| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বিশ্ব রোড ধরে শত শত রিকশা ছুটে চলছে। হাইড্রোলিক হর্ন বাজিয়ে ছুটে চলছে বাস ট্রাক। বিষিয়ে তোলে পরিবেশ। অধ্যাপক স্বপন চৌধুরীর এসব ভাললাগেনা। মাথা গুলিয়ে যায়। শরীরটা বমি বমি করে। সন্ধ্যাকালিন আড্ডা ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েন রাস্তায়। লোডশেডিং চলছে। আবছা আধার। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। ভেজা রাস্তা। মোবাইলের আলোয় আস্তে আস্তে হাটা যায়। মাঝে মাঝে বাস ট্রাকের হেডলাইট এর তীব্র আলো চোখে বড্ড লাগে চোখ জ্বালা করে।কিছুদিন ধরে প্রেশারটাও বেড়েছে।নিয়মিত ঔষধ খান। তবুও যেন ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে নেই। আজিজুল হক কলেজের অংকের অধ্যাপক স্বপন চৌধুরীর জীবনের অংক মিলাতে ভীষণ কষ্ট হয়। একাকীত্ব জীবনে তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন। দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। ফেলে আসা অতীত বার বার মনের জানালায় উঁকি মারে। এক ঝলক আলো নিমিষেই মিলে যায়। আঁধার এসে ঢেকে দেয় সব।
বাবা মা হারা স্বপন চৌধুরী এতিম খানায় বেড়ে উঠেছেন। এতিম খানাতেই লেখা পড়া শুরু। অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন বলে সজ্জন স্বচ্ছল ব্যক্তির আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। আর্থিক আনুকূল্য ও বৃত্তির টাকায় তাঁর পড়ালেখা থেমে যায়নি। তাছাড়া এতিম খানার স্বত্বাধিকারী অনুকুল চৌধুরী, স্বপনকে স্নেহ করতেন। প্রয়োজনীয় পরিধেয় পোশাকাদি তিনিই দিতেন। খাতা কলম বই পুস্তকের অভাব স্বপনকে বুঝতে দেননি। এমনকি স্বপনের নামের শেষাংশ বা উপাধি "চৌধুরী" অনুকুল বাবুরই দেয়া। এতিম খানাতে বসবাস হলেও স্বপনের কোন অভাব ছিল না। অভাব ছিল একতাই, আত্মীয় পরিজনের। বাবা মায়ের। ভাই বোনের। তাঁর রক্ত স্রোতধারার আপন মানুষের। পৃথিবী নামক এই গ্রহে, অনুকুল বাবুর মৃত্যুর পর স্বপন চৌধুরী আজ বড় একা স্বজন হারা পরিত্যক্ত ফসিল যেন।
রিম ঝিম বৃষ্টি ঝরছে । রুমালে মাথা ঢাকেন তিনি। ঃ স্যার উইটা বসেন। পরিচিত রিকশা চালক কফিল। রিকশায় টিপ টিপ হ্যারিকেনের আলো জ্বলে । বৃষ্টির ছাট বাড়ে। পলিথিন মোড়া দিয়ে রিকশায় উঠে বসেন। কফিল কত দিনের চেনা। কতই বা বয়স তখন। আঠারো কিংবা উনিশ। আজ চুলে পাক ধরেছে। সুঠাম মাংসল শরীর ভেঙ্গে পরেছে। কোঠর পরিশ্রম আর আর্থিক অনটন কফিল কে দ্রুত বুড়িয়ে তুলেছে। নিষ্ঠুর সময় আর দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে কফিলরা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। দেখার কেউ নেই। ছেঁড়া গেঞ্জির মালিকেরা হাজার কুটি টাকার মালিক হয়। তাদের টাকার বিদেশী ব্যাংক ফুলে ফেফে ডাইস হয়।রাষ্ট্রীয় সম্পদ ছুরি করে তারা দেশে বিদেশে প্রসাদ গড়ে। কফিলেরা নোংরা, অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে বাস করে আধাপেটা খেয়ে না খেয়ে অকালেই ঝরে পরে। কি নিষ্ঠুর সামাজিক অবক্ষয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন স্বপন চৌধুরী। রিকশায় নড়ে চড়ে বসেন। রোড বেয়ে সাতমাথা, রাইফেল ব্যাটালিয়ন, উপ শহর। মাত্র দশ মিনিটের পথ আজ খুব বেশি দীর্ঘ মনে হয়।
রাস্তার দুধারে অসংখ্য নতুন বাড়িঘর নির্মিত হয়েছে এবং হচ্ছে। দশ বার বছরের ব্যবধানে নিজ শহর আজ অচেনা মনে হয়। সেদিনও খোলা আকাশ ছিল, দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠ ছিল, পরিচিত মানুষ জন ছিল। অনেকের সাথে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল, গলাগলি ছিল। আজ অধিকাংশই অজানা অচেনা। কফিলের রিকশা কখন এসে স্বপন চৌধুরীর এক তলা বাড়ির দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে।
ঃ স্যার এবার নামেন, বাড়িতে আইয়া পরছি।
ঃ ওঁ। এতো তাড়াতাড়ি। এতো জোরে জোরে রিকশা টানো কেন? আস্তে আস্তে চালাতে পারনা। যা শরীর তোমার!
ঃ আস্তে আস্তেই তো আইলাম।
ঃ থামো বেশি কথা কও।
বাড়ির দরজায় এসে কলিং বেল টেপেন স্বপন চৌধুরী। ক্রিং ক্রিং শব্দ হয় একটানা। কাজের বুয়া রোজকার মতো দরজা খুলে দেয়। লোডশেডিং শেষ। এক ঝলক আলোয় ড্রয়িং রুম ভরে ওঠে। শরীরটাকে টেনে নিয়ে ছোফায় বসে পরেন তিনি।
ঃ নীলা কি ঘুমিয়েছে?
ঃ আফায় পরতাছে।
ছকিনার মায়ের ছোট্ট উত্তর।
নীলা। স্বপন চৌধুরীর এক মাত্র অবলম্বন। বগুড়া মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। নীলাকে যখন এতিম খানা থেকে নিয়ে আসেন, কতইবা বয়স তখন। কেবল হাটা শিখছিল। থপথপ দুপা হাটে আড় থপাস করে আছার খায়। মুছকি হাসেন স্বপন চৌধুরী। ছকিনার মা বলে ঃ খালু, হাসেন ক্যান?
ছোফায় বসে নীলার রুম এর জানালার পরদা কাঁপা দেখেন তিনি। নীলা রুম থেকে বেড়িয়ে আসে।
ঃ বাবা, কখন এলে?
ঃ এইতো কিছুক্ষন।
ঃ কাপড় ছাড়ো। হাত মুখ ধুয়ে খেতে এসো।
হুকুম করে নীলা। স্বপন চৌধুরীর বাবা মা নীলাই। ফুল অভিভাবক। চটপটে। সামনের ডিসেম্বরে তেইশ বছর পূর্ণ হবে। ভারি সুন্দরী হয়েছে নীলা। নীলার এক দিন পড়ালেখা শেষ হবে। ডাক্তার হবে। ভেবে চলেন স্বপন চৌধুরী। নীলার কি বিয়ে হবে ওঁ কি মা হবে? ওরও সন্তান কি এতিম খানায় একদিন......................................................
আর ভাবতে পারেন না তিনি। বুকের বাম দিকটা মোচড়ায়। দুহাতে বুকটা চেপে ধরেন।
ঃ কি হল? আসছনা কেন?
সোফা থেকে উঠে পরেন বাবা। পা দুটা কাঁপে। মাথা ঝিম ঝিম করে। নীলা ছুটে এসে বাবার হাত ধরে।
ঃ কতবার বলেছি ঝর বৃষ্টির দিনে বিকেলে বেরুবে না। কে শোনে কার কথা এতো অবাধ্য মানুষকে নিয়ে পারা যায় না। নীলা বকেই চলে। ঃ মা রে, মাথাটা বড্ড ধরেছে। দুপাশের রগ দুটো টনটন করছে, পপ্রেসারটাও মনে হয় বেড়েছে, আমাকে একটু শুইয়ে দাও, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবো।
বাবাকে খাটে শুইয়ে দেয় নীলা। পরম মমতায় মাথায় হাত বুলায়। সে বাবার কষ্ট বোঝে। নিজের কষ্ট বাবার দুঃখ তাবৎ দুঃখ কষ্ট একত্রিত হয়ে মহাকষ্টের পাহাড় গড়ে। নীলার চোখে চিকচিক জল নামে। জীবনটা এমন কেন। বাবা চোখ মেলে তাকান। ঠোঁটে ব্যর্থ হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। খাটে উঠে বসেন তিনি।
ঃ চল খেতে বসি। খুব ক্ষিধে পেয়েছে।
বাবার কথার অর্থ বোঝে নীলা। কোন কথা বলে না। বাপবেটি খেতে বসে। নীলার মুখের দিকে তাকায় স্বপন চৌধুরী । বর্ষণে বর্ষণে সিক্ত থির হয়ে যাওয়া যুঁইফুল যেন। স্বপন চৌধুরীর গোটা জীবনের প্রিয়মুখ। বাবা মা অনুকুল চৌধুরী প্রিয়জনেরা, খেলা করে যেন নীলার সে মুখে।
©somewhere in net ltd.