নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

এই বেশ ভাল আছি

স্বর্গ - স্পর্শ

স্বপ্ন দেখব বলে আমি দু চোখ পেতেছি.

স্বর্গ - স্পর্শ › বিস্তারিত পোস্টঃ

হুমায়ুন আজাদ এর কবিতা -১

২৩ শে জুলাই, ২০১৪ দুপুর ১:৩৭

আমি সম্ভবত খুব ছোট কিছুর জন্য





আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য মারা যাবো

ছোট ঘাসফুলের জন্যে

একটি টলোমলো শিশিরবিন্দুর জন্যে

আমি হয়তো মারা যাবো চৈত্রের বাতাসে

উড়ে যাওয়া একটি পাঁপড়ির জন্যে

একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে



আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো

দোয়েলের শিসের জন্যে

শিশুর গালের একটি টোলের জন্যে

আমি হয়তো মারা যাবো কারো চোখের মণিতে

গেঁথে থাকা একবিন্দু অশ্রুর জন্যে

একফোঁটা রৌদ্রের জন্যে



আমি সম্ভবতখুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো

এক কণা জ্যোৎস্নার জন্যে

এক টুকরো মেঘের জন্যে

আমি হয়তো মারা যাবো টাওয়ারের একুশ তলায়

হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজাপতির জন্যে

এক ফোঁটা সবুজের জন্যে



আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো>



খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্যে

খুব ছোট দুঃখের জন্যে

আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে

একটি ছোটো দীর্ঘশ্বাসের জন্যে

একফোঁটা সৌন্দর্যের জন্যে।





.।.।.।.।.।.।.।.।.।.।.।.।.।

আমাকে ভালবাসার পর





আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার,

যেমন হিরোশিমার পর আর কিছুই আগের মতো নেই

উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত।



যে কলিংবেল বাজে নি তাকেই মুর্হুমুহু শুনবে বজ্রের মত বেজে উঠতে

এবং থরথর ক’রে উঠবে দরোজাজানালা আর তোমার হৃৎপিন্ড।

পরমুহূর্তেই তোমার ঝনঝন-ক’রে ওঠা এলোমেলো রক্ত

ঠান্ডা হ’য়ে যাবে যেমন একাত্তরে দরোজায় বুটের অদ্ভুদ শব্দে

নিথর স্তব্ধ হ’য়ে যেত ঢাকা শহরের জনগণ।



আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার।

রাস্তায় নেমেই দেখবে বিপরীত দিক থেকে আসা প্রতিটি রিকশায়

ছুটে আসছি আমি আর তোমাকে পেরিয়ে চ’লে যাচ্ছি

এদিকে-সেদিকে। তখন তোমার রক্ত আর কালো চশমায় এত অন্ধকার

যেনো তুমি ওই চোখে কোন কিছুই দ্যাখো নি।



আমাকে ভালবাসার পর তুমি ভুলে যাবে বাস্তব আর অবাস্তব,

বস্তু আর স্বপ্নের পার্থক্য। সিঁড়ি ভেবে পা রাখবে স্বপ্নের চূড়োতে,

ঘাস ভেবে দু-পা ছড়িয়ে বসবে অবাস্তবে,

লাল টুকটুকে ফুল ভেবে খোঁপায় গুঁজবে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন।



না-খোলা শাওয়ারের নিচে বারোই ডিসেম্বর থেকে তুমি অনন্তকাল দাঁড়িয়ে

থাকবে এই ভেবে যে তোমার চুলে ত্বকে ওষ্ঠে গ্রীবায় অজস্র ধারায়

ঝরছে বোদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদল।



তোমার যে ঠোঁটে চুমো খেয়েছিলো উদ্যমপরায়ণ এক প্রাক্তন প্রেমিক,

আমাকে ভালবাসার পর সেই নষ্ট ঠোঁট খঁসে প’ড়ে

সেখানে ফুটবে এক অনিন্দ্য গোলাপ।



আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার।

নিজেকে দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত মনে হবে যেনো তুমি শতাব্দীর পর শতাব্দী

শুয়ে আছো হাসপাতালে। পরমুহূর্তেই মনে হবে

মানুষের ইতিহাসে একমাত্র তুমিই সুস্থ, অন্যরা ভীষণ অসুস্থ।



শহর আর সভ্যতার ময়লা স্রোত ভেঙে তুমি যখন চৌরাস্তায় এসে

ধরবে আমার হাত, তখন তোমার মনে হবে এ-শহর আর বিংশ শতাব্দীর

জীবন ও সভ্যতার নোংরা পানিতে একটি নীলিমা-ছোঁয়া মৃণালের শীর্ষে

তুমি ফুটে আছো এক নিষ্পাপ বিশুদ্ধ পদ্ম-

পবিত্র অজর।





.।.।.।.।.।.।.।.।.।.।।।



আমাদের মা







আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি।

আমাদের মা গরিব প্রজার মত দাঁড়াতো বাবার সামনে,

কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতোনা।

আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে

মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি।

আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিলো, কিন্তু ছিলো আমাদের সমান।

আমাদের মা ছিলো আমাদের শ্রেনীর, আমাদের বর্ণের, আমাদের গোত্রের।

বাবা ছিলেন অনেকটা আল্লার মতো, তার জ্যোতি দেখলে আমরা সেজদা দিতাম

বাবা ছিলেন অনেকটা সিংহের মতো, তার গর্জনে আমরা কাঁপতে থাকতাম

বাবা ছিলেন অনেকটা আড়িয়াল বিলের প্রচন্ড চিলের মতো, তার ছায়া দেখলেই

মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম।

ছায়া সরে গেলে আবার বের হয়ে আকাশ দেখতাম।

আমাদের মা ছিলো অশ্রুবিন্দু-দিনরাত টলমল করতো

আমাদের মা ছিলো বনফুলের পাপড়ি;-সারাদিন ঝরে ঝরে পড়তো,

আমাদের মা ছিলো ধানখেত-সোনা হয়ে দিকে দিকে বিছিয়ে থাকতো।

আমাদের মা ছিলো দুধভাত-তিন বেলা আমাদের পাতে ঘন হয়ে থাকতো।

আমাদের মা ছিলো ছোট্ট পুকুর-আমরা তাতে দিনরাত সাঁতার কাটতাম।

আমাদের মার কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিলো কিনা আমরা জানি না।

আমাদের মাকে আমি কখনো বাবার বাহুতে দেখি নি।

আমি জানি না মাকে জড়িয়ে ধরে বাবা কখনো চুমু খেয়েছেন কি না

চুমু খেলে মার ঠোঁট ওরকম শুকনো থাকতো না।

আমরা ছোট ছিলাম, কিন্তু বছর বছর আমরা বড় হতে থাকি,

আমাদের মা বড় ছিলো, কিন্তু বছর বছর মা ছোটো হতে থাকে।

ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ার সময়ও আমি ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম।

সপ্তম শ্রেনীতে ওঠার পর ভয় পেয়ে মা একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে।

আমাদের মা দিন দিন ছোটো হতে থাকে

আমাদের মা দিন দিন ভয় পেতে থাকে।

আমাদের মা আর বনফুলের পাপড়ি নয়, সারাদিন ঝরে ঝরে পড়েনা

আমাদের মা আর ধানখেত নয়, সোনা হয়ে বিছিয়ে থাকে না

আমাদের মা আর দুধভাত নয়, আমরা আর দুধভাত পছন্দ করিনা

আমাদের মা আর ছোট্ট পুকুর নয়, পুকুরে সাঁতার কাটতে আমরা কবে ভুলে গেছি।

কিন্তু আমাদের মা আজো অশ্রুবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত

আমাদের মা আজো টলমল করে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.