নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নিজের সম্পর্কে বলার মত তেমন কিছুই এখনও অর্জন করতে পারি নি।

ডি এইচ তুহিন

মোঃ দেলোয়ার হোসেন তুহিন

ডি এইচ তুহিন › বিস্তারিত পোস্টঃ

সমুদ্রের নীল খাম

০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২


এই শহরে থাকি প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর ধরে। তিন প্রেমিকার মায়া ছেড়ে যাওয়া যায় না এমন এক অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। যার এক হাতে নদী, অন্য হাতে সমুদ্র, আর কপালে জায়গা করে নিয়েছে পাহাড়ের ছায়া আর আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। নদী যেখানে হেঁটে হেঁটে সাগরে মিশে যায়, আর সাগরের ঢেউ যেখানে বিকেলের রোদ মেখে সোনালি হয়ে ওঠে, পাহাড় যেন প্রতিদিন আকাশ ছুঁয়ে দেখে।

আমার নাম নাবিল আর আমি চট্টগ্রাম শহরে থাকি। আমার বাসা থেকে সমুদ্র দেখতে যেতে লাগে বিশ মিনিট, নদী পঁচিশ মিনিট, আর পাহাড় ছুঁতে সময় লাগে দশ মিনিট। এক পাশে নদী, অন্য পাশে সমুদ্র, সামনে পাহাড় মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি। ধরে নিতে পারেন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর মধ্যে একটাতে থাকি যে শহরের এক আঁচলে নোনা জল আর অন্য আঁচলে অরণ্যের সবুজ। চট্টগ্রামে মানুষের নাকি মন খারাপ থাকে না বেশিক্ষণ, কারণ প্রকৃতি নিজেই তাদের মন ভালো করে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। চট্টগ্রাম মানেই সবুজে মোড়ানো এক টুকরো শান্তি।

ছুটির দিন মাথায় এলোমেলো ভাবনা ভিড় করে। এখনো ক্যারিয়ার হয়নি ঠিকঠাক, বিয়ে-সংসারের কিছুই হয় নি এদিকে বয়সটাও যেন নিঃশব্দে বেড়ে যাচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতে দম বন্ধ লাগছিলো তাই পার্কিং থেকে বাইকটা বের করে একটানে চলে গেলাম সাগরপাড়ে।

রাস্তার ধারে বাইকটা ও হেলমেট ভালো করে লক করে হাঁটতে শুরু করলাম। এই জায়গাটায় মানুষ কম আসে, এটাই এর সৌন্দর্য। একসময় এক্স গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে আসতাম কারণ জায়গাটা সবসময় নিরিবিলি থাকে, সমুদ্রের খুব কাছে বসা যায় আবার এখান থেকে খুব সুন্দর সানসেট দেখা যায় এক কথায় প্রেম করার জন্য আদর্শ জায়গা। সমুদ্রের কাছাকাছি গিয়ে বসলাম। দূরে কিছু ছেলে ফুটবল খেলছিল, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ চলছে তাই খেলার প্রতি টানও একটু বেশিই সবার। কে নিবে কাপ এবার? ব্রাজিল নাকি আর্জেন্টিনা না? কেউ কেউ বলছে আবার নাকি কাপ পর্তুগাল নিয়ে যাবে। আমার অলটাইম ফেবারিট আর্জেন্টিনা। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো খেলাও খুব ভাল লাগে, নেইমার, মেসি, সবার খেলা দেখতে ভাল লাগে। আসলে খেলা উপভোগ করার জন্য। শুধু শুধু তর্ক করে কি লাভ?

আমি ওদের খেলা দেখছিলাম, বেশ ভালই লাগছিল ততক্ষণ, যতক্ষণ না চোখ গিয়ে পড়ল সমুদ্রের কাছাকাছি বসে থাকা একটা মেয়ের দিকে। খোলা চুল বাতাসে উড়ছিল, আনমনে বসে বসে সমুদ্র দেখছে। সন্ধ্যা নামার আগে মেয়েটি যেন সমুদ্রের বিষাদের সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ক্যানভাসে আঁকা কোনো বিষণ্ণ ছবির মতো, যার কপালে লেপ্টে ছিল একরাশ এলোমেলো বাতাস আর সূর্যের সোনালী কিরণ। এমন দৃশ্যে দেখে আমি ভুলে গেলাম বাকি সব কিছু।

বিশ টাকার বাদাম হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলাম তার দিকে। মেয়েটা একা বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল তখনও। যেন সমুদ্রের সাথে তার কোনো পুরোনো হিসাব বাকি। এক পাশ থেকে তার চোখের দিকে তাকালাম আর দেখলাম, মুক্তোর মতো একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার জামার ওপর।

কিছু না বলে আরেকটু কাছে গিয়ে বসলাম। বাদামগুলো এগিয়ে দিলাম তার দিকে। সে নিল না, কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখাল না। চুপচাপ সমুদ্র দেখছিল। আমিও কোনো কথা বললাম না। শুধু তার পাশে বসে সমুদ্র দেখতে লাগলাম, যেন নীরবতাটাই তখন সবচেয়ে জরুরি।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে আসছে মেয়েটা তবু একই জায়গায়, একই ভঙ্গিতে বসে। কোনো শব্দ নেই তার মুখে, কিন্তু চোখের ভাষা বলছিল সে ভেতরে ভেতরে একটা যুদ্ধ লড়ছে নিজের সাথেই। আমি নীরবতা ভাঙার সাহস করে তাকে বললাম-

"সমুদ্র দেখলে মন হালকা লাগে, তাই না?"

কোনো উত্তর এলো না।

"আমি নাবিল। এই এলাকাতেই থাকি। প্রায়ই আসি এখানে।"

তবুও নীরব সে। শুধু ঢেউয়ের শব্দ আর দূরের জাহাজগুলোর লাল-নীল বাতি মিটমিট করে জ্বলছিল সমুদ্রের বুকে।

আমি বুঝলাম, জোর করে কথা বলানো যাবে না। তাই শুধু বসে থাকলাম, একটু দূরত্ব রেখে, যাতে সে অস্বস্তি না বোধ করে। রাত বাড়তে লাগল। সৈকতের মানুষজন একে একে ফিরে যাচ্ছিল। আমি লক্ষ করলাম, মেয়েটার এক পাশে রাখা একটা টিফিন বক্স।
হঠাৎ সে ফিসফিস করে বলল-
"ও বিয়ে করে বউ নিয়ে বাসায় উঠেছে।"

আমি কিছু বললাম না, শুধু শুনলাম।

"আমি আমি সত্যিই জানতাম না কিছুই। ওর জন্য নিজে হাতে রান্না করে নিয়ে গিয়েছিলাম ওকে খাওয়াতে। গিয়ে দেখি..." কথাটা শেষ করতে পারল না। গলা ধরে এলো। আবারও চোখের জল গড়িয়ে পড়লো। ​"সমুদ্রের বিশালতাও যেন সেদিন সেই একফোঁটা চোখের জলের কাছে হেরে গিয়েছিল। নোনা জলের সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে আরেক ফোঁটা নোনা জলের এতখানি নীরব হাহাকার আমি আগে কখনো দেখিনি।"

বক্সটাতে করে হয়তো তার জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে গিয়েছিল। ভালোবাসার রান্না যখন প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে আসে, তখন সেই খাবারের চেয়ে ভারী বোঝা বোধহয় পৃথিবীতে আর কিছু নেই।

মেয়েটার চোখের গভীরতায় এমন কিছু একটা ছিল যা আমাকে সতর্ক করে দিচ্ছিল। সমুদ্রের দিকে সে যেভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে, যা তাকে সব দুঃখ থেকে মুক্তি দেবে। রাত হচ্ছে, সৈকত প্রায় ফাঁকা অল্প কিছু মানুষ আছে।

আমি একটু কাছে গিয়ে বললাম, "আজকের রাতটা এখানে একা বসে থেকে কিছুই ঠিক হবে না। চলুন, আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিই।"

"আমি কোথাও যাবো না"

"জায়গাটা ভাল না। মানুষও প্রায় সব চলে যাচ্ছে। প্লিজ চলুন" কয়েকবার অনুরোধ করার পর সে অনেকক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে সে উঠে দাঁড়াল। বাইকে করে তাকে তার বাসার কাছাকাছি এক জায়গায় নামিয়ে দিলাম। যাওয়ার আগে বললাম, "কিছু মনে না করলে আপনার নাম্বারটা দিন।"

সে একটু ইতস্তত করলো। কয়েকবার অনুরোধ করার পর নাম্বারটা দিল। নাম বলল মেঘলা।

তারপর থেকে শুরু হলো এক অদ্ভুত নিয়ম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটা মেসেজ — "কেমন আছেন?" প্রথম কয়েকদিন উত্তর আসত সংক্ষিপ্ত, ভাল,হু,ওকে,ঠিক আছে টাইপ তারপর ধীরে ধীরে সেই উত্তরগুলোতে শব্দ বাড়তে লাগল। একদিন সে লিখল,

"আপনি কেন এত খোঁজ নেন?"
​"সব মানুষ তো শুধু আলো খোঁজে না মেঘলা, কেউ কেউ অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানুষটার হাত ধরে পূর্ণিমার অপেক্ষা করতেও ভালোবাসে।"

সেদিন আর কোন উত্তর দিলো না। পরদিন তার ফোন থেকে একটা মেসেজ এলো,

""আজকের আকাশটা দেখেছেন? কী অদ্ভুত সুন্দর, তাই না?"
"সুন্দর, তবে ভয়ঙ্কর নয়"
"সুন্দর আবার কী ভয়ঙ্কর হয় নাকি?"
"হয়"
"কখন"
"যখন আপনি রেগে যান"
"কী! আমার রাগ দেখেছেন?"
"সুন্দরী মেয়েরা যখন রাগ করে তখন তাদের দেখতে ভয়ঙ্কর সুন্দরই লাগে"
"তাই?"

সেই থেকেই যেন শুরু হলো নতুন গল্প। আমরা কথা বলতাম নদী নিয়ে, পাহাড় নিয়ে, সমুদ্রের ঢেউ গোনা নিয়ে। মেঘলা আস্তে আস্তে হাসতে শিখল আবার। একদিন বলল, "সেদিনের পর আমি এখনো এই শহরের সূর্যাস্ত দেখতে যাই নি।"

"আজকে দেখবে?"

"অন্যদিন"

"আপনি যখন চাইবেন সেদিনই যাবো"

দেখতে দেখতে দিন পেরিয়ে মাস এলো মাস পেরিয়ে বছর। আমরা দুজনেই জানতাম, এটা শুধু বন্ধুত্ব ছাড়াও রয়েছে অন্যরকম অনুভূতি। একদিন বিকেলে সেই একই সৈকতে, একই জায়গায় বসে মেঘলা বলল, "জানেন, সেদিন আমি সমুদ্রের কাছে একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েছিলাম। সমুদ্র উত্তর দেয়নি, কিন্তু আপনাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল।"

আমি হাসলাম। বললাম, "কিছু কিছু ভাঙা মানুষ আসলে ভাঙা থাকে না তারা শুধু নতুন করে গড়ে ওঠার একটা জায়গা খুঁজে বেড়ায়। সমুদ্র শুধু সেই জায়গাটা চিনিয়ে দিয়েছিল।"

সূর্য তখন সমুদ্রের বুকে ডুবছিল, লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছিল আকাশজুড়ে। মেঘলার চোখেও সেই লাল আভা প্রতিফলিত হচ্ছিল এবার কষ্টের নয়, ভালোবাসার।

আমি প্রথমবার তার হাতটা ধরলাম আলতো করে। তার আঙুলের ফাঁকে যখন আমার আঙুলগুলো জায়গা করে নিল, মনে হলো এতদিনের অবাধ্য বাতাসটাও যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে আমাদের এক নতুন রূপকথা পড়তে শুরু করেছে। মেঘলা প্রথমবারের মতো চোখ তুলে সরাসরি আমার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি। আমরা দু'জনে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছি। কেউ কোন কথা বলছি না।

সমুদ্র তখনও ঢেউ নীরবে সাক্ষী হয়ে রইল এক নতুন গল্পের শুরুর...


"কিছু মানুষ আসে ধুয়ে যাওয়া বালুচরের মতো, আর কিছু মানুষ আসে জোয়ারের মতো—সব শূন্যতা ভরিয়ে দিতে। সমুদ্র সেদিন শুধু আমাদের দুজনকে মিলিয়ে দেয়নি, একটা ভাঙা স্রোতকে মোহনায় এনে দিয়েছিল।"

মন্তব্য ২ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৮

রাজীব নুর বলেছেন: নাবিল ভাগ্যবান। সে সমুদ্র আর পাহাড়ের কাছে থাকে।

২| ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬

অপ্‌সরা বলেছেন: বাহ!! ভেরী গুড! :)

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.