নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সৌভিকের চিন্তাচর্চা

চারিদিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি

সৌভিক ঘোষাল

পেশায় সাহিত্যের শিক্ষক। মতাদর্শে মার্কসবাদী। কোলকাতার বাসিন্দা

সৌভিক ঘোষাল › বিস্তারিত পোস্টঃ

কৃষি পরিকাঠামোর বিকাশে সরকারী উদ্যোগের ইস্যুটি সামনে আনতে হবে

১৩ ই অক্টোবর, ২০১৩ দুপুর ১:২৪

সম্প্রতি একটা খবর অর্থনীতির দুনিয়ায় খানিকটা বিষ্ময় মাখা কোতূহল তৈরি করেছে। ভালো বৃষ্টির ফলে এই বছরে কৃষিক্ষেত্রে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। যা অতীতের বছরগুলিতে দেড় দুই শতাংশের গড়ের প্রায় তিনগুণ। বলাই বাহুল্য কৃষি ক্ষেত্রে এই বিকাশ গ্রামের মানুষের হাতে যে অতিরিক্ত অর্থের যোগান দেবে তা অন্যান্য শিল্পদ্রব্যের চাহিদা বিকাশের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতিকেও অনেকখানি চাঙ্গা করবে। এই খবরের সূত্র ধরে কৃষিক্ষেত্র নিয়ে সরকারী নীতির আমূল বদলের দাবিটি আরেকবার তোলার জন্যই এই লেখা।

বুর্জোয়া অর্থনীতি রাজনীতির জগতে একটা চালু ধারণা হল অর্থনীতির ব্যাপক উন্নয়নের প্রেক্ষিতে বেশিরভাগ মানুষের কৃষিতে যুক্ত হয়ে থাকা একটা দায়, একটা অতীতের অনভিপ্রেত রেশ, যা উন্নতির জন্য দ্রুত ঝেড়ে ফেলতে হবে। অধুনা অর্থনীতির যা কিছু সম্ভাবনা তা নাকি কিছুটা শিল্পে (যা মূলত রপ্তানীমুখী চরিত্রের হওয়া বাঞ্ছনীয়) আর পরিষেবায়। সারা পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে জিডিপির ক্ষেত্রে কৃষির স্বল্প অবদানের বিষয়টাকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে ভারতকেও সেই অভিমুখে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখান বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ রাজনীতিবিদেরা।

আমাদের দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষ এই শিল্প বা পরিষেবার গ্রহীতা হওয়ার যায়গাতেই নেই তাদের চরম দারিদ্রের কারণে। অর্জুন সেনগুপ্ত কমিটির রিপোর্ট ব অন্যান্য অনেক রিপোর্ট দেখিয়েছে দেশের ৭৭ শতাংশ মানুষ দিনে কুড়ি টাকার বেশি ব্যয় করতে পারেন না। আমাদের শিল্প আর পরিষেবার বন্টনের চরিত্রটা তাই বাধ্যতামূলকভাবে দেশের একটা ছোট অংশের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ অথবা রপ্তানীমুখী। শিল্প/পরিষেবার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্মাণের পুঁজির জন্য মূলত নির্ভর করা হয় বিদেশী বিনিয়োগের ওপর। কোনও কারণে ডলার বিনিয়োগে ঘাটতি হলে বা বিনিয়োগকৃত ডলার ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হলে গোটা অর্থনীতি জুড়ে ত্রাহি ত্রাহি রব পড়ে।

আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে গেলে এদেশের ষাট শতাংশ মানুশ যে কৃষির সাথে জড়িত, সেই কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ কয়েক গুণ বাড়ানো দরকার। আমাদের দেশে কৃষিতে যে পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে তা মূলত ব্যক্তিপুঁজি। সেটা ধনী চাষী বা কুলাকদের বড় পরিমাণ বিনিয়োগ হোক বা মাঝারী ক্ষুদ্র চাষীর ছোট পরিমাণ বিনিয়োগ। বিপরীতে কৃষিতে সরকারী বিনিয়োগের পরিমাণ নেহাৎই কম। অন্যদিকে শিল্প বা পরিষেবা ক্ষেত্রকে উৎসাহ প্রদানের নামে সরকার বিপুল পরিমাণ ভরতুকি দেয়। পরিকাঠামো নির্মাণের দায় গ্রহণ করে।

অথচ কৃষি উপকরণের জোগান যথাযথ হলে কৃষি উৎপাদনের বৃদ্ধি কতটা হতে পারে সেটা সাম্প্রতিক সময়ে ভালো বৃষ্টির সাহায্যে পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধির নিদর্শন থেকেই বোঝা যায়। টাইমস অব ইণ্ডিয়া এবং ইকনমিক টাইমস এর এক রিপোর্ট জানাচ্ছে ভালো বৃষ্টির ফলে এই বছরে কৃষি অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। শুধু বৃষ্টির সহায়তাতেই কৃষি ক্ষেত্রে জিডিপি বেড়ে গেল প্রায় তিনগুণ। এই তথ্য থেকে বোঝাই যায় শুধু প্রকৃতির দানের মুখাপেক্ষী করে ভারতীয় কৃষিকে ফেলে না রাখলে কৃষির ক্ষেত্রে যথেষ্ট সম্ভাবনা বিদ্যমান।

কৃষির বিষয়টি কীভাবে অর্থনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। কৃষি আর লাভজনক নয়, এই যুক্তিতে কৃষিতে সরকারী বিনিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনাটাই বুর্জোয়া অর্থনীতি রাজনীতির বাইরে চলে যাচ্ছে, যাকে প্রশ্ন করা দরকার। শুধু বুর্জোয়া দলগুলিই নয়, সি পি এম এর মতো তথাকথিত বাম দলও একই কাজ করেছে। আমাদের সবারই মনে আছে ২০০৬ এর পশ্চিম বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বুদ্ধবাবু ও সি পি এমের প্রধান অ্যাজেন্ডাই হয়ে উঠেছিল কৃষিকে নস্যাৎ করা। কৃষকের (শিল্প/রিয়েল এস্টেটের জন্য) জমি বেচে দেওয়াটাই উচিৎ কারণ কৃষি করে লাভ আর হবে না, এটাই ভবিতব্য হিসেবে স্থাপন করা হয়েছিল। যে টুকু বিতর্ক ছিল সেটা শুধু অধিগ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে। রাজারহাট মডেলের সাফল্য আর সিঙ্গুর মডেলের ব্যর্থতা - এরকম ভাবেই আলোচনা এগোচ্ছিল সি পি এমের মধ্যে এবং সমর্থক মহলে।

গোটা ভারতেও এই সময়ে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া গতি পেতে চাইছিল সংসদে নতুন পাশ হওয়া এস ই জেড নীতিকে কেন্দ্র করে। এস ই জেড আইন পাশ হওয়ার সময় তার বিরুদ্ধে সংসদে একটি ভোটও পড়েনি, কিন্তু এই আইন রূপায়ণে সর্বত্র প্রবল বাধার মুখোমুখি হয়েছিল। ১৮৯৪ সালের ঔপনিবেশিক জমি অধিগ্রহণ আইন কে হাতিয়ার করে তরতর করে এগোতে চাইছিল জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া। ডান, সংসদীয় বাম সবার মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করে শিল্প/পরিকাঠামো/রিয়েল এস্টেট তৈরির উন্নয়ন মডেল নিয়ে একটা সামীপ্য দেখা গিয়েছিল। বিপরীতে বাম আন্দোলনের ভালোরকম ঐতিহ্য থাকুক আর নাই থাকুক, সব রাজ্যেই কৃষকদের ব্যাপক বাধার সামনে পড়তে হয় এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে,শেষ পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণের পুরনো আইনটা বাতিলই করে দিতে হয়।

এই গোটা পরিঘটনাটি একটি বিষয়কে প্রমাণ করে, কৃষির প্রতি জমির প্রতি কৃষকের মমতা কমে নি, ভূমিহীন কৃষকের জমির আকাঙ্ক্ষাও শেষ হয়ে যায় নি। আমূল ভূমিসংস্কার এর ইস্যুটা তাই কোনও মৃত ইস্যু আদৌ নয়। খাস জমির আন্দোলন থেকে অনেক ব্যাপক জনভিত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কোনও অতীত স্বপ্নমাত্র নয়।

সি পি এম/ সি পি আই এর মতো দলের ও দল পরিচালিত সরকারের সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম নিয়ে অবস্থান ও ভূমিকা স্পষ্ট করে দিয়েছিল কৃষি ও কৃষকের প্রশ্নটিকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে স্তাপন করার সমস্ত রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা তারা হারিয়েছেন, বুর্জোয়া উন্নয়ন তত্ত্বের কাছে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বন্ধক দিয়েছেন। সংসদীয় ক্ষমতার মোহে জনগণের রাজনৈতিক দাবি থেকে সরে আসার মূল্য তাদের দিতে হয়েছে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, সাংগঠনিক ক্ষয় এবং পরিশেষে এমনকী সংসদীয় রাজনীতির অঙ্কের হিসেবেও অপাংক্তেয় হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।

ভারতীয় রাজনীতিতে বামপন্থার পুনঃজাগরণের জন্য কৃষিকে যথাযোগ্য জায়গায় স্থাপন করাটা প্রাথমিক কাজ। কৃষির ক্ষেত্রে মূল দাবিগুলো হল সার বীজ বিদ্যুৎ সেচ হিমঘর ফসল সংগ্রহর মত ফসলের উৎপাদন সংরক্ষণ ও বন্টনে সরকারী হস্তক্ষেপের দাবি। কৃষিতে সরকারী পরিকাঠামো তৈরি ও বিনিয়োগের দাবি। ভালো সেচ কৃষিকে এখনো কতটা লাভজনক করতে পারে সাম্প্রতিক বছরে ভালো বৃষ্টির ফলে কৃষির নিদারুণ বৃদ্ধি তার একটা প্রমাণ।

ভালো বৃষ্টির ফলে এই বছরে কৃষিক্ষেত্রে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। যা অতীতের বছরগুলির গড়ের প্রায় তিনগুণ। বলাই বাহুল্য কৃষি ক্ষেত্রে এই বিকাশ গ্রামের মানুষের হাতে যে অতিরিক্ত অর্থের যোগান দেবে তা অন্যান্য শিল্পদ্রব্যের চাহিদা বিকাশের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতিকেও অনেকখানি চাঙ্গা করবে। ভারতীয় অর্থনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে রপ্তানি নির্ভর মডেলটিকে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বিশ্ব বাজারের মর্জির ওপর অতি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে দেখেছি। আমেরিকা ইউরোপের মন্দা ভারতের এত দিনের তাক লাগানো বিকাশের গতিকে গত দু বছরে ভালোই নামিয়ে এনেছে। এ বছরে ভারতীয় অর্থনীতি ডলারের আমেরিকা প্রত্যাবর্তন ও সেই সূত্রে টাকার অবমূল্যায়ন ও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঘাটতির নানান আশঙ্কায় যখন জর্জরিত তখন প্রকৃতির হাত ধরে কৃষির বিকাশ সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্বস্তির কিছু হাওয়া এনে দিচ্ছে।

কৃষক আন্দোলনকে জমি বাঁচানোর আন্দোলন ছাড়াও আগ্রাসী দাবিদাওয়ার আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে হবে। এই সময়ে তাই জোরের সাথে আবার কৃষি পরিকাঠামোর দাবিগুলো তোলা দরকার। সেচের ক্ষেত্রে সরকারী বিনিয়োগ কেন বহুগুণ বাড়বে না? সোনালী চতুর্ভুজ থেকে জে এন এন ইউ আর এম এর মতো বড় মাপের প্রকল্প সেচের ক্ষেত্রেও নেওয়া দরকার। সেচের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতে ভরতুকি বাড়াতে হবে অনেক পরিমাণে। অতীতের ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের মতো সার বীজ কারখানার জাতীয়করণের দাবি বা সরকারী সমবায়/রেশন প্রকল্পের মাধ্যমে এর বিলিবন্টন এর দাবি তোলা দরকার।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১৩ ই অক্টোবর, ২০১৩ রাত ১০:০৮

েবনিটগ বলেছেন: kigo dada, pujor chutite bhaloi blogging niye metecho dekhi, agge agge :) :)

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.