| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

মাত্র গুটিকতক দিন হলো দেশের বাইরে এসেছি। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন সংস্কৃতিতে নতুন করে চলা। নতুন জায়গায় নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারবো কি না এই সংকোচের মধ্যেও আশাবাদী ছিলাম দেশের বাইরে হলেও নিজের পাশের দেশেই তো আছি। ভারত বিশ্ব অর্থনীতিতে অনেকটা এগিয়ে গেলেও দুই দেশের সংস্কৃতির মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। তাই একটু হলেও নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পেরেছিলাম খুব একটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে না, তাই নিজেকে খুব সহজেই এখানে মানিয়ে নিতে পারবো।
ভারতে এসেছি ছাত্রবৃত্তি নিয়ে, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক করার জন্যে। যোগ্যতা থাকলেও সরকারি চাকুরিজীবী বাবার ইউরোপে পড়ার খরচ যোগান দেয়ার সামর্থ্য ছিল না বলে নিজেই সরে এসেছিলাম এই জন্যে যে, স্নাতকোত্তর ইউরোপ থেকেই সম্পূর্ণ করবো। ভারতে আসবো এই খবর পেয়ে অনেকে আমাকে সাহস জুগিয়েছে, কথা শুনাতেও ছাড়েনি অনেকে। "পাশের দেশ, ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ায় কেউ পড়াশুনা করতে যায়? ব্লা ব্লা" ইত্যাদি। আমি যেথায় আছি আন্তর্জাতিক র্য্যাংকিং এর দিক দিয়ে এর অবস্থান অনেক ভালো, এবং এর অবস্থান আরো সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। মোটামুটি ৫০ টি দেশ এবং ভারতের সবগুলো রাজ্য থেকেই শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশুনো করতে আসে। ভারতের শিক্ষার্থীদের জন্যে এখানে বাধ্যতামূলক প্রবেশিকা পরিক্ষায় বসতে হয় নতুবা এখানে ভর্তি হওয়া যায় না।
দিল্লী ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমে কলেজের পাঠানো গাড়িতে করে কলেজের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। এতো সাজানো গুছানো শহর বাংলাদেশে দেখাই যায় না। প্রথমে মনে হলো এটা তো এয়ারপোর্ট, সুন্দর হতেই পারে। কিন্তু, এয়ারপোর্ট, শহর, দিল্লী সেনানিবাস ছেড়ে যতোই সামনে এগুচ্ছে ততোই ভুল ভাঙছে, আসলেই অনেক সুন্দর শহর মোঘল সাম্রাজ্যের প্রাক্তন এই রাজধানী এই দিল্লী। ভারত আজ এতো এগিয়ে কেনো তা আমার জানা ছিল না, এখানে এসে, দেখে জেনেছি। শুধুমাত্র তাদের চিন্তাভাবনার সুদূর প্রসারের জন্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত শুধু এগিয়েই চলেছে। পাঞ্জাবে পৌঁছে কলেজে রিপোর্ট করেই কলেজের নির্ধারিত হোস্টেলে উঠে পড়লাম। ভিনদেশি রুমমেটের সাথে রুম শেয়ার করে থাকতে হবে, শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে সংস্কৃতির আদানপ্রদানের জন্যে এই ব্যবস্থা। ক্লাস শুরু করার আগে একটাই কাজ বাকি এইখানে, বাংলাদেশি বাঙালি খুঁজে বের করতে হবে। কলেজ সম্পূর্নরুপে ভেজিটেরিয়ান, মাছ-মাংস ছাড়া চলতে পারলেও বোধকরি বাঙালি বান্ধব ছাড়া চলা অনেক কষ্টসাধ্য হবে৷ নিজের মনের ভাব প্রকাশের জন্যে নিজের মায়ের ভাষা ছাড়া আর কোনো কিছুর বিকল্প নেই। আপনি যতোই ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, ফারসি বা মান্দারিন জানেন না কেনো বাঙলা ভাষাতেই আমি নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। সবকিছু ভুলে গেলেও ভুলতে পারবো না আমি বাংলাদেশি, আমি বাঙালি। কেউ প্রবাসে যে কারণেই গমনাগমন করুক না কেনো, হউক সেটা কাজের জন্যে কিংবা ভ্রমণের জন্যে, এটা ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় যে আমরা বাঙালি। কিন্তু, এখানে এসে দেখলাম সম্পূর্ণ উল্টোটা, কতো সহজেই আমরা বাঙালিয়ানাত্বকে ভুলে যাচ্ছি, কতো সহজেই ওয়েস্টার্ন সংস্কৃতিকে লালন করছি। বাংলাদেশিরা এখানে একে অন্যের সাথে কথাই বলতে চায় না, যেনো এটাই সবচেয়ে বড়ো অপরাধ। সবাই এই আওতায় পড়ে না, তবে সিংহভাগই ভুলে যায় কোথা হতে তার শিখরের উদ্ভব হয়েছে। আমি এখনো ভিনদেশি কারো সাথে পরিচিত হলে নিজের দেশকে তুলে ধরি, নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরি। যদিও এখানকার মাধ্যম সম্পূর্ণ ইংরেজি তবুও তাদের দুটো বাংলা কথা শেখাতে পছন্দ করি। দেশের বাইরে গেলে অবশ্যই মনে রাখা উচিৎ আমরা দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করছি, দেশের সংস্কৃতিকে আমাদেরই তুলে ধরতে হবে, বিশ্ববাসীকে আমাদের গর্বের সাথে জানাতে হবে আমরা বাংলাদেশি। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব শুধু সাকিব, তামিম, মুশফিকেই সীমাবদ্ধ নয়, মাশরাফিও কাল নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে থাকবে না। আজ কোনো অলিম্পিয়াড হলে কাল কোনো দেশি দল সেখানে নাও থাকতে পারে, কিন্তু একজন বাঙালি চিরকাল বাঙালিই থাকবে, সে একজন ভালো উত্তরসূরী রেখে যাবে। এখন বাংলাদেশে ফিরে যাই। বর্তমানে বাংলাদেশি ফেসবুক প্রজন্ম যখন বড়ছেলে নিয়ে পড়ে আছে, তখন আমাদের প্রজন্মের অন্যান্যরা কি করে সেটা জেনে নেয়া দরকার। তাই, শান্তনু হালদার নামে এক বন্ধুর লিখা কোট করছি, "রাশিয়ান যুব প্রজন্ম যখন ফেসবুকে ভবিষ্যত নভোচারি খুঁজে পাওয়ার জন্যে ইভেন্ট খুলে, গ্রিক কৈশোর যখন তাদের নতুন নতুন চিন্তাভাবনা এবং উদ্ভাবনকে তুলে ধরতে ফেসবুক ইভেন্ট খুলে, আমরা বাংলাদেশিরাও তখন ইভেন্ট খুলি 'বড়ছেলে সিনেমা চাই' - কতোটা হাস্যকর বৈ কি!" কতোটা হাস্যরসিক আমরা, তো আমরা পিছিয়ে থাকবো না তো কি অন্যেরা পিছিয়ে থাকবে? বলছিলাম প্রতিটা মানুষই পারে নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে, আমরাও দায়িত্বের সাথে সেই কাজ করছি। তাই তো কবিগুরুর ভাষায় বলতে ইচ্ছে হয়
"সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছো বাঙালি করে
মানুষ করোনি।"
যখন ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয় তখন আমাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় নগর প্রধান আর দেশের সরকার প্রধানকে কিভাবে টেনে নিচে নামিয়ে আনা যায়। দেশটা কি তার একার? আমার কি কোনো দায়িত্ব নেই দেশের জন্য? ঢাকা শহর বিশ্বের অন্যতম মেগাসিটি যেখানে প্রায় পৌনে দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। শুধুমাত্র যে পরিমাণ চিপসের প্যাকেট প্রতিদিন ঢাকা শহরে আমরা অনিয়ন্ত্রিতভাবে যেখানে সেখানে ফেলছি, তাহলে তো ম্যানহোল, ড্রেন বদ্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবেই। হ্যাঁ এটা সত্য যে আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ সুব্যবস্থা নেই, কিন্তু যা আছে তাও বা কম কিসের? আমরা ক’জনই বা সেই সুযোগের ব্যবহার করছি? সিংহভাগ মানুষই তা করছি না। ২০১৫ সালে একবার জাপান গিয়েছিলাম।প্রথমত, ওখানে আমাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে রাস্তা, নগর, শপিং মল, পাবলিক প্লেস কোথাও কোনো গারবেজ দেখা যায় না। কেউ একটা চিপস খেলেও তার প্যাকেট হাতে বয়ে বেড়ায় যতক্ষণ না পর্যন্ত ডাস্টবিন চোখে পড়ে। দ্বিতীয়ত, এতোদিন থেকেও কোনো গাড়ির হর্ন শুনিনি। গল্প শুনেছি, রাত দুটো বাজে, আশেপাশে কোনো ট্রাফিক পুলিশ নেই, নেই কোনো গাড়ি। তারপরও লালবাতি জ্বলার সাথে সাথে গাড়ি থামিয়ে দিবে। সেই গল্পের কাহিনী কতটুকু সত্য তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। এগুলো কেনো আমরা জেনেও আজ না জানার ভান করে থাকি। শুধুমাত্র তাদের চিন্তাভাবনার কারণে। যতোদিন না আমরা আমাদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন আনবো ততদিন আমাদের দেশ অনুন্নতই থেকে যাবে।
একমাত্র আমরাই পারি আমাদের দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোললেই হবে না, আমাদের সংস্কৃতিকেও সুস্থভাবে ধাবিত করতে হবে এবং অসুস্থ সংস্কৃতিকে বর্জন করতে হবে। Everyone wants a change but not everyone wants to change. কিন্তু পরিবর্তনের জন্য দ্বিতীয়টা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আসুন আমরা শপথ নেই আমরা আমাদের নিজেদেরকে পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের পরিবর্তন সাধন করবো, আমাদের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে দেশের উন্নয়নের রাস্তা যেনো সুগম হয়, এই কামনায়।
[ডায়েরির পাতা থেকে, সেপ্টেম্বর ২০১৭। প্রথম ছবিটি গুগল হতে সংগ্রহ করা।]***
©somewhere in net ltd.