নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ভারনার খণ্ডচিত্র

এক চিলতে রোদ্দুর

আমি আমার না বলা কথা আজ বলে দিতে চাই।

এক চিলতে রোদ্দুর › বিস্তারিত পোস্টঃ

ধারাবাহিক: পর্ব -৩ “এসএম হলের ডায়েরি”

০৫ ই জুন, ২০১৪ সকাল ১১:৫৩

আমার রুমমেট ও আমি

২০/০২/২০১০



আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা আট জন। তবে কোন পরিবার প্রধান নেই। তবে হলে লীগপ্রধান বা দলপ্রধান থাকে। তাদের মধ্যে আবার দলাদলিও আছে। আমারা দু’জন করে জড়োসড়ো হয়ে ঘুমাই। যে কেউ দেখলে ভাববে কী ব›ধুত্ব, ভালবাসা এদের মাঝে। অথচ ঘটনা বিপরীত। গায়ে গায়ে জোড়া করে কবুতরের মত ঘুমাই আমরা। আর আমাদের পাহারা দেয়; আমাদের রক্তকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা রক্তচোষা ছারপোকা। রুমমেটদের মন-মানসিকতা সব সময় রুহআফজার মত মধুর থাকে না। সামান্য গোসলের গামছা নিয়েও গলা গরম হয়ে যায়।



রাহাত ভাই, সাংবাদিকতা বিভাগে ‘সংবাদ’ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেন। সংবাদ সংগ্রহের চেয়ে উনি ওনার প্রেমিকা মনিকার সংবাদ রাখতেই বেশি ব্যস্ত। প্রতি ঘন্টার সংবাদের মত উনি সর্বশেষ সংবাদ পান যে, উনার প্রেমের মনিকা টিএসসি’র সামনে দাঁড়ানো। রাহাত ভাই আদর করে মনি বলে ডাকে। ফারিহা আরেফিন মনিকা, শুধু একজনের কাছে মনি। রাহাত ভাইয়ের মোবাইলে মনোয়ার ভাই নামে সেভ করা। যাতে আমরা এতক্ষন কার সাথে কথা বললেন জিজ্ঞেস করলে; ডায়াল ও রিসিভ কল লিস্টে দেখাতে পারেন, উনি উনার ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই দৈনিক সমকাল এর জনপ্রিয় রির্পোটার এর সঙ্গে কথা বলছেন। একদিন অবশ্য রাহাত ভাই ধরা খেলেন। জুনিয়রের কাছে এ লজ্জা তখন কোথায় রাখেন! রোজকার মত রাহাত ভাই মনিকা আপুর সাথে কথা বলে মোবাইল রেখে বাথরুমে গেলেন। হঠাৎ মোবাইলে মেসেজ টোন বেজে ওঠল, আমি স্বল্প পরিসরে অল্প লাইনে লেখা মেসেজটি পড়লাম।

i miss u .i kiss u . বুঝার আর বাকি রইল না, রাহাত ভাই কতগুলি কিস মনোয়ার ভাইকে করে। মনিকা আপুর মন খুব ভাল, সাথে মানসিকতাও। মন দিয়ে উনি রাহাত ভাইকে ভালবাসেন। যদিও সে হলে থাকে না, থাকে মিরপুরে। মিরপুর থেকে এসএম হলের দূরত্ব দশ মাইল হলেও তাদের মত মনের দূরত্ব এত সূক্ষè যে মাপা যায় না। রাহাত ভাইয়ের লেখার হাত খুবই ভাল। যা লেখে তাই যেন সোনা ফলে। ক্লাসের সবচেয়ে ক্লাসিক্যাল নোট রাহাত ভাই মনিকা আপু ছাড়া কারো সাথে শেয়ার করেন না। এই কারণে মনিকা আপু তার ব্যাপক ভক্ত। মেয়েটিও মেধাবী রাহাত ভাই বুঝেন। হলের পাতলা ডালে পানির পরিমাণ মনিকা আপু জানে। তাই মাঝে মাঝে সবজি নুডুলস বাসা থেকে তৈরী করে রাহাত ভাইয়ের জন্য নিয়ে আসেন। শহিদুলের দোকানে বসে সেঁধে সেঁধে খাওয়ান, যেন কচি বাবুকে কেউ খাওয়াচ্ছে। রাহাত ভাইয়ের সাথে চোখাচোখি হতেই উনি লজ্জায় লাল হয়ে যায়। রাহাত ভাই নুডুলস গলা দিয়ে গিলতে চাইলেও আর খাওয়া হয় না। আমরা রুম থেকে দেখি আর হাসি।



মিনার ভাইকে যে কীভাবে বর্ণনা করি বুঝতে পারতেছিনা। ঘড়ির কাঁটায় তার জীবন চলে। আটটা মানে ৮.০০। তাঁর পরিচয়ে গর্ব করার মত গৌরব তাঁর আছে। তিনি একজন জাতীয় দৈনিক এর কলাম লেখক। একজন কলামিস্টের রুমমেট হিসেবে মাঝে মাঝে আমি বন্ধু মহলে গলাবাজি করার সুযোগ পেতাম। বন্ধুদের জোর গলায় বলতাম আজকের দৈনিক পত্রিকার কলামটি কিন্তু আমার রুমমেটের লেখা। বন্ধুরা আমাকে কলাম লেখকের রুমমেট হিসেবে আলাদাভাবে দেখত। মিনার ভাই ফেসবুকের পোকা। ফেসবুকে উনার দুই হাজারের উপরে ফ্রেন্ড। মাঝে মাঝেই আমরা রুমমেটরা মিনার ভাইয়ের একাউন্টে লগইন করে, অতিশয় চেহারাবতী মেয়েদের সাথে চ্যাট করতাম। এ নিয়ে বিভিন্ন মজার কান্ড ঘটত। প্রায়ই দেখা যেত মিনার ভাইয়ের পরিচিত কোন মেয়েকে হায় লিখতেই প্রতিউত্তর আসতো, হায় মিনার। কবে দেখা করবে বলতেই মেয়েটি বলে ওঠল, সকালে না তোমার সাথে দেখা হল। তখন আমরা আর যাই কোথায়? মিনার ভাই ফেসবুকের জনপ্রিয় চ্যাটার। সুন্দরী কোন মেয়েকে এ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠালে দেখি ওনার সাথে মিউচুয়াল ফ্রেন্ড। মিনার ভাই নামাযী, উনি রাত বারটার পর ঘুমিয়ে পড়েন। আমরা রুমে কথা আর গল্পের বাজার বসাই, উনার ঘুমের কোন সমস্যা হয় না। মিনার ভাই বড় সাংবাদিক হবেন, কলম দিয়ে খুঁচিয়ে অন্যায় কে আহত করবেন এরকম স্বপ্ন দেখি আমরা।



বাণিজ্যি বিভাগের মেধাবী ছাত্র মোনায়েম। সবসময় সাদা দু’পাটি দাঁতের বিজ্ঞাপন করে সে। মুচকি হাসি সবসময় লেগেই থাকে তার দু’ঠোঁটে। ফেসবুকের ম্যারিস্যাল স্টাটাসে লেখা সিঙ্গেল। রাহাত ভাইয়ের প্রেম করা দেখে তারও প্রেম করতে মন চায়। কিন্তু তৃতীয় বর্ষ শেষ হলেও, তার প্রেমের সূচনা এখনো বাকিই রয়ে গেছে। কিছুদিন আগে সে ল্যাপটপ কিনেছে। সবসময় তাকে ইন্টারনেটে পাওয়া বলে মিনার ভাই ওর নাম দিয়েছে ‘অনলাইন মোনায়েম’। ল্যাপটপ কেনার পেছনে যে কারণ আমাকে সেদিন বলল- ফেসবুকে যদি একটা প্রেম হয় তবে মন্দ না। টিএসসি’তে ফ্রি নেট ব্রাউজ করা যায়। মোনায়েম সকালে ঘুম থেকে উঠে টিএসসি’তে যায় ল্যাপটপ নিয়ে। ফেসবুকে তার হাজারো ফ্রেন্ড, কিন্তু কোন মনের মানুষ নেই। কী যে আফসোস মোনায়েমের তা বলে বুঝানো যাবে না। একটা প্রেম তার করা লাগবেই। বন্ধুরা টিএসসি, ফুলার রোড, ভিসি চত্বরে বসে প্রেম করে, মোনায়েমের আর সহ্য হয় না। রাতে আমার কাছে বায়না ধরে, আমার কোন এক ছাত্রীর সাথে আমি তাকে যেন প্রেম করিয়ে দেই। তাই কী হয়। আশা করছি আসছে ভালবাসা দিবস তার যেন একা না কাটে।



একজন সংস্কৃতিবান পুরুষের প্রতিমূর্তি রাজ ভাই। নজরুল আর রবীন্দ্রসমগ্র সারি করে সাজানো রাজ ভাইয়ের পড়ার টেবিলে। সকালে ঘুম থেকে ওঠে উনি নিয়মিত নজরুল সংগীত বা রবীন্দ্রসংগীত শোনেন। ভারতীয় বাংলা গানও রাজ ভাই শুনেন। আশা ভোঁসলের গাওয়া-“খুব চেনা চেনা লাগছে তোমাকে” এখনও আমার কানে বাজে। জাতীয় জাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরি, শিল্পকলা একাডেমীতে কবে, কখন কোন সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান, বইমেলা, মোড়ক উন্মোচন বা প্রদর্শনী আছে সব কিছু রাজ ভাই ডায়েরিতে লিখে রাখেন। রাজ ভাই আমার দেখা হল জীবনের সবচেয়ে সাদা মনের মানুষ। আমাদের রুমের কারো জরুরী মুহূর্তে টাকার প্রয়োজন হলে রাজ ভাই শেষ ভরসা। নিজের হাতে টাকা না থাকলে উনি ধার করে এনে টাকা দেয়। তাকে আমি আমার জীবনের আদর্শ মানি। রাজ ভাই অনেক বড় হবেন এই দোয়াই করি।



রুমমেটদের নিয়ে লিখছি। আমিও তো রুমের একজন। আমাকে নিয়ে লেখার কিছু নাই, যা আছে তা পাগলামি ছাড়া কিছু নয়। আমার বাবার মতে, খামখেয়ালিপনা। সেই ছোট বেলা থেকে আমার মধ্যে অতিচঞ্চলতা আমাকে ঘরে থাকতে দেয়নি। ঘরবিমুখ আমি একদিন সত্যিই ঘরছাড়া হলাম। ঢাকায় এলাম পড়াশোনা করতে। আদমজী স্কুলে ভর্তি হলাম নবম শ্রেণীতে। আমি রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পের নায়ক ফটিক হলাম। মামার বাসায় থাকতাম। মামা যেন বিশ্বম্ভর বাবু আর মামী ঠিক যেন বিশ্বম্ভর বাবুর স্ত্রী। আমার মনে আছে আমি যতবার ছুটি গল্পটি পড়েছি তত বারই কেঁদেছি। একবার সত্যি সত্যি বলে ফেললাম মা আমার ছুটি হয়েছে, আমি বাড়ি যাব (তখন আমি অসুস্থ)। ঢাকা আমার ভাল লাগে না। বাড়ি যাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকতাম। শহরে বড় খেলার মাঠ নেই, সাঁতার কাটার পুকুর নেই। সবচেয়ে বড় কথা আমার বাইসাইকেলটি নাই। বাবাকে বললাম সাইকেল কিনে দিতে। উনি ১১০% নারাজ। শহরে কী গ্রামের মত ফাঁকা রাস্তা আছে, তুমি এ্যাক্সিডেন্ট করবে এরকম সাত-সতের বোঝাল আমাকে। অবশেষে সেই সুদিন এল আমার। হোস্টেলের বারান্দায় আমার প্রিয় সাইকেলটি ঠায় দাঁড়ানো। আমি তখন সাইকেল হিরো। সাইকেলটি খুব দামি ছিল তা নয়। সাইকেলটি আমার মনে ধরেছিল। শহুরে জীবনে সাইকেলটি ছিল আমার প্রধান সঙ্গী। তখন আদমজীতে মর্নিং শিফটে ক্লাস হত। খুব সকালে সাইকেল নিয়ে বের হতাম যখন শহরের মানুষের ব্যস্ততা বেড়ে ওঠেনি। সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা রাস্তা ঝাড় দিতে ব্যস্ত। রাস্তায় সাইকেল চালাতাম একমনে। কাজীপাড়া থেকে কচুক্ষেত বাজার পৌঁছতাম একটানে। মাঝখানে কোন বিরতি দিতাম না। কচুক্ষেত বাজার পার হয়ে একদমে স্কুলের সামনে। তখনো সহপাঠীদের আসতে ঘন্টা খানেক বাকি। ঢাকার বন্ধুরা খুব উৎসাহ দেখাত সাইকেলটা একটু চালানোর জন্য। আমি দিতাম না, আছড়ে ফেলে নষ্ট করে এই ভয়ে। বন্ধুরা খুব অভিমান করত। কেউ কেউ বলত ‘সাইকেল পাগল’।

প্রিয় সে সাইকেল হারানোর ছয় বছর পূর্ণ হল এ বছর। ছয় বছর আগে লাল রংয়ের সে সাইকেলটি এসেছিল আমার সঙ্গীবিহীন জীবনে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। সাইকেলটিকে আজ খুব মিস করছি। সাইকেল হারাতে দেখে বন্ধুরা অনেক খুশি। মনের তখনকার অবস্থা কী করুণ তা কেউ বুঝতে চাইল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর আজ শেষ বর্ষের কাছাকাছি এসে কিছুদিন আগে লাল রংয়ের একখানা সাইকেল কিনলাম, কিন্তু স্কুল জীবনের সে আনন্দটা পাই না।

লেখাটি শেষ করব এমন সময় আমার রুমের সামানে বেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ। রুমের বাইরে এসে দেখি আমার রুমমেট সাইকেল কিনে এনেছে ঠিক আমার হারানো সাইকেলটির মডেলের। অতি আবেগী মন আমাকে কাঁদায় এই ভয়ে ওয়াশ রুমে যেয়ে মুখ ধোই।



১ পর্ব:

Click This Link

২য় পর্ব:

Click This Link



মন্তব্য ০ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.