নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নিজস্ব ভাবনা চিন্তা নিয়ে আমার ভার্চুয়াল জগত!

এস.এম. আজাদ রহমান

মানুষ

এস.এম. আজাদ রহমান › বিস্তারিত পোস্টঃ

পরাজয়ের আনন্দ, রাজনীতির মানদণ্ড এবং ভাষার অবক্ষয়

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:০০



পরাজয়ের আনন্দ, রাজনীতির মানদণ্ড এবং ভাষার অবক্ষয়

কোনো মানুষের পরাজয়ে আনন্দ পাওয়া সাধারণত উদার মানবিকতার পরিচয় নয়। আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখি—অন্যের ব্যর্থতায় উল্লাস করা শোভন নয়। তবু বাস্তব রাজনীতিতে এমন মুহূর্ত আসে, যখন একটি পরাজয় কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং একটি রাজনৈতিক ধারা, বক্তব্য বা মূল্যবোধের প্রতি জনসম্মিলিত আপত্তির প্রতিফলন হয়ে ওঠে। তখন আনন্দটি ব্যক্তিকে ঘিরে নয়—একটি অবস্থান, একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনার কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-ভাষা, সংস্কৃতি, মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের জন্য এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। এই সত্যকে অস্বীকার করা, বিজয় দিবসের তাৎপর্য খাটো করা, কিংবা যুদ্ধকালীন নির্যাতিত নারীসমাজকে অবমাননাকর ভাষায় উল্লেখ করা-এসব কেবল মতভেদের বিষয় নয়; এগুলো জাতির স্মৃতি ও সম্মানের প্রশ্নে আঘাত। ফলে এ ধরনের বক্তব্য যখন জনসমর্থন হারায়, তখন সেটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং একটি অসংবেদনশীল রাজনৈতিক চর্চার প্রত্যাখ্যান হিসেবে ধরা দেয়।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—চূড়ান্ত রায় জনগণের। নির্বাচন, জনমত, সামাজিক প্রতিক্রিয়া-সব মিলিয়ে মানুষ বার্তা দেয়: রাজনীতি কেবল বক্তব্যের প্রদর্শনী নয়; এটি দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র। ইতিহাসের প্রতি সংবেদনশীলতা, জনমানসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভাষায় সংযম-এই তিনটি গুণ ছাড়া জনসমর্থন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

রাজনীতিবিদের ভূমিকা: আদর্শ নাকি উসকানি?
একজন রাজনীতিবিদ কেবল নীতিনির্ধারক নন; তিনি সমাজের জন্য প্রতীক। তাঁর ভাষা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। যখন রাজনৈতিক বক্তব্য ক্রমে আক্রমণাত্মক, অশালীন বা বিদ্বেষপূর্ণ হয়, তখন সেটি শুধু বিরোধী পক্ষকে আঘাত করে না-সমাজের সামগ্রিক ভাষা-সংস্কৃতিকেই দূষিত করে। সামাজিক মাধ্যম, টক-শো, মিছিল ও স্লোগানে যে ভাষার ব্যবহার আমরা দেখছি, তা শালীনতার সীমানা ভেঙে দিচ্ছে; এতে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র এবং সহিংসতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

প্রতীক, মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
রাজনীতি শুধু নীতি ও ক্ষমতার খেলা নয়; এটি প্রতীকের প্রশ্নও। মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত, জাতীয় কবি, বিজয় দিবস-এসব আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। এসব প্রতীকের প্রতি অবহেলা বা অসম্মান দেখানো মানে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। তাই রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব-জনপরিসরে ন্যূনতম শালীনতা নিশ্চিত করা, ঘৃণা ও কুরুচির বিস্তার রোধ করা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের ভারসাম্য রক্ষা করা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা দেখছি, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অনেক সময় যুক্তির বদলে কণ্ঠস্বরের তীব্রতায় নির্ধারিত হচ্ছে। নীতি, কর্মসূচি ও ভিশনের জায়গায় ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষপূর্ণ উপমা ও ইতিহাসবিবর্জিত মন্তব্য জায়গা করে নিচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি কেবল বিভক্তই হবে না; গণতান্ত্রিক আস্থাও ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।

অতপর:
কারও পরাজয়ে আনন্দ পাওয়া মানবিকভাবে দ্বিধাজনক হতে পারে। কিন্তু যদি সেই পরাজয় অশালীন, অসংবেদনশীল ও ইতিহাসবিমুখ রাজনৈতিক চর্চার প্রত্যাখ্যান হয়-তাহলে সেটিকে একটি সামাজিক বার্তা হিসেবেই দেখা উচিত। আমাদের প্রশ্ন একটাই: আমরা কেমন রাজনীতি চাই? বিভাজন, কুরুচি ও উসকানির রাজনীতি- নাকি ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, ভাষায় সংযত এবং মূল্যবোধে দৃঢ় এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি?

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণেরই-আর সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ-এর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভাষা, মানদণ্ড ও নৈতিক দিকনির্দেশ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.