নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মেঘের কোলে রোদ

বিন্দু থেকে বৃত্তে তবে বৃত্ত বন্দি নই

মেঘের কোলে রোদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা

২৪ শে মে, ২০১১ ভোর ৬:৫৪

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনবদ্য ইতিহাসে সৃজনশীল মুসলিম ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ইবনেসিনার নাম সবিশেষ উলেস্নখযোগ্য। অনাসৃষ্ট চিকিৎসা বিদ্যা আবিষ্কার করেছেন হিপোক্রেটিস তারপর পতিত এ মহাবিদ্যার পুনরুত্থান করে গ্যালেন। আর অবিন্যস্ত ও বিচ্ছিন্ন এ অনন্য বিদ্যাকে সুবিন্যস্ত, সুসংবদ্ধকরণে ভূমিকা রাখেন আল রাজী। সবশেষে অসম্পূর্ণ এ চিকিৎসাবিদ্যাকে পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করেন মুসলিম চিকিৎসাজ্ঞ ইবনেসিনা। পুরোনাম "আবু আল হোসাইন ইবনে আব্দুলস্নাহ ইবনেসিনা। পরন্ত তিনি "আবু আলী সিনা" বা ইবনেসিনা নামে সমধিক পরিচিত।



ইবনেসিনার পিতা আব্দুলস্নাহ ছিলেন উচ্চপদস্থ রাজ কর্মচারী। তিনি উজবেকিস্তানের "বালাখ" শহরে বসবাস করতেন। চাকরিস্থল পরিবর্তনের কারণে তিনি বুখারা নগরীতে পাড়ি জমান ৩৭০ হিজরীর সফর মাস মোতাবেক ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে বোখারার "খারাশমনী আফসানা" নামক স্থানে চিকিৎসাবেত্তা ইবনেসিনা জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আব্দুলস্নাহ পেশায় রাজ কর্মচারী হয়ে ও তিনি অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাই নিজ তনয়কেও বহুবিদ্যায় বিদ্বজ্জন হিসেবে গড়ে তুলতে অত্যাগ্রহী ছিলেন। ছ'বছর বয়সে ইবনেসিনা স্বীয় পিতার সাথে একবার বুখারা শহরে গমন করেন। বুখারার এক পাঠশালাতেই তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ছেলেবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত বিদ্যাপিয়াসী ছিলেন। বাল্যকালে তিনি "আল ইবানা" নামক একটি পুস্তিকা ক্রয় করেন। তা থেকে অনেক অনার্জিত জ্ঞানের সন্ধান লাভ করেন। পরিতৃপ্ত চিত্তে প্রভুর দরবারে শোকরানা আদায় করেন। তার কোরআন পাঠের পরমবিদ্যা দশ বছরেই সম্পন্ন হয়।



এরপর ফিক্হ (ইসলামী আইন শাস্ত্র), কালাম (যুক্তিতর্ক শাস্ত্র ও সাহিত্য অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন। তদানীন্তন আরব-পারস্য দেশে চিকিৎসা বিজ্ঞান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সমাদৃত ছিলো। সেজন্যে চিকিৎসাবিদদের অপেক্ষাকৃত বেশী আদর-যত্ন করা হতো। যুগপৎ মনোভাব নিয়ে হিপোক্রেটিস, এরিস্টটল গ্যালেন আর রাজী প্রমুখ মহামনীষীদের চিকিৎসা শাস্ত্রে একচ্ছত্র মনযোগ দেন ইবনেসিনা। তাদের ধ্যান-ধারণা, গবেষণালব্ধ তাত্তি্বক বিষয়াদিতে উচ্চতর গবেষণা চালিয়ে যান তিনি। যেখানে তাদের কাজের পরিসমাপ্তি ঘটে ইবনেসিনা সেখানে উচ্চমানসে প্রারম্ভিকরের হাত বাড়ান। তার এ অধ্যয়ন-অধ্যবসায় দিবাযাম চলতো। অধিকন্তু অবিরাম এ গতিতে বাঁধ সাধতো জৈবিক চাহিদা "নিদ্রা" তাই নিদ্রারোধক ওষুধও সেবন করেন তিনি। সাধক ইবনে সিনা স্বপ্নযোগেও লাভ করতেন অনেক অবিদিত সূত্রের সমাধান ও উদ্ভাবন। এমন অলৌকিক প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতেন সৃষ্টার দরবারে। মেধা-মননের একাত্ম প্রয়োগে এভাবেই বিজ্ঞানী সিনা অধীর গতিতে চিকিৎসা গবেষণা চালাতে থাকেন এর মাঝেই দিগ-দিগন্তে ইবনে সিনার সুনাম, সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তার বয়স তখন সতেরোর কোঠায়। বুখারার তৎকালীন শাসক ইবনে মানসূর একবার গুরুতর ব্যধিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। দেশ-বিদেশের অনেক হেকীম বিজ্ঞ চিকিৎসক শাসকের চিকিৎসার্থে শাহী দরবাহে সমবেত হলো। কাজ হলো না কিছুতেই। শেষাবধি ডাক পড়ে ইবনে সিনার। সাড়া দেন শাসকের ডাকে। অসুখের লক্ষণ নির্ণিত করে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করেন। তাঁর প্রেসক্রিপশন ফলপ্রসূ হয়। অল্পদিনেই সেরে উঠেন বুখারার শাসক ইবনে মনসূর। ইবনে সিনার প্রতি তিনি অনুরাগী হয়ে পড়েন। তিনি জানতেন ইবনে সিনা সমসাময়িক জ্ঞান গবেষণায় অত্যন্ত আগ্রহী ব্যক্তিত্ব তাই বাদশাহ তাঁকে শাহী লাইব্রেরীর পূর্ণ প্রবেশাধিকার দান করেন। এতে ইবনে সিনাও বেশ প্রীত হন। যেহেতু রাজকীয় সে লাইব্রেরীটি ছিলো দ্রুষ্প্রাপ্য ও অতিমূল্যবান গ্রন্থাদির সুবিশাল ভান্ডার। কিছুদিন পর বাদশাহ তাকে গ্রন্থাগারের অধিকর্তা নিযুক্ত করেন। একনিষ্ঠ দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে বিজ্ঞানী ইবনে সিনা অমূল্য গ্রন্থ সমাহার থেকে প্রভূত জ্ঞান-অভিজ্ঞান অর্জন করতে লাগলেন, কিন্তু সুখ সব সময় বা সবার কপালে সয় না। ইবনে সিনার ভাগ্যলিপি এমনি ছিলো। এ সময় মারা যান তাঁর প্রাণপ্রিয় পিতা। এর কিছু দিন পরে বুখারার শাসক ইবনে মান সূরও পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। পিতৃ ছায়া হারানোর সাথে সাথে রাজকীয় সৌকর্য সুবিধার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ইবনে মনসূরের তিরোধান ইবানে সিনাকে রাজনৈতিক বাক-বিতর্কের মুখে নিপতিত করে। ইবনে সিনা জীবনের সূচনা লগ্ন থেকেই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মুখোমুখি হন। তখন জীবন সংগ্রামের চড়াই-উৎরাই সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন তিনি। তাই দৃঢ় প্রত্যয়ী থেকেই ইবনে সিনা তরুণ বয়সেই বিদেশ-বিভূয়ে ভ্রমণ শুরু করেন। একবার বুখারা ত্যাগ করে তিনি উজবেকিস্তানের খাওয়ারিজমনামী পন্ডিত প্রসূ ভূখন্ডে প্রস্থান করেন। সেখানে সাক্ষাৎ হয় যুগসেরা পন্ডিত যথা: আবু রায়হান আল বেরুনী, আবু নসর আল ইরাকী ও আল খায়ের প্রমুখ জ্ঞানী-গুণীদের সাথে। তৎকালের বাদশাহ আলী ইবনে মামুনের রাজ দরবার এ ধরনের শাস্ত্রবিদগণের পদচারণায় মুখরিত ছিলো। ইবনে সিনা এসব মহামনীষীদের সংশ্রবে থেকে আপন গবেষণালব্ধ বোধ ও বিষয়গুলো তাদের জ্ঞান-গবেষণার সাথে সমীকরণে ব্রতী ছিলেন। কিছুকাল পর ইবনে সিনা আশ্রয় নেন ইরানে। ১৩২২ খ্রিষ্টাব্দ অবধি ইরানের জুরজান নগরীতে অবস্থান করতঃ অনেক কষ্ট-ক্লেশ ও নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। কোথাও কোথাও আবার বেশ সমাদৃত হয়েছেন। কখন উপদেষ্টা, কখন দার্শনিক বা চিকিৎসাবিদ এমনকি মন্ত্রী হিসেবেও তিনি খ্যাত নন্দিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক রোষানলে প্রক্ষিপ্ত হয়ে নিন্দিত, অনাকাঙিক্ষত জীবন-যাপন করতে হয়েছে বিজ্ঞানী ইবনে সিনাকে। এমন পরিস্থিতিতে ১০২২ খ্রিষ্টাব্দের কোন এক সময় পরিচয় হয় মুক্তমনা জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব আলা-উদ-দৌলা আবু জাফরের সাথে। তার সানি্নধ্যে যেন নবজীবন লাভ করেন তিনি। তার সঙ্গে হামাদান শহরে গমন করলেন। যাপিত জীবনের শেষাংশ এই হামাদানেই কাটে। অতঃপর ৪২৮ হিজরীর ৪ঠা রমযান ১০৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জুন পূর্বের শূল যাতনা কিছুদিন ভোগ করে পরপারে পাড়ি জমান ইবনে সিনা। ইরানের পশ্চিম প্রদেশ হামাদানে মুসলিম চিকিৎসা বেত্তা ইবনে সিনার সমাধি সৌধ আজও বর্তমান। মুসলিম বিজ্ঞানী সিনা পার্থিব রীতিতে পরলোকগত হয়ে গেলেও তিনি আপন সৃষ্টি-কীতিতে অমর। তাঁর প্রভূত অধ্যবসার সাধনা জুরভ্যান, হামাদান ও ইস্পাহান (তেহরান ও সিরাজনগরীর মধ্যস্থলে অবস্থিত ইরানের এক শহর) ইত্যাদি রাজ্যের শাহী দরবারগুলোতে প্রেরিত হয়। চিকিৎসা শাস্ত্রে তার অসংখ্য রচনা রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত সে গ্রন্থগুলো বিশ্ব চিকিৎসা বিজ্ঞানের অঙ্গনে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করছে।



ইবনে সিনা কর্তৃক নির্মিত চিকিৎসা শাস্ত্রিক এ গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম নির্মাণ হচ্ছে- "আল কানুন ফিত্ তিবি্ব" বৃহদাকারের এ গ্রন্থের সমাদর প্রাচ্য প্রতীচ্যের সর্বত্র। চিকিৎসা শাস্ত্রে ছয়শ' বছর পরও পাঠ্য এটি। বিশেষ করে সপ্তদশ শতক অবধি বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভিত বা "কানুন" সর্বস্ব ছিলো। ডাক্তারি শাস্ত্রে যার নাম "কানুন মেডিসিন"। আল আরবিয়াতুল কালবিয়া"-এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের দ্বিতীয় বিখ্যাত গ্রন্থ "হিম্মতই আলাই" ব্যক্তিগত দর্শন শাস্ত্র ভিত্তিক বই "আন্নাজাত" ও ইশরাত ওয়াততামবী-হাত নামক গ্রন্থদ্বয় ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত এবং বহুল প্রচলিত ও পরিচিত চিকিৎসাগ্রন্থ "আশশিফা" একটি অনন্য চিকিৎসা গ্রন্থ। ইবনে সিনা কর্তৃক রচিত এমন প্রায় ১৮৫টি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়।



সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.