| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রাবেয়া রাহীম
মানব মন বুঝে, সাধ্য আছে কার ! কখনো আবেগী গাঁথুনিগুলো যেন নিরেট কনক্রিট কখনো আবার গভীরে সাজানো আবেগগুলো- সৌরভে সুবাসিত হয়ে আনন্দে লীন !
শোবার ঘরটি বেশ বড় । দেয়ালে লাগানো বড় আয়নার ড্রেসিং টেবিল। জানালা বন্ধ করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনী চালাতে যেয়ে খেয়াল করে চোখ বেশ ফোলা । তারমানে অনেকক্ষন ঘুমিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে দিনরাতের হিসেব ঠিক মতন করতে পারছেনা। দিনের অর্ধেকটা সময় ঘুমিয়ে কাটায় রজনী। আবার রাতে কবীর যখন গভীর ঘুমে সে জেগে থাকে। ড্রয়িং রুমে সাউন্ড কমিয়ে নেটফ্লিক্সে মুভি দেখে।
আয়নার ভেতর দিয়ে দেয়াল ঘড়িতে চোখ যায় তাঁর।সকাল দশটা বেজে ১৫ মিনিট। ঘড়িটি বেশ সুন্দর। মনে মনে কবিরের রুচির প্রশংসা করে।
কবিরের কথা মনে হওয়াতে তাঁর খোঁজে বেডরুম থেকে বের হতে যেয়ে মনে পড়ে কবির এখন অফিসে। তাইতো পুরো ফ্ল্যাট খুব নির্জন লাগছে। কোন সাড়া শব্দ নেই। হঠাত তাকে খুব একাকিত্ব পেয়ে বসে । এতোটা একা সে কখনো হয়নি।
বাংলাদেশে একান্নবরতী পরিবারে বড় হওয়া মানুষ সে। অনেক মানুষের সাথে বসবাসে অভ্যাস তার। বাড়িতে কখনো কেউ না থাকলেও ঘরে কাজের লোক থাকতোই। তাদের সাথে গল্প করেও অনেক সময় চলে যেতো। কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তা দিয়ে লোকজনের যাতায়াত ফেরিওয়ালার ব্যস্ততা দেখেও অলস সময় কেটে যেতো। এমন করে একা হওয়া হয়নি কখনো।
বারান্দার কথা মনে হওয়াতে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখতে পায় ছোট সরু একটা সিঁড়ী নীচের দিকে নেমে গেছে । কবির একদিন বলেছিল ওটা নাকি ফায়ার স্কেপ। বাড়ীতে আগুন লাগলে বা জরুরী ভিত্তিতে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে এই সিঁড়ি ব্যবহার করতে হয়। সিঁড়ির গা ঘেঁষে বিশাল এক পাতা শূন্য গাছ। আপন মনে বলে উঠে “ হে অচিন বৃক্ষ কি নাম তোমার "।
হঠাত কেমন গা ছম ছম করে উঠে তাঁর। বাংলাদেশে নিজের আত্মীয় স্বজনের কথা মনে পড়ে যায়। বুকের ভেতর হুহু করে উঠে।
ঘড়ির দিকে চোখ রেখে আঙ্গুলের কড়ায় গুনে বাংলাদেশের সময়ের সাথে সময় মিলিয়ে নেয় । বাংলাদেশে এখন রাত ৯টা ১৫ মিনিট। কলিং কার্ড দিয়ে বাংলাদেশে কেমন করে কল করতে হয় কবির শিখিয়ে দিয়েছে।
বেডরুম থেকে বের হয়ে বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে পানির ঝাপ্টা দিয়ে বের হয়ে আসে। খুব কফির তেষ্টা পেয়ে বসে। গতকাল রাতে কবির তাঁকে সব চিনিয়ে রেখেছিল ঘরের কোথায় কি আছে বিশেষ করে রান্নাঘরে।
কফির ব্র্যান্ড দেখে খুশী হয়ে যায় রজনী। তাঁর প্রিয় ব্রান্ডের কফি ঠিক রেখে দিয়েছে কবির। স্বামীর প্রতি গভীর আনন্দ আর কৃতজ্ঞতা অনুভব করে। ঝকঝকে সাদা কাপে ঘোর কৃষ্ণবর্ণের কফি, অসাধারণ সুবাস! কফিতে চুমুক দেয় সে, ঘ্রাণে মন সতেজ হয়ে যায়।
রজনীর ফ্ল্যাটটি মেইন রোডের পাশে । কফি কাপ হাতে জানালার পাশে এসে বাইরের দিকে মনযোগ দেয়। দামী ব্র্যান্ডের নানান মডেলের গাড়ী রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে কিন্তু কোন শোরগোল নেই । কোন হর্ন নেই। খুব অবাক হয়ে চেয়ে থাকে সে। বাড়ীর বাইরের চারপাশ খুব ব্যস্ত মনে হয় তাঁর কাছে।
ফেব্রুয়ারী মাস শুরু হয়েছে তুষারপাত দিয়ে। সময়ে অসময়ে তুষার ঝরে চলছে। শীতের তীব্রতা খুব বেড়ে গেছে । বাড়ির বাইরের তাপমাত্রা হিমাংকের অনেক নীচে থাকলেও ঘরের ভেতরটায় হিটার সারাক্ষণ চালু থাকায় বেশ আরামদায়ক।
ভারি মাত্রার বরফ কুচি ঝুর ঝুর করে ঝরে চলছে । সাদা বরফের আচ্ছাদনে ঢাকা চারপাশ। সম্পূর্ণ একটি নতুন পরিবেশ খুব আগ্রহ নিয়ে দেখে যায় রজনী। সন্ধ্যায় জানালার ভারি পর্দা ফেলে দেয়। যাতে কোন রকম ঠান্ডা হাওয়া বাইরে থেকে ঘরে ঢুকতে না পারে। গায়ে ভারী ওলেন চাপিয়ে পায়ে মোজা পরে নেয়। গলা কান মাফলার দিয়ে সযতনে পেঁচিয়ে নেয়।
শীতের তীব্রতা আর তাকে ছুঁতে পারেনা। হিউমিডিফায়ারে পানি ভরে নেয়। পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে খুব নতুন অভিজ্ঞতা আর অচেনা। ভেতরে বেশ উত্তেজনা অনুভব করে সে।
দিনরাত শুয়ে বসে ঘরের আসবাব ঝাড়া মোছা, গুছিয়ে সময় কেটে যাচ্ছিল তার। কবির সকালে বেরিয়ে যায় ঘরে ফেরে সেই রাতে। কোন কোন দিন এমনও হয় রজনী শুয়ে আছে কবির উঠে চলে যায়। আবার রজনী রাতে গভীর ঘুমে কবির বাড়ি ফেরে। তাঁর সাথে দেখাও হয়না ঠিকমত ।
সারাদিন একা একা!
খুব ইচ্ছে করে বাহিরের খোলা আকাশে হাত পা ছড়িয়ে একটু বসতে। প্রচন্ড ঠাণ্ডায় ঘর থেকে বের হবার কথা ভাবতে পারেনা।
দিন গড়িয়ে মাস যায়। ঠান্ডা কিছুটা কমে এসেছে এখন। নিউইয়র্কে শহরের আশে পাশে পায়ে হেঁটে একা একাই ঘুরে বেড়ায় রজনী। এলাকাটা বেশ চিনে ফেলেছে। নতুন শহর খুঁটিয়ে দেখার পথশ্রম ভালোই লাগে তাঁর। ঢাকার অভিজাত এলাকার কথা মনে পড়ে যায়।
নিউইয়র্ক শহরের বাড়ি গুলো শত বছরের পুরনো হলেও রক্ষণাবেক্ষণ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। নিউইয়র্কের রাস্তায় পর্যাপ্ত মানুষও আছে। রাস্তায় মানুষের ভীড় থাকলেও খুব সুসংবদ্ধ, শৃঙ্খলিত। শপিংমল, বড় বড় হোটেল, অফিস কাছারি সব আছে । ঘিঞ্জি হলেও খুব সাজানো।
অবাক চোখে চেয়ে দেখে নিউইয়র্ক মহানগরের কোলাহল মুক্ত মেট্রোরেলের জনস্রোত। কিন্তু নেই কোন হৈচৈ-হট্টগোল। অতি সুন্দর, ঝকঝকে পথঘাট, কোথাও কোন নোংরা-ময়লা চোখে পড়েনা।
পাশের বাড়ির সাদা চুলের বয়স্ক মহিলাটির সাথে প্রায় দেখা হয় কিন্তু তেমন কথা হয়না কখনো। স্মিত হাসি দিয়েই চলে আসে। মনে পড়ে যায় নিজের দেশের বৃদ্ধদের কথা। এখানকার বুড়োরা কি সুন্দর করে বাঁচতে জানে! কত প্রাণবন্ত এরা!
আজকে বৃদ্ধাটি বেশ উৎফুল্ল লাগছে। পোষা কুকুরটিকে আদর করতে করতে জানতে চায়---
"হ্যালো, কেমন আছো তুমি? তোমার কথা তোমার স্বামী আমাকে বলেছিল । কথা হয়ে উঠেনি কখনো তোমার সাথে। কেমন লাগছে এই দেশ"?
-আজ তাঁর সাথে বেশ গল্প করে রজনী। মনে মনে বয়স হিসেব করে কত হতে পারে বৃদ্ধাটির?
মহিলাটি খুব আগ্রহ নিয়ে জানায় তার বয়স পঁচাত্তর। পূর্ব পুরুষের বাড়ি ডোমিনিকান ।
বৃদ্ধাটিকে কেমন যেন আপন আপন লাগে। কথা বলতে ভালোই লাগে। বেশ ভাব হয়ে যায় তাঁর মহিলাটির সাথে। মহিলাটির দুই মেয়ে অন্য স্টেটে থাকে। তবে মাদারস ডে আর ক্রিসামাসে নিয়মিত তাকে দেখতে আসে। সরকারি সাহায্যেই চলে সে এখন। নিঃসঙ্গ উদাসী বয়স্ক মানুষটার জীবনের গল্প শুনতে থাকে সে খুব আগ্রহ নিয়ে। একটা কুকুর আর দুইটা বেড়াল তাঁর সব সময়ের সঙ্গী।
হঠাৎ বমি ভাবের দমকে ঘুম ভেঙ্গে যায় রজনীর। বিছানা ছেড়ে উঠতে যেয়ে মাথটা চক্কর দিয়ে উঠে তাঁর। কিছুক্ষণ যেন নিঃশ্বাস আটকে থাকে । জোরে শ্বাস নেয়। কি ঘটছে নিজের শরীরে বুঝতে কিছুক্ষণ সময় নেয়। মনে পড়ে যায় এই মাসের মাসিক চক্রটা সে মিস করেছে। শরীরের ভেতরে আরও একটি শরীর এসেছে এটা তাঁরই জানান। ঘড়িতে সময় দেখে নেয়। ভোর ছটা। আনন্দে শিহরিত হয় বার বার । একটা শিশু ! নতুন একটা জীবন! কিযে আনন্দ!
তাঁরই পাশে কবির অঘোরে ঘুমাচ্ছে। খুব মায়া ভরে স্বামীর দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ তারপর নিজেও এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।
(২য় পর্ব শেষ হোল )
(ছবিটি আমার নিজের তোলা)
০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৮:৪১
রাবেয়া রাহীম বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
২|
০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৮:২৭
ফরিদ আহমদ চৌধুরী বলেছেন: আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।
০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৮:৪১
রাবেয়া রাহীম বলেছেন: মহান রাব্বুল আলামিন আপনারও মঙ্গল করুন
৩|
০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৮:৩৯
রাজীব নুর বলেছেন: আপনি তো সুন্দর লিখেন।
সহজ সরল ভাষা।
বাস্তব লেখা।
০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৮:৪২
রাবেয়া রাহীম বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ রাজীব নুর।
ভাল থাকবেন।
৪|
০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ১:৪৪
মাহমুদুর রহমান সুজন বলেছেন: গল্পটি পড়ে যাচ্ছি। আগামী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।
৫|
০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ১১:৪৮
দেশ প্রেমিক বাঙালী বলেছেন: চমৎকার লেখা। ভালো লাগলো।
©somewhere in net ltd.
১|
০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৮:০০
হাবিব বলেছেন: খুব সুন্দর ছবি........
শুভ সকাল আপু