![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পেশায় সাহিত্যের শিক্ষক। মতাদর্শে মার্কসবাদী। কোলকাতার বাসিন্দা
গুজরাট মডেল এর উন্নয়ন গাথায় বাস্তব নেই, আছে শুধু কুহক
বিভিন্ন মিডিয়া জুড়ে গত কয়েকমাস ধরে লাগাতার একটা মিথ তৈরি করা হচ্ছে গুজরাট ও তার মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে। বিজেপির পক্ষ থেকে যখন মোদীকে ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত করা হলো, তখন থেকে এই প্রচার একটা ঝড়ের চেহারা নিল। উন্নয়ন কাকে বলব, তার মডেল কি হবে, শুধু আর্থিক বিকাশকেই উন্নয়ন ধরতে হবে না মানব উন্নয়ন এর বিবিধ সূচকগুলি তাতে গুরূত্ব পাবে, এই নিয়ে অর্থনীতির দর্শন সংক্রান্ত কিছু ঝোড়ো বিতর্কও আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, যাতে অংশগ্রহণ করলেন এমনকী এই সময়ের দুই দিকপাল অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, জগদীশ ভগবতীও। গুজরাট অন্তত ভারতীয় মানদণ্ডে প্রায় সব পেয়েছির দেশ, সবচেয়ে এগিয়ে থাকা এক রাজ্য, (যার নেপথ্যে মোদীর অনবদ্য নেতৃত্ব – যে কথাটা কখনো সোচ্চারে এবং কখনো মৌনমুখরভাবে সামনে আনা হচ্ছে), এই প্রচারের মধ্য কতটা সত্য আর কতটাই বা মিথ্যা তা তথ্যপ্রমাণ সহযোগে যাচাই করার দরকার আছে। নরেন্দ্র মোদী শুধু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও দাঙ্গার মুখ হিসেবেই যে কলঙ্কিত তা নন, গোয়েবলসীয় প্রচারের (গোয়েবলস ছিলেন হিটলারের জমানায় তার প্রচার সচিব। একটি মিথ্যাকে বারবার প্রচার করে তাকে সত্য বলে বিশ্বাস করানোর ক্ষেত্রে তার গৃহীত কৌশল এখন বহু ব্যবহৃত।) একটা ধরণেরও যে নিদর্শন গুজরাটের উন্নয়ন সম্পর্কে সযত্নে লালিত মিথ ও সত্যের তুলনা করলেই তা ধরা পড়বে। আমরা স্থান পরিমিতির কথা মাথায় রেখে কয়েকটি মূল প্রসঙ্গকেই এই লেখায় তুলে আনার চেষ্টা করবো।
১) প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ – মনে রাখা দরকার প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের মধ্যে দিয়ে উন্নয়নকে কমিউনিস্টরা কখনোই উন্নয়নের মডেল বলে মনে করে না। এই বিতর্কে এখানে না ঢুকে শুধু এটুকুই মনে রাখার এই প্রসঙ্গে মোদীর মিথ্যাচারের দিকটি। মোদী ২০১৩ তে তার শিল্পপতি সম্মেলন ভাইব্রান্ট গুজরাট’ এ বলেছিলেন ‘ভারতে বিশ্বপুঁজির দুয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে গুজরাট’। দাবিটি মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচারিতও হয়েছে আর স্বাভাবিকভাবেই সেগুলি পেইড নিউজ কিনা তা নিয়ে বিতর্ক দানা বেধেছে। কারণ প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে প্রকৃত তথ্যটি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া স্বয়ং জানিয়েছে। সেই তথ্য অনুযায়ী প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের নিরিখে মহারাষ্ট্রর (দাদরা, নগর হাভেলি, দমন দিউ সহ) শতাংশ মাত্রা ৩২, (উত্তর প্রদেশ হরিয়ানার কিছু অংশ সহ) দিল্লির শতাংশ মাত্রা ১৯, সেখানে গুজরাটের শতাংশমাত্রা অন্ধ্রপ্রদেশের সমানই – ৪। এর আগে রয়েছে ৬ শতাংশ মাত্রা নিয়ে তামিলনাড়ু এবং কর্ণাটক।
২) সার্বিক পুঁজি নিবেশ - সার্বিক পুঁজি নিবেশের দিক থেকেও গুজরাট রয়েছে পাঁচ নম্বরে, সমগ্র পুঁজি নিবেশের ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে তার শতাংশ মাত্রা ৪.৬। তার আগে রয়েছে ১৮.৩ শতাংশ মাত্রা নিয়ে মহারাষ্ট্র, ১২.২ শতাংশ মাত্রা নিয়ে দিল্লি, ৬ শতাংশ মাত্রা নিয়ে তামিলনাড়ু এবং ৫.২ শতাংশ মাত্রা পশ্চিমবঙ্গ।
৩) রাজ্যভিত্তিক জিডিপি – ১৮ জুন ২০১৩ তে আই বি এন চ্যানেলে এক লাইভ সাক্ষাৎকারে মোদী দাবি করেছেন ‘ ভারতের জিডিপিতে সবথেকে বেশি অবদান রেখেছে গুজরাট’। এটিও এক সর্বৈব মিথ্যা দাবি। দেশের সামগ্রিক জিডিপি তে মহারাষ্ট্রের অংশভাগ যেখানে ১৫ শতাংশ, উত্তর প্রদেশের ৮.২ শতাংশ, অন্ধ্রপ্রদেশের ৭.৮ শতাংশ, তামিলনাড়ুর ৭.৭ শতাংশ, গুজরাটের সেখানে ৭.৩ শতাংশ।
৪) মাথাপিছু ঋণ – পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার সরকারের যাবতীয় সঙ্কটের জন্য বামফ্রন্টের করে যাওয়া বিপুল ঋণ এর কথা বারেবারে বলে থাকেন। কিন্তু মাথাপিছু ঋণের হিসেবে গুজরাট সবাইকেই পেছনে ফেলেছে। মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু ঋণ ২৫,০০০ টাকা, অন্ধ্রপ্রদেশের ২০,০০০ টাকা, উত্তরপ্রদেশের ১৪,০০০ টাকা। সবাইকে ছাপিয়ে ৩০,০০০ টাকা মাথা পিছু ঋণ নিয়ে সবার শীর্ষে গুজরাট।
৫) বিদ্যুতায়ন ও বিদ্যুতের মাসুল – গুজরাটের বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত এবং তা অন্যান্য রাজ্যকে বিদ্যুৎ ধার দেয়, এই দাবির পাশাপাশিই যদি মোদী জমানায় বিদ্যুতায়ন কর্মসূচীকে রাখি, তবে তা খুব আলোকোজ্জ্বল ছবি তুলে ধরে না। মোদী মসনদে বসার আগেই গুজরাটে ৮০.৪ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল আলোকায়নের প্রাথমিক উৎস। ২০০১ থেকে ২০১১ এই দশ বছরে তা আর দশ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০.৪ শতাংশে। কিন্তু এই সময়ে কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কর্ণাটক এই হারকে অনেকটা বেশি বাড়িয়ে গুজরাটের ওপরে স্থান পেয়েছে। কেরালা এই দশ বছরে ৭০.২ শতাংশ থেকে ৯৪.৪ শতাংশে, তামিলনাড়ু ৭৮.২ শতাংশ থেকে ৯৩.৪ শতাংশে, অন্ধ্রপ্রদেশ ৬৭.২ শতাংশ থেকে ৯২.২ শতাংশে, কর্ণাটক ৭৮.৫ শতাংশ থেকে ৯০.৬ শতাংশে নিয়ে যেতে পেরেছে। এই হারের নিরিখে গুজরাট দাঁড়িয়ে আছে ১১ নম্বরে।
বিদ্যুৎ মাসুলও ভারতের মধ্যে অধিকাংশ রাজ্যের তুলনায় গুজরাটে বেশ বেশি। নিচের সারণি থেকেই তা স্পষ্ট হবে।
ক্ষেত্র গুজরাট গড় ভারতে গড় গুজরাট ক্রম
কৃষি ১.৭৬ টাকা ১.৫৩ টাকা ১৭
গৃহস্থালী ৩.৭৩ টাকা ৩.২০ টাকা ২১
শিল্প ৫.৩২ টাকা ৪.৯৭ টাকা ২২
৫) জনস্বাস্থ্য/শিশুমৃত্যুর হার -বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক অর্থনীতির নিরিখ থেকে গুজরাট অনেকটাই পিছিয়ে আছে। যেমন শিশুমৃত্যুর হার। আমরা মোদির সময়কালে গুজরাটের শিশুমৃত্যুর হারের সঙ্গে অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যে এই হারের তুলনা করতে পারি
রাজ্য ২০০১ ২০০৮ হ্রাস/শতাংশে
তামিলনাড়ু ৪৯ ৩১ ৫৮
মহারাষ্ট্র ৪৫ ৩৩ ৩৬
কর্ণাটক ৫৮ ৪৫ ২৯
গুজরাট ৬০ ৫০ ২০
ভারত (গড়) ৬৬ ৫৩ ২৫
গোটা ভারতে যে সময়পর্বে শিশুমৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ কমছে, সেখানে গুজরাটে সেটা মাত্র কুড়ি শতাংশ কমে এখনো ৫৩ শতাংশে থাকছে, যা জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে এক মারাত্মক ইঙ্গিৎ। পাশাপাশি গুজরাটে ৩৮.৮ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভোগেন আর এদিক থেকে দেশের মধ্যে তার স্থান ১৯ তম।
৬) শিক্ষা -২০০১ সালে মোদী তার ‘ভিশন’ এ জানিয়েছিলেন ২০১০ সালের মধ্যে গুজরাটকে ১০০ শতাংশ স্বাক্ষর করে তুলবেন। কিন্তু ২০১১ সালের জনগণনার তথ্য বলছে গুজরাটে স্বাক্ষরতার হার ৭৯.১ শতাংশ এবং এই নিরিখে দেশের মধ্যে তার অবস্থান ১৮ নম্বরে। প্রথম স্থানে রয়েছে ৯৩.৯ শতাংশ স্বাক্ষর নিয়ে কেরালা। ২০১০-১১ সালের তথ্য অনুযায়ী গুজরাটে প্রাথমিক থেকে উচ্চ প্রাথমিকে ড্রপ আউট ৩৭ শতাংশ, যা ভারতের জাতীয় গড় ৩২ শতাংশ থেকেও বেশ খানিকটা বেশি।
৭) শ্রমের মূল্য ও মজুরী : তীব্র বঞ্চনার ক্ষেত্র
পুঁজিনিবেশ থেকে কল্যাণমূলক ক্রিয়াকর্ম সবেতেই মাঝারি বা নিম্ন মানের হওয়া স্বত্ত্বেও গুজরাট ও তার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দেখতে চাওয়ার জন্য কর্পোরেট জগতের এই উদগ্র তাগিদ কেন ? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে শ্রম ও মজুরি সংক্রান্ত তথ্য পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে।
শহুরে ঠিকা শ্রমিকদের মজুরী সংক্রান্ত সারণী
রাজ্য /মজুরি /ক্রম
কেরালা/ ৩১০/ ১
রাজস্থান/ ১৭৪ /২০
বিহার /১৫৭ /২৫
গুজরাট/ ১৪৫/ ৩০
সারা ভারত/ ১৭০/ -
গ্রামীণ ঠিকা শ্রমিকদের মজুরী সংক্রান্ত সারণী
রাজ্য /মজুরি /ক্রম
কেরালা/ ৩১৫ /২
রাজস্থান/ ১৬০/ ২২
বিহার/ ১২৬/ ২৮
গুজরাট/ ১১৩/ ৩৩
সারা ভারত/ ১৩৯/ -
শহুরে স্থায়ী শ্রমিকদের মজুরী সংক্রান্ত সারণী
রাজ্য /মজুরী/ ক্রম
হরিয়ানা/ ৭৭৭/ ২
রাজস্থান /৪১৭ /২৫
বিহার /৪১২/ ২৬
গুজরাট/ ৩২০/ ৩০
সারা ভারত /৪৫০/ -
গ্রামীণ স্থায়ী শ্রমিকদের মজুরী সংক্রান্ত সারণী
রাজ্য /মজুরী/ ক্রম
দিল্লি /৫০৩/ ৮
বিহার/ ৪১২/ ১৪
রাজস্থান/ ৩০৬/ ২২
গুজরাট /২৫৪/ ২৮
সারা ভারত /২৯৯/ -
ওপরের সারণীগুলো থেকে স্পষ্ট শ্রমিকের মজুরী ও অধিকার এর দিক থেকে গুজরাট কতটা পিছিয়ে পড়া আর সেখানকার শ্রমিকের অধিকার ঠিক কি অবস্থায় আছে। আজকে নব্য উদারনৈতিক যুগে আগ্রাসী পুঁজিবাদ তার অধিক মুনাফার জন্য সমস্ত কল্যাণমূলক পোষাক ছেড়ে শ্রমিক শোষণের আদিম প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়ে অতি মুনাফাকে বজায় রাখতে সচেষ্ট। গোটা দেশ জুড়ে শ্রম শোষণের প্রক্রিয়াকে আরো মসৃণ করার জন্য কর্পোরেট জগৎ গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানাতে চাইছে। শ্রমিক শোষণের নির্লজ্জতম দৃষ্টান্ত হিসেবে গুজরাট মডেলকে তাই তারা নানা মোহিনী মিথ্যার মোড়কে তুলে ধরছে। এই সমস্ত মিথ্যার জালকে অবশ্যই আমাদের ছিন্ন করতে হবে। প্রকৃত তথ্য তুলে ধরে কর্পোরেটদের বানিয়ে তোলা মোদী মিথের মিথ্যাকে সামনে আনতে হবে। সদ্যপ্রয়াত লাতিন আমেরিকার ‘কুহক বাস্তব’ (ম্যাজিক রিয়ালিজম) এর কথাকার গার্সিয়া মার্কেজকে মনে রেখে আমরা বলতেই পারি মোদীর গুজরাট মডেল এর উন্নয়ন গাথায় বাস্তব নেই, আছে শুধু কুহক, শুধু মায়া।
[ এই লেখার তথ্যগুলি মূলত ‘গুজরাট ডেভেলপমেন্ট মডেল : এ রিয়েলিটি চেক’ – নামক বই থেকে নেওয়া। বইটিতে জনগণনার রিপোর্ট, ন্যাশানাল স্যাম্পেল সার্ভে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট এর মতো প্রামাণ্য দলিল তথ্যর আকর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।]
©somewhere in net ltd.
১|
১১ ই মে, ২০১৪ দুপুর ১:২১
রাহাত লতিফ তৌসিফ বলেছেন: ধন্যবাদ তথ্য বহুল পোস্টের জন্য। কেবল উগ্র হিন্দুবাঁদিরাই মোদীর মত নরখাদককে সমর্থন করে, এখানে এক কথায় সাম্প্রদায়িকতাকে পুজি করে ইলেকশন জেতা বলে কথা , অগ্রহণযোগ্য। আর উন্নয়নের মিথ্যা ভাঁওতাবাজি দিয়ে বেশী দিন চলা যায় না। আশা করি ভারতীয় জনসাধারন বুঝতে পারবে।