নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জীবন ও জগত

বিশ্বামিত্র

পিএইচডি গবেষক, সেন্টার ফর আস্ট্রোফিজিক্স, সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।

বিশ্বামিত্র › বিস্তারিত পোস্টঃ

মানমন্দির

১২ ই জুন, ২০১২ রাত ৯:৪০

মানমন্দির বলতে এমন এক স্থান কে বোঝায় যেখানে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এর জন্য দুরবীন এবং আনুষাঙ্গিক উপকরণ থাকে। মুলতঃ দুরবীন এর ক্ষমতার উপর মানমন্দির তার জনপ্রিয়তা বা খ্যাতি লাভ করে। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ সালে মিসরে স্থাপিত অবেলিস্ক আর সৌরঘড়ি গুলোকে সবচেয়ে প্রাচীন মানমন্দির হিসেবে ধরা হয়। আজ আমরা দেখি লোকালয় থেকে বহু দূরে মানমন্দির নির্মিত হচ্ছে আর সেখানে থাকছে শক্তিশালী দুরবীন। এমনকি মহাকাশেও প্রেরন করা হয়েছে দুরবীন।



অতি প্রাচীন কাল থেকে সূর্য, চাঁদ, রাতের আকাশের তারা, গ্রহ- এদের গতিবিধি মানুষের নজরে এসেছে। প্রথমদিকে এগুলোকে দেব-দেবতা বলে পুজো করলেও পরে মানুষ দেখলো যে এদের গতিবিধির সাথে পৃথিবীর অনেক ঘটনার সংযোগ রয়েছে। যেমনঃ দিন-রাত্রি, ঋতু পরিবর্তন ইত্যাদি। ফলে আকাশ পর্যবেক্ষণ একটি জরুরী বিষয় হয়ে দাড়ালো, কেননা এর ফলে মানুষ অনেক কিছুর পূর্বাভাষ দিতে পারতো এবং প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড পরিকল্পনা করা অনেক সহজ হল। এর জন্য প্রয়োজন হল নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বিভিন্ন উপায়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ। আর এ থেকেই মানমন্দির এর যাত্রা শুরু। প্রাচীন মিশর, মায়া সভ্যতা, চৈনিক সভ্যতা, ভারতীয় সভ্যতা, গ্রীক সভ্যতা – সর্বত্র মানমন্দিরে আকাশ পর্যবেক্ষণ এর নিদর্শন পাওয়া যায়।



মানমন্দিরে নানা রকম উপকরণ থাকে। প্রাচীনকালে প্রধানত সূর্যের গতিবিধি পরিমাপ করা হত দৈনিক ও বাৎসরিক সময় পরিমাপ এর জন্য। ফলে কৌনিক পরিমাপ এর উপকরণ থাকতো সেখানে। যেমনঃ সৌরঘড়ি, ম্যুরাল কোয়াড্রান্ট, সেক্সট্যান্ট ইত্যাদি। ভারতের যন্ত্র-মন্তর মানমন্দির এর একটি উদাহরণ।



গ্রীক সভ্যতা থেকেই সর্বপ্রথম মহাকাশ সম্পর্কে যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা শুরু হয়। এসময় আকাশ পর্যবেক্ষণ শুধু সময় গণনার জন্যই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সমগ্র মহাবিশ্বের প্রকৃতি নিয়েও কাজ শুরু হয়। টলেমির ভূকেন্দ্রিক বিশ্ব থেকে কোপার্নিকাসের সৌরকেন্দ্রিক বিশ্বের প্রবর্তন ঘটে। এরপর টাইকো ব্রাহে তার ইউরানিবর্গ মানমন্দিরে যে গবেষনা করেন জ্যোতির্বিজ্ঞান এর জগতে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর উপর ভিত্তি করেই কেপলার সৌরজগত সম্পর্কে তার সূত্রাবলী প্রদান করেন।



সতেরশ শতকের শুরুতে গ্যালিলিও প্রতিসরণ দুরবীন উদ্ভাবন করেন আর এর ফলে আমাদের জ্ঞান এর জগতে বিপ্লব ঘটে যায়। এক শতাব্দী পরে নিউটন উদ্ভাবন করেন প্রতিফলন দুরবীন। ক্রমশ বড় আকারের দুরবীন তৈরি হতে লাগল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানমন্দির তৈরি হতে লাগল এবং দুরবীন দিয়ে মহাকাশ গবেষনা চলতে লাগল। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য মানমন্দির হল ব্রিটেন এর গ্রীনউইচ এ রাজকীয় মানমন্দির। এই মানমন্দির থেকে তারাদের অবস্থান সুনিপুন ভাবে পরিমাপ করা হত যা সমুদ্র পথে দিক নির্দেশনা দিতে সাহায্য করত।



মহাকাশের আরও গভীরে পর্যবেক্ষণ এর জন্য মানমন্দির গুলো লোকালয় থেকে অনেক দূরে স্থাপিত হতে লাগল যেন আলোক দুষন না ঘটে। এছাড়া অনেক উচু পাহাড়ের উপর স্থাপিত হল যার ফলে আবহমণ্ডলের শোষণ কম হয়। উনবিংশ শতক থেকেই অনেক বড় আকারের দুরবীন, ক্যামেরা এবং বর্ণালী ধারক যন্ত্র তৈরি হতে লাগল। মানমন্দিরে বিজ্ঞানীদের বসবাস এর জন্য সব ধরনের সুবিধা প্রদান করা হল। আবিস্কৃত হতে লাগল অনেক নতুন নতুন মহাজাগতিক বস্ত।



ক্যালিফোর্নিয়া এর উইলসন পাহাড়ের মানমন্দিরে ১০০ ইঞ্চি দুরবীন ব্যবহার করে এডউইন হাবল আবিষ্কার করলেন অনেক দূরবর্তী গ্যালাক্সী আর দেখতে পেলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল। পরবর্তীতে পালমার মানমন্দিরে মহাকাশের একটি ব্যাপক জরীপ করা হল যা সে সময় মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অনেক সমৃদ্ধ করেছে।



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞান এ অনেক উন্নতি সাধিত হয়। বিভিন্ন স্থানে বেতার মানমন্দির ও দুরবীন স্থাপিত হয়। উল্লেখযোগ্য হল ব্রিটেন এ জডরেল ব্যাংক মানমন্দির, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বেতার মানমন্দির, সুইডেন এর অনসালা মহাকাশ মানমন্দির ইত্যাদি। বেতার দুরবীন ব্যবহার করে পালসার এবং কোয়েসার এর মতো বস্ত আবিস্কৃত হল। এছাড়া বেল পরীক্ষাগার এর বেতার এন্টেনা দিয়ে অনেকটা কাকতালীয় ভাবে মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন আবিস্কৃত হয় যা পটভূমি বিকিরণ নামে পরিচিত। বর্তমানে হল্যান্ড এ লোফার, অস্ট্রেলিয়া এ আটকা, এবং ভারতের জিএমারটি বেতার মানমন্দির বেশ সক্রিয় ভুমিকা পালন করছে। অচিরেই শুরু হবে এসকেএ বেতার মানমন্দির এর নির্মাণ কার্যক্রম। এই দুরবীন মহাবিশ্বের অতি আদি অবস্থার চিত্র পাওয়া আমাদেরকে দেখাবে।



দৃশ্যমান আর বেতার ছাড়াও পৃথিবী থেকে অবলোহিত আর মিলিমিটার তরঙ্গে পর্যবেক্ষণ হচ্ছে। এর জন্য বিশেষ স্থানে মানমন্দির তৈরি করা হচ্ছে। এরকম একটি জায়গা হল চিলি এর আন্দিজ পর্বতমালা। পৃথিবীর অনেক শক্তিশালী দুরবীন সেখানে বিভিন্ন মানমন্দিরে অবস্থান করছে। উল্লেখযোগ্য হল ইউরোপের দক্ষিন মানমন্দির যেখানে আছে ভিএলটি, কার্নেগী মানমন্দির, আর সম্প্রতি সম্পন্ন আলমা। হাওহাই দ্বীপের কেক মানমন্দির বেশ জনপ্রিয়। সেখানে দুটো একই রকম দুরবীন আছে এবং ফলে অনেক বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে অ্যাপাচি পয়েন্ট মানমন্দির এর স্লোয়ান দুরবীন আর অস্ট্রেলিয়ার সাইডিং স্প্রিং এর মানমন্দির মহাকাশের বিস্তারিত যে জরীপ চালিয়েছে তার ফলে মহাবিশ্বের ব্যাপক কাঠামো সম্পর্কে আমরা স্পষ্ট ছবি দেখতে পাই।



পৃথিবীর বাইরেও আছে মানমন্দির যেগুলো মুলত একেকটি দুরবীন। যেমন হাবল দুরবীন যেটি মহাবিশ্ব এর অনেক অজানা রহস্য উম্মোচন করেছে। এছাড়া রয়েছে অবলোহিত আলোর জন্য স্পিটজার, গামা রশ্মির জন্য কম্পটন, এক্স-রশ্মির জন্য চান্দ্রা ইত্যাদি।



পৃথিবীতে মানমন্দির এ কাজ করা জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিশেবে একটি সৌভাগ্য। লোকালয় থেকে অনেক দূরে রাতের পর রাত মহাকাশ অনুসন্ধান সত্যিই রোমাঞ্চকর। আমার সুযোগ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত ম্যাকডোনাল্ড মানমন্দির এ কাজ করার। সেখানে পাঁচ রাত্র আমি ছায়াপথ এর কিছু তারার বর্ণালী গ্রহণ করি ২.১ মিটার দুরবীন দিয়ে আমার গবেষনার জন্য। আবাসন ও খাবার এর সুব্যাবস্থা ছাড়াও সেখানে সার্বক্ষণিক থাকেন স্টাফ যারা যেকোনো সমস্যা হলে সহায়তা করেন।





চিত্রঃ ম্যাকডোনাল্ড মানমন্দির।



মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.