| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

কিছু কিছু রাত মানুষের ঘুম কেড়ে নেয় না, বরং তার ভেতর থেকে এমন কিছু দরজা খুলে দেয় যেগুলো দিনের আলোয় কোনোদিন খোলা যায় না।
সেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকে পুরোনো কিছু দিন। দিনগুলো মৃত,অথচ তাদের স্মৃতিগুলো আশ্চর্য রকম জীবিত।
তারা ফিরে আসে কোনো শব্দ না করে,বসে থাকে বুকের ভেতর, তারপর ধীরে ধীরে পোড়াতে থাকে এমন জায়গাগুলো, যেখানে কোনো ক্ষত দেখা যায় না।
একসময় মানুষ ব্যথার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যায়।
কিন্তু ব্যথা যখন দীর্ঘদিনের অতিথি হয়ে ওঠে,তখন তাকে আর অতিথি মনে হয় না—মনে হয়, সে-ই বুঝি ঘরের আসল বাসিন্দা।
রাত বাড়ে,শহর ঘুমিয়ে পড়ে।
জানালার ওপাশে আলো নিভে যায় একে একে,অথচ মাথার ভেতর কিছু আলো জ্বলতেই থাকে,অদ্ভুত। অসহ্য কিছু আলো,যেখানে পুরোনো দৃশ্যগুলো বারবার অভিনীত হয়,অথচ পর্দা নামার কোনো উপায় থাকে না।
চোখ বন্ধ করলেই অতীত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাই চোখ খোলা রাখি। কিন্তু চোখ খোলা রাখলেও তো নিজেকে এড়ানো যায় না,হাহাহা।
ভোরের দিকে আয়নায় দাঁড়ালে নিজের মুখটাকে কখনো কখনো অপরিচিত লাগে। চোখ দুটো যেন কোনো ঘুমহীন রাতের সাক্ষী নয়, বরং বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা এক অদৃশ্য ইতিহাসের প্রমাণ।
সেখানে লালচে চোখের ভেতর আমি কাউকে খুঁজে পাই।
একজন মানুষকে, যে একসময় খুব সহজে হাসত। যে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবত। যে বিশ্বাস করত,কিছু দরজা বন্ধ হলেও পৃথিবীতে আরও অনেক দরজা খোলা থাকে।
এখন তাকে খুব কম দেখা যায়।
হয়তো সে হারিয়ে যায়নি,হয়তো শুধু ক্লান্ত হয়ে কোথাও বসে আছে,নিজেরই ভেতরেই।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো,মানুষ একদিন নিজের কষ্টকে আর ব্যাখ্যা করতে পারে না। কেন মন খারাপ,কেন ঘুম আসে না,কেন হঠাৎ বুক ভার হয়ে যায়? এসব প্রশ্নের উত্তর ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যায়,ম্যাটার করেনা পর্যায়ে নেমে আসে।
তারপর একসময় কষ্টেরও কোনো কারণ লাগে না,সে শুধু থাকে,নিঃশব্দে,নিয়মিত,অবিচ্ছিন্নভাবে। আর ঠিক তখন মানুষ নিজের সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দেয়। কারণ সে ইতিমধ্যে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে,সে নিজের কাছেই নিজের কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর পাবেনা,অথবা উত্তরেরই আর দরকার নেই।
দিনের বেলায় সে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে। মানুষের সঙ্গে কথা বলে,হাসে,প্রয়োজনীয় কাজ করে,পৃথিবীর নিয়ম মেনে চলে,ট্র্যাফিক সিগনাল ও। কেউ বুঝতেও পারে না,এই স্বাভাবিক মুখটার পেছনে কতগুলো রাত জেগে আছে।
কেউ জানে না,কিছু মানুষ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে জীবনের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে নয়,শুধু অভ্যাসের কারণে।
তবু অদ্ভুতভাবে তারা উঠে পড়ে।
হয়তো এটাই মানুষের সবচেয়ে নীরব সাহস,ভেঙে যাওয়ার পরও পৃথিবীকে নিজের ভাঙনের খবর না দেওয়া।
কিন্তু রাত হলে সেই সাহসেরও একটা সীমা থাকে।
তখন মনে হয়,যদি একটু দূরে কোথাও গিয়ে বসা যেত!
যদি নিজের স্মৃতিগুলোকে কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে রাখা যেত! যদি বুকের ভেতর জমে থাকা পুরোনো শব্দগুলোকে একবারের জন্য চুপ করানো যেত!
কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় কারাগারের কোনো দরজা থাকে না,তার নাম স্মৃতি। সেখান থেকে পালাতে চাইলেই মানুষ যত দূরেই যাক,নিজের কাছেই ফিরে আসে।
তাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে ভয় পাই। ভয়টা চোখের রঙ দেখে নয়,ভয়টা এই ভেবে যে,এই চোখ দুটো কত কিছু দেখেছে, অথচ এখনো কাউকে কিছু বলতে পারেনি।
©somewhere in net ltd.