| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রেখাচিত্রের খন্ডচিত্র★১৩
:
:
গাঁয়ের ইটবিছানো আধাপাকা পথ ধরে আনমনে একাকী স্কুল থেকে ফিরছিলাম।টিফিনে মিরার সাথে সামান্যতেই ঝগড়া লেগে গেছে,তাই একাই ফিরছিলাম।মেজাজ খারাপ।এই মিরা টা ঝগড়া লাগাতে আর অনুনয় বিনয় করে মিলমিশ করতে ভারি ওস্তাদ..প্রত্যেক ঝগড়ায় ভাবি, এবার মাফ তাইতে আসিস! করব ক্ষমা!!
যদি তোর চোখেরজল,নাকের জল এক না করি তো আমার নাম ও রেখা নাহ!
কিন্তু ও যেই কাছুমাছু মুখে বলবে,
রেখা,এবারের মত মাফ কর সোনা!
আমার আর কিছু মনে থাকে না। এবার ঠিক থাকবে! আমি কিছুতেই ওকে.....
:--দোস্ত! এই পথের রেখা টা কদ্দুর গ্যাসে রে?
তড়িতাহতর মত চমকে আমি সামনে তাকাই।যা ভেবেছিলাম তাই....
ইদানীং পথে মাঝে মাঝেই একদল ছেলে কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি,দেখলেই হাসাহাসি করে,ন্যাকা মন্তব্য ছুড়ে দেয়। তবে আমরা অনেক মেয়ে একসাথে দল বেধে স্কুলে যাই আসি তাই পাত্তা পায় না।কিন্তু আজ হঠাৎ নিজেকে এদের মাঝে সম্পূর্ণ অরক্ষিত একা দেখে ভয়ে আশংকায় কাঠ হয়ে গেলাম।ছেলেগুলো ইতিমধ্যে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে,কি কুৎসিত হাসি মুখে,ছি!হাসলে নাকি সৌন্দর্য ফোটে? এমন ঘৃণিত ও দেখায়!
উলটো ফিরে দৌড় দিব কী..?
কিন্তু এদের সাথে পেরে উঠব??
ভয়ে ভাবনায় হৃদপিণ্ড নিসাড় হতে যাচ্ছে বুঝি...
চারিদিকে কেন এত অন্ধকার....
:--রেখা,ওঠ।
আহ!
কি চেনা/আপন/দৃঢ় কণ্ঠস্বর!
মুহুর্তে আমি মিয়াবাবুর সাইকেলের পিঠে।
মিয়াবাবু মাত্রাতিরিক্ত জোড়ে সাইকেল চালাচ্ছে,ঝুকে যাচ্ছি এপাশ ও পাশ,ভয় লাগছে।কিন্তু কিছু বলতে পারছি না,সে কোথা থেকে কি করে হঠাৎ উদয় হয়ে আমার রক্ষা কর্তা হয়ে উঠল!! কৌতুহল বাধ মানছে না...
মিয়া...
কিছু বলতে চেয়ে থেমে গেলাম।
সে হঠাৎ মুহুর্তের জন্য ফিরে তাকালো... সেই চাওয়াতে আর যাই থাক প্রীতি ছিল না! কঠিন সে দৃষ্টি,রেগে ফেটে পড়বে যেন।
মনেই পড়ছে না আমি এর আগে ওর এত বেশি রাগীমুখ দেখেছি কিনা... কিংবা ওর আজকের রণচণ্ডী রুপে আমার স্মৃতিভ্রষ্ট হল কিনা..!
কাঠের পুতুলের মত নিসাড় বসে আছি।
সত্যি বলতে ভয় পাচ্ছি, মারাত্মক! ভয়।একটু আগের ভয় টা যেন এর কাছে কোন ব্যপার ই না...বাড়ির আঙিনায় মিয়াবাবু সাইকেল টা এত জোড়ে পাকিং করল যে আমাকে নামতে নয়,পড়ে যেতে হল।মাগো,হাটু তে ছিলে গেসে ইশ!
নিঠুর টা ফিরেও তাকাল না...!
হনহন করে বাড়ির মধ্যে ডুকে গেল।
এদিকে যন্ত্রণায় আমি উঠে দাঁড়াতে পারছি না।আমার এখন রাগ,অভিমান,কান্না কোন টা করা উচিত সেটাও বুঝতে পারছি না...
শুধু ভীষণ ইজ্বালাপোড়া অনুভব করছি হাটুতে আর মনে।
বেশ কিছুক্ষণ পর খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়ির মধ্যে ঢুকলাম।চারিদিকে সুনসান। দুপুরের অবসরে যে যার ঘরে ঘরে নিদ্রায় কিংবা বিশ্রামরত। নিজের রুমে এসে বিছানায় এলিয়ে দেই নিজেকে.... কোথা থেকে দুচোখে বাঁধভাঙা জল.... ভীষণ পুড়ছে ভেতর টায়.... একটা মানুষের একটা দিন এত টা খারাপ হয়?
মিরার সাথে ঝগড়া,পথে অঘটন, মিয়াবাবুর দূরব্যবহার,সেই সাথে হাটুর এই ক্ষতের ব্যথা....
অকারণে মাকে স্বরণ করে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছি বহুদিন পর,আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে এ বাড়ির কেউ আমার নয়,সব্বাই পর।দোড়ে কারো ছায়া দেখে চমকে ফিরে তাকালাম, মিয়াবাবু!
চোখে সেই আগের রাগ টা নেই তবে বিরক্তি বিদ্যমান।তার নমনীয়তা দেখে কান্নার ঢেকুর বাড়ল বৈ কমল না...
চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সে।এ যেন ঝড়ের পুর্বের থমথমে আকাশ! কি বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।দ্রুত পায়ে বিছানায় বসে হাটুতে হাত দিতেই ব্যথায় কুঁকড়ে পা সরিয়ে নিলাম...
বড় বড় চোখ করে একবার চোখের দিকে তাকিয়ে ফের টেনে নিল পা,আমার সে পা সরিয়ে নিতে সাহস হল না...! ঠিক হাটুর কাঁছে ছিলে গেছে,শুধু তাই নয় পাজামার কাঁপড় টাও শক্ত হয়ে রক্তে মিশে ক্ষতের সাথে আটকে গেছে!মিয়াবাবু সেটা আলগা টান দিতেই আমি গগন বিদারী চিৎকার দিতে যাচ্ছিলাম.... মিয়াবাবু যথাসময়ে চেপে ধরলেন মুখটা তাই রক্ষে,নচেৎ এতক্ষণ...
মিয়াবাবু গভীর ভাবে তাকিয়ে আছেন ক্ষতের দিকে,আমি তার নত মুখের দিকে,চারিদিকে কি সুনসান নিরবতা!হঠাৎ মিয়াবাবু উঠে চলে গেলেন, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফের হাজির,স্যাভলন,
ব্যান্ডেজ,পানি, কেঁচি হাতে করে।
আমি অভিভূত হয়ে দেখছি।ওগুলো যে আমার পায়ে ব্যবহার হতে চলেছে ভুলেই গেছি।
খুব যত্ন নিয়ে ধিরে ধিরে ক্ষতে আটকে যাওয়া কাঁপড় টা আলগা করলেন তিনি!
অতঃপর যেই ক্ষত দেখতে যাচ্ছেন,
তড়িতগতিতে পা টা সরিয়ে নিলাম দ্বিতীয়বারের মত! ব্যথায় না লজ্জায়।কিন্তু তার ভেতর কোন ভাবান্তর হল বলে মনে হয় না!ফের পা টেনে নিতে গেলেন,ফের সরাতে গিয়ে মুখে একটা থাপ্পড় এসে জুটল...
অগত্যা জেদের সাথে চুপকরে চোখ বুঝে আছি...
তিনি নিষ্ঠার সাথে ক্ষত টা পরিস্কার করছেন...চারিদিক
ে নিঝঝুম শুধু
বুকের ধুকধুকানির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি স্পষ্ট.!
স্যাভলনের প্রথম কামড় টা সইতে গিয়ে কখন যে হাতটা তার হাতের উপর চাপ খেয়েছে আমি কি জানি! তিনি হাত সরিয়ে নিয়ে ব্যান্ডেজ করতে বসলেন....
নিচুমুখে বিরবির করছেন....
এত সাহস ভালো না...যদি কিছু হত? মিরা বুদ্ধি করে এক ফ্রেন্ডের ফোন থেকে কল দিয়েছিল বলে।
যদি না দিত? যদি কল পেয়েই আমি পড়িমরি করে ছুটে না আসতাম? জানিসয় কত টেনশন হচ্ছিল আমার? ক্ষত হয়েছে না! ঠিক হয়েছে....
খাচ্চোর একটা....!!
এতগুলো যদি যুক্ত অভিযোগ আমি অভিভূত হয়ে শুনছি!কিংবা কল্পনা বুনছি! এসব কি বাস্তব?? ব্যান্ডেজ শেষে চলে যেতে যেতে হুমকি দিয়ে গেলেন,চুপচাপ শুয়ে থাকবি,বাইরে বের হয়েছিস তো ঠাং ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব...!!
হুম!
বাধ্য মেয়ের মত চুপটি করে শুয়ে আছি।মন কিন্তু চুপটি করে নেই।সে অনবরত দৌড়ে ফিরছে আজকের এই পুরো ঘটনাটায়....
নাহ!
একটা দিনের পুরো টা খারাপ যায় না...! সব কিছু নিমিষেই তুচ্ছ একটুকরো সুখের ছোয়ায়....!!
©somewhere in net ltd.