| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ঢাকায় থাকি। জন্ম বাংলাদেশের শ্যামল গ্রামে। শাহবাগে আড্ডা দিই মাঝেমাঝে। কবিতা লিখে আনন্দ পাই। লেখার চেষ্টা করি।
আবুল আহসান চৌধুরীর ‘লালনসমগ্র’ : আদর্শ সম্পাদনার নজির
তপন বাগচী
লালন নিয়ে দেশে-বিদেশে বহুমুখী চর্চার খবর আমরা জানি। লালনের গানের পরিবেশনা, লালনকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ কিংবা লালন সম্পর্কিত আলোচনা-গবেষণা লালনচর্চার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু লালনচর্চার যাবতীয় তথ্য সংকলন ও সম্পাদনার মাধ্যমে লালনচর্চার ত্রে আরো প্রসারিত করলেন প্রফেসর ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী। ‘লালনসমগ্র’ নামে ‘প্রামাণ্য লালনগীতিসমগ্র, অনুবাদ, দু®প্রাপ্য দলিলপত্র, ফটোআ্যালবামসহ লালনের আখড়াই ঘরানার আদি সুরের গানের অডিও সিডি’-সম্বলিত সংকলনগ্রন্থ সম্পাদনা করে আবুল আহসান চৌধুরী, কেবল দায়িত্ব পালন নয়, আদর্শ সম্পাদনারও নজির সৃষ্টি করলেন।
আবুল আহসান চৌধুরী বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিাবিদ। সাহিত্য-গবেষণায় তাঁর খ্যাতি দেশের বাইরেও বহুধাবিস্তৃত। ফোকলোর ও লালন গবেষণায় তাঁর কৃতিত্ব নানা মাত্রায় আলোচিত হলেও, তাঁর আরো কয়েকটি কৃতিত্বের দিকের খবর আমরা জানি। উনিশ শতকের সাহিত্য, দু®প্রাপ্য ও বিলুপ্তপ্রায় সাহিত্য-উপকরণ উদ্ধার ও মূল্যায়নে বাংলাদেশে তাঁর সমক কাজ করার মতো গবেষকের সংখ্যা অঙুলিমেয়। বিশেষত লালন সাঁই ও মীর মশাররফ হোসেনকে নিয়ে তাঁর গবেষণা দুই বাংলায় এখনো শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। দু®প্রাপ্য চিঠিপত্র সংগ্রহ ও সংকলনে তাঁর যোগ্যতা তুলনারহিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অন্নদাশঙ্কর রায়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, হেমন্তকুমার সরকার, হেমচন্দ্র বাগচী প্রমুখের চিঠিপত্র সংগ্রহ ও সংকলন করে তিনি বাংলাসাহিত্যের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপকরণ যুক্ত করেছেন। অন্নদাশঙ্কর রায় ও আহমদ শরীফের দীর্ঘ সাাৎকারভিত্তিক গ্রন্থ রচনার কৃতিত্বও তাঁর। এই ধরনের গ্রন্থ আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে অনেক নতুন তথ্য যোগ করতে সমর্থ। এরকম একক সাাৎকারের গ্রন্থ রচনার মতো প্রাজ্ঞ লেখকের অভাবও রয়েছে এদেশে।
ঢাকা থেকে অনেক দূরের শহরে অবস্থান করেও তিনি এ ধরনের মৌলিক গবেষণা করে যাচ্ছেন, কোনো রকম পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই, যা জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বের দাবিদার। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে যাঁরা গবেষণা করেন, উপাধি অর্জন কিংবা পদোন্নতি প্রাপ্তির পরে তাঁদেরকে আর তেমন করে গবেষণা করতে দেখা যায় না। শিাদানের পাশাপশি গবেষণা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকদের চাকরির শর্ত হলেও গবেষণার প্রতি অনেক শিকেরই প্রবল অনীহা ল করা যায়। মেধা ও প্রতিভা ছাড়া গবেষণাকর্ম যে চালিয়ে যাওয়া যায় না, ওইসকল গবেষকের এ ধরনের আচরণ থেকেই তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায়। পান্তরে আমরা দেখি, আবুল আহসান চৌধুরী তাঁর ছাত্রজীবনেই গবেষণার েেত্র সফলতার প্রমাণ রেখেছেন। ‘কুষ্টিয়ার বাউল সাধক’ (১৯৭৪) সেই সময়েই আশুতোষ ভট্টাচার্য, আহমদ শরীফ, শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, শঙ্কর সেনগুপ্ত প্রমুখ গবেষক-সমালোচকের উচ্চপ্রশংসা লাভে সমর্থ হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আগেই তিনি যে ক’টি গবেষণা সম্পন্ন করেছেন, তাতেই তিনি দেশের একজন শ্রেষ্ঠ গবেষক হিসেবেই নন্দিত হয়েছেন। কলেজের অধ্যাপক থাকাকালেই তিনি গবেষণার কুলীনতা অর্জন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার পরেও তিনি গবেষণার ধারাকে কেবল অব্যাহত রেখেছেন। এই সময়ের খুব কম অধ্যাপককেই দেখি এতটা পরিশ্রমী, এতটা উদ্যোগী আর এতটা মেধাবী! তাঁর পরিশ্রম-উদ্যোগ আর মেধার সাম্প্রতিক স্বার এই ‘লালনসমগ্র’।
বিশালাকার এই গ্রন্থের চারটি পর্ব রয়েছেÑ ১. লালনের গান, ২. লালন-সম্পর্কিত আলোচনা, ৩. লালন-চর্চার নজির-সম্বলিত দলিল ও আলোকচিত্র, ৪. আখড়াই ঘারানার আদিসুরের গানের সিডি। এই গ্রন্থ একই সঙ্গে পাঠ্য, দৃশ্য ও শ্রাব্য। এই আয়োজন যে গবেষকের দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের ফসল, তা বুঝতে কারোরই কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
আবুল আহসান চৌধুরীর লালনচর্চার সূত্রপাত তাঁর কৈশোর থেকেই। লালনের প্রতিবেশি হওয়ার সুবাদে জন্মের পর থেকেই তিনি লালনের গান শুনে আসছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে-জীবনে প্রকাশিত ‘কুষ্টিয়ার বাউল সাধক’ গ্রন্থ তাঁর লালন-গবেষণার প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। গ্রন্থের ভূমিকায় মনীষী আহমদ শরীফ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, ‘আবুল আহসান চৌধুরীর প্রয়াস ও সাফল্য অভিনন্দনযোগ্য। কালে তিনি একজন পণ্ডিত ও গবেষকরূপে প্রখ্যাত হবেনÑ দেশও মানুষ তাঁর অবদানে উপকৃত ও আনন্দিত হবেÑ এ প্রত্যাশা ও কামনা নিয়ে এবং তাঁকে আমার অভিনন্দন জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি। ১৮.০৯.১৯৭৩’। আহমদ শরীফের মতো শিকের এরকম সংপ্রশংস ভূমিকা আবুল আহসান চৌধুরীর মতো একজন গবেষক-ছাত্রের গ্রন্থের ভূমিকা হিসেবেই মানায়। আহমদ শরীফের বাণীকে তিনি সত্য প্রমাণ করেছেন।
প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের মাসদুয়েক ব্যবধানে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘লালন স্মারকগ্রন্থ’ (মার্চ ১৯৭৪)। লালনের জন্মের দ্বিশততম বার্ষিকী উপলে বইটি প্রকাশ করে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র। ‘লালন সম্পর্কে এ জাতীয় সংকলন বাংলাতে সম্ভবত প্রথম’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আহমদ কবির। ওই গ্রন্থ পড়েই অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর ‘লালন ও তাঁর গান’ নামের প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেন। এই স্বীকারোক্তি রয়েছে তাঁর কণ্ঠেÑ ‘আমরা এই জন্য আবুল আহসান চৌধুরীর কাছে ঋণী। বিশেষ করে আমি। লালন সম্পর্কে আমার ছোট একখানি রচনা আছে। ওটি আমি লিখতে পারতুম না, যদি না আবুল আহসান চৌধুরীর গ্রন্থখানি আমার কাছে থাকত’। মনীষী অন্নদাশঙ্কর রায় যে গবেষকের কাছে ঋণ প্রকাশ করেন, সে গবেষকের পাণ্ডিত্য ও কর্মতৎপরতার ব্যাপারে আর সন্দেহ থাকে না। আবুল আহসান চৌধুরী এরপর লালন সাঁইয়ের জীবনী লিখেছেন। এই জীবনী সম্পর্কে কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় সুধীর চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন, ‘...নিঃসংশয়ে বলা যায়, এখনও পর্যন্ত বাংলা ভাষায় প্রকাশিত লালনবিষয়ক বইগুলির মধ্যে এই বই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, তথ্যবহুল এবং আকরবিশেষ।’
এরপর লালনবিষয়ক একাধিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন, যা প্রকাশিত হয়েছে ‘সমাজ সমকাল ও লালন সাঁই’ (১৯৯৪), ‘লালন সাঁই: প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ’ (২০০৩), ‘লালন সাঁইয়ের সন্ধানে’ (২০০৮) প্রভৃতি গ্রন্থে। লালনবিষয় তথ্য ও দলিল সংগ্রহ করে তিনি অনেক ভ্রান্ত ধারণা শুধরে দিয়েছেন এবং নতুন তথ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিরন্তর গবেষণা ও অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থেকে তিনি সংকলন করেছেন ‘লালনসমগ্র।’ সম্পাদকের ভূমিকার পরে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমানের ‘লালনের গান’ নামক কবিতা এই গ্রন্থের শুরুতে স্থান দিয়ে অর্থাৎ আধুনিক কবির কবিতা দিয়ে এই লোককবির প্রতি সম্মান জানানোর একটি চমৎকার প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করলেন। এরপরে রয়েছে লালনের গানের সূচি এবং লালনের গান।
বাংলাদেশে লালনচর্চায় সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন আবুল আহসান চৌধুরী। তাঁর গবেষণাই বেশি অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণী। লালন সম্পর্কে সর্বাধিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন তিনি। সর্বাধিক গ্রন্থের প্রণেতাও তিনি। লালন সম্পর্কে বেশি কিছু জানতে গেলে তাঁর দ্বারস্থ হতে হয়। এমনকি লালনচর্চার খবর নিতেও তাঁর রচনার কাছে আশ্রয় খুঁজতে হয়। তিনি লালনের পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনা করেছেন, যা লালনের মৃত্যু শতবার্ষিকীতে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয় ‘লালন সাঁই’ (১৯৯০) নামে। আমরা জানি যে, একদল গবেষক লালনকে ‘মুসলমান’ বানানোর চেষ্টায় আদাজল খেয়ে লেগেছিলেন। কেউ কেউ লালনের গানকে ‘অনৈসলামিক’ বলে ফতোয়া দিয়ে বাউল মতবাদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াতে লাগলেন। কেউ কেউ আবার লালন যে হিন্দু সম্প্রদায়ের, তা প্রমাণের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। লালনের গান নিয়ে চর্চা-ব্যাখ্যার চেয়ে তাঁর জাত-ধর্ম নিয়ে বেশি টানাটানি শুরু হয়ে গেল। লালনের জন্মস্থান কুষ্টিয়ার ভাঁড়ারা নয়, ঝিনাইদহের হরিশপুর Ñ এরকম দাবি নিয়ে কেউ কেউ গ্রন্থও ফেঁদে বসলেন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের যৌক্তিক পথ দেখিয়েছেন ড. আবুল আহসান চৌধুরী। তাঁর সপ্রমাণ যুক্তি সুধিজনের কাছে গ্রাহ্য হওয়ায় লালনচর্চার ধারাটাই বদলে যায়। মতলববাজদের হাত থেকে রার ব্যাপারে তিনি এক বড় ভূমিকা পালন করেছেন। লালনচর্চার প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে তিনি হাজির করেছেন ‘হিতকরী’ পত্রিকার ‘মহাত্মা লালন ফকীর’ প্রবন্ধ। এটি একধরনের মূল্যবান আবিষ্কার বটে!
লালনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত মীর মশাররফ-সম্পাদিত পাকি ‘হিতকরী’ পত্রিকায় ‘মহাত্মা লালন ফকীর’ প্রবন্ধটি লালনচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এর প্রকৃত লেখক কে, তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। কেউ বলেন রাইচরণ দাসের নাম, আবার কেউ বলেন মীর মশাররফ হোসেনের নাম। লেখাটি রাইচরণ দাসের বলেই মন্তব্য করেছেন বেশিরভাগ লালন-গবেষক। আবুল আহসান চৌধুরী এই তথ্য উদ্ধার করেছেন এবং সৈয়দ মুর্তাজা আলী প্রমুখ গবেষক এটি সমর্থন করেছেন। লালনচর্চার প্রাচীন দলিল হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লালন সম্পর্কে প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ এবং ‘মহাত্মা লালন ফকির’ নামে গ্রন্থ রচনার কৃতিত্ব বসন্তকুমার পালের। লালনের গান সংগ্রহে মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ব্যাপক অবদান রয়েছে। প্রথমযুগের লালনচর্চার েেত্র কবি জসীমউদ্দীনের ‘লালন ফকির’ প্রবন্ধেরও গুরুত্ব রয়েছে। লালনের প্রথম জীবনীকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন বসন্তকুমার পাল। ১৩৬২ সালে তিনি ‘মহাত্মা লালন ফকীর’ নামে এই জীবনী প্রকাশ করেন। কুষ্টিয়ার এককালীন মুন্সেফ মতিলাল দাশ লালনের অনেক গান সংগ্রহ করেন। তাঁর সংগ্রহ ‘লালন-গীতিকা’ (১৯৫৮) নামে প্রকাশিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। লালনচর্চায় গবেষক ভোলানাথ মজুমদার এবং ড. উপন্দ্রেনাথ ভট্টাচার্যের অবদান রয়েছে। ড. ভট্টাচার্যের ‘বাংলার বাউল ও বাউলগান’ গ্রন্থে লালনের গান এবং জীবনতথ্য পাওয়া যায়। ‘হারামণি’-খ্যাত মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন গ্রামেগঞ্জে ঘুরে লালনের গান সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক মুহম্মদ আবূ তালিব, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্য প্রফেসর ড. আনোয়ারুল করীম, বাংলা একাডেমীর প্রাক্তন উপপরিচালক ড. খোন্দকার রিয়াজুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. এসএম লুৎফর রহমান, গবেষক এএইচ ইমামউদ্দীন প্রমুখ ব্যক্তি লালন-গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন এবং গ্রন্থ রচনা করেন। লালনচর্চায় ঢাকা বিশ্ববিাদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন প্রফেসর ড. আহমদ শরীফের ‘বাউলতত্ত্ব’ (১৯৭৩) গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিাদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. হায়াৎ মামুদ লালনের কিশোরতোষ জীবনী রচনা করে একটি গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। কথাশিল্পী আবু রুশদ লালনের ৬০টি গান অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন। ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী লালনের গান ফরাসিভাষায় অনুবাদ করেছেন। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে লালনকে পৌঁছে দেয়ার কাজ সুগম হয়েছে। লালন বিষয়ক রচনাপঞ্জি প্রণয়ন করে বাংলা একাডেমীর প্রাক্তন পরিচালন ড. মোমেন চৌধুরী লালনগবেষণায় যে অবদান রেখেছেন, তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার্য।
আনোয়ারুল করীম ‘বাউল : একটি আধ্যাত্মবাদী সাধনা’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএম লুৎফর রহমান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সোলায়মান আলী সরকার পিএইচডি পেয়েছেন। এঁদের অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ছিলো যথাক্রমে ‘বাউলসাধনা ও লালন শাহ’ এবং ‘লালন শাহের মরমী দর্শন’। ইমাম আহমেদ নামের এক গবেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে গবেষণা করে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ‘লালনের গান: আধ্যাত্মিকতার স্বরূপ সন্ধান’ নামে তা গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছে। লালনের গানের ছন্দ-ও-অলঙ্কারবিচার করতে গিয়ে তিনি ভুল তথ্য ও ভুল বিশ্লেষণের নজির স্থাপন করেছেন। আবুল আহসান চৌধুরীর তথ্য ব্যবহার করেই জুলফিকার নিউটন নামের এক ব্যক্তি ‘মরমী লালন ফকির’ নামের গ্রন্থ রচনা করে বসে আছেন। ওই গ্রন্থে একটি তথ্যও জুলফিকার নিউটনের নিজের আবিষ্কার কিংবা উদ্ধার নয়। কিন্তু স্বীকৃতি ছাড়াই তিনি নিজের নামের গ্রন্থে অন্যেও বিশেষত আবুল আহসান চৌধুরীর যাবতীয় তথ্য ব্যবহার করেছেন। এরকম কুম্ভিলকবৃত্তির আশ্রয় নিয়ে অনেকেই লালনবিষয়ক গ্রন্থ কিংবা প্রবন্ধ রচনা করেছেন।
‘লালনসমগ্র’ গ্রন্থে একসঙ্গে যাবতীয় তথ্য পাওয়া যায় বলে লেখক ও গবেষকের কাছে এটি মহার্ঘ্য হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু যারা বিনা পরিশ্রমে গ্রন্থ রচনা করতে চান তাদের জন্যও এটি উপকারী আশ্রয় হতে চলছে। লালন সম্পর্কে কোনো রকম অনুসন্ধান ছাড়াই অনেকে লালনের গান সংকলন করে চলছেন।
লালনের গান সংকলনের েেত্র মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের নাম সর্বাগ্রে উচ্চার্য। গান সংকলনে লালন-আখড়ার ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহ-র অবদান ব্যাপক। তিনি লালনের গান সংগ্রহ করে তিনখণ্ডে প্রকাশ করেন। এর ভূমিকা রচনা করেন ড. আবুল আহসান চৌধুরী। পরবর্তীকালে আরও অনেকে লালনের গান সংকলন করেছেন। গবেষণা কিংবা তথ্যসংগ্রহের শ্রম স্বীকার না করেও কিংবা বাউলদের কণ্ঠে একটি গান না শুনেও কেউ কেউ লালনের গান সংকলন করে গবেষকের মর্যাদা পাচ্ছেন। এই সকল গবেষকের তুলনায় যাঁরা সস্তা নিউজপ্রিন্টে লালনের গান ছেপে ‘বটতলার বই’য়ের মতো করে প্রকাশ করেছেন, লালনের গানের বাণী প্রচারের েেত্র তাদের অবদান কম নয়। এঁরা হয়তো গবেষক নন, নিছক পুস্তক ব্যবসায়ী; কিন্তু লালনের গানের কদর তাঁদের কাছে একটুও কম মনে হয়নি।
লালন-শিষ্য দুদ্দু শাহ রচিত ‘লালনজীবনী’ পুঁথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশ করে ড. এসএম লুৎফর রহমান লালনের জন্মপরিচয় নিয়ে নতুন তথ্য হাজির করেন। এতে লালনের পিতার নাম দরিবুল্লাহ দেওয়ান ও মাতা আমিনা খাতুন এবং জন্ম ঝিনাইদহের হরিশপুর বলে উল্লেখ করা হয়। মুহম্মদ আবূ তালিব ও খোন্দকার রিয়াজুল হক এই মতের সমর্থন ও প্রচার করেন। কিন্তু লালন-গবেষক ও পুঁথিবিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই পুঁথিকে জাল হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিশেষত পুঁথিবিশেষজ্ঞ ড. আহমদ শরীফ একে ‘বানানো দলিল’ বলে মনে করেছেন। একে বিশ্বাস না করার ৬টি কারণ সযুক্তি উপস্থাপন করে তিনি ‘একালের কোন স্বল্পবুদ্ধি যশোহরী ও ইসলামগৌরবগর্বী গবেষকই এ জীবনী তৈরি করেছেন’ বলে মন্তব্য করেছেন। ‘তেমনি জাত’ লালনকে ‘খতনার জাত’ বানানোর অপকৌশল এভাবে ব্যর্থ হয়ে পড়ে ড. আহমদ শরীফ ও ড. আবুল আহসান চৌধুরীর অনুসন্ধানী গবেষণার কারণে। পরে আনোয়ারুল করীম, এএইচএম ইমামউদ্দীন প্রমুখ গবেষক দুদ্দু শাহের ‘পুঁথি’কে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। তবে জেনে হোক না-জেনে হোক, লালনের জাত নিয়ে টানাটানি করার কিংবা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার নিয়ে মত্ত থাকার লোক দু’চারজন এখনও এ সমাজে রয়েছে। খোন্দাকার রিয়াজুল হকের প্রবন্ধ এগ্রন্থে থাকলেও মুহম্মদ আবূ তালিব ও ড. এসএম লুৎফর রহমানের প্রবন্ধ এ গ্রন্থে গ্রহণ করা হয়নি। অর্থাৎ ‘লালনসমগ্র’ বলা হলেও লালনবিষয়ক যাবতীয় রচনা এখানে গ্রন্থিত হয়নি। তবে তাঁদের গ্রন্থের প্রচ্ছদ এবং আখ্যাপত্র ছাপা হয়েছে গ্রন্থের তৃতীয় পর্বে। লালনকে যাঁরা ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, কিংবা যে সকল রচনায় লালন সম্পর্কে সদর্থক মূল্যায়ন রয়েছে, তার উল্লেখযোগ্য এবং প্রধান রচনাই এই গ্রন্থের আধেয়। এ গ্রন্থে প্রবন্ধ রয়েছে বসন্তকুমার পাল, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, মতিলাল দাশ, অন্নদাশঙ্কর রায়, কাজী মোতাহার হোসেন, জসীমউদ্দীন, হিরণ¥য় বন্দ্যোপাধ্যায়, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, মুহম্মদ আবদুল হাই, আহমদ শরীফ, রথীন্দ্রকান্ত ঘটকচৌধুরী, আশরাফ সিদ্দিকী, ওয়াকিল আহমদ, ক্যারল সলোমন, সনৎকুমার মিত্র, শামসুজ্জামান খান, সুধীর চক্রবর্তী, শক্তিনাথ ঝা, রমাকান্ত চক্রবর্তী, আনোয়ারুল করীম, হরিপদ চক্রবর্তী, মুচকুন্দ দুবে, মকছেদ আলী সাঁই, আবু জাফর, খোন্দকার রিয়াজুল হক প্রমুখের। দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে ক’জন লেখকের প্রবন্ধ বাদ দেয়া হলেও লালনকে বুঝতে এই প্রবন্ধগুলিই যথেষ্ট। প্রবন্ধগুলো নিয়ে পৃথক মন্তব্য করার সুযোগ নেই। নাম পড়েই বোঝা যায় যে, এরা সকলেই বাংলা সাহিত্যে খ্যাতিমান এবং লোকসংস্কৃতি ও লালন সম্পর্কে এঁদের পাণ্ডিত্য সুবিদিত। ৩২টি নির্বাচিত প্রবন্ধ একসঙ্গে পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য সম্পাদক আবুল আহসান চৌধুরীকে কৃতজ্ঞতা জানাই। এই প্রবন্ধগুলো সহজপ্রাপ্য ছিল না। নানা উৎস থেকে খুঁজে এনে তিনি একসঙ্গে গ্রথিত করেছেন। যে আশঙ্কায় তিনি উৎস-নির্দেশ করেননি, তা রোধ করার উপায় নেই। সম্পাদকের সংগৃহীত তথ্য তো নিজের নামেই চালিয়ে দিচ্ছেন কেউ কেউ।
লালনবিষয়ক যত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার প্রচ্ছদ ও আখ্যাপত্র মুদ্রিত হয়েছে তৃতীয় পর্বে। এটি যে কত প্রয়োজনীয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। রীতিমতো প্রদর্শশালায় পরিণত হয়েছে এই অংশ। লালনবিষয়ক গ্রন্থের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য দেখে বিস্ময় মানতে হয়। বাউল লালনের প্রতি বাঙালির এত আগ্রহ, এই গ্রন্থ প্রকাশিত না হলে, তা টের পাওয়া যেত না।
আবুল আহসান চৌধুরীর বড় কীর্তি লালনের গানের প্রামাণ্য পাঠ নির্ধারণ। আঞ্চলিকতার কারণে ভুল উচ্চারণে গীত হওয়ায় লালনের গানের বাণীও বদলে গেছে। কোনও কোনও গবেষক দুরভিসন্ধিবশত লালনের গানের শব্দ বদলে দিয়েছেন। কেউ কেউ অন্যের গান লালনের গান বলে চালিয়ে দিয়েছেন। এই সকল অনাচার থেকে লালনের গানকে রা করার জন্য প্রামাণ্যকরণের এই উদ্যোগ তর্কাতীতভাবে প্রশংসনীয়। ‘লালনসমগ্র’ গ্রন্থটি আমাদের সমাজে আদর্শ সম্পাদনাকর্মের নজির হিসেবে মূল্য পেতে পারে।
১৩৩৫ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম ১৪৯৫ টাকা একটু বেশি মনে হলেও পাঠকের আকর্ষণ তাতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বইটির গুরুত্ব এ থেকেও প্রমাণিত। সেলিম আহমেদের প্রচ্ছদ যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি আকর্ষণীয় এর প্রকাশনা-সৌকর্য। এেেত্র পাঠক-সমাবেশ-এর সাহিদুল ইসলাম বিজুর রুচির প্রশংসা করতে হয়।
.................................
লালনসমগ্র
সম্পাদক : আবুল আহসান চৌধুরী
প্রকাশক : সাহিদুল ইসলাম বিজু, পাঠক সমাবেশ, শাহবাগ, ঢাকা
প্রকাশকাল : ফেব্র“য়ারি ২০০৮
প্রচ্ছদ : সেলিম আহমেদ
পৃষ্ঠা : ১৩৩৫
মূল্য : ১৪৯৫ টাকা
২|
২০ শে মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৩৬
ফালতু মিয়া বলেছেন: উৎসাহী পাঠক অবশ্যই পাবেন এখানে। দেখুন লালন সম্পর্কে আবুল আহসান চৌধুরীর কথা আবু জাফর সাহেবও স্বীকার করেছেন মোট ৭টি পর্ব
২০ শে মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:০২
তপন বাগচী বলেছেন: ধন্যবাদ, ফালতু মিয়া! আপনার লালন-অনুরাগ আমাকে মুগ্ধ করেছে।
৩|
২০ শে মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:২৬
মামুন মাহফুজ বলেছেন: Click This Link
নিউজটা দেখুন আপনার প্রিয় মুখ দেখতে পাবেন।
আর..কালেকশনটা পেতে পারি? আমিতো এই বিষয়ে ভার্সিটিতে ক্লাস নেই, অনেক হেল্প হতো।
২০ শে মার্চ, ২০১০ রাত ৮:০২
তপন বাগচী বলেছেন: ধন্যবাদ! কালেকশনাটা পেতে পারেন শাহবাগ-এ পাঠক সমাবেশ থেকে।
৪|
২০ শে মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:২৭
বাংলার কথা বলেছেন: ব্লগার তপন বাগচী আমার কমেন্ট মুছে ফেলেছেন।
যুক্তি দিতে পারতেন।About Abul Ahshan
২০ শে মার্চ, ২০১০ রাত ৮:১১
তপন বাগচী বলেছেন: অভিযোগ করেছেন আপনি। আমি যুক্তি দেব কেন? পারলে
[email protected]
এই ঠিকানায় যুক্তি দেবেন। এই আলোচনা ফোরামে না ওঠাই ভালো। আশা করি এটুকু অনুরোধ রাখবেন।
৫|
২০ শে মার্চ, ২০১০ রাত ৮:০৫
রিপাজ ভাই বলেছেন: ক্যান ভাই । কি কমেন্ট করছিলেন?
৬|
২০ শে মার্চ, ২০১০ রাত ৮:৫৬
মামুন মাহফুজ বলেছেন: Click This Link
এখানে দেখুনতো দেখা যায় কি না?
৭|
২০ শে মার্চ, ২০১০ রাত ৯:০৩
রুদ্র তুফান বলেছেন: পি, ডি, এফ কি পাওয়া যাবে? এত দাম! টাকা তো নাই। পি, ডি, এফ, থাকলে বলেন ভাই। পড়তে চাই।
৮|
২১ শে মার্চ, ২০১০ দুপুর ১:১১
খাখা বলেছেন: লেখাটা অসাধারণ। কিন্তু ব্লগের উপযোগী নয়। ব্লগে যারা ঢোকে, তারা হালকা বিষয় নিয়ে কথা বলতেই পছন্দ করে। তবু তপন বাগচীর এই পোস্টটি আমি কষ্ট হরে হলেও পড়েছি। তাঁর পাণ্ডিত্যের প্রতি সালাম জানাই।
৯|
২৫ শে মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৪৬
অনুপম হাসান বলেছেন: সম্পাদক গবেষক ও পণ্ডিত হিসেবে আবুল আহসান চৌধুরী বাংলাদেশের শুধু নয় পশ্চিমবঙ্গের পাঠকমহলেও নন্দিত নাম। আপনার এই পোস্টটির মাধ্যমে জানলাম-- কাঙাল হরিণাথ, জলধর সেন কিংবা মশাররফ হোসেনের পর তিনি আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদনা করেছেন।
ধন্যবাদ আপনাকে-- মরমী কবি লালনের ওপর সম্পাদিত নতুন গ্রন্থের সংবাদ পরিবেশনের জন্য।
২৫ শে মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:২১
তপন বাগচী বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ!
এটি নতুন গ্রন্থ নয়। ২০০৯ সালে প্রকাশিত এবং প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত। ১৫০০ টাকা দামের বই ১০০০ কপি শেষ হয়েছে। তারপরেও তুমি নাম শোনোনি। অবাক!
১০|
১০ ই মে, ২০১১ বিকাল ৪:৪৭
হাম্বা বলেছেন: আমিও শুনি নাই
©somewhere in net ltd.
১|
২০ শে মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৩০
তপন বাগচী বলেছেন: লেখাটি 'কালি ও কলম'-এ ছাপা হয়েছিল। এই ব্লগের উৎসাহী পাঠকদের জন্য এখানে পোস্ট করা হলো।