নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সৌভিকের চিন্তাচর্চা

চারিদিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি

সৌভিক ঘোষাল

পেশায় সাহিত্যের শিক্ষক। মতাদর্শে মার্কসবাদী। কোলকাতার বাসিন্দা

সৌভিক ঘোষাল › বিস্তারিত পোস্টঃ

খুলনা জেলার ভূমি ব্যবস্থাপনার ইতিহাস

১০ ই এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ১২:১৩


ভূমির সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক। এই ভূমিতে ভূমিষ্ঠ হয়ে ভূমির আলো, বাতাস, জল, শস্য, গাছপালা, ফল এসব নিয়েই মানুষের বেড়ে ওঠা এবং একদিন এই ভূমিতেই সকলের মিশে যাওয়া। বাংলাদেশের ভূমি উর্বর ও সমতল হওয়ায় কৃষি হয়ে ওঠে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকার প্রধান অবলম্বন। মানুষ জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদের উপযোগী করে ফসল ফলাতো এবং জীবিকা নির্বাহ করতো। একই সাথে জনসংখ্যা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে অধিক জনসংখ্যার বিভিন্ন চাহিদার যোগান দিতে গিয়ে ভূমির ওপর মানুষের নির্ভরতা আরও বেড়ে যেতে থাকে।

অতীতে বিভিন্ন সময় যারা শাসন, শোষণ কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে তারা নির্ভর করেছে ভূমি রাজস্বের ওপর। যদি কখনও প্রজাবৎসল রাজা ক্ষমতা গ্রহণ করতো তখন প্রজারা কিছুটা শান্তিতে থাকতে পারতো আবার যদি অত্যাচারী রাজা রাজ্য দখল করতো তখন প্রজাদের ওপর চলতো নিপীড়ন- প্রজার সমস্যার কথা না ভেবে রাজার খাজনা আদায়ই হয়ে উঠতো মূখ্য। প্রজাদের কাজ ছিল ফসল উৎপাদন করা আর রাজার কাজ ছিল প্রজাদের নিকট থেকে ভূমি-রাজস্ব আদায় করা। রাজা ভূমির মালিক আর প্রজা ভূমি ব্যবহারকারী। তাই যুগে যুগে চলেছে রাজায় রাজায় ভূমি দখলের লড়াই, ভূমি-রাজস্ব আদায়ের লড়াই।

বাংলাদেশের দক্ষিণের একটি জেলা খুলনা। এ জেলার উত্তরে যশোর ও নড়াইল জেলা দক্ষিণে সুন্দরবন। পূর্বে বাগেরহাট জেলা ও পশ্চিমে সাতক্ষীরা জেলা। ষাটের দশকের পূর্বে এ অঞ্চলের জমি ছিল এক ফসলি। তখন অষ্টমেশে বাঁধ দিয়ে বর্ষা মৌসুমে শুধু আমন ধানের চাষ করা হতো। কিন্তু ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা রোধ করায় সকল এক ফসলী জমি দোফসলি জমিতে পরিণত হয়।

তবে বাঁধের ফলে লবণাক্ততা রোধ হলেও নদীগুলো শুকিয়ে মরে গেছে বলে পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দেয়ার ফলে নদী নাব্যতা হারিয়ে ফেলে এবং নদী ভরাট হয়ে নূতন চরের সৃষ্টি হয় এবং ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দেয়। এর পর ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে কৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা জারি করা হলে ভূমিহীনদের মাঝে খাস জমি বিতরণ শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে ভূমিহীনদের চেয়ে ভূমিমালিক সমাজের শক্তিশালী লোকজনই অধিক ভূমি নামে বেনামে বন্দোবস্ত পায়। পরবর্তীতে ঘের ব্যবসা শুরু হলে জমির চাহিদা আরও বৃদ্ধি পায়। নতুন করে শোষণ শুরু হয়। প্রান্তিক চাষীরা হারায় তাদের জমি, মাস্তান ঘের মালিকদের কৌশলী চক্রান্তের কাছে। ব্যবস্থাপনা সহজ করার চেষ্টা করা হলেও এটি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। কালক্রমিকভাবে ভূমি ব্যবস্থাপনা আলোচনা করা যাক।

ভূমি ব্যবস্থাপনা রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ভূমির ওপর করারোপের ক্ষমতার মধ্য দিয়ে আধিপত্যের প্রমাণ পাওয়া যেত, কোন ভূখণ্ড কার দখলে আছে। তাই রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতো ভূমি ব্যবস্থাপনা তথা ভূমি প্রশাসন বা ভূমি রাজস্ব। কোন শাসকের অধীন সমগ্র ভূখণ্ডে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো বলেই এক শাসকের অধীন সব ভূখণ্ডে একই ধরণের ব্যবস্থাপনা দেখতে পাওয়া যায়।

ভূমি সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও ভূমি সংস্কারের ভাবনা সবসময় ই ছিল। বিভিন্ন সময়ে আর্থ-সামাজিক পটভূমির পরিপ্রেক্ষিতে এর পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। বাংলাদেশের যে কোন জেলার ভূমি রাজস্ব ও প্রশাসন ব্যবস্থার আলোচনায় হিন্দু, বৌদ্ধ, সুলতানী, পাঠান, মোঘল , বৃটিশ ও পাকিস্তানী আমলের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার আলোচনা অপরিহার্য । তাই বিভিন্ন সময়ের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার বিশদ বিবরণ নিচে দেওয়া হল।

প্রাচীন যুগঃ (৬০৬ খ্রিঃ পর্যন্ত )

প্রাচীন যুগে জনসংখ্যার তুলনায় সম্পদের প্রাচুর্য্য থাকায় জমির মালিকানার প্রশ্নটি তখন তেমন গুরুত্ব পায়নি । মানুষ তার নিজ আবাসস্থলের চারপাশের পতিত জমি ও জঙ্গল পরিস্কার করে কৃষি কাজের জন্য জমি প্রস্তুত করতো এবং তাতে চাষাবাদ করতো। ব্যক্তির জমির স্বীকৃতি তখন ছিল না। যিনি রাজা বা শাসন কর্তা থাকতেন তিনিই ছিলেন জমির মালিক আর প্রজার ছিল শুধু চাষাবাদের অধিকার। যিনি জমি চাষ করতেন তিনি জমি চাষের জন্য রাজাকে রাজস্ব প্রদান করতেন। রাজস্ব বলতে রাজার ভাগ বা অংশ {রাজন্ +স্ব} বোঝানো হত। ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কতগুলো নিয়মকানুনকে বোঝানো হতো যার মাধ্যমে ভূমির মালিকানা ও প্রজার অধিকার ইত্যাদি নিয়ন্ত্রিত হতো।

প্রাচীন যুগে ভূমির প্রকৃত অধিকারী কে ছিলেন সে বিষয়ে মতভেদ থাকলেও বিভন্ন সময়ে ভূমি ব্যবস্থা সম্বন্ধে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তাতে অনুমান করা যায় যে, রাজা বা রাষ্ট্র দেশের সমস্ত ভূমির মূল স্বত্বাধিকারী এবং মূল মালিক দুই-ই ছিলেন। সমাজের ক্রম বিবর্তনের ফলে এই চেতনাই বিকাশ লাভ করে যে রাজা বা রাষ্ট্রই সমাজ ব্যবস্থার ধারক ও নিয়ামক । এ সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনাই অন্যতম প্রধান অংশ। গুপ্ত যুগের যে কয়টি লিপি পাওয়া গিয়েছে তার প্রত্যেকটিতেই দেখা গেছে যে ভূমি বিক্রেতা হচ্ছেন রাজা বা রাষ্ট্র এবং বিক্রিত ভূমি ধর্মাচারের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত হত বলে রাজা দান পূণ্যের এক ষষ্ঠ ভাগের অধিকারী হতেন। তবে রাজা ভূমির অধিকারী হলেও দান বিক্রয়ে যথেচ্ছাচার করতেন না। প্রস্তাবিত ভূমি দান ও বিক্রিত হলে গ্রামবাসীদের কৃষি ও অন্যান্য কর্মের কোন অসুবিধা হবে কিনা একথাও চিন্তা করা হত।

ভূমি বিক্রয়ের ফলে রাজা ভূমির মালিকানা হারালেও ভূমির স্বত্বাধিকারের দাবী বজায় রাখতেন কর গ্রহণের মাধ্যমে। ভূমির মালিকেরা উত্তরাধিকার সূত্রে রাজস্ব বা করের বিনিময়ে জমি জমা ভোগ করতে পারতেন। এছাড়া রাজার নিজস্ব জমিও থাকত এবং এসব রাজকীয় জমির ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধান রাজা নিজেই করতেন। বিভিন্ন তাম্র শাসনে স্বীকৃত ষষ্ঠাধিকৃত নামক এক কর্মচারীর উল্লেখ থেকে ধারণা করা যায় যে, প্রাচীন যুগে সাধারণতঃ উৎপন্ন ফসলের এক ষষ্ঠাংশ কর হিসেবে দেওয়া হত। যে কর্মকর্তা এই কর আদায়ের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, তাঁকেই খুব সম্ভব ষষ্ঠাধিকৃত বলা হত। তদুপরি রাজভোগ বা রাষ্ট্রকে দেয় ভাগ, ভোগ, কর, হিরণ্য ইত্যাদি বিভিন্ন করের কথাও বিভিন্ন তাম্র শাসনে দেখা যায়। কোন কোন পন্ডিত মনে করতেন, রাজা সবসময় শস্যের ভাগ গ্রহণ করতেন না। তার বদলে মাঝে মাঝে মুদ্রাও গ্রহণ করতেন। সেই মুদ্রাই ছিল হিরণ্য। এ নিয়ে অবশ্য মতভেদ আছে। এই ভাগ, ভোগ, কর হিরণ্য ছাড়াও জনসাধারণকে অন্যান্য কর ও দিতে হত। ঘাট ও খেয়া পারাপার কর এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। রাজা আদায়কৃত অর্থের সাহায্যে প্রজাদের নিরাপত্তা বিধান ও যাবতীয় প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ করতেন। রাজস্ব ও কর আদায়ের জন্য রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত সব স্তরে রাজার কর্মচারী নিয়োজিত থাকত ।

বৌদ্ধ ও হিন্দু যুগঃ ( ৬০৬-১১৬১* ১২৬০ খ্রিঃ)

বৌদ্ধ ও হিন্দু যুগে খুলনা জেলার ভূমি রাজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থা সম্বন্ধে সঠিক কিছু জানা যায় না। সাধারণভাবে জানা না গেলেও কোন রাজ্য সীমানার অন্তর্ভুক্ত সকল ভূমির মালিক রাজাই ছিলেন। তিনি ভূমির স্বত্বাধিকারী না হলেও প্রজাদের নিকট হতে কর হিসেবে ফসলের অংশবিশেষ গ্রহণ করতেন। হিন্দু যুগে ভূমিতে চাষীদের মুখ্য ও ব্যক্তিগত অধিকার থাকায় পরিবারের প্রধান তার ইচ্ছানুযায়ী জমি দান, বিক্রয় বা অন্যকোনভাবে জমি হস্তান্তর করতে পারতেন। কৃষকেরা যারা তাদের জমি চাষের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলনা রাজা তাদেরকে জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারতেন। মোট উৎপাদনের এক ষষ্টাংশ রাজার প্রাপ্য অংশ বলে নির্ধারিত থাকায় রাজস্ব সাধারণতঃ শস্যের মাধ্যমে প্রদান করা হত এবং রাজার তরফ থেকে রাজস্ব আদায় কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা রাজস্ব সংগ্রহ করতেন। বাংলায় সেন রাজাদের আমলে মুদ্রায় রাজস্ব প্রদান ব্যবস্থার প্রচলন হয়।

মুসলিম আমলঃ (১২০৩/১২০৪-১৬৯০)

বাংলায় সুলতানী আমলই মুসলমান শাসকদের রাজত্বকাল। হিন্দু ও বৌদ্ধ যুগের প্রবর্তিত ভূমি ব্যবস্থাই লক্ষণাবতির মুসলমান শাসকেরা অনুসরণ করতেন। পাল ও সেন আমলে যে রাজস্ব প্রক্রিয়া শুরু হয় মুসলিম আমলে তার গুরুত্ব বেড়ে যায়। ফলে রাজা ও রায়ত বা কৃষকের মাঝে আরও বেশী করে সৃষ্টি হয় নানা ধরণের স্বত্বাধিকারী ভূ-স্বামী । এরা রাজস্ব আদায়কারী হলেও কার্যত ভূ-স্বামীই ছিলেন। অনেক সময় এরা বংশানুক্রমিকভাবে ভূমির স্বত্ব ভোগ করতেন। সুলতানী আমলে সরকারী কর্মচারীদের দ্বারা রাজস্ব সংগ্রহ না করে মন্ডল, স্থানীয় কৃষক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ করা হত । এ সময়ে ভূমি রাজস্ব আদায় করার জন্য স্থানীয় ভূমির মোটামুটি তিনটি ভাগ ছিল। (১) আমীর ও মালিকদের মধ্যে বরাদ্দকৃত ভূমি বা জায়গির ভূমি, (২) সুলতানদের খালসা বা খাস ভূমি, (৩) সামন্ত নৃপতি বা জমিদার ভূমি। তখনকার দিনে খেরাজ (ভূমি রাজস্ব), গনিমাত এবং অন্যান্য কর ছিল সুলতানদের আয়ের উৎস। খেরাজ ছিল ভূমি রাজস্ব আর গনিমাত ছিল যুদ্ধে লব্ধ দ্রব্যে শাসকদের প্রাপ্য এক-পঞ্চমাংশ। এ আমলে ভূমি রাজস্ব ছিল সচরাচর উৎপন্ন ফসলের এক-পঞ্চমাংশ।

খালসা ভূমির রাজস্ব সরাসরি রাজকোষে জমা হত। অনেক ক্ষেত্রে খালসা ভূমির আয়ের উপরই সরকারের আর্থিক সংগতি নির্ভরশীল ছিল। সুলতান কর্তৃক আমির-ওমরাহ, মোড়ল, ইজারাদার অথবা ঐ শ্রেণীর নিযুক্ত কর্মচারীদের দ্বারা জায়গির ভূমির রাজস্ব আদায় করা হত। রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এবং দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে সুলতানী আমলে সমগ্র রাজ্য বিভিন্ন অংশে (ইকতায়) বিভক্ত করে সেসব অংশ বিভিন্ন আমিরকে জায়গির হিসেবে দেওয়া হত এবং সে সব ভূমির আয় থেকে তাঁরা নিজেদের ও অধীনস্ত কর্মচারীদের ব্যয় নির্বাহ করতেন। এই সমস্ত বিভাগের শাসনকর্তাকে ‘মকতা’ বলা হত। এ সময়ে বিশেষ অঞ্চলের ‘খেরাজ’ (খাজনা) সংগ্রহের দায়িত্বভার বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির উপর ন্যস্ত ছিল।

খাজনা আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি আদায়কৃত খাজনার একটি নির্দিষ্ট অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে গ্রহণ করতেন। সুলতানদের রাজস্ব বিভাগের প্রধান কর্মচারীর উপাধি ছিল ‘সর-ই-গোমশতাই’। আরিন্দাহ নামক আরও একজন রাজস্ব কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি রাজধানী থেকে এসে বিভিন্ন মহলের রাজস্ব নিয়ে যেতেন।

সুলতানী আমলে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯ সাল) সর্ব প্রথম রাজস্ব প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপন করেছেন বলে মনে করা হয়। ঐ সময় সমগ্র রাজস্ব এলাকাকে দেওয়ানীখানা নামক অনেকগুলো প্রশাসনিক এককে বিভক্ত করা হয়। এগুলোই খুলনাসহ প্রদেশের অন্যান্য জেলার রাজস্ব প্রশাসনের ভিত্তি। পরবর্তী সময়ে এগুলো পরগণা হিসেবে পরিচিত হয়। শেরশাহ তাঁর সমগ্র রাজত্বকে কতকগুলো সরকার ও পরগণায় বিভক্ত করেন। আমিন দিয়ে মাপ-জোক করে প্রত্যেক রায়তের জমি আলাদা করা হয়। তিনি ফসলের এক-চতুর্থাংশ রাজস্ব হিসেবে ধার্য করেন। প্রত্যেক রায়ত তার উপর ধার্য রাজস্ব, জমির পরিমাণ ও সাক্ষ্য প্রভৃতিসহ একটি কবুলিয়ত সম্পাদন করে সরকারের কাছে জমা দিতেন। বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে পেতেন ‘পাট্টা’। ‘মুবাদ্দার’ নামে একজন কর্মচারী প্রত্যেক পরগণা কর্তৃক রাজ কোষে দেয় রাজস্ব নির্ধারণ করে দিতেন। কিন্তু পরগণা রাজ কোষে প্রজা ইচ্ছা করলে সরাসরি রাজস্ব জমা দিতে পারতেন। রায়তকে অবশ্য জমি জরিপের জন্য একটি এবং রাজস্ব আদায় বাবদ আর একটি কর বহন করতে হত।

মোঘল আমলঃ বাদশাহ আকবরের আমলে ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর রাজস্ব মন্ত্রী রাজা টোডরমল সমগ্র বাংলার রাজস্ব বন্দোবস্তের তালিকা প্রস্তুত করেন। তাঁর তালিকায় খালসা ভূমির রাজস্ব ৬৩,৭৪,২৬০ টাকায় এবং জায়গির ভূমির রাজস্ব ৪৩,৪৮,৮৯২ টাকায় নির্ধারিত হয়।

রাজা টোডরমল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার প্রদেশগুলোকে ১৯ টি সরকার বা রাজস্ব বিভাগ(Fiscal Division) এবং এগুলোকে আবার ৬৮২টি উপ-বিভাগ বা মহলে বিভক্ত করেন। এই তালিকার নাম ছিল আসলি জমা। টোডরমলের রাজস্ব তালিকা অনুসারে সুবাহ বাংলার সরকারগুলো হল (১) আরদবুজ ওরফে টান্ডা, (২) জনতাবাদ অর্থাৎ লাকনৌতি, (৩) ফতেহাবাদ, (৪) মাহমুদাবাদ, (৫) খলিফাতাবাদ (৬) বগলা অর্থাৎ বাকলা (৭) পূর্ণিয়া (৮) তাজপু (৯) ঘোড়াঘাট (১০) পাঞ্জরা, (১১) বারবকাবাদ, (১২) বাজুহা, (১৩) সোন্নারগাঁও, অর্থাৎ সোনারগাঁও, (১৪) লিহেট অর্থাৎ সিলেট, (১৫) চাটগাঁও, (১৬) শরীফাবাদ, (১৭) সোলায়মানবাদ, (১৮) সাতগাঁও এবং (১৯) মদারণ অর্থাৎ মন্দারণ। পরে ত্রিপুরা রাজ্য হলে উদয়পুর নামে আরও একটি সরকার বা রাজস্ব বিভাগ গঠিত হয়।

এই তালিকায় বর্ণিত সেই সময়কার সরকার খলিফাতাবাদ এবং সাতগাঁও ও ফতেহাবাদ সরকারের অংশ নিয়ে বর্তমান খুলনা জেলা গঠিত হয়েছিল। বর্তমান খুলনার পশ্চিমাঞ্চল সাতগাঁও সরকার এবং উত্তরপূর্ব অংশে ফতেহাবাদ সরকারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে খুলনা জেলার বৃহৎ অংশ সরকার খলিফাতাবাদ এর অন্তর্ভূক্ত ছিল।

রাজা টোডরমলের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্তর্ভূক্ত সরকার ও পরগণাগুলো ছিল (বিশেষ করে খুলনা জেলার ক্ষেত্রে)সুবিন্যস্ত। পরগণা গুলো কানুনগো কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এবং চৌধুরী বা জমিদারদের দ্বারা পরিচালিত হত। কানুনগো পরগণার রাজস্ব হিসাব রক্ষণের দায়িত্বে থাকতেন এবং তার কাছে পরগণার অধিবাসীদের খাজনার হার রেকর্ড করা থাকত। তিনি পরগণার জমি জরিপ পরিচালনা করতেন এবং তিনিই ছিলেন প্রজাসাধারণের অধিকার ও সুখ স্বাচ্ছন্দের রক্ষক । কানুনগোর অনুরূপ আরেকজন ছিলেন ‘পাটোয়ারী’। তিনি গ্রামের রাজস্ব ধার্য, আদায় ও রাজস্ব মূল্যায়ন করে তালিকা প্রণয়ন করতেন।

তৎকালে বাংলায় ১৯টি সরকারের অন্তর্ভুক্ত ভূমি ‘খালসা’ নামে পরিচিত ছিল। ‘খালসা’ ভূমির রাজস্ব সরাসরি রাজকীয় কোষাগারে জমা হত। ‘জায়গির’ জমির রাজস্বের পরিমাণ জায়গিরদারদের রাষ্ট্রীয় কাজে অবদানের উপর নির্ভর করত।

বাংলা পর্যন্ত মোঘল সম্রাজ্য বিস্তারের পর এখানে রাজস্ব বন্দোবস্ত পুনর্বিন্যাস করা হয়। বাংলার গভর্ণর শাহজাদা সুজা (১৬৩৯-১৬৬০খ্রিঃ) রাজস্ব তালিকা নতুন করে প্রণয়ন করেন ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে। এই রাজস্ব তালিকায় বাংলায় ১৯টি সরকারের পরিবর্তে ৩৪টি সরকার গঠন করা হয়। সরকারগুলোকে আবার ১,৩৫০টি উপ-বিভাগ বা মহালে বিভক্ত করা হয়। নতুন গঠিত সরকারগুলোর মধ্যে ৩২ তম সরকারটির নাম ছিল মুরাদখানা বা জেরাদখানা। এই সরকারে সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশ অন্তর্ভূক্ত ছিল এবং সুন্দরবন থেকে এই সরকার বাৎসরিক ৮,৪৫৪ টাকা আদায় করত। এই রাজস্ব মূল্যায়ন ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ পযর্ন্ত বহাল ছিল। নবাব মুর্শিদকুলী খানের আমলে প্রথম দিকে এই ব্যবস্থা চালু থাকলেও পরে তিনি নতুন রাজস্ব তালিকা প্রণয়ন করেন।

সম্রাট আওরঙ্গজেব মুর্শিদকুলী খানকে সুবে বাংলা র দেওয়ান নিযুক্ত করেন। মুর্শিদকুলী খান বাংলার রাজস্ব তালিকা পুনঃসংশোধন করেন। নূতন বন্দোবস্ত তৃতীয় মোঘল বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। সংশোধনকৃত নতুন রাজস্ব তালিকার নাম দেওয়া হয় ‘জমা-ই-কামিল তুমারি’। এই রাজস্ব তালিকায় সুবা ই-বাংলা কে ১৩টি চাকলা এবং ১,৬৬০টি পরগণায় বিভক্ত করেন। চাকলাগুলো ছিল নিম্নরুপঃ (১) বন্দর বালাশোর, (২) হিজলী, (৩) মুর্শিদাবাদ, (৪) বর্ধমান, (৫) হুগলী বা সাতগাঁও, (৬) তূষ্ণা, (৭) যশোর, (৮) আকবর নগর, (৯) ঘোড়াঘাট, (১০) বাড়িবাড়ি, (১১) জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা), (১২) শ্রীহট্র ও (১৩) ইসলামাবাদ (চট্রগ্রাম)

নতুন ব্যবস্থা অনুযায়ী সাতগাঁও সরকারের অংশ বিশেষসহ খলিফতাবাদ সরকারের পুরোটাই একসাথে যশোর চাকলার অন্তর্ভূক্ত হয়। বৃহত্তর খুলনা জেলা এই চাকলার অন্তর্ভুক্ত। সরকার সাতগাঁও এর পরগণাসমূহের মধ্যে বুড়ন, ভালুকা, হোসাইনপুর, কুলিয়াপুর, কলারোয়া এবং সরকার সুলাইমানাবাদের খুলনা, যশোর এবং ২৪ পরগণার অংশ নিয়ে বর্তমান বৃহত্তর খুলনা জেলা গঠিত হয়। প্রথম মোঘল বন্দোবস্তে বর্ণিত পরগণা মুকিমপুর চাকলা ভূষণা এবং পরগণা সেলিমাবাদ চাকলা জাহাঙ্গীরনগরের অন্তর্ভূক্ত হয়।

এই চাকলাগুলো রাজস্ব সংগ্রহের চাইতে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার ব্যাপারে অধিকতর উদ্যোগী ছিল। পরবর্তী সময়ে বৃটিশ আমলে বাংলার বিভিন্ন প্রদেশ ও জেলা এই চাকলাগুলোর ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চাকলা গঠন করে রাজস্ব আদান-প্রদান ছাড়াও প্রশাসনিক কাজে জমিদারদের নিরংকুশ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। মুর্শিদকুলী খাঁ পরে সমুদয় ‘খালসা’ ভূমিকে ‘ইহতিমাম’(Trust) বা বড় জমিদারি এবং ছোট তালুক নামে ১৫টি রাজস্ব সংগ্রহ বিভাগে বিভক্ত করেন।

নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর গৃহীত রাজস্ব বন্দোবস্ত বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার গভর্নর সুজা-উদ-দীন খান পুনরায় ভূমি বন্দোবস্ত করেন। তিনি নতুন নীতি অর্থাৎ প্রজার সামর্থ বা ফসলের অংশ নয়, জমিদারের সামর্থ্যের উপর ভিত্তি করে রাজস্ব নির্ধারণ করেন। তিনি ‘আবওয়াব’(Abwabs) প্রথার প্রচলন করে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করেন। ‘আবওয়াব’ ছিল তিন প্রকারের। যথা-‘খাসনবিসী’,‘কেফায়েৎ’ ও ‘তাউফির’। ‘কেফায়েৎ’ ছিল গুপ্ত খাজনা আদায়ের একটি ভাগ। ‘তাউফির’ ছিল রাজস্ব গোপনকৃত জমির উপর ধার্যকৃত রাজস্ব। নতুন কর ধার্য করার পিছনে যুক্তি ছিল এই যে, জমিদারেরা কৃষকদের কাছ থেকে আইনতঃ বে-আইনীভাবে অতিরিক্ত কর আদায় করতেন। কিন্তু এতে রাষ্ট্রের কোন ভাগ ছিল না। সুতরাং রাষ্ট্রের লাভের জন্য জমিদারদের উপর কর আরোপ করা উচিত। জমিদারদের নজর, পূন্যাহ, বাহাই, খইলত, পুষ্টাবানি, সুসমত, নেজারত, ফিলখানা ও ফৌজদারী একত্রে ‘জরমাহুত’ নামক বিভিন্ন আবওয়াব প্রদানে বাধ্য করা হত। এগুলো কাসিম আলী খান (১৭৬০-৬৩) এর সময় আরোপিত হয়। এই সময় রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়ে ২,৫৬,২৪,২২৩ টাকায় উন্নীত হয়।

আবওয়াবগুলো আসল জমার উপর ভিত্তি করে ১ আনা থেকে যে কোন অংকের টাকা পযর্ন্ত ধার্য করা হত। সূজা-উদ্দীন খোনের সময় পর্য্ন্ত আবওয়াবগুলো রায়তদের জন্য দুরূহ ছিল না। কারণ তখন অতিরিক্ত রাজস্ব ফসলের মূল্য বৃদ্ধি করে মিটানো হত। কিন্তু নবাব আলীবর্দী খানের (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রিঃ) আবওয়াবগুলো সত্যি সত্যিই প্রজাদের উপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে রায়তেরা ঐ সময় দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই অবস্থা কোম্পানীর আমল পযর্ন্ত চলে আসছিল।

চাঁচড়া জমিদারের ইতিহাসঃ

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে খুলনা জেলার অধিকাংশ কৃষি ভূমি চাঁচড়া জমিদারির অধীনে চলে যায়। এই জেলার রাজস্ব ইতিহাস চাঁচড়া রাজ পরিবারের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত।

খুলনার চাঁচড়া জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মাধব সিং ষোড়ষ শতাব্দীতে মুর্শিদাবাদের (পশ্চিমাংশ) ফতেসিং পরগণার অধিকাংশ ভূমির মালিক ছিলেন। পরে মাধব সিংহের অধস্তন তৃতীয় পুরুষের দুই ভ্রাতা এই বিরাট সম্পত্তির মালিকানা হারায় এবং ভাগ্যান্বষণে অন্যত্র চলে যায়। এদের এক ভ্রাতা ভুবনেশ্বর সিং জীবিকার তাগিদে মোঘল সেনাবাহিনীতে চাকুরী করেন। তিনি মোঘল সেনাবাহিনীতে অতুলনীয় অবদানের জন্য পুরস্কারস্বরুপ মোঘল কর্তৃপক্ষের নিকট হতে যশোর খুলনা অঞ্চলের ৪টি পরগণার জায়গির লাভ করেন। যথা- সৈয়দপুর, ইমামপুর, মুড়াগাছা এবং মল্লিকপুর। ভুবনেশ্বর সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মাহতাব রাম তাঁর উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। পরে মোঘল সম্রাট মাহতাব রামকে ঐ ৪টি পরগণার জমিদার হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এই এলাকার রাজস্ব পুনর্মূল্যায়ন করেন মাহতাব রাম। ১৬১৯ খ্রিঃ তিনি লোকান্তরিত হন এবং তাঁর পুত্র কর্ন্দপ রায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। কর্ন্দপ রায়ের সময়েই দাঁতিয়া, খালিশকাঠি, বাঘমারা এবং ইসলামাবাদ পরগণা চাঁচড়া জমিদারির অন্তর্ভূক্ত হয়। মোঘল কর্তৃপক্ষ এই সময়ে নতুন নিয়মে রাজস্ব সংগ্রহ শুরু করেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ছোট ছোট পরগণার রাজস্ব পার্শ্ববর্তী বড় জমিদারির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হত। মোঘল সম্রাট রাজা কর্ন্দপ রায়কে পার্শ্ববর্তী সকল ছোট পরগণার রাজস্ব আদায়কারী নিযুক্ত করেন। কোন কারণে যখন এসব পরগণার রাজস্ব বকেয়া পড়ত, রাজা কর্ন্দপ রায় সেসব পরগণা কিনে নিতেন। রাজা কর্ন্দপ রায়ের সময়ে ইমাদপুর পরগণায় চাঁচড়ার রাজবাড়ী নির্মাণ করা হয়। চাঁচড়া বর্তমান যশোর শহরের দক্ষিণ উপকন্ঠে খুলনা বেনাপোল সড়কের উপর অবস্থিত। চাঁচড়া রাজবাড়ীর ভগ্নাবশেষ এখনও পরিলক্ষিত হয়। রাজা কর্ন্দপ রায়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র মনোহর রায় ১৬৪৯ খ্রিঃ চাঁচড়ার জমিদার হন। তিনিও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজস্ব বকেয়া পড়া ছোট ছোট পরগণাগুলো কিনে নিতে থাকেন। মনোহর রায়ের সময়ে চাঁচড়া জমিদারির এলাকা বিস্তৃত হয় মোট ২৪ টি পরগণায়। ফলে জমিদারির আয় অনেক বৃদ্ধি পায়। সাথে সাথে জমিদারির সার্বিক উন্নতিও হয়। মহোনর রায়ের সময় পার্শ্ববর্তী পরগণা মোহাম্মদপুরের সীতারাম রায় প্রবল প্রতাপশালী হয়ে উঠেন এবং মনোহর রায়কে কর প্রদান করে জমিদারি লাভ করেন। তিনিও রাজস্ব বকেয়া পড়া ছোট ছোট পরগণাগুলো কিনতে থাকেন। ১৬৪৯ খ্রিঃ থেকে ১৭২৯ খ্রিঃ পযর্ন্ত চাঁচড়া জমিদার পরিবার নিম্নলিখিত পরগণাগুলো কিনে নেয় । এইগুলো ছিল রামচন্দ্রপুর, চেঁগুটিয়া, ইউসুফপুর, মালাই, তালা, ভাট্রা, সবনা, ফালুয়া, শ্রীপতি, কবিরাজ, কলিকাতা, পাইকান, মালপুর, সেলিমপুর, পানোয়ান, বুরান, বংদিয়া, রহিমাবাদ, সৈয়দ মাহমুদপুর, মাগুরা ঘোড়া, বেরাচি, রাখমংগল, বন্ডার, মুকন্দপুর, শ্রীপদগহ, হোসাইনপুর, নুরনগর, সাহোস, সবনালি, বাজিতপুর, রহিমপুর, ইসলামাবাদ, বেকরা রাজা, ধুলিয়াপুর, সাহাপুর এবং মহেশ্বরপাশা। এই সময়ের মধ্যে চাঁচড়া রাজ পরিবার সবচাইতে বেশী উন্নতি লাভ করে। কৃষ্ণরামের মৃত্যুর পর ১৭২৯ খ্রিঃ থেকে এই পরিবারের পতন শুরু হয়। তৃতীয় পুরুষের সময় থেকে এই পতনের গতি ত্বরান্বিত হয়। মনোহর রায়ের পুত্র কৃষ্ণরাম এবং কৃষ্ণরামের পুত্র শুকদেব রায়। শুকদেব রায় ১৭৩১ খ্রিঃ পিতা-মাতার আদেশে ছোট ভাই শ্যাম সুন্দরকে সম্পত্তির ৪ আনা অংশ আলাদা করে দেন। এই চার আনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সৈয়দপুর পরগণা। নতুন ৪ আনা অংশের জমিদারিই পরে সৈয়দপুর এস্টেট নামে পরিচিত হয়। বাকী ৩/৪ আনা অংশ যেটার মালিকানা শুকদেবের কাছে ছিল সেটা ইউসুফপুর পরগণা নামে পরিচিত। এই জমিদারির আয়তন ছিল পূর্বে ভৈরব ও পশুর নদীর মধ্যবর্তী এলাকা থেকে পশ্চিমে ইছামতি নদী এলাকা পর্যন্ত এবং এর উত্তরে ছিল কলিকাতা ঢাকা মহাসড়ক। বর্তমানে খুলনা জেলার অধিকাংশ এলাকা এই দুইটি জমিদারি এলাকা নিয়েই গঠিত। ইউসুফপুরের জমিদার শুকদেব ১৭৪৫ খ্রিঃ মারা যান। শুকদেবের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নীলকান্ত এবং তার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শ্রীকান্ত রায় জমিদার হন। শ্রীকান্ত রায় ১৭৬৪ খ্রিঃ জমিদার হন এবং ১৭৬৫ খ্রিঃ ইউসুফপুরের জমিদারি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজস্ব প্রশাসনের অধীনে চলে যায়।

সৈয়দপুর জমিদারিঃ

শ্যাম সুন্দর রায় ১৭৫০ খ্রিঃ তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সৈয়দপুর এস্টেটের জমিদার ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রাম গোপাল রায় জমিদার হন। রাম গোপাল রায় ১৭৫৭ খ্রিঃ অপুত্রক অবস্থায় মারা যান। ১৭৫৭ খ্রিঃ পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাহায্যে বাংলার নবাব হন। কোম্পানীর সাথে পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী তিনি কলকাতার নিকটবর্তী ২৪টি পরগণার (পশ্চিমবঙ্গ) জমিদারি কোম্পানীকে দান করেন।এসব সম্পত্তির মধ্যে হুগলীর ফৌজদার মীর্জা মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের জায়গিরও ছিল। ইতমধ্যে অপুত্রক অবসস্থায় রাম গোপাল মারা যান। মীর জাফর কোম্পানীকে প্রদত্ত ফৌজদার মোঃ সালাউদ্দিনের সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ হিসেবে সৈয়দপুর এস্টেট তাকে দান করেন। ফৌজদার মোঃ সালাউদ্দিনের মৃত্যূর পর তাঁর বিধবা পত্নী মন্নুজান জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সমস্ত সম্পত্তির মালিক হন। মন্নুজান আগা মোতাহার নামে একজন ‘ইস্পাহান’ ব্যবসায়ীর কন্যা। মৃত্যুর আগে সমস্ত সম্পত্তি কন্যা মন্নুজানকে উইল করে দিয়ে যান। মন্নুজান দৃঢ় চরিত্রের মহিলা ছিলেন। সন্তানহীনা মন্নুজান তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বৈপিত্রেয় ভাই মহসীনের নামে দানপত্র করে দেন। এই মহসীনই আমাদের কাছে দানবীর হাজি মুহম্মদ মহসীন নামে পরিচিত। মন্নুজান ১৮০৩ খ্রিঃ মারা যান। মহসীন ইহলৌকিক সুখের প্রতি উদাসীন ছিলেন। বিষয় সম্পত্তির প্রতি তার কোন আকর্ষণ ছিল না। তিনি তার সমস্ত সম্পত্তি জনহিতকর কাজে লাগানোর জন্য সরকারের নিকট সমর্পণ করেন। সরকার তাঁর সম্পত্তির বাৎসরিক আয় শিক্ষা ক্ষেত্রে খরচের ব্যবস্থা করেন।

বর্তমান সৈয়দপুর এস্টেটের খুলনা অংশের ট্রাস্টি খুলনা জেলা প্রশাসন। সম্পত্তির খাস অংশ এখনও আছে। মধ্যস্বত্ব প্রথা ১৯৫০ খ্রিঃ জমিদারি অধিগ্রহণ আইনে বিলুপ্ত হয়। এস্টেটের বর্তমান ফান্ডে এবং জমির আয় থেকে প্রতিবছর শতাধিক বৃত্তি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়। এই জেলার মহসীন নামীয় সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূলে সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের অবদান উল্লেখযোগ্য। এছাড়া অনেক মাদ্রাসা এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ট্রাস্ট থেকে প্রতি বছর অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়। ১৯৭৭-৭৮ সালে সৈয়দপুর এস্টেটের মোট ২৫.৭৮ একর জটিলতামুক্ত খাস জমি এবং অনুদান ১০ লক্ষ টাকার নগদ তহবিল ছিল।

মোঘল আমলে প্রজাদের অবস্থাঃ

মোঘল আমলের গোড়ার দিকে বৃহত্তর খুলনা জেলা এলাকার প্রজাদের অবস্থা ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ যুগের অনুরুপ। হিন্দু ও বৌদ্ধ যুগে রাজস্ব ছিল উৎপন্ন ফসলের ১/৬, সুলতানী আমলে ১/৫, শেরশাহের আমলে১/৪, সম্রাট আকবরের আমলে ভূমি রাজস্ব ছিল বিগত ১০ বৎসরের গড় উৎপন্ন ফসলের ১/২ ভাগ। আওরঙ্গজেবের সময়ে এর পরিমাণ ছিল আরও বাড়িয়ে অর্ধেক করা হয়। এছাড়া আর বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়নি। স্থায়ী প্রজাদের খোদকাস্ত রায়ত বলা হত এবং তারা নিয়মিত খাজনা দিতে পারলে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হত না। জমির উপর তাদের প্রকৃত অধিকার ছিল।পরবর্তীকালের আইনে একে ‘দখলীস্বত্ব’ (Frequency Right) বলা হয়েছে। প্রচলিতহারে ফসলের নির্দিষ্ট অংশ বা এর সমপরিমাণ নগদ অর্থ খাজনা হিসেবে দিতে হত। এ হার ‘পরগণা হার’ নামে পরিচিত ছিল। মোঘল সম্রাট যখন রাজস্ব বাড়াতেন কিংবা জমিদারদের উপর অধিক হারে আবওয়াব বসাতেন তখন কৃষকদের কাছ থেকে তা আনুপাতিক হারে আদায় করা হত। আবওয়াব হচ্ছে রাষ্ট্রের আরোপিত অতিরিক্ত কর। এ কর ধার্যের উদ্দেশ্য ছিল সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করা। এর হিসাব ভিন্নভাবে রাখা হত। মোঘল আমলে প্রচলিত আবওয়াব চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরবর্তীকালের আবওয়াব থেকে ভিন্ন ছিল। পরবর্তীকালে আবওয়াব বলতে ভূ-স্বামী কর্তৃক রাজাদের ন্যায্য করের উপর অন্যায়ভাবে আরোপিত অতিরিক্ত কর বোঝাত।

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্ আলম কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী প্রদানের সাথে সাথে খুলনা জেলার রাজস্ব প্রশাসনও কোম্পানীর অধীনে চলে যায়। কোম্পানী ১৭৬৫ থেকে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোঘলদের অনুসৃত রাজস্বনীতি অনুসরণ করে এবং রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে এ দেশীয় লোকদের হাতে ছেড়ে দেয়।

এইসব রাজস্ব কর্মকর্তারা ছিলেন (১) জমিদার (২) কানুনগো। সনদের মাধ্যমে সম্রাট জমিদারদের নির্দিষ্ট পরগণা ও জেলার ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব প্রদান করতেন। কানুনগোর পদটি সৃষ্টি করেছিলেন সম্রাট আকবর। জমিদারদের কাজ সম্বন্ধে সম্রাটকে অবহিত করা এবং গ্রামের রাজস্ব হিসাবে রক্ষণকারী বা পাটোয়ারীর কাজে সাহায্য করাই ছিল কানুনগোদের কাজ। কিন্তু এ ব্যবস্থায় আশানুরূপ ফল না হওয়ায় কোম্পানী রাজস্ব সংগ্রহ মূল্যায়নের জন্য রাজস্ব প্রশাসনের কাজ নিজ হাতে গ্রহণ করে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বাংলায় তৎকালীন বৃটিশ গভর্ণর ভেরেলস্ট (Verelost) জেলায় ইউরোপীয় সুপারভাইজার নিয়োগ করেন। যথাযথ রাজস্বের পরিমাণ ধার্য করার উদ্দেশ্যে জেলাগুলোর রাজস্ব সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সম্বন্ধে অনুসন্ধান করার দায়িত্ব তাদের উপর অর্পিত হয়। তারা জেলার খাজনা তালিকাও তৈরী করেন। সুপারভাইজারদের কাজে তদারকি করার জন্য ১৭৭০ খ্রিঃ জুলাই মাসে মুর্শিদাবাদে ‘রাজস্ব পরিষদ’ বা ‘রেভিনিউ কাউন্সিল’ গঠন করা হয়। এই পরিষদে সুপারভাইজারদের উল্লিখিত প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেই সময়ে বাংলায় ভীষণ বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল।

১৭৬৯-৭০ খ্রিঃ দুর্ভিক্ষের দরুণ বাংলায় একলক্ষ লোক মারা যায়। এতে রাজস্ব আদায়ে বিঘ্ন ঘটে। এই দুর্ভিক্ষের সময় রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে উৎপীড়ন ও তহবিল তছরুপের দায়ে কোর্ট অব ডাইরেক্টরস কর্তৃক নায়েব নাজিম মোহাম্মদ রেজা খানকে অপসারিত করা হয়।১৭৭২ খ্রিঃ ‘কোর্ট অব ডাইরেক্টরস্’ প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব সংক্রান্ত সমস্ত নিয়ন্ত্রণভার কোম্পানীর হাতে দিতে স্বীকৃত হয়। প্রধান রাজস্ব অফিস মুর্শিদাবাদ থেকে কোলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। প্রতি জেলায় দেওয়ান (Diwans) নামে একজন স্থানীয় কর্মকর্তার সহায়তায় রাজস্ব আদায় করার জন্য একজন ইউরোপীয় কালেক্টর (Collector) নিযুক্ত করা হয়। ইউরোপীয় ও ভারতীয়দের মিশ্র প্রশাসন চালুর ফলে রাজস্ব ব্যবস্থার আংশিক উন্নতি হলেও পরে বিশেষ সুবিধা না হওয়ায় এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। এর পরে ‘কমিটি অব সার্কিট’ গঠিত হয় এবং ১৭৭২-৭৭ খ্রিস্টাব্দে নিলাম ডাকের মাধ্যম পাঁচসালা বন্দোবস্ত প্রবর্তন করা হয়। প্রাক্তন জমিদার হোক বা না হোক সর্বোচ্চ ডাককারীর নিকট ৫ বছরের জন্য ভূমি বন্দোবস্ত দেবার ফলে বাংলার পুরাতন জমিদার পরিবারগুলো প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং রেহাইকৃত ও আদায় অসাধ্য (Irrecoverable) বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে জমিদারি নিলাম ডাকের মাধ্যমে একদল নতুন জমিদারের সৃষ্টি হয়েছিল যারা প্রাচীন জমিদার ও কৃষকদের চেয়ে অধিকতর চড়া হারে প্রজাদের কাছ থেকে শেষ কপর্দকটুকুও আদায় করে নিত। এই সময় খুলনা জেলার উত্তরাংশ বাংলার অন্যান্য জেলার মত পাঁচসালা বন্দোবস্তের অধীনে আসে। রাজস্ব কাউন্সিল লেন (Lane) নামে একজন পদস্থ বৃটিশ কর্মকর্তাকে খুলনা জেলার জমিদারদের সম্পত্তি তদন্ত করে রিপোর্ট প্রদানের জন্য নিয়োগ করে। কিন্তু তিনি শুধুমাত্র খসড়া গণনার মাধ্যমে জমিদারদের অতিরিক্ত রাজস্ব প্রদানের সুপারিশ করেন। ফলে জমিদার এবং পরগণাসমূহের প্রজাগণ সর্বসান্ত হয়ে পড়ে।তাই ১৭৭৩ থেকে ১৭৭৬ সাল পর্যন্ত রাজস্ব বোর্ডের প্রতিবেদনে দেখা যায় জমিদারদের অধিক পরিমাণ রাজস্ব বাকী পড়েছে এবং অনেক কৃষক ও প্রজা তাদের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র গমন করেছে। সুলতানপুর জমিদারির রাজস্ব বকেয়া পড়ে গেলে কাশিনাথ দত্ত বকেয়া রাজস্ব প্রদান ও ভবিষ্যতে আরোপিত রাজস্ব অনুসারে খাজনা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জমিদারি ক্রয় করেন। কিছু কিছু ত্রুটি পরিলক্ষিত হওয়ায় পাঁচসালা বন্দোবস্ত বাতিল হয়ে যায়।

পাঁচসালা বন্দোবস্ত ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাবার পর ১৭৭৮ খ্রিঃ ডিসেম্বর মাসে বোর্ড অব রেভিনিউ একসালা বা বাৎসরিক বন্দোবস্তের প্রবর্তন করেন। প্রাদেশিক পরিষদ এই জেলার জমিদারদের সাথে নতুন করে ১ বৎসরের জন্য ভূমি বন্দোবস্ত করেন এবং এই একসালা বন্দোবস্ত ১৭৯০ সাল পর্যন্ত প্রচলিত থাকে। কিন্তু একসালা বন্দোবস্তের মূল্যায়নও হয়েছিল অসম্পূর্ণ উপাত্তের উপর ভিত্তি করে। ফলে জমিদারদের উপর রাজস্বের চাপ অত্যধিক হয়ে পড়ে। এ সময় অনেকেই ঋণে জর্জরিত হয়। এই সম্বন্ধে স্যার জেমস ওয়েস্টল্যান্ড তার “Report on the district of Jessore” বই এ লিখেছেন জমিদারেরা যারা ভবিষ্যত সম্পর্কে অনিশ্চিত ছিল তাঁরা তাদের উপর অর্পিত বর্ধিত করভার প্রজাদের উপর চাপিয়ে দিত। ফলে,মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার বা ভোগদখলকারী রায়ত কেউই ভূমির উন্নয়নের জন্য কোন প্রকার ব্যবস্থা অবলম্বনের কথা চিন্তা করত না। এর অন্যতম কারণ ছিল যে, ভূমির উন্নয়ন হলে বা উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে ইংরেজ কালেক্টর জমিদারদের উপর এবং জমিদাররা রায়তদের উপর সেই হারে খাজনা বৃদ্ধি করত। এতে সরকার-জমিদার, জমিদার-রায়ত সম্পর্কও হয়ে পড়ে অবিশ্বাসের।

১৭৮১ সালে প্রাদেশিক পরিষদ বিলুপ্ত করা হয় এবং খুলনা জেলাসহ প্রদেশের ভূমি রাজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থা কলিকাতায় অবস্থিত প্রাদেশিক কাউন্সিলের অধীনে চলে যায়। কালেক্টর ও কানুনগোদের পুনরায় ব্যবহার করা হয়। ১৭৮৪ খ্রিঃ কোম্পানীর কার্যাবলীর সুনিয়ন্ত্রণ ও সুব্যবস্থাপনার জন্য বৃটিশ পার্লামেন্টে একটি আইন পাস হয় এবং এই আইনে রাজস্ব ব্যাপারে একটি বড় রকমের সংস্কার সাধন করা হয়। এরপরে রাজস্ব কাউন্সিল বাতিল হয়ে যায় এবং রাজস্ব নির্ধারণের দায়িত্ব কালেক্টরদের উপর দেওয়া হয়। জেলার রাজস্ব প্রশাসন রাজস্ব বোর্ডের অধীন করে দেওয়া হয়। ১৭৮৬ সালে রাজস্ব কমিটি বাতিল করে দেওয়া হয় এবং নতুন করে রাজস্ব বোর্ড গঠন করা হয়। কালেক্টরদের তৈরী ভূমি বন্দোবস্তের অনুমোদন দেওয়াই ছিল রাজস্ব বোর্ডের অন্যতম কাজ। এই বছরই লর্ড কর্ণওয়ালিশ ভারতের গভর্ণর জেনারেল নিযুক্ত হন। তিনিই উত্তরাধিকারযোগ্য মধ্যস্বত্ব ভোগের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসহ ন্যায়সংগত রাজস্ব প্রদানের নতুন বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে রাজস্ব প্রশাসনের ১০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী রাজস্বের পরিমাণ সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য পায়নি। সুতরাং নতুন বন্দোবস্তের প্রয়োজন।

তদানীন্তন ভারতের গভর্ণর জেনারেল ১৭৯০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী দশসালা বন্দোবস্তের নির্দেশ প্রদান করেন। সরেজমিন জরিপ কিংবা উৎপন্ন ফসলের উপর ভিত্তি করে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তিনি অতীতের দেয় রাজস্বই ভবিষ্যতেও দেয় বলে এই বন্দোবস্ত করেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হল না। যথাযথ তথ্যভিত্তিক নয় বলে এই দশসালা ব্যবস্থাও সময় শেষ না হতেই বাতিল হয়ে যায়। লর্ড কর্ণওয়ালিশ ১৭৯৩ সালের পূর্বে প্রবর্তিত দশসালা ভূমি বন্দোবস্তকেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রূপান্তরিত করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দ্বারা জমির উপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হয় এবং জমিদার ও জোতদারদের দ্বারা রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের ১নং রেগুলেশন অনুযায়ী জমিদারির দেয় রাজস্ব চিরদিনের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।ফলে জমিদারেরা তাদের সম্পত্তির আয়ের ১০/১১ ভাগ সরকারকে রাজস্ব প্রদানের অঙ্গীকার করে ।অন্যদিকে জমিদারগণকে নির্ধারিত রাজস্বের দশ ভাগের এক ভাগ জমিদারি ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হিসেবে দেওয়া হয়। তদুপরি ভবিষ্যতে কৃষি সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য কারণে রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে জমিদারদের আয় বৃদ্ধিরও সুযোগ দেওয়া হয়। জমিদারদের আয় বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে তাদের উপর সরকার অতিরিক্ত কর ধার্য করবেন না এই মর্মেও নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। অন্য কথায় এই চুক্তির মাধ্যমে সরকার স্বীকার করে নেন যে ভবিষ্যতে জমিদারিসমূহের নগদ রাজস্ব আর বাড়ানো হবে না।

এই জেলায় দশসালা বন্দোবস্ত চালুর সময়ে ১৭৯০ সনে 'রকে' রাজস্ব কালেক্টর ছিলেন। এর আগের বছরই তিনি টিলম্যান হেংকেলের স্থলাভিসিক্ত হন। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় পর্যন্ত তিনি এই জেলার রাজস্ব কালেক্টর পদে বহাল থাকেন। তিনি প্রজাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে অন্য যে কোন বন্দোবস্তের চেয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনেক উন্নত। কারণ এই বন্দোবস্ত প্রজাসাধারণ তথা জমিদারেরা জমির উন্নয়ন করে উৎপাদন যতই বৃদ্ধি করুক না কেন রাজস্ব নির্দিষ্ট হওয়ায় এই বাড়তি উৎপাদনের উপর সরকার কোন রকম দাবি করতে পারবে না। ফলে জমির উৎপাদন ও উন্নয়ন কাজে প্রজা সাধারণ এবং জমিদার উভয়ই সচেষ্ট হবেন।স্বতন্ত্র তালুকদারদের ব্যাপারেও বিরাট এক পরিবর্তন আনা হয়েছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে। স্বতন্ত্র তালুকদারেরা ছিল ছোট খাট জমিদার। জমিদারদের মাধ্যমে তালুকদারেরা সরকারের নিকট রাজস্ব প্রদান করত। খুলনা জেলায় দুই প্রকারের তালুক ছিল। এগুলো হলো পাট্টা বা ইজারাকৃত এবং খরিদা বা খরিদকৃত। এগুলো জমিদাররাই সৃষ্টি করেছিলেন। জমিদারদের নিয়মিত খাজনা পরিশোধের ভিত্তিতে এসব তালুকদার জমিদারদের জমিদারির সন্নিকটেই তাদের তালুক ভোগ করত।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভিত্তি ছিল বিগত বছরগুলোর রাজস্ব বন্দোবস্ত অথবা এলাকার রাজস্ব কালেক্টরের পেশকৃত হিসাব। ফলে বড় বড় জমিদারিগুলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খুলনা জেলায় ইউসুফপুর জমিদার বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল ৩,০২,৩৭২ টাকা। এটা ছিল ইউসুফপুর জমিদারির বিগত বৎসরের বন্দোবস্তের ৫ হাজার টাকা বেশী। খুলনা জেলার অপর বৃহৎ জমিদারি সৈয়দপুর এস্টেট বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল ৯৩,৫৮৩ টাকা বা বিগত বৎসরের রাজস্বের চেয়ে দুই হাজার টাকা বেশি। অন্যান্য কয়েকজন জমিদারের সাথে ইউসুফপুরের জমিদার কোম্পানীর এই বন্দোবস্তের শর্তাদির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করেও কোন উপায়ান্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত সরকারের নির্ধারিত রাজস্বেই জমিদারি ইজারা নেয় এবং চড়া দামে জমিদারি ক্রয় করে। জমিদারেরা বর্ধিত হারে রায়তদের উপর রাজস্ব আরোপ করে তাদের ক্ষতি কিছুটা লাঘবের চেষ্টা করত। কিন্তু দেখা যায় অধিকাংশ জমিদারিই তাদের বর্ধিত খাজনা তুলতে না পেরে সরকারের খাজনা পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফলে তাদের জমিদারিও নিলামে উঠে যায়। অনেক প্রজাও খাজনা প্রদানে অক্ষম হয়ে নিজেদের বাড়ী ঘর ছেড়ে অন্যত্র পলায়ন করে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারিগুলোতে জমিদারদের স্বত্বাধিকার এবং প্রয়োজনে জমিদারি বিক্রয়ের সুবিধা দেওয়া হয়। ফলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর খুলনা জেলায় প্রায় ১ হাজার ছোট বড় জমিদারি খাজনা প্রদানে অসমর্থ হয়ে পড়ে এবং খাজনা বকেয়া পড়ায় তাদের জমিদারি বিক্রি হয়ে যায়। এদের মধ্যে ইউসুফপুরের জমিদার রাজা শ্রীকান্ত রায় ছিলেন অন্যতম। তিনি একে একে বিক্রির মাধ্যমে তার জমিদারির অধীনস্থ সব পরগণা হারাতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে নি:স্ব হয়ে পড়েন। অন্যান্য জমিদারির স্বত্বাধিকারীরাও এ ব্যাপারে সৌভাগ্যবান ছিলেন না। পরগণা ‘হোগলা’ ১৭৯৬ সালে বিক্রি হয়ে যায় এবং পরগণা ‘বেলফুলিয়া, কয়েকবার বিক্রির জন্য পেশ করা হয়। খুলনা জেলায় মাত্র দুইটি জমিদারি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দশ বছর পর্যন্ত টিকে ছিল। এগুলো হচ্ছে সৈয়দপুর এবং সুলতানপুর ‘খারোরিয়ান’ জমিদারি। ওয়ারেন হেস্টিংস যখন ভারতের গভর্ণর জেনারেল তখন কাশীনাথ দত্ত সুলতানপুর জমিদারি ক্রয়করেন। পরে রায়তেরা যাতে ঠিকমত রাজস্ব প্রদান করে বা জমিদারেরা যাতে সঠিকভাবে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে এই জন্য ১৭৯৯ সালে ৭ম রেগুলেশন আইন পাস করা হয়। কিন্তু এর আগেই অনেক জমিদারি বিক্রি হয়ে যায়।

খুলনা জেলার তৎকালীন রাজস্ব ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল জমিদারীগুলোর পুনরুজ্জীবন। চিরস্থায়ী বন্দবস্তের সময় বিরাট এলাকাকে রাজস্ব মুক্ত এলাকা (লাখেরাজ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কর্তৃপক্ষ এই রাজস্ব মুক্ত অনুদানগুলোকে নিরীক্ষা করে বিশেষ ব্যবস্থায় আলাদা করে সংরক্ষণ করত। এগুলোকে বাদশাহী ও হুকুমী এই দু’ভাগে ভাগ করা হয়। বাদশাহী এলাকাগুলোকে সম্রাট নিজে প্রত্যক্ষভাবে এবং হুকুমী এলাকাগুলো মোঘল সম্রাটের অধীনস্ত কর্মচারীরা পরোক্ষভাবে দান করতেন। ১৭৯৩ সালে আইনের ৯৬নং ধারাতে বাদশাহী অনুদান এবং ১৯নং ধারাতে অন্যান্য অনুদান অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাদশাহী অনুদান গুলোকে বৈধ (বাহালি) মনে করা হত। অবশ্য এই সব অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এটা প্রমাণ করতে হত যে তার সনদ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এবং অনুদানকৃত জমিটি তখনো তার দখলে আছে। হুকুমী অনুদানগুলোও ১৭৬৫ সালের আগে প্রাপ্ত হলে সেগুলোকে বৈধ করে দেওয়া হত। কিন্তু ১৭৬৫ সালের পরবর্তী অনুদানগুলো অবৈধ বলে ঘোষণা করে বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১৯নং আইন অনুসারে ১৭৯০ সালের পরে জমিদারের যে সমস্ত রাজস্ব মুক্ত অনুদান প্রদান করে সেগুলোকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়।

১৮০০ সালের পূর্ব পর্যন্ত লাখেরাজ ভূমির অনুদান সম্বন্ধে বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ১৮০০ সালে প্রথম লাখেরাজ ভূমি প্রসাথে বাধ্যতামূলক আইন প্রণয়নের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থাও ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হলে ১৮১৯ সালে ২নং রেগুলেশনের মাধ্যমে ভূমি পুন:গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়ানী আদালত থেকে রাজস্ব আদালতে (Revenue Court) স্থানান্তরিত করা হয়।

১৮২৮ খ্রি: রেগুলেশন নং ২ এর সম্পূরক আইন রেগুলেশন নং ৩ পাস হয়। এই আইনের আওতায় সরকারী নীতি বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কমিশনার (Special commissioner) নামক প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। তাঁরই প্রত্যক্ষ তদারকিতে জমি পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলো ১৮৩০-৫৩ সালের মধ্যে মীমাংসার জন্য গ্রহণ করা হয়। এই ভাবেই খুলনা অঞ্চলের এক বিরাট সংখ্যক জমিদারি রাজস্ব তালিকার (Revenue Roll) অন্তর্ভুক্ত হয়।

সুন্দরবনের রাজস্ব প্রশাসনের ইতিহাস জেলার অন্যান্য অঞ্চলের রাজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থা হতে সম্পূর্ণ আলাদা। সুন্দরবন অঞ্চলের রাজস্ব প্রশাসনের ইতিহাস প্রথম উলে¬খযোগ্য ঘটনা হল ১৬৫৮ সালে দ্বিতীয় মোঘল বন্দোবস্তের সময় যুবরাজ মুহম্মদ সুজা কর্তৃক সরকারী বা জেরাদখানার সৃষ্টি। এরপর রাজস্ব সংক্রান্ত ব্যাপারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রথম কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

পশ্চিম বঙ্গের ২৪ পরগণা সংলগ্ন সুন্দরবন জঙ্গল থেকে ভূমি পুনরুদ্ধারের কাজটি ১৭৭০ খ্রি: তৎকালীন কালেক্টর জেনারেল ক্লড রাসেল এবং হরিণঘাটা কিংবা বালেশ্বর নদীর মোহনা থেকে পশ্চিমে রায়মঙ্গল নদীর তীর পর্যন্ত সুন্দরবন এলাকা পুনরুদ্ধারের কাজটি তৎকালীন যশোর জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট ও জজ টিলম্যান হেংকেল (Tiltman Henkell) ১৭৮৩ সালে সম্পন্ন করেন। ক্লড রাসেল যে সমস্ত ভূমি ইজারা দেন তা ২৪ পরগণার পাতাবদি (Patabdi) তালুক এবং যশোর ও খুলনায় হেংকেলের তালুক হিসেবে পরিচিত।

খুলনা জেলা সংলগ্ন সুন্দরবনের রাজস্ব ইতিহাস সমন্ধে বলতে গেলে হেঙ্কেলের তালুকগুলো সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা হওয়া দরকার।

টিলম্যান হেংকেল সুন্দরবনের সীমারেখা নিম্নলিখিতভাবে বর্ণনা করেছেন।

দক্ষিণ: বঙ্গোপসাগর।

পূর্ব: হরিণঘাটা নদী।

পশ্চিম: রায়মংগল নদী।

উত্তর:

(ক) কালিগঙ্গা নদীর তীরবর্তী ধুলিয়াপুর গ্রাম।

(খ) যমুনা নদীর তীরবর্তী কাগ্রিঘাট।

(গ) কপোতাক্ষ নদীর তীরবর্তী চিংড়িখালী গ্রাম।

(ঘ) মারজাটা নদীর তীরবর্তী ঢাকাই খাঁড়ির মুখ।

(ঙ) ঢাকাই খাঁড়ির শেষ প্রান্ত।

(চ) দুধখালি নদীর তীরে সেরপাতালয় (Serpatalaya) গ্রাম।

(ছ) বালেশ্বর নদীর তীরে কচুয়া গ্রাম

টিলম্যান হেংকেল আগ্রহী দরখাস্তকারীদের উপর্যুক্ত সীমারেখার মধ্যে ভূমি ইজারা দেন এবং সুন্দরবনের উত্তরাংশে তিনটি সীমান্ত এলাকা স্থাপন করেন। এদের মধ্যে হেংকেলের নাম অনুসারে প্রথমটির নাম ছিল হেংকেলগঞ্জ (হিংগালগঞ্জ)। এটি যমুনা এবং কালিন্দি নদীর সংযোগ স্থলে অবস্থিত। ২য় এলাকাটি ছিল কাবাডক নদীর তীরবর্তী চাঁদখালি গ্রাম। তৃতীয়টি ছিল বালেশ্বর নদীর তীরে কচুয়া গ্রাম। এই এলাকাগুলো খাস আবাদ নামেও পরিচিত ছিল। হেংকেলগঞ্জ এখন পশ্চিমবংগের ২৪ পরগণা জেলায় অবস্থিত। কিন্তু চাঁদখালী ও কচুয়া বর্তমান খুলনা জেলায় অবস্থিত। কচুয়া ছিল খাস জমিদারী। ১৭৯০ সালে দশসালা বন্দোবস্তের সময়ে এই জমিদারির বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল। চাঁদখালিকে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত কৃষি কাজের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল। এই জমিদারির পরবর্তী বন্দোবস্তগুলোও হয়েছিল সুন্দরবন তালুকদারী অধিকার আইনে (Sundarban Talukdari Right) ১৮৭৭ খ্রি: এই জমিদারির খাজনা বকেয়া পড়ার দায়ে নিলামে উঠলে সরকার এই জমিদারি কিনে নেয়। পরে এই জমিদারি রায়তওয়ারী প্রথার অধীনে ১৮৭৮ খ্রি: থেকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয় এবং সরকারের খাসজমি ব্যবস্থাপনার অধীনে চলে যায়। কিন্তু টিলম্যান হেংকেলের এই বন্দোবস্তের পার্শ্ববর্তী জমিদারের যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন। কারণ এই সকল জমিদার সরকারকে প্রাপ্য অংশ প্রদানের বিনিময়ে সুন্দরবনের অনাবাদি পতিত জমি চাষাবাদ করে লাভবান হতেন।

‘‘বাস্তবপক্ষে এই ধরণের অনাবাদি পতিত জমির অবৈধ ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছিল। অতীতের নথিপত্র থেকে এটা দেখা গিয়েছে যে, সুন্দরবন এলাকার বুজুরগুমেদপুরের জমিদার ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫ বৎসর ধরে ক্রমাগত সরকারী পতিত জমি অবৈধ ব্যবহারের মাধ্যমে তার খাজনা ৬০০০ টাকা থেকে ২ লক্ষ টাকায় উন্নীত করেন। সুতরাং এলাকার জমিদারদের স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ায় তারা টিলম্যান হেংকেলের ভূমি বন্দোবস্তের বিরুদ্ধাচারণ করে।

এলাকার জমিদারদের অসহযোগিতার কারণে টিলম্যান হেংকেলের ভূমি বন্দোবস্ত সাফল্য লাভ করতে পারেনি। তারা দলগতভাবে সরকারী ভূমি বন্দোবস্তের যে কোন উদ্যোগেরই বিরুদ্ধাচরণ করতেন। ১৭৬৫ সালে টিলম্যান হেংকেলের ‘বাঁশগাড়ি’ নামে বহুল পরিচিত। কিন্তু সুন্দরবনের দক্ষিণ দিকের পতিত জমির উপর অযৌক্তিক দাবী বেড়েই চলছিল। শেষে রাজস্ব বোর্ড ১৭৮৮ সালে একটি সাধারণ নোটিশ জারী করে জমিদারদের জমিদারীর সীমারেখা তিনমাসের মধ্যে দাখিল করার নির্দেশ দেন।

এভাবেই প্রথম জমিদারদের জমিদারির সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত টিল ম্যান হেংকেল তার বন্দোবস্ত অনুদানগুলোর বৈধতা প্রদানে সমর্থ হন। তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে জমিদারির সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরাতন গ্রহিতাদেরই নতুন করে সুন্দরবন এলাকা ইজারা দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে এগুলোই হেংকেলের তালুক নামে পরিচিত হয়।’’

১৭৯০ সালের দশসালা বন্দোবস্তের সময়ে, ‘‘সমস্ত চাষযোগ্য ভূমি” যেগুলোর উপর জমিদারেরা তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছিল বা যেগুলো তাদের দখলে ছিল, সেগুলোকে মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে একত্রিত করা হয় এবং অনুদানগুলোও পুনর্মূল্যায়ন করে সেগুলো খারিজা তালুক হলে ১৭৯০ সালে দশসালা বন্দোবস্তের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই জমিদারিগুলোর খাজনা বেঁধে দেওয়া হয়নি বরং ইজারার শর্তানুসারে প্রগতিশীল হারে খাজনা আরোপ করা হয়। ১৭৯৩ সালে দশসালা বন্দোবস্তকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রূপান্তরিত করার সময়ে তালুকদারদের অবস্থার বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়নি। তালুকগুলো রায়তী হিসেবে তাদের উদ্ভবের কারণে ‘পরগণা’ নামে অধিকহারে সমাদৃত হয়’’।২

খুলনা এলাকার জমিদারিগুলো দায়েমী (Daimi) বন্দোবস্তের মাধ্যমে স্থায়ী করা হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় এই তালুকগুলোর সংখ্যা ছিল ১৬। এগুলোর মধ্যে তৎকালীন সাতক্ষীরা মহকুমায় ছিল ৭টি তালুক যথা-পরানপুর, রমজানপুর, ভৈরবনগর, বংশীপুর, গুটলাকাঠি, ইসমাইলপুর ও গোবিন্দপুর। খুলনা মহকুমায় ছিল ৫টি তালুক যথা- বড়চানগর, বশারাতপুর, বাবুপুর, মামুদাবাদ এবং কালিদাসপুর। বাগেরহাট মহকুমায় ছিল ৩টি তালুক যথা-আসমতপুর, গোকুলনগর এবং বালবপুর। ষোড়শ তালুকটির নাম ছিল চান্দিপুর। এটা বর্তমানে বাকেরগঞ্জ জেলায় অবস্থিত।

সুন্দরবন এলাকার রাজস্ব ইতিহাসের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল লেফটেন্যান্ট ডাবি¬উ,ই, মরিসন কর্তৃক ১৮১১-১৪ সালে হুগলী নদীর তীর থেকে পশুর নদীর তীর পর্যন্ত সুন্দরবন এলাকার বিস্তৃত ভূমি জরীপ। ১৮১৮ সালে ডাবি¬উ,ই, মরিসনের ভাই ক্যাপ্টেন হাগ মরিসন ঐ জরিপের ভুলক্রটিগুলো সংশোধন করেন। খুলনা জেলায় তাদের জরিপ কপোতাক্ষ ও পশুর নদীর মধ্যবর্তী এলাকা এবং মংগা ও বালেশ্বর নদীর মধ্যকার এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল।’

১৮১৫ খ্রি: সুন্দরবন এলাকায় ভূমি পরিমাপ ও তদন্তের জন্য বোর্ড অব রেভিনিউ মি: স্মেল্ট (Smelt) কে নিয়োগ করেন। টিলম্যান হেংকেলের বন্দোবস্তকৃত তালুকগুলোর ভূমি কখন চাষাবাদের আওতায় এসেছিল, এগুলোর খাজনা মূল্যায়ন ও বন্দোবস্তের শর্তাদি জানার উদ্দেশ্যেই বোর্ড অব রেভিনিউ স্মেল্টকে এই দায়িত্ব দেন। এটাও আশা করা হয়েছিল যে, জঙ্গল থেকে উদ্ধারকৃত চাষাবাদযোগ্য ভূমিও এই পরিমাপের আওতায় আসবে। সেই অনুসারে স্মেল্ট ১৮১৫ সালে ডিসেম্বর মাসে ভূমি পরিমাপের কাজ শুরু করেন এবং ১৮১৬ সালে এপ্রিল মাসে পরিমাপের কাজ শেষ করেন। তিনি ৩,২৩,২৫২ বিঘার এক বিরাট পরিমাণ ভূমি পরিমাপ করেন, যার মধ্যে ২,১২,০২৫ বিঘা জমি চাষের আওতাভূক্ত ছিল। টিলম্যান হেংকেল প্রদত্ত পাট্টা ও সরকার কর্তৃক বন্দোবস্তকৃত নয় এমন উদ্ধারকৃত জমিও এই পরিমাপের অন্তর্ভুক্ত হয়। যে জমি উদ্ধারের সময় নির্ধারণ সম্ভব হয়নি অথচ জমিটি বহুদিন ধরে চাষাবাদের আওতায় আছে তাদের উপর বিঘায় ৮ আনা হারে খাজনা ধার্য করা হয় এবং বোর্ড অব রেভিনিউ খুলনা জেলার কালেক্টরেটকে ১৮১৫ সালের মধ্যে জেলার সমস্ত ভূমি বন্দোবস্তের নির্দেশ দেন। ১৮১৬ সাল নাগাদ জেলার জমিদার এবং তালুকদারেরা তাদের জমিদারি বা তালুকদারির উপর ধার্যকৃত খাজনা প্রদানে স্বীকৃত হয়।

১৮১৬ সালে ৩০শে আগস্ট জমিদার ও তালুকদারের সাথে সরকারের উপর্যুক্ত বন্দোবস্তের শর্তাদি সংশোধন করা হয় এবং ৫ বৎসরের বিরতি ব্যতিরেকে রাজস্ব পুনর্মূল্যায়ন নিষেধ করে দেয়া হয়। সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতীত যারা ভূমি পুনরুদ্ধার করে অবৈধভাবে চাষাবাদের কাজে লাগিয়ে মুনাফা লাভ করেছিল তাদেরকে অন্যভাবে মূল্যায়ন করা হয়। ইত:মধ্যেই সরকার বিঘা প্রতি ৮ আনা হারে খাজনা ধার্যের ঢালাও নীতি পরিহার করেন এবং কালেক্টর কর্তৃক সুন্দরবন এলাকার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতীত অবৈধ দখলদারীদের চাষকৃত জমির মূল্যায়নও সমাপ্ত করেন।

ডি,স্কট (D.Scott) সুন্দরবন এলাকার প্রথম কমিশনার নিযুক্ত হন ১৮১৬ খ্রিঃ ৫ই জুলাই। ১৮১৬ সালের ২৬শে এপ্রিল রেগুলেশন নং ৯ পাস হয়। এই আইনেই সুন্দরবন এলাকায় রাজস্ব কালেক্টরের পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন একজন কমিশনার নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর ডি, স্কটের প্রধান কাজ ছিল ২৪ পরগণার দক্ষিণ সীমানা এবং নদীয়া (ইন্ডিয়া), যশোর, ঢাকা, জামালপুর ও বাকেরগঞ্জের (বাংলাদেশ) সীমানা নির্ধারণ। দশসালা বন্দোবস্তের সময় সুন্দরবনের যে এলাকার খাজনা মূল্যায়ন করা হয়নি, ১৮১৬ সালে সেই এলাকার খাজনাও মূল্যায়ন করা হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পূর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর চাকুরীতে নিয়োজিত জেমস গ্রান্ট (Gemes Grant) সুন্দরবনে সরকারের খাস জমিতে ফসলের নির্দিষ্ট অংশদানের বিনিময়ে জমিদারদের মালিকানার অধিকার পান। জমি পুরোটাই সরকারের; এসব ভূমির দখলকারীরা সবাই অবৈধ। কিন্তু এলাকার জমিদারেরা দাবী করেন যে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় যেহেতু জমিদারদের জমির সীমানা ও খাজনা চিরদিনের জন্য বেঁধে দেওয়া হয় সেহেতু সুন্দরবন এলাকা পুনর্মূল্যায়নের অধিকার আর সরকারের নেই। ১৮১৬ সালে দেওয়ানী আদালতে এই বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয় এবং সুন্দরবন এলাকায় সরকারী মলিকানা স্বীকৃত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮১৭ সালে ১৩নং আইন পাস হয়। এই আইনের মুখবন্ধ ছিল নিম্নরূপঃ

‘‘এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, দেশের যে বিস্তীর্ণ এলাকা সুন্দরবন নামে পরিচিত সে এলাকা সম্পূর্ণভাবে খাসজমি ছিল এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় এই এলাকা কোন পরগণা, মৌজা বা জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই উৎসাহী ব্যক্তিরা এ সমস্ত এলাকা সুবিধামত চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসে। ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যক্তিগত ভোগ দখলে চলে যায়। এরা প্রতি বিঘার ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরকারকে প্রদানের শর্তে উত্তরাধিকারসূত্রে দখল করে সুন্দরবনের সরকারী খাসজমি ভোগ করত। এই বিষয় সরকারের সাথে ভোগদখলকারীদের কোন চুক্তিপত্র ছিল না। তাই উপর্যুক্ত ভূমি নতুন করে বন্দোবস্ত দেওয়া প্রয়োজন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ১৯১৭ সালে ২৩নং রেগুলেশনের মুখবন্ধ ভূমি বন্দোবস্তে সরকারের অধিকারের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে আরও উল্লেখ ছিল যে, ‘‘সম্পত্তির অধিকার এবং ভূমিতে রাজস্ব মূল্যায়নের অধিকার এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য হল ভূমি রাজস্ব প্রশাসনের মূল বিষয়, কিন্তু মনে হয় এই পার্থক্যটুকু সেই আমলে স্বীকৃত ছিল না। ব্যক্তিগত হিসেবে রূপান্তরিত পলিময় ভূমি এবং নাব্য নদীতে সৃষ্ট চর এর পার্থক্য বোঝাতে তাই এর উপর জোর দেওয়া হত। তাই সুন্দরবন পুনরুদ্ধার সম্বন্ধীয় আইনে (রেগুলেশন অব ১৮২৮) ভূমিতে সরকারের অধিকার প্রশ্নাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’’

১৮২৮ সালে রেগুলেশন নং ৩ সুন্দরবনের রাজস্ব ইতিহাসে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য সংযোজন এই রেগুলেশনের ১৩নং ধারা নিম্নরূপঃ

‘‘জনবসতিহীন সুন্দরবন জঙ্গল এলাকা পূর্বেও এবং এখন পর্যন্ত সরকারী সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত। এই এলাকা জমিদারদের নিকট ইজারা দেওয়া হয়নি এবং কোন বন্দোবস্তেই এই এলাকা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই গভর্ণর জেনারেল ইন কাউন্সিলকে সুন্দরবন এলাকার যে কোন অংশ ইজারা দেবার ক্ষমতা দেওয়া হয়।

কমিশনার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এলাকা জরিপের মাধ্যমে সুন্দরবনের সীমানা নির্ধারণ করেন এবং সার্ভে মাপের কপি আগ্রহী জমিদার ও তালুকদারদের মধ্যে বিতরণ করেন।’’২

‘‘১৮২৮ সালে রেগুলেশন নং ৩ আইন পাসের মাধ্যমে সুন্দরবনের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। সুন্দরবনের সীমানা নির্ধারণের জন্য জরিপের কাজটি ১৮২৯ সালে তৎকালীন সুন্দরবনের কমিশনার উইলিয়াম ডেমপেয়ার এবং লেফটেন্যান্ট আলেকজান্ডার হোজেস সম্পন্ন করেন। খুলনা জেলার পুরোটাই (কালিন্দী নদীর তীরবর্তী প্রাণপুর থেকে বালেশ্বর ও পানগুটি নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত) এই জরিপের আওতাভূক্ত হয়।

এই জরিপ পরবর্তী সময়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোজেস কর্তৃক সুন্দরবনের মানচিত্র তৈরীতে সাহায্য করেছিল। এই মানচিত্রের উপর ভিত্তি করে ১৮৩১ সালে হুগলী (ভারত) নদীর তীরে থেকে মেঘনা নদীর তীর পর্যন্ত সুন্দরবন এলাকার পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র প্রণয়ন করা হয়। লেফটেন্যান্ট হোজেস পরে আর একটু বদলে পশুর নদীর তীর থেকে হুগলী নদীর তীর পর্যন্ত সুন্দরবনের সীমানা নির্ধারণ করেন। তখন সুন্দরবনের মোট আয়তন ছিল ১৭,০২,৪২৩ একর বা ২,৬৬০ বর্গমাইল বা ৬৮৮৯.৩৭ বর্গ কিলোমিটার।

১৮২৮ সালে সুন্দরবন এলাকায় সরকার নিরঙ্কুশ অধিকার লাভ করেন এবং খাজনামুক্ত পুনরুদ্ধারকৃত জমির বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করেন। ১৮৩০ সালে বনাঞ্চল বন্দোবস্ত দেওয়ার আইন প্রণয়ন করা হয়। কলিকাতায় বসবাসরত ইউরোপীয়দের কাছ থেকে বনাঞ্চল অনুদান নেবার জন্য বহু দরখাস্ত জমা হয়। ১৮৩০-৩১ সালে দরখাস্তকারীদের মধ্যে বিনামূল্যে ৯৮টি জমি অনুদান দেওয়া হয় এবং পরবর্তী পাঁচ বছর আরও ১২টি অনুদান দেওয়া হয়। একর প্রতি ১টাকা ৮আনা হারে খাজনা নির্ধারণ করে চিরদিনের জন্য এই অনুদান দেওয়া হয়। এই অনুদানের শর্ত ছিল অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ভূমি পুনরুদ্ধারের কাজটি ত্বরান্বিত করবে।

এইভাবেই সুন্দরবনের খাস এলাকার এক বিরাট অংশ বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। কিন্তু অনুদানের শর্ত অনুযায়ী অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেশীর ভাগই ভূমি পুনরুদ্ধারের কোন চেষ্টাতো করেই নি, বরং বনের কাঠ জাতীয় দ্রব্যাদি থেকে যতটুকু পারতো মুনাফা করে নিত। এরপরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন ক্রেতা জুটিয়ে তাদের জমি বিক্রি করে দিয়ে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করত। অবশ্য কোন কোন অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি অনুদান প্রাপ্তির শর্তাদি পালন করার জন্য জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিল। তবে তাদের বেশীর ভাগই ক্ষতির সম্মুখীন হত। তাই তারা অনেক সময়ই প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নিত। ফলে অনুদানের শর্তাদি পূরণ না হওয়ায় সরকারও অনুদান প্রত্যাহার করে নেয়।

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৩০ সালে ভূমি অনুদান আইন সফলতা অর্জন করতে পারেনি। তাই ১৮৫৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে এই আইনের আধুনিকীকরণ, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা হয়। এই আইন বলে যে কোন ভূমি অনুদান ৯৯ বৎসরের জন্য হত এবং প্রতিযোগীতা হত। সর্বোচ্চ ডাককারীর নিকট নিলাম বিক্রির ব্যবস্থা করা হত। এইসব জমির খাজনা কমিয়ে একর প্রতি ৬ আনা ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ৫১ বৎসর পর্যন্ত নিম্নহারে খাজনাও ঠিকমত পাওয়া যায়নি। নতুন আইনে ভূমি পুনরুদ্ধারের কাজটি খুবই সতর্কতার সাথে হাতে নেওয়া হয় এবং আগ্রহী ব্যক্তিরা ৫ বছরের মধ্যে মোট জমির 18 অংশ, দশ বছরের মধ্যে ১৪ অংশ, ২০ বছরে ১২ অংশ এবং ৩০ বৎসরের মধ্যে পুরোটাই চাষাবাদের আওতায় আনা হবে এই শর্তে রাজী হলেই অনুদান দেওয়া হত। পুরাতন অনুদানপ্রাপ্তদের সময় শেষ না হতেই তাদের ইজারা সমাপ্ত করে নতুন ইজারা গ্রহণের নিয়ম করা হয়। এই নিয়ম অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি আনন্দের সাথে গ্রহণ করে এবং প্রায় ৭০ জন পুরাতন অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি তাদের ইজারা ভঙ্গ করে নতুন ইজারা গ্রহণ করেন। নতুন আইন সুন্দরবনের জমি পুনরুদ্ধারের কাজটি ত্বরান্বিত করে। ১৮৪০ সাল থেকে জরিপকারীরা বন্দোবস্তযোগ্য জমি জরিপ করতে থাকে। এ ছাড়াও খুলনা এবং বাকেরগঞ্জ জেলার অনুরূপ ভূমিও জরিপ করা হয়। এই জরিপের উপর ভিত্তি করেই ১৮৫৭ থেকে ১৮৬৩ সালের মধ্যে এই শতাব্দীর ২য় ভাগে প্রায় ১৫৭,৯৯০ একর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।

১৮৬২ সালে বিক্রয় আইন প্রণয়নের দ্বারা ১৮৫৩ সালে আইনটি রহিত হয়ে যায়। কিন্তু শেষোক্ত আইনটি অকার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় ১৮৭৯ সালে সংশোধিত ইজারানীতি প্রণীত হয়। এই আইন অনুসারে অনুদান প্রাপকদের দুইভাগে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ (১) বড় পুঁজিপতি-যাদের জমির পরিমাণ ২০০ একরের বেশী ছিল এবং যারা জমির উন্নয়নের অর্থ ও সময় ব্যয় করতে সক্ষম ছিল, (২) ক্ষুদ্র পুঁজিপতি যাদের জমির পরিমাণ ২০০ একরের কম ছিল এবং যারা কৃষকদের দ্বারা জমির উন্নয়নে সচেষ্ট হত।

১৮৬২ সালের বৃহৎ পুঁজিপতি আইন ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের আইনের চেয়ে কিছুটা আলাদা ছিল। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের আইনে খাজনামুক্ত ইজারার প্রাথমিক শর্ত ছিল ইজারাপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রথম পাঁচ বছরে তার ইজারাকৃত মোট জমির ১/৮ অংশ জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদের আওতায় আনবে। অন্যথায় খাজনামুক্ত জমির ইজারা বাজেয়াপ্ত হবে অথবা উচ্চহারে খাজনা আরোপ করে নতুন চুক্তি হবে। এই আইনে আরও বলা হয়েছিল যে খাজনামুক্ত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ইজারাকৃত জমির খজনার হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং উর্বরা শক্তির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন জমির খাজনা বিভিন্ন হারে নির্ধারিত হবে। পুনঃ বন্দোবস্তের মাধ্যমে নতুন ইজারা দানের ব্যাপারটি ক্রমাগত চলতে থাকবে। মূল ইজারা ছিল ৪০ বছর মেয়াদী এবং এই সময়কালের প্রথম ৩০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরই শুধুমাত্র পুনঃবন্দোবস্তের প্রশ্ন আসত। বৃহৎ পুঁজিপতিদের ইজারায় সর্বোচ্চ জমির পরিমাপ ছিল ৫০০০ একর এবং সর্ব নিম্ন ২০০ একর। ইজারাকৃত জমিতে চাষাবাদ বিচ্ছিন্নভাবে হতে পারত। কেবলমাত্র বন্ধক অনুযায়ী চাষাবাদের কাজে সম্প্রসারিত হতে পারত বৃহৎ পুঁজিপতিরা আবার একর প্রতি ধার্য খাজনা হারে তাদের জমি কৃষকদের কাছে পুনরায় ইজারা দিতে পারত। এই ইজারাগুলো ছিল দখলস্বত্ব সম্বলিত এবং উত্তরাধিকার ও হস্তান্তরযোগ্য। রাস্তা, পানি ও পয়ঃপ্রণালীর অধিকার বৃহৎ পুঁজিপতিদের নিকট সংরক্ষিত ছিল। নৌচলাচল উপযোগী নদীপথ এবং দুইপাশের ২৫ ফুটের অধিক প্রশস্ত রাস্তা ব্যবহারের অধিকার জনগণের জন্য সংরক্ষিত ছিল। সরকারের হাতে ছিল জমিতে সমস্ত খনিজ সম্পদের অধিকার। ইজারাকৃত জমির গাছ-গাছালির জন্য কোনমূল্য ধার্য করা হত না। ভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য কোন গাছ কাটা হলে বা পোড়ান হলে তার জন্যও মূল্য ধার্য করা হত না। তবে জমিতে উৎপাদিত দ্রব্যাদি অন্যত্র রফতানী করা হলে তার উপর লেভী ধার্য করা হত।

ক্ষুদ্র পুঁজিপতি আইন অনুসারে ২০০ একরের কম আয়তন বিশিষ্ট জমি ক্ষুদ্র পুঁজিপতিদের কাছে ৩০ বৎসরের জন্য ইজারা দেওয়া হত। এই ইজারার শর্ত ছিল ২ বৎসর পর পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনতে হবে। এই দুই বৎসর জমি খাজনামুক্ত থাকত। কিন্তু জমিতে চাষাবাদ শুরু হবার পর চাষকৃত জমির অনুরূপ খাজনা ধার্য করা হত। উপরন্তু এই সমস্ত ইজারা দ্বারা ইজারাকৃত জমির আশে পাশে যে কোন জমি (যা তখন পর্যন্তও বিশেষ কারো অধিকারভুক্ত হয়নি) চাষাবাদের আওতায় আনা যেত। সাধারণতঃ ৫ বৎসর পর পর ইজারা প্রদত্ত জমির সীমানা পুননির্ধারণ করা হত এবং ইজারায় নির্ধারিত মূল সীমানার বাইরে চাষকৃত জমির উপর এই মূল্যায়নের সময় মূল ইজারার সমান খাজনা ধার্য করা হত। এই ইজারা উত্তরাধিকার ও হস্তান্তরযোগ্য ছিল। তবে হস্তান্তর ১ মাস পূর্বে সরকারকে নোটিশ দিতে হত এবং সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতীত কোন জমিই হস্তান্তর বা বিভক্ত করা যেত না। এই ইজারায়ও বৃহৎ পুঁজিপতি ইজারার মত জমির উপর গাছ-গাছালির জন্য ভূমি চাষাবাদ করার স্বার্থে গাছ কাটা বা পোড়ান হলে তার জন্য কোন মূল্য দিতে হত না। তবে জমিতে উৎপাদিত দ্রব্যাদি বিক্রয়ের জন্য পাঠানো হলে তার উপর লেভী ধার্য করা হত।

এই ব্যবস্থা বিশেষ সাফল্য লাভ করতে পারেনি। কারণ, এই ব্যবস্থায় একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় দারুণভাবে কমে যাচ্ছিল অন্যদিকে জমিদারদের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণও শিথিল হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষক ও মূল ইজারাদারের মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী অপর এক শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছিল। দূরদর্শী জমিদারেরা ভবিষ্যতে অধিকদামে বিক্রি করার ইচ্ছায় জমির ইজারা নিত এবং নিয়োজিত মূল খরচ উঠিয়ে নেবার জন্য একসময় ইজারাকৃত জমির একাংশ বিক্রি করে দিত। এভাবেই মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত জমি পুনরুদ্ধারের ও চাষাবাদের মূল দায়িত্ব কৃষকদের উপর ন্যস্ত হত এবং কৃষকেরাই সরকারকে প্রদেয় করের গুরুভার বহন করত। তাই ১৯০৪ সালে এই পদ্ধতির বিলোপ সাধন করে রায়তওয়ারী বন্দোবস্ত (প্রকৃত কৃষকদের কাছে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে জমি চাষাবাদের বন্দোবস্ত) পরীক্ষামূলকভাবে প্রবর্তন করা হয়। এসব ক্ষেত্রে সরকার কৃষকদের পুকুর খনন, বাঁধ নির্মাণ এবং জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য অগ্রিম ঋণদানের ব্যবস্থা করে।
(লেখাটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১০ ই এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ১২:২৬

ঘূর্নী বলেছেন: ভাই এতো লম্বা লেখা ..... !

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.