নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি একজন সাধারণ মানুষ।নিজের সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলার মত নেই।

পূর্বাশার আলো

একজন সাধারণ মানুষ।

পূর্বাশার আলো › বিস্তারিত পোস্টঃ

হাওড়ে আকস্মিক বন্যা এবং কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

০২ রা মে, ২০১৭ রাত ১২:৪৮

সম্প্রতি মার্চের শেষ এবং এপ্রিলের শুরুতে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের হাওড় এলাকা আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয়। অন্যান্য বিষয়ের মত এই বন্যা নিয়েও তথাকথিত বিশেষজ্ঞ মহল মনের মাধুরী মিশিয়ে মন্তব্য করছেন, খবর ছাপছেন।এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার জন্য কিছু তথ্য এবং নিজস্ব মতামত উপস্থাপন করছি এই নোটে।
প্রথমেই জানা দরকার এই বন্যার কারণ কী।কিছু পেছনের কথা বলে নেই। বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পর্বতমালার ঠিক পাদদেশে। মেঘালয় রাজ্যের বোরাক নদী অববাহিকার পানি আমাদের সুরমা-কুশিয়ারা, মনু, সোমেশ্বরী-কংস, মেঘনা সহ এই অঞ্চলের অন্যান্য নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়।বাংলাদেশের সিলেট সীমান্তের মাত্র ১৫-২০ কিলোমিটারের মধ্যেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের এলাকা চেরাপুঞ্জীর অবস্থান।১৯৯৫ সালের ১৬ই জুন চেরাপুঞ্জীতে ২৪ ঘন্টায় ১৫৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল যা কিনা অনেক দেশের গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের থেকেও বেশি! একে তো পাহাড়ি টপোগ্রাফি তার উপর অস্বাভাবিক বৃষ্টি- দুইয়ে মিলে একেবারে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টির উপযুক্ত ক্ষেত্র।
এবারের বন্যার ক্ষেত্রেও তাই- স্বাভাবিকের তুলনায় উজানে এবং দেশের অভ্যন্তরে বেশি বৃষ্টি এবং তা থেকে পাহাড়ি ঢল।তবে এবারের পরিস্থিতি গত কয়েক বছরের চেয়ে ভয়াবহ, কারণ বৃষ্টিপাতের পরিমান আর বন্যার সময়। নিচের ছবিতে এপ্রিল মাসে দেশের অভ্যন্তরে মেঘনা আববাহিকায় বিভিন্ন স্টেশনে রেকর্ডকৃত মোট বৃষ্টিপাতের সাথে ওইসব স্টেশনের এপ্রিল মাসের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের তুলনা করা হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এপ্রিল মাসে মেঘনা অববাহিকায় অনেক স্টেশন যেমন সিলেট, শেওলা, শেরপুর, সুনামগঞ্জে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বা আড়াই গুণ বৃষ্টি হয়েছে এবং সিলেটের শেওলায় সর্বোচ্চ ৯১১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চিত্রও একই রকম।নিচের ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে পহেলা মার্চ থেকে ২৬ শে এপ্রিল পর্যন্ত বোরাক নদী অববাহিকায় স্বাভাবিকের তুলনায় অন্তত ৬০% বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।এই বৃষ্টপাত থেকে সৃষ্ট পাহাড়ী ঢলেই আমাদের সিলেট-সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা হয়েছে।এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ভারতের মেঘালয় অংশে এই বন্যার কোন প্রভাব নেই কারণ টপোগ্রাফি পাহাড়ী বা আমাদের হাওড় অঞ্চলের তুলনায় অনেক উঁচু।মজার বিষয় হল, অনেক বিশেষজ্ঞদের মতামত দিতে শুনছি যে, ‘ভারত উত্তরবঙ্গে পানি দিচ্ছে না আর এইদিকে সব ভাসিয়ে দিল’ বা ‘বন্যার কোন তথ্য বাংলাদেশকে দেয়নি ভারত’ ইত্যাদি।আসল কথা হল, এই বন্যার সাথে উজান থেকে পানি ছেড়ে দেওয়ার মত কোন ব্যাপার নেই।আর তথ্যের ব্যাপারে আমরা একেবারে চোখ বুজে বলে দেই- তথ্য দেওয়া হয় না, দিতে চায়না; কিন্ত যারা এসব বলেন, তারা সম্ভবত নিজেরাও জানেন না এই বন্যার কোন তথ্য আমাদের জানা দরকার।অথচ মেঘালয়ের অংশে যেসব বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণের স্টেশন রয়েছে তার তথ্য প্রায় রিয়েল টাইমে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যায়।বোরাক অববাহিকায় মেঘালয় রাজ্যে কিছু সংখ্যক পানি সমতল স্টেশন আছে- এগুলোর উপাত্তও রিয়েল টাইমে ‘সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনে’র ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যায়।মোদ্দাকথা, তথ্য-উপাত্ত শেয়ার করে না বলে বলে অরণ্য রোদন না করে, যেসমস্ত তথ্য-উপাত্ত হাতের নাগালে রয়েছে, সেসব গাণিতিক মডেলে ব্যবহার করে কিভাবে এইসব বন্যার পূর্বাভাস আরও সুচারুরূপে দেওয়া যায়, সেদিকে মনযোগী হওয়া দরকার।

তার পরও, ধরলাম আমাদের সাথে মেঘালয় রাজ্যের নদীর পানিসমতল তথ্য পাওয়ার জন্য কোন ফরমাল চুক্তি হল এবং সেই অনুযায়ী আমরা তথ্য পেতে থাকলাম।প্রশ্ন হল, সেই তথ্য কী আমাদের কোন কাজে আসবে?আসবে না।কারণ আকস্মিক বন্যার ধরণটাই হল এমন যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে অত্যাধিক বৃষ্টি হবে এবং পাহাড় থেকে ঢল নেমে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে।দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক; নিচের প্রথম গ্রাফে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসের ১৬ তারিখ সারি নদীর পানিসমতলের পরিবর্তন দেখানো হয়েছে, দেখা যাচ্ছে, মাত্র ৬ ঘন্টার ব্যবধানে পানি সমতল প্রায় ২ মিটার (৬.৫ ফুট) বেড়ে গিয়েছিল।

নিচের গ্রাফে দেখা যাচ্ছে, এই বছরের বন্যার সময় কুশিয়ারা নদীর পানি শেওলা পয়েন্টে কিভাবে মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে প্রায় ৮ মিটার (২৬ ফুট) বৃদ্ধি পেয়েছিল।কাজেই বোঝা যাচ্ছ, কেবল পানিসমতলের উপর নির্ভর করে এই ধরণের বন্যার তেমন একটা পূর্বাভাস দেওয়া যায়না।

এখন কথা হচ্ছে, এইরকম একটা বন্যা যে হতে পারে, তার কি কোন তথ্যই কি আমাদের কর্তৃপক্ষের কাছে ছিল না? উত্তর হচ্ছে, অবশ্যই, ছিল। বেশ ভালভাবেই ছিল।বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর হতে এই সংক্রান্ত ভারী বর্ষনের সতর্কবাণী জারি করা হয়েছিল এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকেও সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছেও এই তথ্য ছিল।কিন্ত এমন একটা সময় এবার বন্যা হয়েছে যে, হাওড়ের বোরো ধান ওইসময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্তনের উপযোগী ছিল না।আর যেসব কৃষকেরা এপ্রিলের শেষভাগে আক্রান্ত হয়েছেন, ডুবে যাওয়া ধান কেটে শেষ করতে না পারায় তাদের ধানও পচে নষ্ট হয়েছে।
হাওড়ের কৃষকের এই হাহাকার কিন্ত নতুন নয়।কয়েক বছর পর পরই এই ধরণের ছোট-বড় আকস্মিক বন্যা হয়ে থাকে।এবার বন্যার পর পরই বাঁধ নির্মানে দুর্নীতির ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে মহলবিশেষ ঝাপিয়ে পড়লেন। তাদের কাছে প্রথম প্রশ্ন, ভাই, যখন দুর্নীতি হচ্ছিল বা কাজ ফেলে রাখা হয়েছিল তখন কোথায় ছিলেন?দ্বিতীয় প্রশ্ন, বাঁধ ঠিকঠাক মেরামত হলেই কি আমরা এই বন্যার হাত থেকে বেঁচে যেতাম?-এই প্রশ্নের উত্তর এত সহজ নয়।হাওড়ে ধান চাষ হয় ৩ মাস যা মোট ধান উৎপাদনের ১৮ শতংশ, অন্যদিকে দেশের উন্মুক্ত উৎস থেকে আহরিত মাছের ২৮ শতাংশ আসে হাওড় অঞ্চল থেকে। তাহলে মাছের কথা বিবেচনা করে হাওড়কে তো বাঁধ দিয়ে পুরো ঘিরে ফেলা যাবে না।এজন্য, এখানের বাঁধগুলোও কিন্ত এমনভাবে তৈরি হয় যাতে, একটা নির্দিষ্ট সীমার পরে বর্ষা মৌসুমে হাওড়ে ঠিকমতন পানি প্রবেশ করতে পারে- যা সাবমারসিবল এম্বাংকমেন্ট নামে পরিচিত। কাজেই এখন আমরা যখন বন্যার প্রকোপ কমানোর জন্য হাওড়ে বাঁধের উচ্চতা ৬ মিটার থেকে বাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলছি, সেখানে ভেবে দেখার মত যথেষ্ট বিষয় আছে।আর স্বাভাবিকের তুলনায় যখন ২-৩ গুণ বেশি বৃষ্টি হয়, তখন বাঁধ দিয়েও কি তা সম্পুর্ণ ঠেকিয়া দেয়া যায়? সমস্যার শেষ কিন্ত এখানেই নয়, বর্তমানে যেসব বাঁধ আছে সেখানেও স্থানীয় লোকজন বিভিন্ন জায়গায় কেটে দেয়, হাওড়ে দ্রুত পানি নেওয়ার জন্য- এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করবে কে?
আগেই বলেছি, এমন সময়ে এবার বন্যা হয়েছে যে, পূর্বাভাস তেমন একটা কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল না।তারপরও যে পূর্বাভাস ছিল, তা তৃণমূল পর্যায়ে কতটুকু পৌঁছেছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।কারণ গতবছরই সঠিক সময়ে পূর্বাভাস পেয়ে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ধান কেটে আগাম বন্যার ক্ষতি প্রায় ৫০ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।যদিও এইসমস্ত খবর প্রচার পায়নি।এবছর তৃণমূল পর্যায়ে সতর্কবাণী পৌছালে হাওড়ের জনগণ অন্তত একটা মানসিক প্রস্তুতি নিতে পারতেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এমন আগাম বন্যা হচ্ছে কীনা, তা নিশ্চিত করে বলা গেলেও, বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে আভাষ পাওয়া যাচ্ছে এধরণের বন্যার প্রকোপ এবং তীব্রতা সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন এবং তা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং।যেমন হাওড়ের জন্য আরও সল্পমেয়াদী ধানের জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে, কিন্ত মেয়াদ কমিয়ে আনলে উৎপাদন ও কমে যায়-তাই একটা ‘অপটিমাম কন্ডিশন’ অর্জন করাটা অনেক গবেষণার বিষয়।
পরিশেষে ডিসিশন মেকারদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, হাওড়ের সমস্যা সমধানে আই ওয়াশিং বক্তব্য না দিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার কথা বলুন।যেখানে গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত দরকার, সেখানে মনগড়া বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেন না।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা মে, ২০১৭ রাত ১:০৫

চাঁদগাজী বলেছেন:


হাওরে কি করা সম্ভব?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.