| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সমালোচনার ঝড় উঠেছে মুরাদ পারভেজ নির্মিত ‘বৃহন্নলা’ সিনেমাটি নিয়ে। সিনেমাজগতসহ সাধারণ দর্শকের মাঝেও বইছে সমালোচনার ঝড়। বিনোদন সাংবাদিক ও সিনেমা সমালোচকেরা নকলের অভিযোগে তুলোধোনা করে ছাড়ছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকায় মনোনীত হওয়া এই সিনেমাটিকে।
‘বৃহন্নলা’ সিনেমাটির জন্য মুরাদ পারভেজ তিনটি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন : শেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ কাহিনি এবং সংলাপে । সিনেমার গল্পটি তার নয়, অথচ তিনি শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার! পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘গাছটা বলেছিল’ গল্প অবলম্বনে তিনি সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন শুধু পটভূমি নয়, সিনেমার নামটিও নিয়েছেন মুস্তাফা সিরাজের ‘গাছটা বলেছিল’ গল্প থেকেই। অথচ সিনেমার কোথাও লেখকের নাম উল্লেখ নেই, উপযুক্ত সম্মানী দেওয়া তো দূরের কথা।
মুরাদ পারভেজ এর আগেও সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘রানীর ঘাটের বৃত্তান্ত’ গল্প নিয়ে নির্মাণ করেন ‘চন্দ্রগ্রহণ’ সিনেমাটি। তার মানে মুস্তাফা সিরাজের গল্পের সঙ্গে তার জানাশোনা অনেক আগে থেকেই। একটি দৈনিক পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘বৃহন্নলা’ প্রসঙ্গে মুরাদ পারভেজ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় বলেন, ‘সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গল্পে একটি গাছের ঐশ্বরিক ক্ষমতা দেখানো হয়েছে। আর বৃহন্নলা ছবিতে একটি গাছকে ঘিরে গ্রাম্য রাজনীতি তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটিতে মূলত দখলের রাজনীতির চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছি। এক্ষেত্রে আদর্শগত কোনো মিল হয়ত থাকতেই পারে, কিন্তু বৃহন্নলা কাহিনি এবং ছবির চরিত্রগুলোর সঙ্গে কেউ ওই গল্পের কোনো মিল খুঁজে পাবেন না।’(বিডি নিউজ24.কম/ প্রথম আলো)
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যের পাঠক ও বাংলা সিনেমার দর্শকদের অনেকটা মূর্খ ভাবছেন মুরাদ পারভেজ? যারা সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘গাছটা বলেছিল’ গল্পটা গভীর মনসংযোগে পড়েছেন তারা জানেন, সৈয়দ সিরাজ তার গল্পের সেই গাছটিকে ঘিরে কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা দেখাননি। লোকমিথ তথা লোকসংস্কারের আড়ালে তিনি ওই গল্পে গ্রামের কুটিল রাজনীতিকেই এঁকেছেন। গল্পের শেষাংশেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন, ‘আচম্বিত একটি বোমা ফাটল। আবার বোমা ফাটল। হল্লা, রণহুঙ্কার, ক্রমাগত বোমা বারুদের কটু গন্ধ। ধোঁয়া। গাছটা নিশ্চয় বলছিল, মর মর মর...। আর লোকগুলো মরছিল। গাছটা বারবার বলে থাকবে, মর মর মর। কারণ লোকগুলো বারবার মরছিল। চাপ চাপ রক্ত। নো-ম্যান্স-ল্যান্ড রক্তে লাল হচ্ছিল। প্রকৃতিতে তখন বসন্তকাল। এ সময় মৃত্যুও যেন রক্তিম সৌন্দর্য হয়।’
লেখা বাহুল্য, গাছটাকে ঘিরে যদি ঐশ্বরিক ক্ষমতা দেখানো হতো, তাহলে লেখক বোমার কথা উল্লেখ করতেন না। ঈশ্বর বোমা মারেন না। বোমা মারে মানুষ। সেই মানুষ, যারা ওই বৃহন্নলা বৃক্ষকেন্দ্রিক বিরানভূমিটি দখল করতে চায়। এর মানে দাঁড়ায়, মুরাদ পারভেজ গল্পটির অর্থই বোঝেননি। আর তিনি যদি না বুঝে থাকেন তাহলে কী করে ব্যাখ্য দিলেন ওই গাছটির ঐশ্বরিক ক্ষমতার ব্যাপারটি? তিনি যে জেনেশুনেই গল্প চুরি করেছেন এটা পরিষ্কার। সিরাজের গল্পের গাছটি গ্রাম্য রাজনীতিরই একটি অংশ।
বৃহন্নলা সিনেমাটি ‘গাছটা বলেছিল’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত তা প্রথম লেখক পরিবারের দৃষ্টিগোচর হয় ভারতের জয়পুর চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবার পর। ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ‘ইন্ডিয়ান টাইমসে’ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ছেলে অভিজিৎ সিরাজের অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে শিরোনাম করা হয়, ÔBangla director lifted father’s story : Mustafa Siraj’s sonÕ.| (Click This Link)
ওই প্রতিবেদনে গল্প চুরির অভিযোগটি অস্বীকার করেছিলেন মুরাদ পারভেজ। তিনি বলেছিলেন, ‘ছবিটি সম্পূর্ণ আমার মৌলিক গল্প নিয়ে তৈরি।’ মুস্তাফা সিরাজপুত্র অভিজিৎ সিরাজ বলেন, “মুরাদ পারভেজ ‘চন্দ্রগ্রহণ’ সিনেমার কাজটি বাবার অনুমতি নিয়েই করেছিলেন। তাহলে তিনি ‘বৃহন্নলার’ ক্ষেত্রে কেন অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি আমি বুঝতে পারছি না। আমাদের কথা হলো অনুমতি তো দূরে থাক, তিনি এটি নিজের প্লট বলেই চালিয়ে দিয়েছেন। তার চেয়ে বড় কথা তিনি অবলীলায় কিভাবে এই সত্যটি অস্বীকার করে যাচ্ছেন।”
‘বৃহন্নলা’ গাছের নামের ব্যাখাও ছিল গল্পে। গল্পের বর্ণনায়, ‘গাছটা ছিল ফলহীন। কোনো ফুলও ফুটতে দেখা যায়নি তার ডালপালার ডগায়...নর নও, নারীও নও। তুমি কি বৃহন্নলা অর্জুন?’ ‘গাছটা বলেছিল’ গল্পে বৃহন্নলা শব্দটি ১০ বার আছে। বৃহন্নলা সিনেমার ডিভিডি কাভারে বৃহন্নলার নামকরণ নিয়ে লেখা আছে, ‘এই গাছটির কোনো ফল নেই, ফুল নেই। তাই এটি বৃহন্নলা গাছ।’ এই উক্তিটি ছিল মুস্তাফা সিরাজের গল্পেও। বৃহন্নলা ছবির গল্প এবং মুস্তাফা সিরাজের ‘গাছটা বলেছিল’র গল্প, এই দুটিতেই গাছের দুই পাশে হিন্দু-মুসলিম অধ্যুষিত দুটি গ্রামকে দেখানো হয়েছে। উন্নাসিক আরসিনিক এক প্রৌঢ়, বৃহন্নলায় যাকে যুক্তিবাদী আরজ ডাক্তার হিসেবে দেখানো হয়েছে । ছবির মাস্টারমশায় (মানস বন্দ্যোপাধ্যায়) যাকে গল্পের রসিক মঞ্জুর হোসেন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গল্পের পাচু চোর ছবিতে হুবহু চোর। ছবিতে মুসলিম ডাক্তার চরিত্রটি তৈরি হয়েছে গল্পের তরুণ ডাক্তার অসীম বোসের অনুকরণে। গাছের মোটা শেকড়ে বুট জুতা পরা একজন পা রেখেছিল গল্পে। সেটির দৃশ্যায়নও রয়েছে সিনেমায়।
অপরদিকে বৃহন্নলার একটি গানও চুরি করা। পশ্চিমবঙ্গের নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষের হিন্দি সিনেমা ‘রেইনকোট’ সিনেমায় পিয়া তোরা ক্যায়সা আভিমান/সাঘান সাওয়ান লায়ি/কাদাম বাহার/মাথুরা সে ডোলি লায়ে/চারো কাঁহার।’ অপরদিকে মুরাদ পারভেজের ‘বৃহন্নলা’য় এই গানের সুর এবং কথা প্রায় হুবহু ঠিক রেখে বাংলায় করেছেন এ রকম : ‘প্রিয় তোর কিসের অভিমান/সঘন শ্রাবণ এল পায়ে পায়ে/ মথুরার পালকি এল চাদর গায়ে/ এল না এল না প্রিয়া সখা আমার/ আঙিনা হলো সুনসান।’
হিন্দি গানটির সংগীতায়োজন করেন দেবজ্যোতি মিশ্র এবং বাংলা এই গানের সংগীতায়োজন করেন গীতিকার-সুরকার ইমন সাহা। কথা ও সুর হুবহু থাকার পরও ইমন সাহা এই গানটিকে নকল বলতে নারাজ। কিংবা গানটি চুরি করা সুরে করা তাও স্বীকার করতে চান না তিনি। ইমন সাহা বলেন, “রেইনকোট সিনেমায় দেবজ্যোতি মিশ্র ছাড়াও এই সুরটা মেহেদি হাসানসহ আরো অনেকেই ব্যবহার করেছেন। এটি চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশের দশকে গাওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে মেহেদি হাসান ‘বালমা তুম ক্যায়া জানো’ বন্দিশটা গজল আকারে করেছিলেন। তবে এযাবৎকাল এর আসল সুরকারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।”
https://www.youtube.com/watch?v=4CtBGbt5z7A রেইনকোট এর এই গানটি নকল করেন সংগীত পরিচালক ইমন সাহা। এই গানের নকল বাংলা বা অনুবাদ করে তৈরি করেন https://www.youtube.com/watch?v=tV6aGCkSK1M
‘বৃহন্নলা’য় ব্যবহৃত গানটি যে রেইনকোট সিনেমার গানটির অনুবাদ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইমন সাহা কিংবা মুরাদ পারভেজ এই গানটি নিয়ে কেন পুরনো কাসুন্দি ঘাটছেন বোঝা কষ্টকর। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নীতিমালায় আছে সিনেমার কোনো একটি অংশের মৌলিকত্ব না থাকলে এটি জাতীয় পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবে না। সরকারি অনুদান নীতিমালার ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “দেশি গল্প কাহিনির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লেখক/সংস্থা/প্রকাশকের লিখিত সম্মতি/অনুমতি নিতে হবে। বিদেশি গল্প বা কাহিনির ক্ষেত্রে কপিরাইট আইন এর আওতায় সংশ্লিষ্ট লেখক/সংস্থা/প্রকাশকের লিখিত অনুমতি নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দাখিল করতে হবে।” ২৪ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্র মৌলিক নয় বলে প্রমাণিত হলে প্রযোজক অনুদান হিসেবে গৃহীত সমুদয় অর্থ ও সেবার মূল্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রচলিত সুদসহ ফেরৎ দিতে বাধ্য থাকিবে এ মর্মে একটি অঙ্গীকারপত্র প্রযোজ্য স্ট্যাম্প পেপারে আবেদনের সঙ্গে দিতে হবে। অবৈধ পন্থা অবলম্বন ও অনুদানের শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরকার সংশ্লিষ্ট নির্মাতা/অনুদান গ্রহণকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।”
এমন আইন থাকার পরও গল্প ও গান চুরি করে বানানো ‘বৃহন্নলা’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। এই পুরস্কার কতটা যৌক্তিক। এই পুরস্কার কি চুরিশিল্পকে উৎসাহিত করবে না?

২|
০৭ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ৯:০৫
বিজন রয় বলেছেন: হা হা হা ।
আর কত দেখবো।
৩|
০৮ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ১:২০
সরদার ভাই বলেছেন: সত্য কখনো চাপা থাকবেনা। গল্পটি আমি পড়েছিলাম। অওসাম স্টোরি লাইন।
©somewhere in net ltd.
১|
০৭ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৪:৩৭
টোকাই রাজা বলেছেন: নকলের রাজ্যে পৃথিবী ছন্দময়।