নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

রাজ কমল

রাজ কমল › বিস্তারিত পোস্টঃ

বরেন্দ্রই কি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন পুরাভূমি

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ রাত ১০:০১

আঁধার পাতাল থেকে

পৃথিবীর বুকচিরে সগৌরবে উঠেছিল

রাজগিরি হিমালয়,গিরিরাজ নাম যার

নক্ষত্রকে ছোঁবে বলে স্বপ্ন ছিল তার।

সে এক প্রসব বেদনা ছিল বিদীর্ণা পৃথিবীর

কোটি কোটি বছরের ওরোজেনী ব্যথা নিয়ে

কোটি প্রাণ লালনের স্বপ্ন নীল আকাঙ্খায়

উদগীরণ করেছিল প্রাগৈতিহাসিক

গলিত লাভার স্রোত রক্ত লাল গৈরিক।

তারপর রূপান্তরের ব্যথা

সেও কোটি বছরের ইতিহাস হয়ে

আজো চিহ্ন বুকে নিয়ে আছে জেগে

মিশে আছে ভাঙরের সাথে

এই লাল মাটি এই বরিনের বুকে ।



প্রাগৈতিহাসিক-

কমল





অনেক অনেক পুরোনো পুরাভূমি এই বরেন্দ্র। পৃথিবীর উৎপত্তিকালে ঘণীভূত হয়ে প্রথম যে শিলা তৈরী হয়েছিল তার নাম আগ্নেয়শিলা বা আদি শিলা। সে প্রায় সাড়ে চারশো বছর থেকে পাঁচশো কোটি বছর আগের কথা। বরেন্দ্রর বিভিন্ন অঞ্চলে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়শো ফুট মাটির নীচে পাওয়া গেছে আর্কিয়ান শিলার স্তর যা ঐ আগ্নেয়শিলা এবং রূপান্তরিত শিলার সংমিশ্রণে তৈরী এবং যার বয়স ষাট কোটি বছরের অধিককাল আগের।

দিনাজপুরের রাণীপুকুর মধ্যপাড়ায় প্রাপ্ত আর্কিয়ান শিলান্যাসের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এতে রয়েছে মোট চারটি স্তর, প্রথম স্তরটি আধুনিক কালের এর বয়স ২৫০০০ থেকে ৫০০০০ হাজার বছর। পরের স্তরটি প্লিষ্টোসিন যুগের স্তর এর বয়স এক লক্ষ চল্লিশ হাজার বছর, তার নীচের স্তরটি প্যালিওসিন যুগের এর বয়স এক কোটি দশ লক্ষ বছর এবং তার নিচে রয়েছে প্রাক-কাম্ব্রিয়ান যুগের স্তর। এই স্তর প্রায় একশ কোটি বছর পূর্বের।Ñ১

আগ্নেয়শিলা পৃথিবীর উৎপত্তিকালে ঘণীভূত হয়ে প্রথম গঠিত হয়েছিল বলে একে আদি শিলাও বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর বহু পাহাড়ী অঞ্চল কেবলমাত্র আগ্নেয়শিলা দ্বারা গঠিত। এ ধরণের শিলা দ্বারা গঠিত ভূমিকে বলা হয় ঢাল বা বর্ম অঞ্চল।

পণ্ডিতদের অনুমান দিনাজপুরের শক্ত শিলাস্তর মাত্র আড়াই কোটি বছর আগেও ভূপৃষ্ঠে ঢাল বা বর্ম এলাকা রূপে বিদ্যমান ছিল। সম্ভবত: আবহাওয়া জনিত ক্ষয়ের ফলে এই শিলা স্তরের উপরের অংশ কর্দমাক্ত কেয়োলিনে পরিণত হয়। অপর দিকে ইয়োসিন যুগের কোনো এক সময়ে তৃতীয় হিমালয় ওরোজেনি আন্দোলনের কালে এক বিশাল ও বিস্তৃত চ্যুতির সৃষ্টি ঘটে ফলে চ্যুতির এক অংশ উত্থিত হয় যা শিলং মালভূমি নামে দৃষ্ট অন্যদিকে দিনাজপুর ঢাল বসে গিয়ে নিম্নভূমি বা গ্রাবনে রূপান্তরিত হয়। এই এলাকাটিই রংপুর স্যাডল নামে পরিচিত।-২

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দিনাজপুর ঢাল বা রংপুর স্যাডলই হল বাংলাদেশের প্রাচীনতম এলাকা। এ সম্পর্কে পণ্ডিতদের অভিমত প্রায় এক এবং অভিন্ন। এ সম্পর্কে বিশিষ্ট গবেষক অজয় রায় বলেছেন ‘‘বাংলাদেশের প্রতœভূতাত্ত্বিক ইতিহাস এখনো স্পষ্ট নয়। নানা তথ্য আহরণ চলছে। হয়তো কিছু দিনের মধ্যে আরো স্পষ্ট চিত্র আমাদের কাছে ধরা পড়বে। তবে বর্তমানে এটুকু অবশ্য বলা যায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে দিনাজপুর ঢাল অঞ্চল এবং রংপুর স্যাডল অতি প্রাচীন; রাণীপুকুর ও মধ্য পাড়ায় প্রাপ্ত আদি বা আর্কিয়ান শিলান্যাসের অস্তিত্ব এর প্রমাণ।Ñ”৩

বাংলাদেশের প্রখ্যাত প্রতœতত্ত্ববিদ এবং গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া বরেন্দ্রভূমির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে মত প্রকাশ করেছেন এভাবে যে ‘‘বরেন্দ্র অঞ্চল অত্যন্ত প্রাচীনভূমি। প্রায় ষাট কোটি বছর আগেকার সেই প্রাচীন আর্কিয়ান যুগে এ ভূমির গোড়াপত্তন হয়েছিল এবং এরও কোটি কোটি বছর পরে গণ্ডোয়ানা যুগে সৃষ্ট কঠিন শিলা, কয়লা, চুনাপাথর, বেলেপাথর, সাদামাটি ইত্যাদি বিভিন্ন খনিজদ্রব্য আমরা বরেন্দ্রভূমির অভ্যন্তরে দেখতে পাই। এছাড়া লালমাটিতে গঠিত যে বরেন্দ্রভূমির অস্তিত্ব আমরা রাজশাহী দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া ও পাবনা অঞ্চলের স্থানে স্থানে দেখতে পাই তার সুচনাও প্রায় বিশ(২০) লক্ষ বছর আগে শুরু হয়েছিল বলে পণ্ডিত মহলের অভিমত।”Ñ৪

বরেন্দ্রভূমির প্রাচীনত্বের আরো স্পষ্ট প্রমাণ হলো এইযে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাত্র পাঁচশ থেকে এক হাজার ফুট নীচে ষাট কোটি বছরেরও আগের আর্কিয়ান শিলার স্তর পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে তা রয়েছে সাধাÍণভাবে অন্তত ত্রিশ হাজার ফুট পলিমাটির নীচে । -৫

এছাড়া সাড়ে বাইশ কোটি থেকে পয়ত্রিশ কোটি বছর আগের পারমিয়ান শিলা যা গন্ডোয়ানা নামে অধিক পরিচিত তা রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর জেলাগুলোর বহু স্থানে মাত্র চারশ ফুট মাটির নীচে পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের অন্যত্র এই শিলা রয়েছে কমবেশি প্রায় ত্রিশ হাজার ফুট পলিমাটির নিচে।-৬

এ ছাড়া সারা বাংলাদেশে যেখানে পলিমাটি প্রায় ত্রিশ হাজার ফুট পুরু অর্থাৎ পলিমাটির গড় গভীরতা সারা বাংলাদেশে যেখানে সাধারণভাবে প্রায় ত্রিশ হাজার ফুট সেখানে বরেন্দ্র অঞ্চলে এর গড় গভীরতা বা পুরত্ব মাত্র চারশ থেকে এক হাজার ফুট।-৭

এ থেকে প্রমাণিত হয় বরেন্দ্র অঞ্চলই বাংলাদেশ সহ এতদঅঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন, উচ্চ পুরাভূমি। কোটি কোটি বছর যখন বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল ছিল অসীম জলারাশির নীচে বরেন্দ্র অঞ্চল তখন সগৌরবে মাথা উচু করে অবিচল দাড়িয়ে ছিল আপন অস্তিত্ব নিয়ে।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক আলবেরুনী তাঁর রচিত ‘ভারত তত্ত্ব’ নামক গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, সমস্ত ভারতীয় এলাকাটি এক সময় সমুদ্র ছিল পরে ক্রমশ: নদীবাহিত পলিমাটি দ্বারা ভরাট হয়েছে। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আসলে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের ক্ষুদ্র পাহাড়িয়া এলাকা উত্তরে দিনাজপুর, রংপুর সহ বরেন্দ্রভূমি এবং মধ্যঅঞ্চলে ঢাকা, ময়মনসিংহ এলাকার মধুপুরগড় এবং কুমিল্লার লালমাই ময়নামতি অঞ্চলের উচ্চভূমি ব্যতিত সমগ্র বাংলাদেশই ছিল এক বিশাল নিম্ন সমতল ভূমি। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে নদীবাহিত পলিমাটি জমে যা আজকের রূপ ধারণ করেছে।

কিন্তু ভূতাত্ত্বিকদের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যে কথা নি:সংশয়ে বলা যায় তা হলো উত্তরাঞ্চল তথা বরেন্দ্রই হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন এবং উচ্চ পুরাভূমি। কারণ রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর প্রভৃতি অঞ্চলে গন্ডোয়ানা নামে অধিক পরিচিত পারমিয়ান শিলা প্রাচীন আর্কিয়ান শিলার ঠিক উপরের স্তরে বর্তমান ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র চার পাঁচশত ফুট নীচে পাওয়া গেছে। তাতে ধারণা করা হয় যে, অন্তত: বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রাচীন আর্কিয়ান যুগ থেকে শুরু করে কয়লা উৎপাদনকারী কারবনিফরাস যুগ পর্যন্ত স্থলভাগ বিদ্যমান ছিল। এরপর পয়ত্রিশ কোটি বছর আগে থেকে সাড়ে বাইশ কোটি বছর আগে পর্যন্ত পারমিয়ান বা গন্ডোয়ানা যুগে বাংলাদেশ সহ এতদঅঞ্চলের বিভিন্ন স্থান যখন ছিল কখনো গভীর সমুদ্র বা গভীর জলাভূমি বা বিলের নীচে তখনও বরেন্দ্র অঞ্চলের বেশির ভাগ স্থান আজকের অবস্থান থেকে গড়ে মাত্র চারশত ফুট নিচে ছিল। অর্থাৎ নি:সন্দেহে বরেন্দ্রভূমি সামগ্রিকভাবে উচ্চ পুরাভূমি হিসেবে বিদ্যমান ছিল।

এছাড়া সাত থেকে চার কোটি বছর আগে টারশিয়ারি যুগে টেথিয়ান ভূপ্রক্রিয়ার কারণে হিমালয় পর্বতের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে সমগ্র বাংলাদেশ যখন দক্ষিণ দিক থেকে আগত সমুদ্র দ্বারা নিমজ্জিত হয় তখনো বরেন্দ্রের অন্তত: কিছু অঞ্চল ঐ প্লাবন থেকে মুক্ত ছিল। -৮

এছাড়া বরেন্দ্রের নিমজ্জিত অঞ্চলও যে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে কতো ঁউচুতে অবস্থিত ছিল তার প্রমান পাওয়া যায় সারা বাংলাদেশে চূনাপাথরের তুলনামূলক অস্তিত্ব দেখে। এই চুনাপাথর রাজশাহী অঞ্চলে মাত্র এক হাজার(১০০০) ফুট নিচে কিন্ত বাংলাদেশের অন্যত্র গভীর মাটির নিচে দেখা যায়।-৯

এরপরের অলিগোসিন যুগে (৪ কোটি বছর আগে শুরু) বাংলাদেশের বেশির ভাগ স্থানে স্থলভাগের সৃষ্টি হলেও পন্ডিতদের মতে ঐ যুগের শেষে এবং মাইওসিন যুগের শুরুতে আড়াই কোটি বছর আগে এ দেশটা আবার সাগরের নিচে চলে যায়। এরপর হিমালয় থেকে বিভিন্ন জলধারা বাহিত প্রায় ত্রিশ হাজার( ৩০,০০০) ফুট পলি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ¯তুপিকৃত হয়ে কোটি কোটি বছরে আজকের বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, সারা বাংলাদেশে সাধারণভাবে এই পলিমাটির গড় গভীরতা যেখানে নূন্যতম ত্রিশ হাজার(৩০,০০০) ফুট সেখানে বরেন্দ্র অঞ্চলে তথা রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার বহু স্থানে খুবই অগভীরে মাত্র চারশত(৪০০) ফুট মাটির নিচে এই পলির আবরণের আরম্ভ দেখা যায়।আর তার নিচেই পাওয়া যায় প্রায় সাতাশ(২৭) কোটি বছর আগের গন্ডোয়ানা যুগের বিভিন্ন খনিজ পদার্থ আর তার ঠিক নিচের স্তরে পাওয়া যায় প্রায় ষাইট(৬০) কোটি বছরেরও আগের আর্কিয়ান শিলা।

তাই এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, বরেন্দ্র অঞ্চলই মূলত: বাংলাদেশের সবচেয়ে উচ্চতম আদিম পুরাভূমি।

আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বরেন্দ্রে রয়েছে মূলত: প্লিষ্টোসিন যুগের পলিমাটির এক বিস্তীর্ণ উচ্চভূমির বেল্ট। যা বরেন্দ্রকে সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে এক বিশেষ আসন দিয়েছে। বরেন্দ্র ভূমির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে এই মাটির সাক্ষ্যই সবচেয়ে দামী কারণ এ মাটি প্লিষ্টোসিন যুগের পুরাতন কদর্ম দ্বারা গঠিত যা অন্যান্য পললভূমির নতুন কর্দম থেকে বহু লক্ষ বছরের পুরনো ও প্রাচীন।



তথ্য নির্দেশ



১। তথ্যসূত্র,অজয় রায়, আদি বাঙালিঃ

নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পৃ.- ৭।

২। তথ্যসূত্র,অজয় রায়, প্রাগুক্ত, পৃ.- ৭।

৩। অজয় রায়, প্রাগুক্ত, পৃ.- ৯।

৪। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, সম্পাদকীয়, বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস।

৫। তথ্যসূত্র,আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া।বরেন্দ্র অঞ্চলের ভৌগোলিক ওভূতাত্ত্বিক পরিচিতি।(বরেন্দ্রঅঞ্চলেরইতিহাস)পৃ- ৯।

৬। তথ্যসূত্র,প্রাগুক্ত,আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, পৃ.- ৯।

৭। তথ্যসূত্র,প্রাগুক্ত,আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া,পৃ.- ১০।

৮। তথ্যসূত্র, প্রাগুক্ত, পৃ-. ১০।

৯। তথ্যসূত্র প্রাগুক্ত, পৃঃ-১০

১০। তথ্যসূত্র, প্রাগুক্ত, পৃঃ-১০

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.