| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
‘বিপ্লবী চিন্তাধারার জনক’ খ্যাত বিপিন চন্দ্র পাল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমল থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কার একজন বিশিষ্ট ও প্রধান জাতীয় নেতা ছিলেন। বিপিন চন্দ্র পালের সহযোগি ও সহকর্মী জাতীয়তাবাদী বাল গঙ্গাধর তিলক ও লালা লাজপুত রায়ের পাশাপাশি, পাল বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গঠনে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তৎকালীন উগ্র জাতীয়তাবাদ, স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে উকালতি ও সামাজিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরার অন্যতম পথিকৃৎ পাল ১৮৫৮ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের হবিগঞ্জ জেলার পইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে বেড়ে উঠা পাল ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা লাভের পাশাপাশি প্রগতিশীল ধারণার সাথে উন্মোচিত হয়েছিলেন যা সামাজিক সংস্কার ও স্বাধীনতার জন্যে তার আবেগকে উস্কে দিয়েছিল। ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি তার গভীর মমতা ও গর্ববোধ, বিপিন চন্দ্র পালের পারিবারিক ও প্রাথমিক শিক্ষা তার এই জাতীয়তাবাদী আদর্শকে প্রভাবিত করেছিল।
বিদেশী পণ্য বয়কট ও দেশীয় শিল্পের প্রচারের মধ্য দিয়ে বিপিন চন্দ্র পালের রাজনৈতিক যাত্রার গতি লাভ করে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অপরিহার্যতা ও বিশ্বাস তিনি দৃঢ়ভাবে জনগণকে উপলব্দি করিয়েছিলেন। জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনাকে প্রজ্বলিত ও স্বদেশি আন্দোলনে জনগণকে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করতে পালের শক্তিশালী বক্তব্য ও লিখাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল। বিভিন্ন সময়ে পালের বক্তব্যগুলোতে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনের কট্টর সমালোচনা ও ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্য দিয়ে সংগঠিত অন্যায়ের প্রতি ভারতীয় জনগণকে জাগ্রত করার আহ্বান উনাকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করার জন্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের অন্যতম সমর্থক ছিলেন তিনি। ভারতীয়দের তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, জ্ঞান ও শিল্পে গর্ব করার আহ্বান জানিয়ে পাল স্বনির্ভরতা এবং স্বয়ংসম্পুর্ণতার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক সক্রিয়তার পাশাপাশি পাল ছিলেন একজন দক্ষ লেখক ও সাংবাদিক। ১৯০৫ সালে ‘বন্দে মাতরম’ নামে একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন যা জাতীয়তাবাদী অনুভূতি প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠে। তার লেখার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ, স্ব-শাসন এবং সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের যে ধারণা তিনি তৃণমূলে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তা ভারতীয়দের একটি প্রজন্মকে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করে। অর্থাৎ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনমতকে একত্রিত করতে পালের বাগ্মীতা এবং প্ররোচনামূলক লেখার শৈলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
বিপিন চন্দ্র পাল স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রী অরবিন্দের আদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তিনি বিদেশী আধিপত্য ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত একটি ভারতের কল্পনা করেন যেখানে মানুষ সম্প্রীতি ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড়কে আলিঙ্গন করতে পারে। তার জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ ‘বন্দে মাতরম’ (অর্থাৎ মাতৃভূমির প্রতি প্রণাম) ধারণার উপর জোর দিয়েছিল যা ভারতের প্রতি তার ভালোবাসা ও ভক্তির প্রতীক।
ব্রিটিশ কতৃপক্ষের সমালোচনা ও নিপীড়নের সন্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি জনসাধারণকে স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রাম করতে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বিপিন চন্দ্র পালের অবদান ছিল অমূল্য। স্বাধীনতার পক্ষে ভারতীয়দের একত্র ও তাদের মধ্যে জাতীয় গর্ব ও সংকল্পের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পক্ষে নিরলস ওকালতি, সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের উপর জোর দেওয়া এবং স্বনির্ভরতা প্রচার ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর সাথে মতের মিল না হওয়ায় রাজনীতি থেকে সরে দাড়ানোর পর ১৯৩২ সালের ২০’শে মে বিপিন চন্দ্র পাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
©somewhere in net ltd.