নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ফেসবুকে আমি - রিয়াদুল রিয়াদ (শেষ রাতের আঁধার)

রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার )

কিছু মানুষ অন্য মানুষকে মুগ্ধ করার অসীম ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। আর কিছু মানুষের ভিতর এই ক্ষমতা কখনই আসে না। আমি দ্বিতীয় দলের মানুষ। কাউকে মুগ্ধ করার মত কিছু কখনই করতে পারি না। কেউ অনেক সুন্দর গান গায়, আমি শুধু শুনে যাই। কেউ অনেক সুন্দর নাচে, আমি শুধু হাত তালি দিয়ে যাই। কেউ অনেক সুন্দর লেখে, আমি শুধু ভেবে যাই, কী করে এত ভালো লেখে কেউ? আমিও লিখি। তবে তা কাউকে মুগ্ধ করার মত কিছু না। আমার লেখায় আমার ভালোবাসা ছাড়া কিছুই নেই। পড়াশুনা শেষ, বুটেক্স থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হয়ে চাকরি, বিয়ে, পেশা পরিবর্তন সব হয়েছে। লেখালেখির ধারাবাহিকতায় চারখানা উপন্যাস অমর একুশে বইমেলায় বেরিয়েছে। টুকরো ছায়া টুকরো মায়া (২০১৫) – সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার । একা আলো বাঁকা বিষাদ (২০১৬) – সামাজিক উপন্যাস । মধ্য বৃত্ত (২০১৮) – ডিটেকটিভ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার । অভিসন্ধি (২০২০) – ক্রাইম থ্রিলার । দেশটাকে ভালোবাসি অনেক। অনেক মায়া কাজ করে। মাঝে মাঝে ভাবি, সব বদলে দিতে পারতাম। স্বপ্নের মত না, বাস্তবের মত একটা দেশ গড়তে পারতাম …………………………

রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার ) › বিস্তারিত পোস্টঃ

ডিটেকটিভ, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার: মধ্য বৃত্ত (শেষ পর্ব)

২০ শে মার্চ, ২০২৪ রাত ২:২৯

পর্ব ১ পর্ব ২ পর্ব ৩ পর্ব ৪ পর্ব ৫ পর্ব ৬ পর্ব ৭
পর্ব ৮

১৩
ডিটেকটিভ অদিতের অফিস। বেশ সাজানো গোছানো। অদিত বসে আছে ওর নিজের চেয়ারে, সামনের দুটো চেয়ারে রাদিব আর কায়েস। অদিতের হাতে একটা কাগজ, সেখানে খুনের বিবরণী, খুনির নাম, খুনের কারণ, ফরেনসিক রিপোর্ট ও প্রফেসর সাজিদ এলাহীর রেখে যাওয়া ক্লুগুলোর সাথে মিলিয়ে খুনির সাথে মিল, সব কিছু পয়েন্ট আকারে লেখা।

অদিতের কপালে ভাঁজ, কাগজটা নিজের লেখা হলেও বার বার পড়ছে, দেখছে ভ্রু কুঁচকে, খেয়াল করছে প্রচণ্ড মনোযোগ নিয়ে। একজন মানুষকে খুনের দায়ে, অন্য একজনকে দোষী করা হচ্ছে, ব্যাপারটা একটু গুরুত্বের সাথে নেয়াটাই স্বাভাবিক। অদিত কাগজটা থেকে মনোযোগ সরিয়ে রাদিব আর কায়েসের দিকে তাকাল। নীরবতা ভেঙে বেশ গম্ভীরভাবে বলল, "আপনারাও আশা করি এতক্ষণে ভেবে বের করে ফেলেছেন আসল খুনি কে? আপনাদের চিন্তার সাথে, আমার এই কাগজে লেখা বিষয়গুলোর হুবহু মিল থাকার কথা। অন্তত আমি তাই ভাবি।”
অদিত থামে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলা শুরু করে, “আমাদের সন্দেহভাজনদের মধ্যেই খুনি ছিল,” যেন চারপাশে সব সন্দেহভাজনেরা চুপচাপ তার কথা শুনছে, অপেক্ষা করছে অদিতের চমকে দেয়া তদন্তের ফলাফল শোনার জন্য। “তার খুন করার যথেষ্ট কারণ ছিল এবং সব গুলো প্রমাণ এটাই প্রমাণ করে যে, সে খুনি।"

রাদিব আর কায়েস চুপ করে শুনে যায়। অদিত আসল কথায় চলে যায়, "আমাদের ফরেনসিক রিপোর্ট অনুসারে খুন করা ছুরিতে কোনো হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি। মানে খুনি খুব ঠান্ডা মাথার কেউ, সে খুব সাবধানে খুন করেছে কিন্তু হাতের ছাপ রাখেনি।“

নড়েচড়ে বসে রাদিব আর কায়েস। এখন অদিতের কথা শোনা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
“ফরেনসিক রিপোর্ট বলে, আঘাত গুলো করা হয়েছে ঘাড়ের পিছনে এবং যথেষ্ট শক্তিশালী। তার মানে আমাদের বুঝতে হবে, আমাদের খুনি অবশ্যই বলিষ্ঠ শরীরের অধিকারী এবং খুব শক্তিশালী কেউ। প্রফেসর সাজিদ এলাহীর লাশের পাশে একটা সিগারেটের ফিল্টার পাওয়া গেছে, মানে আমাদের খুনি স্মোকিং করেন। সিগারেটের ব্র্যান্ড বেনসন। ফরেনসিক রিপোর্ট অনুসারে ঘাড়ের পিছনের এই আঘাতগুলো প্রফেসর সাজিদ এলাহীর বাম থেকে ডান দিকের অ্যাঙ্গেলে। মানে খুনি পিছন থেকে আঘাত করলে অবশ্যই সে বাম হাতে শক্তিশালী। কারণ ডান হাতি কারও পক্ষে এভাবে পিছন দিক থেকে বাম থেকে ডানে এত শক্তিশালী আঘাত করা সম্ভব না।“
অদিত এবার থামল, কাগজটার দিকে আবার মনোযোগ দিয়ে কাগজের দিকে তাকিয়েই বলল, “আর সবচেয়ে বড় যে ক্লু, সেটা প্রফেসর সাজিদ এলাহী নিজেই রেখে গিয়েছেন। তার পাশে পড়ে থাকা, TOTAL PAID বইটা। আমরা খুব সাধারণ ভাবে ভেবে নিয়েছি, এটা টাকা পয়সা সংক্রান্ত কোনো বিষয় বা পুরাতন কোনো ঘটনার হিসাব মেলানো। আসলে ব্যাপারটা তা না।”

অদিত কায়েস আর রাদিবের দিকে মুখ তুলে বলল, “একটু ভালো করে খেয়াল করলে আমরা দেখব, প্রফেসর সাহেব মারা যাবার আগে, বইয়ের নামের উপর রক্ত দিয়ে হাত বুলিয়ে গিয়েছেন। তিনি হাত বুলিয়েছেন PAID এর উপর আর TOTAL এর T এর উপর। আমরা যদি তার হাত বুলানো বর্ণ গুলোর কথা চিন্তা করি, পাশাপাশি রাখি আমরা পাচ্ছি TPAID, এটা দ্বারা আসলে কিছুই বোঝায় না। কিন্তু আমরা যদি আর একটু চিন্তা করি, বর্ণগুলোকে শাফল করি। আমরা আমাদের সন্দেহভাজনদের মাঝে একজনের নাম পাই। TPAID শাফল করলে DIPTA, মানে দীপ্ত।"
রাদিব ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে রইল, অবাক হয়ে মুখ হাঁ হয়ে গেল কায়েসের। দুজনে কোনো কথা বলে না কিংবা কথা বলার মতন কিছু খুঁজে পায় না। একটা নিঃশ্বাস ফেলে অদিত বলে, " দীপ্ত সাহেব স্মোকিং করেন, ব্র্যান্ড বেনসন। কীভাবে বুঝলাম? আমরা যেদিন দীপ্ত সাহেবদের হলে যাই, দীপ্ত সাহেবের জবানবন্দি নেয়ার জন্য, তিনি গেস্ট রুমে ঢুকবার আগে সিগারেট খাচ্ছিলেন এবং রুমে ঢুকবার সময় দরজার কাছেই ফিল্টারের আগুন পা দিয়ে নিভিয়ে দিয়েছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বের হবার সময় আমি সিগারেটের ফিল্টার দেখেছি, সেটা বেনসনের ছিল। দীপ্ত সাহেব বাম হাতি। তিনি গেস্ট রুমের দরজা টান দিয়ে খুলে ঢোকার সময় বাম হাতে খুলেছেন, কোকের বোতল বাম হাতে নিয়েছেন, চেয়ার ছেড়ে উঠে চেয়ার জায়গা মত সাজিয়ে রাখার সময় বাম হাত ব্যবহার করেছেন, দরজা খুলে চলে যাবার সময়ও বাম হাত।“

কায়েস রাদিবের ভাবলেশহীন চেহারার দিকে তাকাল খানিক সময়ের জন্য, যেন নীরবে জানতে চাচ্ছে, অদিত যা খুঁজে বের করেছে, রাদিবও তা খুঁজে পেয়েছিল কিনা।
অদিত একতরফা কথা চালিয়ে যায়, “দীপ্ত সাহেব জিম করেন, আঘাত গুলো শক্তিশালী, মানে এটাও প্রমাণ করে আঘাত গুলো দীপ্ত সাহেবের করা। তার মানে সব গুলো ব্যাপার বলছে, দীপ্ত সাহেবই খুনি। এছাড়া নাহিন সাহেব, দীপ্ত সাহেবের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। যে প্রফেসর সাহেবের কারণে নাহিন সাহেব মারা গেলেন, তাকে তিনি এত সহজে ছেড়ে দিবেন এটা ভাবাটাও ভুল। তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি মঙ্গলবার মোতালেব প্লাজা এসেছিলেন। এটা বলার কারণ যদি কেউ তাকে হাতির পুলে দেখেও থাকে, তিনি এই মিথ্যা কথাটা বলে পার পেয়ে যেতে পারবেন। তিনি খুন করে, তার পরদিন ভোর বেলাতেই মানিকগঞ্জ চলে গিয়েছেন। তাছাড়া তিনি খুনের রাতে ঠিক কয়টা নাগাদ ফিরেছেন হলে, কেউ জানে না, তার কোনো অ্যালিবাই নেই। এমন একটা খুন করার জন্য প্রচণ্ড ঠান্ডা মাথার হওয়াটা জরুরি, দীপ্ত সাহেব অতি ঠাণ্ডা মাথার মানুষ, তার নার্ভ প্রচণ্ড শক্ত, ইন্টারোগেশনের কোনো পর্যায়েই সে ঘাবড়ে যাননি, যেন ব্যাপারগুলো খুব স্বাভাবিক, তার কাছে সব প্রশ্নের খুব সুন্দর এবং গোছানো উত্তর প্রস্তুত ছিল। তিনি খুব ঠান্ডা মাথায় সব সামলেছেন, অতি ঠান্ডা মাথায় প্রফেসর সাহেবকে খুন করেছেন।"

রাদিব নীরবতা ভেঙে, গলায় একটা উত্তেজনার ভাব এনে বলল, "ব্রিলিয়ান্ট, আপনি সত্যিই ব্রিলিয়ান্ট।"

অদিতের কথা শেষ হয়নি, সে চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি করে। কায়েস আর রাদিবের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, তারা জিজ্ঞাসু চোখে জানতে চাচ্ছে, বাকিদের কেনো সন্দের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হলো?

অদিত সে জিজ্ঞাসু চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে বলে যায়, "এখন আপনাদের ব্যাখ্যা দিচ্ছি বাকিদের কেন খুনি বলা যায় না। প্রথমে আসি, নাসির উদ্দিনের ব্যাপারে। ওনার তিন লাখ টাকা মেরে দিয়েছে, প্রফেসর সাজিদ এলাহীর বন্ধু। সাজিদ এলাহী নয়, মানে তাকে খুন করার প্রশ্ন আসে না।
মিসেস রেনুফা ইয়াসমিন, তিনি বাম হাত ব্যবহার করলেও, তিনি যখন আমার দিকে এশ-ট্রেটা ছুঁড়ে মারলেন, ওটা খুবই দুর্বল ছিল। তাই তার পক্ষে বাম হাত দিয়ে অত শক্তিশালী আঘাত করা সম্ভব নয়।
মেহেদী আশিক এসেছিলেন অল্প সময়ের জন্য বাসায়, এই সময়ের মধ্যে তার পক্ষে খুন করে জামা কাপড় চেঞ্জ করে আবার সাড়ে দশটার মধ্যে ধানমন্ডি পৌছানো সম্ভব ছিল না।
দিদার সাহেব, জ্বর থেকে মাত্র উঠেছেন, তার দ্বারাও অমন আঘাত করা সম্ভব না। তাছাড়া তিনি বাসায় ছিলেন এ ব্যাপারে তার অ্যালিবাই তার মা।
আরিফ সাহেব অল্পতে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারান, মিশু সাহেব অতি ভীতু, দুজনের কারও পক্ষেই এমন ঠান্ডা মাথার খুন অসম্ভব।
নাহিন মৃত।
বাকি থাকে শুধু দীপ্ত
ইন্সপেক্টর জুয়েল রানাকে ইনফর্ম করা হয়েছে, সে লোক নিয়ে গিয়েছে দীপ্তকে গ্রেফতার করতে।"
কথা বলা শেষ করে, একটা গভীর দম ছাড়ল অদিত। যেন বুকের উপর দিয়ে অনেক বড় একটা বোঝা নেমে গেল, কঠিন কোনো দলা পাকানো বস্তু, বাষ্প হয়ে উড়ে গেল।

রাদিব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে অদিতের দিকে। তার এত পরিশ্রম আর মেধাকে সত্যিই সাধুবাদ জানানো উচিৎ। কায়েস চেয়ার ছেড়ে উঠে বলল, "স্যার, আপনি এত ছোটো ছোটো বিষয়গুলো খেয়াল করলেন, আমরা কিছুই দেখলাম না, খেয়াল করলাম না, চিন্তাও করলাম না। আমি বুঝতেই পারছিলাম না কে খুনি।"
অদিত রাদিবের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি কিছু বলুন।"

রাদিব সহজ ও সহনীয় ভাষায় বলল, "আপনার আর আমার মনের অদ্ভুত মিল। আপনি যাকে খুনি ভাবেন, আমিও ঠিক তাকেই খুনি ভাবি। সে যাই হোক, খুনি গ্রেফতার হচ্ছে, এর ফাঁকে আমি একটা গল্প বলতে চাই, গল্প বলতে ইচ্ছা করছে একটা। এতক্ষণ খুনাখুনির আলাপে মাথা ভার হয়ে গিয়েছে, আপনার নিশ্চয় ব্যস্ততা নেই?"
অদিত খুশি মনে বলল, "অবশ্যই বলেন। রিলাক্স।"
অদিত চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসল।
রাদিব একটু গলা খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে নিল, গল্প বলার পূর্ব প্রস্তুতি। এরপর গল্পে চলে গেল সোজা, "এটা গ্রিক পুরাণের গল্প। গ্রিক পুরাণের নদীর দেবতা কিফিসসের ছেলে নার্সিসাস, একবার হরিণ শিকারে বের হয়। নানা জায়গা ঘুরে এক হরিণকে ধাওয়া করতে করতে হঠাৎ একোর নজরে পড়ে। একো কে? একো স্বর্গের রানী হেরাকে গল্প শোনাতো, তাকে নানা রকম গল্পে মগ্ন করে রেখ দিত। রানী হেরা যখন একোর গল্পে মগ্ন তখন স্বর্গ রাজ জিউস, অন্য দেবীদের নিয়ে আমোদ প্রমোদে ব্যস্ত। এই খবর জেনে যাবার পর রানী হেরা খুবই রাগ করেন একোর উপর, এই কারণে যে সে রানীকে গল্প বলে মগ্ন করে রাখে আর ওদিকে জিউস অন্য দেবীদের সাথে সময় কাটায়। রানী হেরা, একোর কথা বলার শক্তি কেড়ে নেন। তো সেই একোর নজরেই পড়ে নার্সিসাস। একো প্রেমে পড়ে যায় নার্সিসাসের। কিন্তু নার্সিসাস প্রচণ্ড আত্ম-অহংকারী, সে সরাসরি একোকে প্রত্যাখ্যান করে। এতে ক্ষুব্ধ হয় প্রতিশোধের দেবতা নেমেসিস। শাস্তি দেয় নার্সিসাসকে। নার্সিসাস যখন ক্লান্ত আর তৃষ্ণার্ত হয়ে এক ঝরনার কাছে আসলো, সেখানে পানিতে নিজের চেহারা দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেল। নিজের চেহারার প্রতি মায়া, মুগ্ধতা নার্সিসাসের আর কাটে না। সে বুঝতেই পারে না, এটা তার নিজের চেহারা। একসময় সে পানিতে ডুবে মরেই যায়।"
অদিত বলে উঠল, "বাহ, আপনি তো দেখি বেশ ভালো ভালো গল্পও জানেন। ইন্টারেস্টিং।"
রাদিবের দিকে তাকিয়ে অদিত কিছুটা চমকে উঠল। এতদিন ধরে রাদিবকে দেখে আসছে, কেমন একটা গোবেচারা রকম ভাব। কিন্তু এই রাদিবের চোখে মুখে যেন অন্য রকম একটা গাম্ভীর্য। রাদিব অদিতের দিকে তাকিয়েই বলে, "এই গল্প থেকেই, একটা রোগের নাম করা হয়েছে। মানসিক রোগ, নাম নার্সিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার। আর আপনি এই রোগে খুব খারাপ মাত্রায় আক্রান্ত।"
অদিত মুখে হাসি ও হাসি উধাও হয়ে যাওয়ার মাঝামাঝি এক দ্বিধান্বিত ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "মানে?"
"মানে আপনি নার্সিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার আক্রান্ত।"
অদিতের মুখটায় হঠাৎ করে কালো ছায়া ভর করল, হাসি মাখা মুখের হাসি পুরোপুরি মিলিয়ে গেল। অদিত রাদিবের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "আপনি স্পষ্ট করে বলুন, কী বলতে চান? আমি রাগ করি আর না করি, আপনি স্পষ্ট করেই বলুন, যতটা স্পষ্ট করে পারেন।"

রাদিব ঈষৎ একটা হাসি দিয়ে বলল, "আমি স্পষ্ট করেই বলছি, আপনি শুনুন, আচ্ছা? আমার এই কেসে ঢোকাটা একরকম অসম্ভব ছিল। আপনাদের সাথে থেকে খুনের তদন্তে থাকাটা কল্পনাতীত ছিল। আপনারা গোয়েন্দা, আমি ডাক্তার। আপনাদের সাথে আমার কী? আমি যখন প্রথম প্রফেসর সাহেব খুন হবার পর ওনার ওখানে যাই, আপনি আমার উপর খুবই বিরক্ত ছিলেন। কিন্তু যেই মুহূর্তে আমি বললাম, প্রফেসর সাহেব আপনার খুব প্রশংসা করেন, আপনার চোখ মুখ চিকচিক করে উঠল। আপনি খুশি হলেন। আমি আপনার দুর্বল দিকটা ধরে ফেললাম, আপনি প্রশংসা শুনতে ভালোবাসেন। আমি এরপর আপনার পিছন পিছন ঘুরতে লাগলাম, যতটা সম্ভব আপনার প্রশংসা করলাম। আপনার কাজ, কাছ থেকে দেখার অনেক ইচ্ছা আমার, আপনার মত করে আমি ভাবতে চাই, এসব বললাম। আপনি গলে গেলেন। আমাকে আপনার কাজ দেখার সুযোগ করেও দিলেন। আপনার সহযোগী তাতে মনঃক্ষুণ্ণ হলো তবুও। আপনি পাশে আরও কাউকে চান, যে আপনার প্রশংসা করে।"
রাদিবের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অদিত। রাদিব সে দৃষ্টি গ্রাহ্য করল না। বলে গেল, "আপনি মানুষকে চমকে দিতে ভালোবাসেন, মানুষ আপনার কাজের প্রশংসা করুক আপনি চান। অন্য কারও প্রশংসা আপনি সহ্য করতে পারেন না। আপনার স্ত্রী মধুমিতা তাই যখন, আমার জাদু দেখে অবাক, আপনি তার দিকে, এই যে এখন আমার দিকে যেভাবে তাকিয়ে আছেন, তেমন তীব্র দৃষ্টিতেই তাকিয়ে ছিলেন। আপনি মানুষের প্রশংসা শোনার জন্য নিজের গুণ নিজেই তৈরি করেন। ঘর ভর্তি ক্রেস্ট বানিয়ে ভরে রেখেছেন। যার কোনোটাই আপনার অর্জন না। একই দোকান থেকে, আপনি সবগুলো ক্রেস্ট বানিয়ে এনে ঘর সাজিয়েছেন। সবগুলো ক্রেস্ট একই ফ্রন্টে লেখা, একই ডিজাইনের, তা দেখেই যে কেউ একটু বুদ্ধি খাটালেই বুঝতে পারে। তাছাড়া সব গুলো ক্রেস্টে আপনার নাম লেখা। অনেক জায়গাতেই এমন ক্রেস্ট দেয়, শুধুমাত্র প্রথম, দ্বিতীয় লেখা বা অভিনন্দন জানানো। আপনার অত গুলো ক্রেস্টে একটাও তেমন নেই। আপনি জিজ্ঞাসাবাদে সবাইকে চমকে দিলেন, খুশি হলেন। পারলেন না চমকাতে দীপ্ত সাহেবকে, তাই সেখানে নিজের মেজাজ হারালেন। আপনার রুম ভর্তি ক্রিকেট খেলার ক্রেস্ট, অথচ মিসেস রেনুফা ইয়াসমিনের অত আস্তে ছুঁড়ে দেয়া, এশট্রে ধরতে পারলেন না। আপনার বাবা আপনার প্রশংসা করেন না, তাই তাকে দূরে সরিয়ে রেখে দিয়েছেন। এগুলো সব আপনার নার্সিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের ফল।"

অদিত হতভম্ব হয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। কী বলবে বুঝতে পারল না। কায়েস হুট করে এসে রাদিবকে পিছন দিক থেকে ধরে হাত দুটো আটকিয়ে ফেলল। অদিত ইশারা করল ছেড়ে দিতে। কায়েস ছেড়ে দিলো রাদিবকে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দাঁড়িয়ে রইল রাদিবের পাশে। রাদিব পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। সে সিগারেট পুড়তে দেখবে, মাথার চিন্তা গুলোকে গুছাবে। রাদিব সিগারেটের পুড়তে দেখা দেখতে দেখতে বলল, "এখন সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপারটা বলি। আপনার মতে, খুন করেছে দীপ্ত। আমি আপনার সব গুলো যুক্তি ভুল দেখাচ্ছি এবং দেখিয়ে দিচ্ছি খুনটা দীপ্ত করেননি।“

অদিত মুখ শক্ত হয়ে রাদিবের কথা শুনে যায়। যেন সুযোগ দিচ্ছে রাদিবকে, বলে যাও, যা বলতে চাও। রাদিব বলে যায়, “আপনার মতে আঘাত গুলো বাম-হাতি কারও করা, যে খুব শক্তিশালী। বাম-হাতির করা কীভাবে? কারণ আঘাত গুলো ঘাড়ের বাম পাশ থেকে ডান পাশের এঙ্গেলে। আচ্ছা, আপনি কী করে নিশ্চিত হলেন, আঘাতটা পিছন থেকে করা? আমি যদি বলি আঘাত গুলো সামনে থেকে করা। প্রফেসর সাহেবের সাথে খুব সখ্যতা এমন কেউ তার সাথে কোলাকুলি করার অজুহাতে যদি সামনে থেকে ঘাড়ে আঘাত করে, আর সে যদি ডান-হাতি হয়, তাহলে তাকে অমন শক্তিশালী আঘাত করতে হলে, অবশ্যই তাকে বাম থেকে ডান দিকের এঙ্গেলে আঘাত করতে হবে। আর দীপ্তর যে উচ্চতা, তাতে কোনোভাবেই প্রফেসর সাহেব দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ঘাড়ে অত জোরে আঘাত করা সম্ভব না। প্রফেসর সাহেব দাঁড়ানো অবস্থায় তাকে আঘাত করা হয়েছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, তার লাশের পাশের বুক শেলফের উপর দিকে ছিটে যাওয়া রক্ত। বসে থাকলে, আর আঘাত করলে, কোনোভাবেই ও পর্যন্ত রক্ত পৌছাত না। আর বেনসন সিগারেট বাংলাদেশে শুধু দীপ্তই খান না। আরও অনেকেই খায়। আমার পকেটে একটা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটা সিগারেটের ফিল্টার আছে, সেটাও বেনসনের। তার লাশের পাশে যে সিগারেটের ফিল্টার ছিল তা আমার রেখে আসা। আমি চলে আসার সময় তার টেবিলে একটা সিগারেট রেখে এসেছিলাম, তিনি পোড়াবেন সে কারণে। আর ওটা কারও খাওয়া সিগারেট না, শুধুমাত্র পোড়ানো একটা সিগারেটের ফিল্টার, যা প্রফেসর সাহেবই পুড়িয়েছেন। আমি যেমন এখন পোড়াচ্ছি।"

অদিত হতাশা আর বিষণ্ণতা সামলে একটু শান্ত স্বরে বলল, "তাহলে কে খুন করেছে?",বলে অতি ঠান্ডাভাবে উত্তরের প্রতীক্ষা করল।

রাদিব হাসল, শুকনো হাসি না, অনেক মিষ্টি একটা হাসি। সে হাসি দেখে অদিতের মাথা আরও গরম হয়ে গেল। অদিত তবু নিজেকে সামলালো। রাদিব বলে যায়, "অবশ্যই এমন কেউ, যার উচ্চতা আমি কিংবা দীপ্ত রকম না। খুব ভালো উচ্চতার, সুঠাম দেহের কেউ। এমন কেউ যার সাথে প্রফেসর সাহেবের খুব ভালো সম্পর্ক। এমন কেউ, যার প্রফেসর সাহেবের বাসায় যাবার কোনো বাধা নেই। এমন কেউ যার কাছে প্রফেসর সাহেবের বাসার চাবি আছে। এমন তো একজনই আছে। আপনি প্রশংসা শোনবার নেশায় এতটাই পাগল হয়ে গিয়েছেন যে, নিজেই সমস্যা সৃষ্টি করে, নিজেই তার সমাধান করতে লেগে গেলেন। কারণ ঐ সমস্যার পুরোটা আপনার জানা। আপনি কিন্তু নাহিনের সমস্যার কোন সমাধান করতে পারেননি, কারণ ঐ সমস্যা আপনার সৃষ্টি না। এমনকি যার কেস নিয়ে তদন্ত করছেন সে নাহিনের ছবিটা পর্যন্ত আমি আপনাকে এনে দিয়েছি। আপনার মনে হয় নি যে, তদন্তের একটা ধাপ ভিক্টিম কিংবা যাকে নিয়ে তদন্ত করছেন তার ছবি আপনার কাছে থাকা দরকার।"

অদিত দ্বিধা আর সংকোচের চোখে রাদিবের দিকে তাকিয়ে বলল, "তাহলে আপনার মতে খুনি?"
"অবশ্যই আপনি। আপনি খুন করেছেন। আপনিই এটার সমাধান করতে চাচ্ছেন।"

বিষাদ যেন অদিতের রাগ হলো, চোখের মাঝে রক্ত যেন জমাট বেধেছে। অদিত জিজ্ঞেস করে, "আপনার কাছে কী প্রমাণ আছে, আমার বিরুদ্ধে? এক্সপ্লেইন ইট।"
রাদিব আবার সেই হাসি দিল, "আপনার কাছে প্রফেসর সাহেবের বাসার চাবি আছে। আমাকে যখন প্রফেসর সাহেব চাবি দেন, বাসার নিচের দরজা খুলে যাবার জন্য, প্রথম যেদিন আমি তার বাসায় যাই তখন, আমি দেখেছিলাম চাবি তিনি রাখেন, ড্রয়িং রুমের টেবিলের নিচের তাকে। আপনার সাথে আমি যখন প্রথম দিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যাই, আমি মোবাইল ফেলে রেখে এসেছি বলে, উপরে গিয়ে দেখি চাবি ওখানেই আছে। অথচ আপনি চাবি দিয়ে দিব্বি দরজা খুলছেন, বের হচ্ছেন। এমনকি তদন্তের কোথাও আপনি বলেননি, প্রথমে লাশ কে দেখল? কে জানাল পুলিশকে? আপনি নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে এসে লাশ দেখে, আপনিই পুলিশ ডেকেছেন। আপনি যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, তাদের কেউ ই প্রফেসর সাহেবের ঘাড়ে তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় আঘাত করার মত লম্বা নয়। একমাত্র আপনি। আপনার টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই। আপনি টাকা দিচ্ছেন কায়েস সাহেবকে, টাকা দিচ্ছেন ফরেনসিকের ডাক্তার তারেক আজিজকে। আপনার পছন্দ মত, কেস পেতে সহায়তা করছে আপনার দুলাভাই মানে মঈন আহমেদ, যিনি আপনার ডিপার্টমেন্টের বড় অফিসার।“
অদিতের অস্থির ভাব বাড়ছে, চিৎকার করে বলে উঠল, “Be silent & listen to me.”
রাদিব অদিতের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, “এই যে আপনি বাইবেলের এই লাইনটা বললেন, Be silent & listen to Me. এখানকার Silent আর Listen এই শব্দগুলোকে বলা হয় অ্যানাগ্রাম। একটি শব্দের বর্ণগুলোকে সাজালে যদি অন্য একটি শব্দ বা বাক্যের সৃষ্টি হয়, তাকে অ্যানাগ্রাম বলে। আশা করি আপনি বিষয়টা জানেন।”
রাদিবকে চুপ করাতে গিয়ে অদিত নিজেই চুপ হয়ে গেল।

রাদিব বলে, “সবচেয়ে বড় যে প্রমাণ আপনি দেখিয়েছেন, প্রফেসর সাহেবের মারা যাবার আগে TOTAL PAID এর T এবং PAID এর উপর রক্ত দিয়ে আঙুল বুলানো। এটা আপনার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল যেভাবে হোক। আমিই ধরিয়ে দিয়েছিলাম বিষয়টা। আপনি হয়ত এটাও দেখেননি, TOTAL PAID বইয়ের লেখকের নাম RICHARD WILD, তিনি হাত বুলিয়েছেন TPAID এর উপর। TPAID এর অ্যানিগ্রাম আপনি বের করেছেন DIPTA. কী অদ্ভুত দেখেন না, TPAID এর আবার আরেকটা অ্যানিগ্রাম হচ্ছে ADIT P. মানে বর্ণগুলোকে এলোমেলো করে সাজালে ADIT P পাই। অদিত আপনার নাম আর পি দিয়ে পোদ্দার লিখতে চাচ্ছিলেন। যদিও তার আগেই তিনি মারা গিয়েছেন। আর কিছু সময় বেঁচে থাকলে অতি সহজেই পুরো ADIT PODDAR লিখে দিয়ে যেতে পারতেন। কারণ আপনার পুরো নামের বর্ণ গুলো বইয়ের নাম আর লেখকের নামের মধ্যেই আছে। এছাড়া আপনি নিজেই বলেছেন, আপনি প্রফেসর সাজিদ এলাহীকে মানা করেছিলেন সেদিন সন্ধ্যায় যখন আপনাকে ফোন করে, যাতে কেউ বাসায় না যায়। দরকার হলে আপনি যাবেন এবং আপনি গিয়েছিলেন, খুন করলেন, চলে আসলেন, সাথে ছিল আপনার সহযোগী ইমরুল কায়েস। আপনাদের দুজনের নেমে যাবার শব্দই দরজার ওপাশ থেকে শুনেছিলেন নাসির উদ্দিন। আমি জানতাম খুন করেননি নাসির উদ্দিন, দিদার, আরিফ তাই তাদের আমি আস্তে করে ব্যাপারটা বলে দিয়েছিলাম, আপনার জিজ্ঞাসাবাদের পরেই। বাকিদের বলবার সুযোগ হয়নি। আর কি কোন প্রমাণ লাগবে?"

ম্লান করা বিবর্ণ মুখটা অদিতের হঠাৎ করেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উচ্চস্বরে হেসে বলল, "আপনি অনেক বুদ্ধিমান একজন মানুষ ডাক্তার সাহেব, বলতেই হবে। তবে আপনার কি মনে হয় আপনি, কোথাও আমার বিরুদ্ধে এসব প্রমাণ করতে পারবেন? আমাকে শাস্তি পাওয়াতে পারবেন?"
রাদিব ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। অনেকক্ষণ পর মৃদু স্বরে বলল, "আমার তো এসব প্রমাণ করার কোনো দরকার নেই। ওসব আপনাদের কাজ, খুনি ধরা, শাস্তি দেয়া। আমি কিন্তু এটাও জানি, আপনার আগের দুইটা চিফ ডিটেকটিভ হিসাবে কেসও, আপনার খুন করা খুনের তদন্ত। শিপম্যান যেমন তার রুগিদের খুন করত, আপনিও তার মত খুন করে তারপর তদন্তে নামেন, তদন্ত শেষে ম্যাজিশিয়ানদের মত ম্যাজিক দেখান, কিন্তু জাদুর পুরোটাই তো ফাঁকি, মিথ্যে। প্রথমে আপনি যে চিফ ডিটেকটিভের সহযোগী ছিলেন তাকে খুন করলেন, তদন্ত শেষে তার ড্রাইভারকে ফাঁসিয়ে দিলেন। এরপর আপনার বন্ধু শুভ দেবনাথের খুনটাও আপনি করেছেন এবং ফাঁসিয়ে দিয়েছেন তার স্ত্রীকে। আপনি এমন মানুষ গুলোকে খুন করেছেন যাদের সম্পর্কে আপনি জানেন অনেক কিছু। যাদের নিয়ে তদন্তে আপনি সে তথ্য গুলো পাল্টে অন্য কারও নামে চালিয়ে দিতে পারেন। মানুষ প্রতিহিংসা থেকে খুন করে, রাগ থেকে খুন করে। আপনি খুন করছেন মানুষের প্রশংসা শোনবার জন্য। প্রফেসর সাজিদ এলাহীর মত একজন মানুষ, যিনি আপনাকে স্নেহ করতেন, আপনার প্রশংসাও করতেন। তাকেও আপনি খুন করলেন। শুধুমাত্র তার খুনের তদন্ত করে আরও বেশি প্রশংসা শোনবার আশায়। এখন আপনাকে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা তো আমার নেই, উল্টা চাইলে আপনি এখন আমাকে খুন করতে পারেন। আমি শুধু এতটুকু বলতে পারি, আপনি মানসিক ভাবে অসুস্থ, আপনি সাইকো। আপনি মানুষগুলোকে খুন করেছেন কোনো কারণ ছাড়াই। আপনি মারাত্মক অসুস্থ একজন মানুষ। আপনার চিকিৎসা দরকার।"

কথাটা বলে রাদিব সস্নেহে তাকাল অদিতের দিকে। অদিতের মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না। অদিত রাদিবের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল, হেসে হেসে বলল, "না না ডাক্তার সাহেব, আপনাকে আমি খুন করব না। আপনার ব্যাপারে আমি তেমন কিছুই জানি না। তবে আমার পরের খুনের দায়ে আপনি গ্রেফতার হবেন, এটা জেনে রাখুন। আপনার বুদ্ধির খেলাটা তখন দেখা যাবে।"

রাদিব কিছু বলল না। রাদিবের সূক্ষ্ম বোধশক্তি অদিতের স্থূল বোধের কিছুই পরিবর্তন করতে পারেনি। রাদিব বেরিয়ে আসলো অফিস থেকে। দীপ্ত যদি গ্রেফতার হয়েই থাকে, ওকে ছাড়াবার ব্যবস্থা করতে হবে। কীভাবে করবে তাই ভাবছে, জটিল সমস্যার আর একটা সহজ সমাধান করতে হবে।

১৪
রাদিব বিছানায় শুয়ে আছে। বিছানায় ছারপোকায় গিজগিজ। ছারপোকারা রক্ত খাচ্ছে, রাদিব তা মেনে নিচ্ছে। এরা মানুষের রক্ত খেয়েই বেঁচে থাকে, কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ মেনে নেয়। প্রতিবাদ করলেও ছারপোকা রক্ত খায়, মেনে নিলেও রক্ত খায়।

রাদিবের মোবাইলে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে মেসেজ আসলো, ডিটেকটিভ অদিত খুন হয়েছেন।

রাদিব মোবাইলটা রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। রাদিব জানে খুনটা কে করেছে! সহযোগী অদিত তার চিফ ডিটেকটিভকে খুন করে যে চক্রের শুরু করেছিল, চিফ ডিটেকটিভ অদিতের খুনের মধ্য দিয়ে সে চক্র পূর্ণ হলো।

রাদিব বিছানা থেকে জানালা দিয়ে তাকিয়ে চাঁদ দেখছে, একদম গোল একটা চাঁদ, সম্পূর্ণ একটা চাঁদ, বড় বিচ্ছিরি একটা চাঁদ। রাদিব ভাবে, পৃথিবীর অসম্পূর্ণ জিনিস গুলোই সুন্দর, অপরূপ। পূর্ণতা দানের একটা টান থাকে। সম্পূর্ণ জিনিস গুলোই বিচ্ছিরি, বড় বেমানান।

জীবন কখনও সরল রেখায় চলে, কখনও বক্র রেখায়। সে রেখা গুলো ভাঙলে বিন্দু পাওয়া যায়। ও বিন্দুকে খুব কাছ থেকে দেখলে মনে হবে যেন একটা বৃত্ত। যে বৃত্তে কেউ ব্যাস ধরে কেন্দ্রে যেতে চায়, কেউ জ্যা ধরে। বেশির ভাগই পরিধি ধরে ঘুরে বেড়ায়, ঘুরে ফিরে একই জায়গায় পড়ে থাকে। বৃত্ত ভেঙে বের হতে পারে না। সরল রেখার মধ্যের বৃত্ততে আটকে যায়, বক্র রেখার মধ্যের বৃত্ততে আটকে যায়। সব কিছুর মধ্য বৃত্তের চক্রে পড়ে আশার পারদ উড়াতে উড়াতে একদিন হতাশা আর গ্লানিতে বিলীন হয়ে যায়।


(২০১৮ সালে প্রকাশিত আমার তৃতীয় উপন্যাস মধ্য বৃত্ত।)

রিয়াদুল রিয়াদ




মন্তব্য ১০ টি রেটিং +৩/-০

মন্তব্য (১০) মন্তব্য লিখুন

১| ২০ শে মার্চ, ২০২৪ সকাল ৭:৪৬

এম ডি মুসা বলেছেন: এ বইটি কবে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন? এবার বইমেলায় নতুন কি কি বই আপনার আসছে?

২০ শে মার্চ, ২০২৪ রাত ৯:১৫

রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার ) বলেছেন: এই বই প্রকাশিত হয়েছে প্রথম ২০১৮ তে। ২০২০ পর্যন্ত বই বিক্রি হয়েছে। তিন মুদ্রণ গিয়েছিল এটার।

২০২০ এ আমার শেষ বই প্রকাশিত হয়। এরপর আর বই প্রকাশ করিনি।

আগামী বছর ইচ্ছে আছে। আগের লেখাগুলোতে অনেক ভুলত্রুটি ছিল, সেসব শুধরে নতুন কিছু লেখার ইচ্ছে আছে।

২| ২০ শে মার্চ, ২০২৪ বিকাল ৪:১৪

মায়াস্পর্শ বলেছেন: প্রিয়তে নিলাম। সব একসাথে পড়ে ফেলব।

২০ শে মার্চ, ২০২৪ রাত ৯:১৬

রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার ) বলেছেন: আন্তরিক ধন্যবাদ। পড়া শেষে মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম।

৩| ২০ শে মার্চ, ২০২৪ বিকাল ৫:৪৫

রাজীব নুর বলেছেন: সুন্দর ফিনিশিং।
তবে গোয়েন্দার নাম অদিত হিসেবে মানায় নাই।

২০ শে মার্চ, ২০২৪ রাত ৯:১৭

রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার ) বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ রাজীব নুর ভাই। অ্যানাগ্রামের জন্যই আসলে অদিত নামটা দেয়া।

৪| ২২ শে মার্চ, ২০২৪ দুপুর ১২:০৩

গেঁয়ো ভূত বলেছেন: সবগুলো পর্ব পড়েছি, শেষ দুটি পর্ব সবচাইতে বেশি ভাল লেগেছে। সত্যিই চমৎকার!!

তবে, নাহিনের জীবিত হওয়ার গল্পটায় কিছু বিষয় আমার কাছে বেশ খাপছাড়া মনে হয়েছে, একজন যুবকের হঠাৎ মৃত্যুর পর আবার জীবিত হয়ে হাড়িয়ে যাবার ব্যাপারটা যদি বাস্তবে হতো তাহলে কি হতো? তার সমস্ত সার্কেলে বিশাল একটা হইচই পড়ে যেত কিনা? অথচ গল্পটিতে সবাইকে এব্যাপারে কেমন জানি একেবারেই নিস্পৃহ মনে হয়েছে আমার কাছে। অথচ এই ব্যাপারটা নিয়ে গল্পে একটা শোরগোল ফেলে দিয়ে পাঠককে আরো উদ্বেল করে ফেলা যেত। আবার জীবিত হওয়ার পর জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়ার যে ব্যাপারটা, এটা যদি বাস্তবে হতো তাহলে হয়তো লাশ জীবিত হতে দেখে গাড়ির ড্রাইভার এবং নাহিনের ভাই পড়িমরি করে দৌড়ে জান নিয়ে পালাতো, অথচ এখানে দেখা গেল তার উল্টা! যাইহোক, আমি গল্পকার নই, পাঠক হিসেবে আমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথাগুলো লিখলাম।

আর একটি কথা, আলিবাই শব্দটি অন্য কোনো শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যেতে পারে। অল্প কিছু মুদ্রণ প্রমাদ রয়েছে তা পরবর্তী এডিটিং এ ঠিক হয়ে যাবে আশা করি।

আশা করছি আপনার পরবর্তী বইটি যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা পাবে। যদি সুযোগ হয়, আপনার পরবর্তী বইটি তারিয়ে তারিয়ে পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

শুভকামনা।

২৪ শে মার্চ, ২০২৪ রাত ১:৪৭

রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার ) বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ, ধৈর্য নিয়ে পুরো উপন্যাসের সবগুলো পর্ব পড়ার জন্য।

এই লেখাটা প্রায় ৭-৮ বছর আগের লেখা। এখন আমি এ উপন্যাস লিখলে হয়ত এভাবে লিখতাম না। ল্যাজারাস সিনড্রোমের অবতরণা করার জন্য, নাহিনের কাহিনীকে অন্যভাবে সাজাতাম। নাহিনের বিষয়টায় যথেষ্ট জায়গা ছিল কাজ করার এটা আমিও অনুভব করি। বেশ দুর্বল হয়ে গিয়েছে এখানটায়।

অ্যালিবাই এর পরিবর্তে সাক্ষী, ও ইন্টারোগেশনের পরিবর্তে জিজ্ঞাসাবাদ ব্যবহার করা হয়েছিল, প্রথম দুই মুদ্রণে। শেষ মুদ্রণে আমি ইচ্ছে করেই এই শব্দ দুটো ব্যবহার করেছিলাম।

আমার শেষ বই প্রকাশিত হয় ২০২০ এ। এরপর সময় নিয়েছি, আমার লেখা নিয়ে কাজ করার আরও অনেক জায়গা আছে, সেসব নিয়ে কাজ করেতছি। আবার সব ঠিক থাকলে আগামী বছর বই বের হতে পারে।

ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানবেন গেঁয়ো ভূত।

৫| ২৪ শে মার্চ, ২০২৪ রাত ১০:৫০

মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেছেন: খুবই ভালো একটি কাজ।

২৫ শে মার্চ, ২০২৪ রাত ২:০৯

রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার ) বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই। ভালোবাসা জানবেন।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.