারেট নিয়ে ধরাল। ধোঁয়া গলায় পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই যক্ষা রোগীর মত কেশে উঠল সে। বুঝলাম, জীবনের প্রথম সে সিগারেট টানছে। আমি ভাল করে শিখিয়ে দিলাম, কি করে সিগারেট টানতে হয়। ধীরে ধীরে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠল।



আজ রানা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। শুধুই প্রত্যাখ্যাত হয়নি, ভরা ক্যাম্পাসের মাঝে অপমানিতও হয়েছে। মিলি রানার হাতের ফুলের গুচ্ছ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, যারপর নাই অপমান করেছে বিভিন্ন কথায়। মিলি যখন রানাকে ধরাশায়ী করছিল তার কথার ঝড়ে, তখন স্পষ্ট দেখেছি, মিলির চোখেমুখে অহংকার ঠিকরে বেরুচ্ছে। তারপর থেকেই রানা চুপ হয়ে গেছে। রানার মত আমিও বুঝতে পাচ্ছি না, ভালই তো বেসেছে, বড় কোন অপরাধ তো করেনি। তাহলে এমন অপমানের কি দরকার ছিল? যে কথা শান্তভাবে বোঝানো যায়, সে কথার জন্য কেন লাউডস্পিকারের আয়োজন? মিলির এমন আচরনের কোন ব্যাখ্যা আমরা কেউ বুঝিনি।



৬.

“হ্যালো গুরু।“

“কি রে কোথায় হারিয়েছিল এ ক’দিন? ফোন দেই, রিসিভ করছ না কেন?” রানা কয়েকদিন ধরেই গায়েব ছিল। মিলি তাকে অপমান করার পর থেকেই আচার-আচরনে পরিবর্তন এসেছে রানার। আগের সেই স্বতঃস্ফূর্ততা আর খেলা করে না তার চেহারায়। বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকত। ক্লাসে ঢুকে সবসময় সবার থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করত। ঢাল হিসেবে আমাকে আর আমাদের গ্রুপের বন্ধুদেরকে ব্যবহার করত। এদিকে মিলির গ্রুপের বন্ধুরা রানাকে দেখলেই টিপ্পনী কাটত। মিলিও এমনভাবে তাকাত রানার দিকে, যেখানে তাচ্ছিল্য ছাড়া আর কিছু পাওয়া যেত না। এভাবেই মাসখানেক চলার পর রানা আচমকা গায়েব হয়ে গেল। কোথাও তার হদিস পাওয়া গেল না। ফোন খোলাই ছিল কিন্তু কেউ রিসিভ করত না। প্রায় দু’মাস গায়েব থাকার পর আজ হঠাৎ ফোন করেছে রানা আমাকে।

“বলব সব গুরু। তোমাকে বলব না তো কাকে বলব? একবার দেখা করতে পারবে গুরু?”

“কবে, কখন, কোথায়?” আমি দ্রুত জানতে চাইলাম।

“চিন্তা কর না গুরু, তোমাকে বেশি কষ্ট দেব না। কাল বিকেলে তুমি ফ্রী থাকলে আমি তোমার এলাকাতেই আসব। যদি চাও আমরা ধানমন্ডী লেকে দেখা করব।“

“ওখানে কেন? বাসায় চলে আয়?”

“না গুরু। ওখানেই। তুমি ফ্রী আছ?”

“ওকে। কাল বিকেল সাড়ে চারটা।“

“আচ্ছা, গুরু।“ ফোন রেখে দিল রানা। সে কেন আমার বাসায় আসতে চায়নি, বুঝতে পেরেছি। আমরা চারবন্ধু একসাথেই থাকি তখন। আমি, শাকিল, রুবেল আর রাজিব। আমরা সবাই ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। অতএব রানার ঘটনা সবাই জানে। নিজেকে লুকাতেই রানা আসতে চায়নি।



পাশাপাশি দুজন বসে আছি। অনেকক্ষণ নিরবতায় কেটে গেছে। দেখা হতেই রানা গড়গড় করে বলে দিয়েছে, তার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য। ওর কোন এক আত্মীয় স্পন্সর করায় সে পরবর্তী দিনের ফ্লাইটে আমেরিকা যাচ্ছে। ওটার জন্যেই নাকি দৌড়াদৌড়ি করতে যেয়ে এভাবে গায়েব হতে হয়েছিল রানাকে।

“গুরু, একটা কথা বলি?” রানাই নিরবতা ভাঙল।

“বল?”

“আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু তুমি। আমাকে কখনও ভুলে যেও না প্লিজ।“



কেন যেন দুচোখ ফেটে জল আসতে চাইছে। রানার এই দেশ থেকে পালানোর জন্য নিজেকে দায়ি মনে হচ্ছে। আগেভাগেই যদি ওকে আমি মিলির সব রহস্য জানিয়ে দিতাম, তাহলে আজ হয়তো এভাবে দেশ ছেড়ে পালাতে হত না! এই প্রথম আমার কোন বন্ধুর জন্য প্রচণ্ড কষ্ট অনুভব করছি আমি। শক্ত দিলের মানুষ হিসেবে আমাকে পরিচিত সবাই জানে। সেই আমার আজ একজন মামুলি বন্ধুর জন্য কান্না পাচ্ছে।

“গুরু, একটা অনুরোধ করি?” রানা আবার কথা বলে উঠল।

“কর।“ নিজেকে সামলানোই কঠিন হয়ে গেছে আমার।

“আমি যে চলে যাচ্ছি, এটা তুমি ছাড়া আর কাউকে বল না প্লিজ।“ খুব শান্ত স্বরে কথা বললেও, সেখানে কিসের যেন একটা আকুতি ছিল রানার। আমি রানার অজান্তে চোখের জল মুছলাম খুব সাবধানে। কেউ আমাকে দুর্বল চিত্ত ভাবুক, এটা আমি মেনে নিতে পারি না।

“মিলি যদি জানতে চায়?” কোনরকমে প্রশ্নটা করলাম। লম্বা কথা বললেই রানা টের পেয়ে যাবে আমার মনের অবস্থা। আমি অনেকক্ষণ থেকেই ওর দিকে তাকাচ্ছি না। শুনেছি, মানুষ তার চেহারা এবং কণ্ঠ থেকে মনের অবস্থা মুছে ফেলতে পারলেও চোখ থেকে পারে না।

“ও জানতে চাইবে না। আর যদি চায়ও, তাহলে ওকেই শুধু বোলো।“ কথার শেষ প্রান্তে এসে রানার গলাও ভিজে গেল খুব সম্ভবত।



আমি আর দেরি করলাম না। দ্রুত রানাকে বিদায় করে দিলাম। এর সাথে বেশিক্ষণ থাকলে পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা ঘটে যাবে। আমি কেঁদে ফেলব। নিজেকে আর শক্ত মনের মানুষ হিসেবে কখনও দাবি করতে পারব না আমি!



৭.

রানা চলে গেছে বেশ কিছুদিন হল। তাকে ভুলে যেতে বসেছে সবাই। গায়েব হয়ে যাওয়ার পর আর সে ক্যাম্পাসে পা রাখেনি; আর রাখলেও হয়তো সবার দৃষ্টির অগোচরেই রেখেছে। আমি নিজেই ওকে দেখিনি ক্যাম্পাসে। এখন শুধু আমিই জানি, ও কোথায় আছে। বাকিরা কিছুদিন এর ওর কাছে রানার কথা জানতে চেয়ে সদুত্তর না পেয়ে চুপ হয়ে গেছে। নিজের চলমান জীবনের প্রতি এখন মনোযোগ সবার। এই জীবনে কত মুখ আসে, আবার কত মুখ হারিয়ে যায়, তার হিসেব কে রাখে! সবাই একসময় ভুলে যায়। ভুলে যেতে হয় মানুষকে। না ভুললে, হারানোর ব্যাথায় মারা পড়বে সবাই। শেষ দেখার দিন যে আমি প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলাম অঝরে, সেই আমিও আজকাল রানার কথা ভাবি না। বাকি বন্ধুদের সাথে ক্লাস করে, প্রান খুলে আড্ডা দিয়ে আবার প্রানবন্ত হয়ে উঠেছি। মাঝে মাঝে শুধু মিলির চোরা দৃষ্টি আমাকে রানার কথা মনে করিয়ে দেয়।



ক্লাস শেষে যথারীতি সেদিন বন্ধুদের নিয়ে ক্যাম্পাস গেটের একপাশে দাঁড়িয়ে ধূমপানে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। হঠাৎ মিলির আগমন ঘটল আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে। যতদূর জানি, আমাদের এই গ্রুপটাকে মিলি এবং তার গ্রুপ সহ্য করতে পারে না। না পারারই কথা। আমরা কাউকে তোয়াজ করে চলি না। নিজেদের মত থাকি সবসময়। আরও অবাক হল সবাই, যখন মিলি সরাসরি আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি নিজেও হতচকিয়ে গেলাম। মেয়েরা কোন এক অজানা কারণে আমাকে সহ্য করতে পারে না। আমার সাথে পরিচিত হওয়ার আগে থেকেই ঘৃণা করতে শুরু করে। সেই আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের ক্লাসের সেরা সুন্দরী!



“রাকিব, রানা কোথায়?” আরে ব্বাহ! এ তো দেখি, আমার নামও জানে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হওয়ার পর এই প্রথম মিলি আমার সাথে কথা বলছে!

“জানি না।“ যতই অবাক হই না কেন, মিলির প্রশ্নে আমার বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা অভিমান মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চাইল। তাই সরাসরি বলে দিলাম, জানি না। রানা আমাকে বলে গিয়েছিল, মিলি জানতে চাইলে বলতে; কিন্তু কেন যেন আমার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

“তুমি জান। রানা আমাকে বলেছিল, আমার গুরু আমার সব জানে। সারাজীবন আমার খবর কেউ না জানলেও আমার রাকিব গুরু জানবে। রাকিব, আর কেউ না জানলেও একমাত্র তুমিই জান রানা কোথায়।“ মিলির চোখ করুন হয়ে উঠল কথাগুলো বলার সময়।

“কেন? নোট কালেকশনের জন্য লাগবে নাকি অ্যাসাইনমেন্ট? রানাকে খুঁজছ কেন তুমি? নাকি অপমান করার মত কাউকে খুঁজে পাচ্ছ না বলেই রানাকে খুঁজছ?” আমার ভেতরের মানুষটা এতটাই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে যে আমি তাকে নিয়ন্ত্রন করতে পাচ্ছি না। কেন যেন, ভেতরের মানুষটা মিলিকে কষে একটা থাপ্পড় মারতে পিড়াপীড়ি শুরু করেছে। হয়তো মেরেও বসতাম। কিন্তু তার আগেই মিলি নিরবে সরে গেল আমার সামনে থেকে। যাওয়ার আগে একবার আমার চোখে চোখ রাখল। ছলছল করছে সে চোখ। কি যেন খোঁজার চেষ্টা করল আমার চোখে নীল ওই চোখজোড়া! হয়তো রানাকে!



( সমাপ্ত )

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.