| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

ছোট্ট একটা প্রশ্ন দিয়েই বরং শুরু করা যাক...
আচ্ছা মানুষ কি সত্যি মাদকে আসক্ত হয়? নাকি সে আসক্ত হয় সেইসব অনুভূতিতে যেখানে মানুষ বিশ্বাস করে,এইতো,আরেকটু এগোলেই জীবন বদলাইয়া যাবে।
Requiem for a dream সিনেমাটি কোন নৈতিক শিক্ষা দেয়না,বরং ধীরে ধীরে দেখিয়ে দিতে থাকে মানুষ যখন নিজের শূন্যতাকে কৃত্রিম উপায়ে ভরাট করতে যায় তখন সেই শূন্যতাটাই তাকে উল্টো গ্রাস কইরা ফেলে একটা সময়।
চারটি চরিত্র,চারটি স্বপ্ন,কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের গন্তব্য একই। কারণ ধ্বংসের পথ সবসময় একরকম হয়না না। কখনো তা হেরোইনের প্যাকেটে আসে,কখনো ডায়েট পিলের বোতলে,কখনো ভালোবাসার ছদ্মবেশে,কখনো ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিতে।
সারা গোল্ডফার্বের মুখে যখন আপনি প্রথমবার শুনতে পারবেন "I'm gonna be on television" তখন সেটাকে একটু নিরীহই মনে হইতে পারে৷ আরেহ এই বৃদ্ধা কিসব বলছে? এই বয়সে টেলিভিশনে দেখতে চায় নিজেকে? আপনি দ্বিতীয়বার ও সারা গোল্ডফার্বের মুখে একই কথা যখন শুনবেন আপনার মনে হতে পারে সে এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। তৃতীয়বারের মত আবারো শুনলেই কেবল বুঝতে পারবেন যে নাহ,বৃদ্ধা এখন পুরোপুরি স্বপ্নের ভেতরে বাস করা শুরু করেছে।
কিন্তু সারা গোল্ডফার্বকে যখন শেষবারের মতন শুনবেন তখন আপনি বুঝতে পারবেন সে আর কিছুই হতে চায়না। তার যেন আর চাওয়ার কিছুই নেই,টেলিভিশনের পর্দায় নিজেকে নয়,বরমগ সে নিজের জীবনকেই যেন আর দেখতে চায়না।
সিনেমাটির আরেকটি অস্বস্তিকর বিষয় হলো,এখানে নায়ক, খলনায়ক বলে কেউ নেই। সবাই স্বাভাবিক মানুষ। সবাই একটু ভালো জীবন চায়। একটু স্বস্তি,একটু স্বীকৃতি,একটু ভালোবাসা। কোন চেচামেচি নেই,বরং ফিসফিসই সিনেমাটিকে আরো গভীর ও অর্থবহ করে তুলেছে।
দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষুদা খাবারের নয়,হ্যা টিকে থাকার জন্য খাবারের বিকল্প নেই,কিন্তু কিছু ক্ষুদা থাকে যেমন,গুরুত্ব পাওয়ার,দেখা হওয়ার কিংবা কারোর কাছে এখনো মূল্যবান হয়ে থাকার ক্ষুদা। যেখানে সামাজিকতাও ভেঙে পড়ে।
সারা গোল্ডফার্ব কি চেয়েছিলো? যাতে কেউ তাকে ভুলে না যায়। এই কারণেই ফ্রিজের সেই দৃশ্যগুলা অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর। অনেকে মনে করে সেগুলা হ্যালুসিনেশন। মূলত সেই ফ্রিজটাই ছিলো সারা গোল্ডফার্বের একাকীত্বের প্রতীক। যে একাকীত্বকে যে প্রতিদিন খোলার চেষ্টা করে,আবার বন্ধ করে, কিন্তু কখনো পূরণ করতে পারেনা। সারা গোল্ডফার্ব তার স্বপ্নের পেছনে ছুটতে থাকে ডায়েট পিলের বোতলের মাঝে।
অন্যদিকে সারা গোল্ডফার্বের ছেলে হ্যারি,হ্যারির প্রেমিকা আবার ম্যারিয়ন। আর টাইরন হল হ্যারির সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
আপনি ইতিমধ্যে সিনেমার গভীর স্তরে ডুবে গেছেন।
হ্যারি,ম্যারিয়ন ও টাইরন আনন্দের জন্য নেশা করেনা,বরং তারা নেশা করে একটা ভবিষ্যৎ পাবার জন্য,একটি ভবিষ্যৎ কিনতে চায়।
হ্যারি আর ম্যারিয়নের সেই ছোট্ট এপার্টমেন্ট,দোকান খোলার পরিকল্পনা,নিজেদের জীবনকে গুছিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা। হ্যারির কাছের বন্ধু টাইরন ও হ্যারির সঙ্গে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে,যার উদ্দেশ্যে সহজ,হেরোইন ব্যবসা করে দারিদ্রতা মুছে একটা সুন্দর জীবন গড়া।
নাহ এইসব কোন নেশাখোরের স্বপ্ন হইতেই পারেনা। তাদের নেশা করার নির্দিষ্ট মটো ছিল,স্পষ্ট। এইসব অত্যন্ত সাধারণ স্বপ্ন মনে হইতে পারে,তাইনা? ঠিক এই কারণেই সিনেমাটা এত নির্মম।
ড্যারেন এরোনফস্কি পুরো সিনেমাতেই একটা জিনিস বার বার দেখানোর চেষ্টা করেছেন,আর তা হল,পুনরাবৃত্তি,একই কাট,একই রিচ্যুয়াল,একই শব্দ,একই আকাঙ্খা। কারণ আসক্তি কখনো কোন পদার্থ দিয়ে হয়না,এটা বিশ্বাস থেকেই শুরু হয়। ঠিক এই ধরণের বিশ্বাস,আরেকবার,এইতো ব্যস এইবার,আরেকটাবার,শুধু এইবারই শেষবার তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।
তারপর যখন হ্যারির হাত পঁচে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখবেন তখন রিলেট করতে পারবেন,আপনি আসলে সিনেমার কোন পর্যায়ে ডুব দিয়েছেন। পুরো সিনেমার সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম সিনের একটি। কারণ হ্যারির পঁচে যাওয়া হাত শুধুমাত্র শারীরিক ক্ষতিই ছিলোনা,বরং এই হাত দিয়ে সে ভবিষ্যৎ কে আকড়ে ধরতে গিয়ে হাতই হারিয়ে ফেললো। সেই একই হাত,যে হাত দিয়ে সে স্বপ্ন বুনেছিলো ম্যারিয়নকে আকড়ে ধরে থাকবে,সেইসব স্বপ্নগুলো যেগুলো সে ছুতে চেয়েছিলো ম্যারিয়নকে নিয়েই,অথচ সেই হাত মৃত।
অন্যদিকে ম্যারিয়নের কি হয়েছিলো? ম্যারিয়নের শেষ দৃশ্যটা অনেকে অপমানের দৃশ্য হিসেবে মনে করে,তবে আমি মনে করি এটি ছিলো আত্মসমর্পণ! আত্মসমর্পণের দৃশ্য হিসেবেই।। মানে ম্যারিয়ন তার জীবনে ভালোবাসা খুজতে খুজতে এখন সে নিজেকে এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে যে এখন তার অনুভূতির কোন দাম নেই। শ্রেফ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অনুনয়। স্বপ্নের ও তো একটা মূল্য আছে তাইনা,কিন্তু সে নিজের পুরো অস্তিত্ব দিয়েই সেই মূল্য পরিশোধ করলো।
টাইরন মাদক সম্পর্কিত অপরাধে জেলে যায় কিন্তু দীর্ঘ সময়ের হেরোইনের প্রভাবে তার উইথড্রয়াল সিম্পটম দেখা দেয়,যা এক ধরণের বিষক্রিয়ার মত। কারণ সে জেলখানায় হেরোইন পাচ্ছেনা।
তারপর আসে সেই বিখ্যাত ফোটাল পজিশন। চারজন মানুষ,চারটি আলাদা জায়গা,আলাদা পরিণতি,কিন্তু একই ভঙ্গি। যে ভঙ্গিতে মানুষ পৃথিবীতে আসে।
পুরো সিনেমাজুড়ে চারজন মানুষের ভবিষ্যৎ দেখতে থাকি,কিন্তু শেষে তারা সবাই ফিরে যায়,অসহায় শরীরে,ভঙ্গুর অস্তিত্বে এবং জন্ম নেয়া শিশুর ভঙ্গিতে।
যেন সমস্ত স্বপ্ন,সমস্ত পরিকল্পনা,সমস্ত আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষকে আবার সেই জায়গাতেই ফিরিয়ে আনে যেখানে সে সবচেয়ে একা,নির্জন ও নিষ্প্রাণ।
©somewhere in net ltd.