| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
তাহেরকে নিয়ে এক অদ্ভুত খেলা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সঙ্গত কারনেই যেহেতু ১৫ই অগাস্ট থেকে শুরু করে ৭ই নভেম্বরে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহকে বাদ দিয়ে এদেশের ইতিহাসকে বোঝা যাবেনা, সেহেতু বারবার তাহেরকে নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক চলতেই থাকবে। এই বিতর্কের উৎস ষোলোআনা রাজনৈতিক। এটাও আমাদের সবার জানা, এদেশে যেখানে রাজনিতি সেখানে সত্য বরাবরই মিথ্যার সাগরে খাবি খায়। এই ধরনের মতলবি বিতর্ক রাষ্ট্রীয় জীবনে কখনো কল্যাণকর প্রতীয়মান হয়না। সম্প্রতি তাহেরের বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে হাইকোর্টের দেওয়া রায় এই বিতর্কে নতুন ইন্ধন জোগাবে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
তাহেরের প্রধানত দুটি পরস্পর বিরোধী মূল্যায়ন চোখে পড়ে। একটি পক্ষের কাছে তাহের এক মহানায়ক। বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের চেহারাই পাল্টে দিতেন। অন্য পক্ষের কাছে তাহের একজন ষড়যন্র্বকারী এবং রাষ্ট্রীয় সংহতি বিনষ্টকারি। এই দুই ধারা অবশ্য ভীষণ ভাবে অসম। তাহের আমরণ যে রাজনিতিকে লালন করেছেন তা কখনো বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ আপন করে না নিলেও তাহেরের পক্ষে লেখনির বিস্তর উদাহরন দেওয়া চলে। অন্যদিকে, পছন্দ হোক বা নাহোক, এটি স্বীকার করতেই হবে যে জিয়া বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রানপুরুষ। এই ধারাটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রচার যন্ত্রগুলির একধরনের অবিরাম আক্রমনের মুখেও টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও স্বমহিমায় টিকে থাকবে বলে আশা করা যায়। তারপরেও, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী লেখক এবং বুদ্ধিজীবীদের তাহের ইস্যুতে জিয়ার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে কদাচিৎ দেখা যায়। এর কারণটি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাহের এবং জিয়ার জীবনের নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে জিয়াপন্থীদের এই দুর্বল অবস্থানটি আরও অদ্ভুত ঠেকে। এর কারন কি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের অযোগ্যতা? কোনও বিশেষ কারনে দুর্বল নৈতিক অবস্থান? ঠিক উত্তরটি পাওয়া মুশকিল। তবে ধারনা করি অযোগ্যতা এবং দুর্বল নৈতিক অবস্থান দুটিরই কিছু ভুমিকা আছে। এই পরিস্থিতি লজ্জাজনক। জাতীয়তাবাদীধারার বুদ্ধিজীবীরা সময়ভেদে সরকারের সুবিধাভোগী কিন্তু বারবার দেখা যায় দলের সংকটের মুহূর্তে এরা বুদ্ধি, পরামর্শ, বা লেখনি নিয়ে দিকনির্দেশনা দিতে অপারগ।
কর্মসূত্রে তাহের এবং জিয়ার পরিচয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে তাদের মধ্যে একধরনের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা লক্ষ্য করা যায়, যার মূলে রয়েছে সম্ভবত সেক্টর কমান্ডেরদের ভেতরে বিরাজমান একধরনের আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। একথা বললে ভুল হবেনা যে জিয়া প্রথম থেকেই একজন পেশাদার সৈনিকের ভুমিকা পালন করে আসছিলেন। ১৯৭১ থেকে একরকম যেন ইতিহাসের দায় মেটাতেই জিয়াকে নানান ভুমিকায় দেখা যায়। অন্যদিকে তাহের শুরু থেকেই একজন রাজনিতিঘনিষ্ঠ সৈনিক। সেনাবাহিনীকে নিয়ে শুরু থেকেই তার অপ্রচলিত ধ্যানধারনা ছিল। তাহের ছিলেন একজন আপদমস্তক শ্রেনিসংগ্রামী। পেশাগত জীবনে এই অবস্থানের কারনে তাহেরকে বিভিন্ন সময় বিরম্বনা পোহাতে হয়েছে। তাহেরের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি জিয়ার কোনও ধরনের সহানুভুতির প্রমান কোথাও পাওয়া যায় না।
১৫ই অগাস্টের পর সেনাবাহিনীতে পেশাদারিত্ব এবং চেইন-অফ-কমান্ড ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৩রা নভেম্বর খালেদ মশারফ পাল্টা সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। এই অভ্যুত্থানের ফলে জিয়া সেনানিবাসে অন্তরিন হয়ে পরেন। খালেদের এই ক্ষমতাগ্রহন ছিল রক্তপাতহীন। ৩রা নভেম্বরের পালাবদলের পেছনে কি ধরনের রাজনিতি ক্রিয়াশীল ছিল তা স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। খালেদের পক্ষ থেকে যে কারনগুলি দেখান হয়ে থাকে তা হচ্ছে, প্রধানত সেনাবাহিনীতে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলার এবং ১৫ই অগাস্টের নায়কদের সীমাহীন দাপটের নিরসন। ১৫ই অগাস্টের পর জিয়া একধরনের নিরব অবস্থান গ্রহন করেন যা খালেদের চোখে ১৫ই অগাস্টের নায়কদের হাত শক্তিশালী করবারই নামান্তর ছিল। ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক রূপটি অস্পষ্ট হলেও এখানে যে এক ধরনের ব্যক্তিত্বের সংঘাত এবং ক্ষমতার লড়াই বিদ্যমান ছিল তা বেশ জোর দিয়ে বলা যায়। খালেদের অভ্যুত্থানের স্থিতি এবং স্থায়িত্ব দুটোই ছিল নড়বড়ে। সেনাবাহিনীতে গ্রহণযোগ্যতার অভাব, সাধারণ মানুষের সমর্থন লাভ করতে না পারা, এবং ঘটনাচক্রে ভারতপন্থী বলে চিত্রিত হওয়ায় দ্রুত খালেদ নিয়ন্ত্রন হারাতে থাকেন । সেনাবাহিনীতে খালেদের অনুগত অংশটি মুজিবপন্থী বলে বিবেচিত হওয়াটাও সে সময়ের প্রেক্ষিতে ছিল এক বড় ধরনের দুর্বলতা (মনে রাখা দরকার ১৫ই অগাস্টের পর দেশজুড়ে তীব্র মুজিববিরোধী আবেগ ক্রিয়াশীল ছিল)। দেশ জুড়ে বিদ্যমান এই শূন্যতার এবং সেনাবাহিনীর এক ধরনের বেহাল দশার ভেতর তাহের আরেকটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আঁটেন। ফলশ্রুতিতে ৭ই নভেম্বরের ঘটনাবলীর শুরু। যার শেষটুকুর নিয়ন্ত্রন গনভিত্তিবিহীন তাহের ধরে রাখতে পারেননি।
তাহের একটি পরিষ্কার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। তাহের ছিলেন একজন radical leftist। বামপন্থার কোন গনভিত্তি এই ভূখণ্ডে না থাকলেও তাহের একটি উগ্র-বাম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। এটা বলে নেওয়া ভালো, আমজনতার কাছে এই ধরেনের রাষ্ট্রকে শোষণমুক্ত এবং শ্রেণিহীন বলে পরিচয় দেওয়া হলেও এর বাস্তব কোন ভিত্তি নেই। উগ্র বামপন্থিদের এটি এক ভাওতাবাজি। যাইহোক, বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা এবং নেতৃত্বশূন্যতা তাহেরকে একটি মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। জাসদ, গণবাহিনী, এবং সামরিকবাহিনীতে থাকা তাহের-অনুগত অংশ (বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা), আরও একটি পালটা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে খালেদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হন। এই ক্ষমতার পটপরিবর্তন ছিল রক্তাক্ত। তাহের অনুগত সৈনিকদের হাতে বেশ কিছু সেনা অফিসার খুন হন। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের সদস্যরাও রক্ষা পাননি। স্মরণ রাখা প্রয়োজন তাহের-অনুগত সৈনিকদের শ্লোগানের একটি অংশ ছিল “অফিসারদের রক্ত চাই”। “শ্রেণিহীন” সেনাবাহিনী গড়বার মানসে তাহের যে ধরনের প্রণোদনার আশ্রয় নিয়েছিলেন তাতে রক্তক্ষয় ছিল একরকম অনিবার্য। ৭ই নভেম্বর সকালে খালেদ মশারফ দুজন সহযোগী সামরিক অফিসারসহ নিহত হন। হত্যাকারীদের মধ্যে ছিলেন ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আসাদ এবং ক্যাপ্টেন জলিল। এই সেনা অফিসারদ্বয় ৭১-এ খালেদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। এমনটিও শোনা যায়, ৭১-এ নিজ প্রানের ঝুঁকি নিয়ে খালেদ আসাদের জীবন রক্ষা করেন। অপশাসন, পুঞ্জিভুত ক্ষোভ এবং নৈরাজ্যের দাপটে স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় ৭১-এর ঐক্য এবং সংহতির কি হাল হয়েছিলো তা খালেদ হত্যাকাণ্ড থেকে বেশ পরিষ্কার বোঝা যায়। এদিকে ক্যান্টনমেন্টের দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। সেনাবাহিনীতে জিয়ার জনপ্রিয়তা ছিল অন্য যেকারো চেয়ে বেশি। জিয়া-অনুগত সেনারা অভ্যুত্থানে অংশ নেন এবং একই সাথে জনসাধারনের একটি বড় অংশ এই অভ্যুত্থানের সাথে সংহতি জানান। এই পর্যায়ে ৭ই নভেম্বরের ঘটনাবলী প্রকৃত অর্থেই একটি সিপাহি-জনতার বিপ্লবের চেহারা ধারন করে। জিয়া মুক্ত হন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্যপটে ৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের একক নেতৃত্বের অবস্থানে চলে যান। ৭১-এর পর আরও একবার ইতিহাসের দায় মেটাতেই যেন জিয়ার এই উত্থান। যুক্তির বিচারে বলা যায় এদেশের মানুষের কাছে এবং দিকভ্রান্ত সেনাবাহিনীতে সেই সময়ে জিয়ার চেয়ে গ্রহনযোগ্য আর কেউ ছিলেন না। জিয়ার মুক্তিতে তাহের অনুগত সৈনিকদের ভুমিকা ছিল। এটিও প্রতিষ্ঠিত সত্য যে মুক্তির পর জিয়া তাহেরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সেনাবাহিনীর ঠিক কোন দলটি জিয়াকে মুক্ত করেন তা নিয়ে কিছুটা বিতর্কের অবকাশ আছে। এই বিতর্ক এই প্রবন্ধটির জন্য প্রাসঙ্গিক না হওয়ায় তার বিশ্লেষণে যেতে চাইনা। তাহের নিজে তার শুরু করা এই অভ্যুত্থানের অন্তর্গত দুর্বলতা - বাম রাজনিতির প্রতি আমজনতার বিরাগ এবং সেনাবাহিনীতে তার নিজের গ্রহণযোগ্যতার অভাব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। জিয়ার প্রতি বিশেষ কোন দুর্বলতা না থাকলেও তাহের জানতেন জিয়ার সহযোগিতা ছাড়া উদ্দেশ্য পুরন হবার নয়। জিয়ার কাঁধে বন্দুক রেখে নয়, বরং তাহেরের ভাষায় “He will be under my foot”, অর্থাৎ জিয়াকে পায়ের নিচে রেখে তাহের তার রাজনৈতিক বিশ্বাসকে দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন। যে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তাহের প্রেমিকেরা সবসময় এড়িয়ে যান তা হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করে বাম শাসন চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার তাহের কোথায় পেলেন? এই প্রশ্নের ফয়সালা ছাড়া তাহেরের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন অসম্ভব।
সেনাবাহিনীতে জিয়ার জনপ্রিয়তা এবং সাধারণ জনতার মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা জিয়াকে ক্ষমতার কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত করে। জিয়া না বিশ্বাস করতেন বাম ধারায় না তার সমর্থন ছিল তাহেরের স্বপ্নের অপ্রচলিত ধারার সেনা কাঠামোতে। তাহের এবং জিয়ার সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। অভ্যুত্থানকালে রক্তপাত এবং খালেদের মৃত্যু তাহেরের দুর্বল অবস্থানকে আরও দুর্বল করে ফেলে। তাহের যা শুরু করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তা তার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। খালেদের মতই তাহের ব্যর্থ হন। দুজনকেই ব্যর্থতার জন্য দিতে হয় উচ্চমূল্য। জিয়া এবং সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশের ইচ্ছায় তাহেরকে সামরিক আদালতের কাঠগড়ায় দাড়াতে হয়। এর ফলশ্রুতিতে তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
তাহেরের বিচার প্রক্রিয়া ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সুত্র থেকে জানা যায় তাহের অত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি। বিচার কার্যক্রমে সকল বিধিবিধান যথারীতি পালন করা হয়নি। যদিও বিচার চলাকালীন সময়ে, এমনকি দণ্ড কার্যকর করবার সময়েও জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন না, তবুও একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ৭ই নভেম্বেরের পর থেকে ক্ষমতার চাবিটি প্রধানত জিয়ার হাতেই ছিল। তাহেরের উপর যে বিচারিক অবিচার হয়েছে তার দায় জিয়া এড়াতে পারেন না। সে সময়কার বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতেন, তাহেরকে জীবিত রেখে কোনও অবস্থাতেই সেনা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় এবং দেশ ও সেনাবাহিনীর স্বার্থে বিষয়টির দ্রুত সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। বিচার চলাকালীন সময়ে ৭ই নভেম্বরে ঘটে যাওয়া রক্তপাতের দায় তাহের অস্বীকার করেন। তাহেরের এই অবস্থান যুক্তিগ্রাহ্য নয়। সকল সেনা অভ্যুত্থানে রক্তপাতের আশংকা থাকে এবং এর দায়দায়িত্ব নেতৃত্বকেই নিতে হয়। একথাটি আরও সত্য হয়ে দাড়ায় ব্যর্থ অভ্যুত্থানের বেলায়। ইতিহাসে এর কোনও ব্যাতিক্রম দেখা যায় না বললেই চলে। জিয়াকে “পায়ের তলায়” রেখে তাহের তার রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করতে চেয়েছেন। জিয়া “পায়ের তলায়” থাকেননি, দাবার ছক উল্টে যায় এবং তার মাশুল জীবন দিয়ে তাহেরকে মেটাতে হয়।
তাহের ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সফল সেক্টর কমান্ডার, এবং একজন স্বপ্নচারী বাম রাজনিতিক। স্বপ্ন এবং বাস্তবতার ভেতর বিস্তর ফারাক থাকলে অনেক সময় করুন পরিনতি ভোগ করতে হয়। তাহেরের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটে ছিল। ৭ই নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রকৃত অর্থে এর পর থেকেই হোঁচট খেতে খেতে দুর্বল হলেও একটি গনতান্ত্রিক ধারার দিকে দেশ এগিয়ে যায়। তাহেরের দুর্ভাগ্য তার হঠকারি রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূর্ণ হয়নি। পক্ষান্তরে এটা বাংলাদেশের জন্য সৌভাগ্য। জনভিত্তিহিন বাম-বিপ্লবের জন্য বাংলাদেশ কখনোই উপযুক্ত ছিলনা। বলা যায় তাহের ব্যর্থ হওয়াতে বাংলাদেশ ভিন্ন মোড়কের আরেকটি বাকশালের হাত থেকে রেহাই পায়।
এই লেখাটিতে বারংবার বামপন্থীদের জনবিচ্ছিন্নতার কথা বলা হয়েছে। একথা অনস্বীকার্য যে মুজিব শাসন আমলে জাসদ এবং গণবাহিনী বিরোধী ধারার সৃষ্টি করে। এরপরেও খুব জোর দিয়েই বলা যায় ধারাগুলি মোটাদাগে জনসমর্থনহীন ছিল। এর জলন্ত প্রমান স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের ফলাফল। বামধারার দলগুলির ফলাফল রীতিমতো করুনার উদ্রেক করে। এখানে একথাও বলে নেওয়া ভালো তাহেরের বিচার চলাকালীন সময়ে দেশের ভেতর থেকে নিজ দল ছাড়া কোনও পক্ষ থেকে কোনও ধরনের প্রতিবাদ এমনকি কোনও ধরনের অভিযোগও উত্থাপিত হয়নি। মজার ব্যাপার হলে তাহের সমর্থক জাসদ কর্মীদের বিচার চলাকালীন একটি স্লোগান ছিল “রুখো বাকশাল, হটাও জিয়া – টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া”। এখানে দুটি কৌতুকপ্রদ দিক আছে। প্রথমটি হচ্ছে তাহের যে ধরনের রাষ্ট্রব্যাবস্থার স্বপ্ন দেখতেন তা বাকশালের চেয়ে খুব উন্নততর কিছু ছিলনা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাহেরভক্ত আওয়ামীরা এমনকি আজকের জাসদ নেতৃত্ব একথা বেমালুম চেপে যায় – তাহেরের সংগ্রামের একটি প্রধান দিক ছিল বাকশালি অপশাসনের বিরুদ্ধে। তাহের বন্দনাকারিদের এই মতলববাজি বাংলাদেশের নোংরা রাজনৈতিক কুটচালের একটি বড় উদাহরন। পুঁজিবাদী আওয়ামী এবং (তথাকথিত) সমাজবাদীরা অতি সহজে একই সুরে গান ধরে শুধুমাত্র জিয়া বিরোধী প্রচারনার স্বার্থে। ইতিহাস এবং মতাদর্শ চুলোয় যাক। জাতি হিসেবে আমরা অপরিপক্ব। নির্মোহ ইতিহাস চর্চা এদেশে শেকড় গাড়তে পারেনি। তাই ইতিহাসে তাহের এবং জিয়ার অবস্থান এখনো অনির্ণেয়। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এবং নিজ নিজ রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে আমরা সত্যমিথ্যা যাচাই করি। বিরোধী মত যৌক্তিক হলেও তা বিবেচনা করতে চাইনা।
সামরিক শাসন কখনো কাঙ্খিত নয়। জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরু একজন সামরিক শাসক হিসেবে। এখানে মনে রাখা দরকার কোনও গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যাবস্থার ভেতরে থেকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়া ক্ষমতা দখল করেন নি। এমনকি যে অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে জিয়া ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন, সেখানেও তার নিজের কোনও বড় ভুমিকা ছিলনা। পারিপার্শ্বিকতা এবং দেশের সামগ্রিক অবস্থার প্রেক্ষিতে জিয়াকে নেতৃত্ব গ্রহন করতে হয়। একথা স্বীকার করতে হবে জিয়া ছিলেন এদেশে সত্যিকার অর্থে বহুদলীয় গনতন্ত্রের সূচনাকারী। বাংলাদেশের অন্যান্য শাসকের শাসনামলের মত জিয়ার শাসন আমলেও ভুলত্রুটি হয়েছে কিন্তু দেশের প্রতি জিয়ার ভালবাসা এবং মানুষের হৃদয়ে তার যে স্থান তা প্রশ্নাতীত। একজন রাজনিতিবিদের সবচেয়ে বড় যে অর্জনগুলি রয়েছে তার ভেতর গনমানুষের ভালবাসা পাওয়াটা অন্যতম। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকে জিয়ার বিদায়। এর তাৎপর্য বুঝবার দরকার আছে। আজ দেশ জুড়ে জিয়া বিরোধী যে প্রচারনা চলছে তার উপযুক্ত জবাব ইতিহাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। দুঃখের বিষয় এই বিরামহিন অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী ধারার বুদ্ধিজীবীরা কার্যকর কোনও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছেন না।
(এই লেখাটি লিখতে দেশবিদেশ থেকে প্রকাশিত বহু প্রবন্ধ, বই, এবং ইন্টারনেট-এ প্রাপ্ত তথ্যাবলির সাহায্য নেওয়া হয়েছে, লেখক সকলের নিকট কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ)
©somewhere in net ltd.