| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আপনার জিজ্ঞাসা হল কেন মানুষ মনে করে যে কুরআন মুসলিমদের তাদের স্ত্রীদের প্রহার করার কথা বলে। আমরা জানি এবং মানি যে দুনিয়াতে অসংখ্য ঘটনা আছে স্ত্রীদের প্রহার করার বিষয়ে কিন্তু মনোযোগ সেইসব ঘটনাগুলোর দিকে নিবদ্ধ করা হয় যেগুলো মুসলিম স্বামীদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল পার্থক্য নির্ণয় করা, ইসলাম কি শিক্ষা দেয় এবং মুসলিমরা কি করে। ব্যক্তিগত আচরণ বিচার্য বিষয় হতে পারে না ইসলামের সামগ্রিক পদ্ধতিকে বিচার করার। সমস্ত অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি, ইসলামকে জানুন সঠিকভাবে, বিচার করার পূর্বে।
ইসলাম নারীদের সম্মান করে এবং তাদেরকে সমান অধিকার দেয়। পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে এবং হাদিসে উল্লেখ আছে কিভাবে একজন স্বামীর তার স্ত্রীর সাথে আচরণ করা উচিত। প্রকৃত অবস্থা হল তাদের প্রতি সদয়ভাবে এবং ভদ্রভাবে আচরণ করা। পবিত্র কুরআনে বলা আছেঃ
“তাদের সাথে বসবাস কর উদারতা এবং সমদর্শিতার মনোভাব নিয়ে। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ কর এটা এমন হতে পারে যে তোমরা একটা জিনিস অপছন্দ করলে, এবং আল্লাহ্ সেটাকে প্রচুর কল্যাণকর করে রেখেছেন।” [সূরা আন-নিসা (৪) আয়াত ১৯]
এইটাই কুরআন মুসলিমদের শিক্ষা দেয়। যার ফলে, এটা গ্রহণযোগ্য নয় যে একই গ্রন্থ মুসলিমদের তাদের স্ত্রীদের সাথে হিংসাত্মক আচরণের হুকুম দেয়। যেখানে কুরআন নারীদের মানসিক অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার বিরুদ্ধে, কিভাবে এটা তদের প্রতি শারীরিক নির্যাতনকে অনুমতি দেয়?
যেই আয়াতটি দ্বারা মানুষ তাদের যুক্তি সমর্থনের ক্ষেত্রে উদ্ধৃতি দেয় যে স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের প্রহার করতে পারে, তা হল নিম্নরুপঃ
“পুরুষরা নারীদের সংরক্ষণকারী এবং ভরণপোষণকারী, কারন আল্লাহ্ কয়েকজনকে (পুরুষদের) বেশি দিয়েছেন (শক্তি) অন্যদের (নারী/পুরুষ) থেকে, এবং কারন তারা (পুরুষরা) তাদের (নারীদের) সমর্থন করে নিজেদের সম্পত্তি থেকে। যারফলে ন্যায়নিষ্ঠ নারীরা আন্তরিকভাবে অনুগত হয় (আল্লাহ্র প্রতি), এবং গোপনীয়তা রক্ষা করে (স্বামীর) অনুপস্থিতিতে যা আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করতে বলেছেন। আর ঐ সমস্ত নারীদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা বিশ্বাসঘাতকতা এবং অসদাচারণের ভয় কর, তাদেরকে সতর্ক কর (প্রথমে), তারপর, তাদেরকে শয্যা হতে প্রত্যাখ্যান কর, এবং সবশেষে, তাদেরকে প্রহার (আলাদা করে দাও/দৃষ্টান্ত দাও) কর। তবে যদি তারা সম্মতির সাথে ফিরে আসে, তাদের বিরুদ্ধে কিছু করবে না (রাগ বা বিরক্তি)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবার উপরে, মহান।” [সূরা আন-নিসা (৪) আয়াত ৩৪]
এই আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদে কয়েকটি বিতর্কিত বিষয় আছেঃ
১) পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল।
২) পুণ্যবান নারীরা স্বামীদের প্রতি আনুগত্য হয়।
৩) অবাধ্য হলে পুরুষরা স্ত্রীদের প্রহার করতে পারবে, যতক্ষণ না তারা সন্তুষ্ট করতে পারে বাধ্যতার প্রমাণ দেখিয়ে।
এই বিতর্কিত বিষয়গুলোতে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়, আবার অনেকের মনে বিভিন্ন প্রশ্নের উদয় হয়। কিভাবে আল্লাহ্, যিনি সবচেয়ে জ্ঞানী, মহান এবং সবচেয়ে দয়ালু, এরকম পুরুষ পক্ষপাতী নির্দেশ কুরআনে দিতে পারেন যা যুগে যুগে পুরুষদের তাদের স্ত্রীদের অধীন করে রাখতে এবং শারীরিক নির্যাতন করতে উৎসাহিত করবে? আর স্ত্রীদের মারধর করা নিশ্চয় সুষ্ঠ পারিবারিক সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এমন নয় যে স্ত্রীরা সবসময় ভুল করে, আর স্বামীরা ধুয়া তুলসী পাতা।
এই আয়াতটি নিয়ে প্রচলিত যেসব বিভ্রান্তি আছে তা অনেকেই বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যেমন, কেউ কেউ প্রহার করাকে “হালকা” অর্থে ব্যবহার করেছেন, যেখানে মূল আরবিতে “হালকা” বলে কোন শব্দ নাই। অনেকে আবার আঘাত শব্দটি ব্যবহার করেছেন প্রহারের বদলে। তাদের যুক্তি হল, প্রহার শব্দটি প্রাপ্ত হয়েছে আরবি দা-রা-বা শব্দ হতে যার অনুবাদিত অর্থ হবে আঘাত, প্রহার না। আর আঘাত মানসিকও হতে পারে, কিন্তু প্রহার কেবল শারীরিকই হয়ে থাকে।
কিন্তু বিষয় হল আল্লাহ্ কি সবক্ষেত্রেই স্বামীদের স্ত্রীদের উপর কর্তৃত্ব দিয়েছেন, স্ত্রীদেরকে স্বামীদের প্রতি অনুগত থাকতে বলেছেন, এবং প্রয়োজনে প্রহার করার কথা বলেছেন? নিচে আমি চেষ্টা করেছি বিভিন্ন গুণীজনদের মতামত অনুযায়ী বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করার যা আমার কাছে যুক্তিযুক্ত এবং গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। গ্রহণ করা না করা এটা একান্তই আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।
পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল
আরবি قَوَّامُونَ কা’ওয়ামুন্না শব্দটির অর্থ হচ্ছে কর্তৃত্ব। কুরআনে এই শব্দটি অন্যান্য আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে সংরক্ষক, ভরণপোষণ, অটল থাকা, দাঁড়ান, পুনরুত্থান ইত্যাদি অর্থে। এটি কা’ইম (যে যত্ন করে, যে কারও জন্য দায়ী) এর একটি বিশেষ রুপ। সূরা বাকারার (২) ২২৪ – ২৪২ পর্যন্ত আয়াতগুলোতে এটাই পরিস্কার হয় যে পারিবারিক সম্পর্কের ব্যপারে স্ত্রীরা পুরুষদের সমান অধিকার রাখে এবং পুরুষরা স্ত্রীদের ভরণপোষণ করার জন্য দায়ী। তাই কা’ওয়ামুন্না অর্থ ‘কর্তৃত্ব’ হবার কোন যুক্তি বা প্রমাণ কোনটাই নেই। বরং এর অর্থ হবে “সংরক্ষণকারী” বা “ভরণপোষণকারী”। [সুত্রঃ মুহম্মাদ আসাদ, আব্দেল হালেম, লালেহ বখতিয়ার, ইদিপ ইয়ুক্সেল]
পুণ্যবান নারীরা স্বামীদের প্রতি আনুগত্য হয়
আরবি قَانِتَاتٌ কা’নিতাতুন শব্দের অর্থ কেউ কেউ অনুবাদ করেছেন “স্বামীর প্রতি অনুগত” অথচ কুরআনে আর যত জায়গায় কা’নিতাতুন এবং তার অন্যান্য রুপ গুলো এসেছে, তার প্রত্যেকটি “আল্লাহর প্রতি অত্যন্ত অনুগত” অর্থে করা হয়েছে। শুধুমাত্র এই একটি আয়াতে স্ত্রীদেরকে “স্বামীর প্রতি অনুগত” অর্থ করা হয়েছে। কুরআনে সূরা তাহ্রীম (৬৬) ১২ আয়াতে আল্লাহ একই শব্দ ব্যবহার করেছেন হযরত ঈসা (আঃ) এর মাতা মরিয়ম (আঃ) এর ক্ষেত্রে। মরিয়ম (আঃ) এর কোন স্বামী ছিল না। তাই তার স্বামীর প্রতি অনুগত হবার প্রশ্নই আসে না। সুতরাং, কা’নিতাতুন শব্দের অর্থ “স্বামীর প্রতি অনুগত” হতে পারেনা বরং বাকি সবগুলো আয়াতের মত এখানেও “আল্লাহ্র প্রতি অনুগত হবে”। আল্লাহ যদি শুধুমাত্র এই আয়াতে কা’নিতাতুন ভিন্ন অর্থ করতেন, তবে তিনি তা পরিস্কার করে বলে দিতেন। আরও সমর্থন পাওয়া যায় ৬৬:৫ থেকে যেখানে আল্লাহ আদর্শ স্ত্রীর গুণগুলো বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি একই কা’নিতাতুন শব্দটি ব্যবহার করেছেন “আল্লাহর প্রতি অত্যন্ত অনুগত” অর্থে। কয়েকজন অনুবাদক সেখানেও সুবিধামত “স্বামীর প্রতি অনুগত” ব্যবহার করেছেন কোনই ভিত্তি ছাড়াই। [সুত্রঃ মুহাম্মাদ আসাদ, আব্দেল হালেম, লালেহ বখতিয়ার]
পুরুষরা স্ত্রীদের প্রহার করতে পারবে
আরবি اضْرِبُوهُنَّ ইদ্রিবু’হুন্না শব্দটি ৪:৩৪ আয়াতে বাংলা করা হয়েছে “তাদেরকে (স্ত্রীদের) প্রহার কর”। অথচ এই আরবি শব্দটির অনেকগুলো অর্থ হয় যা কুরআনে বিভিন্ন আয়াতে ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদ করা হয়েছে। এই শব্দটি এসেছে মূল ض ر ب দা-রা-বা থেকে যার অর্থগুলো হলঃ
ভ্রমণ করা, চলে যাওয়া – ৩:১৫৬, ৪:১০১, ৩৮:৪৪, ৭৩:২০, ২:২৭৩।
আঘাত করা – ২:৬০, ২:৭৩, ৭:১৬০, ৮:১২, ২০:৭৭, ২৪:৩১, ২৬:৬৩, ৩৭:৯৩, ৪৭:৪।
প্রহার করা – ৮:৫০, ৪৭:২৭।
উপস্থাপন করা – ৪৩:৫৮, ৫৭:১৩।
উদাহরন, প্রতীক, দৃষ্টান্ত দেওয়া – ১৪:২৪, ১৪:৪৫, ১৬:৭৫, ১৬:৭৬, ১৪:১১২, ১৮:৩২, ১৮:৪৫, ২৪:৩৫, ৩০:২৮, ৩০:৫৮, ৩৬:৭৮, ৩৯:২৭, ৩৯:২৯, ৪৩:১৭, ৫৯:২১, ৬৬:১০, ৬৬:১১।
দুর্দশা পতিত হওয়া – ২:৬১।
ঢেকে দেওয়া – ১৮:১১।
পার্থক্য করা – ১৩:১৭।
ফেরত নেওয়া – ৪৩:৫।
এখন প্রশ্ন হল এতগুলো মানে থাকতে “প্রহার” মানেটিই কেন বেছে নেওয়া হল যখন স্ত্রীদের প্রসঙ্গ আসে?
অনেকে বলেন, দা-রা-বা এর একটি অর্থ যেহেতু “আঘাত করা” হয়, তাহলে কেন স্ত্রীদেরকে আঘাত করা যাবে না? লক্ষ্য করুন, যতগুলো আয়াতে আল্লাহ আঘাত করতে বলেছেন, তার প্রত্যেকটি আয়াতে তিনি পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন কি দিয়ে বা কোথায় আঘাত করতে হবে। যেমন ২:৬০, ৭:১৬০, ২৬:৬৩ بِّعَصَاكَ লাঠি দিয়ে, ২:৭৩ بِبَعْضِهَا একটি অংশ দিয়ে, ৮:১২ فَوْقَ الْأَعْنَاقِ ঘাড়ের উপরে, ২০:৭৭ فِي الْبَحْرِ নদীতে, ২৪:৩১ بِأَرْجُلِهِنَّ পা দিয়ে, ৩৭:৯৩ بِالْيَمِينِ ডান হাত দিয়ে, ৪৭:৪ الرِّقَابِ ঘাড়ে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন “কি দিয়ে” বা “কোথায় আঘাত” হবে। তাই ৪:৩৪ –এ স্ত্রীদেরকে “আঘাত কর” হতে পারে না কারণ আল্লাহ বলেন নি কি দিয়ে আঘাত করতে হবে বা কোথায় আঘাত করতে হবে। আল্লাহ কুরআনে কোন বিভ্রান্তি রাখেন না, যেন মানুষ নিজের ইচ্ছা মত অর্থ করে নিতে পারে। এরপরেও যদি কেউ দাবি করেন যে এই আয়াতে আঘাত করাই হবে, তবে এটি হবে একমাত্র আয়াত যেখানে আল্লাহ কি দিয়ে বা কোথায় আঘাত করতে হবে তা সুস্পষ্ট করে বলেন নি। [সুত্রঃ লালেহ বখতিয়ার, ইদিপ]
অনেকে দাবি করেন যে, যখন ‘দা-রা-বা’ এর সাথে অন্য কোনো শব্দ যুক্ত হয় এবং তারা একসাথে একটি বাক্যাংশের রুপে ব্যাবহৃত হয়, তখনি শুধুমাত্র দা-রা-বা এর অর্থ প্রহার না হয়ে অন্য কিছু হবে। যেমন দা-রা-বা মাছালা অর্থ ‘উদাহরণ দেওয়া’, দা-রা-বা আ’লা অর্থ ‘ঢেকে দেওয়া’। যদি দা-রা-বা এর সাথে অন্য কোন শব্দ যুক্ত না হয়, শুধুই যদি দা-রা-বা ক্রিয়াবাচক শব্দটি থাকে, তাহলে দা-রা-বা অর্থ হবে ‘প্রহার করা’ এবং কাকে প্রহার করতে হবে তা মাফুউ’ল বিহি অর্থাৎ ক্রিয়া পদের উদ্দেশ্য হিসেবে আসবে। যদি এই নিয়ম অনুসরণ করি আমরা, তাহলে ১৩:১৭ আয়াতে কি হয় দেখুনঃ
… এভাবে আল্লাহ ‘প্রহার করেন’ সত্য এবং মিথ্যা। (১৩:১৭)
এটি অর্থহীন। এখানে দা-রা-বা নিশ্চিতভাবে ‘পার্থক্য করা’ / ‘আলাদা করা’ হবে।
প্রচলিত অনুবাদগুলো কুরআনের বাকি সকল শান্তিপ্রিয়, নিরপেক্ষ বাণীর পরিপন্থি। কুরআন পড়লে আপনি অবাক হবেন যে প্রচলিত ধারনা অনুসারে নারীদেরকে যেভাবে হেয় করা হয়, শারীরিক এবং মানসিকভাবে অত্যাচার করা হয়, পুরুষদের থেকে নারীদেরকে কম অধিকার দেওয়া হয়, কুরআন তার সম্পূর্ণ বিপরিত নির্দেশ দেয়। কুরআনে আল্লাহ নারীদের মর্যাদা, অবদান, অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেনঃ
“আর তাঁর নিদর্শনগুলোর হল এই, যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য থেকে সহধর্মিণী সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের মধ্যে প্রশান্তি [শান্তি, নিরাপত্তা, দয়া, করুণা, নম্রতা, বিনয়] খুজে পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা এবং দয়া তৈরি করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে তাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা চিন্তা করে। (৩০:২১)
হে বিশ্বাসীরা, নারীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের উত্তরাধিকার হবে না। আর তাদের উপর এমন কোন সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে না যাতে করে তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তার কিছু ফেরত নিয়ে নিতে পারো, যদি না তারা প্রকাশ্যে কোন নীতিবিগর্হিত [মাত্রাতিরিক্ত, লজ্জাজনক, সীমালঙ্ঘন, ব্যভিচার] কাজ করে। আর তাদের সাথে বসবাস কর উদারতা এবং সমদর্শিতার মনোভাব নিয়ে। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ কর এটা এমন হতে পারে যে তোমরা একটা জিনিস অপছন্দ করলে, এবং আল্লাহ্ সেটাকে প্রচুর কল্যাণকর করে রেখেছেন।” (৪:১৯)
এই দুটি আয়াত থেকে পরিস্কার ভাবে বোঝা যায় নারীদের সম্পর্কে আল্লাহর সিদ্ধান্ত কি। নারীদের প্রতি এত সুন্দর সহমর্মিতার নির্দেশ যিনি দেন, তিনি কিভাবে তাদেরকেই প্রহার করার কথা বলতে পারেন?
এছাড়াও দেখুন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদের ব্যপারে আল্লাহ কি বলেছেনঃ
“আর যখন তুমি স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এবং স্ত্রীরা অপেক্ষার সময় পূরণ করে, তখন হয় তাদেরকে সন্মানের সাথে/ন্যায্যভাবে রাখবে অথবা তাদেরকে সন্মানের সাথে ছেড়ে দিবে। তাদেরকে আঘাত/কষ্ট দিয়ে ধরে রাখবে না, যেন তোমরা তাদের উপর কোন সীমালঙ্ঘন করে না ফেল। আর যে সেটা করবে সে নিঃসন্দেহে নিজের উপর অন্যায় করবে।” (২:২৩১)
যে স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে তালাকের মত একটি চরম পর্যায়ে পৌঁছাবার পর, তাকেই যেখানে আল্লাহ কোন রকম কষ্ট না দিয়ে সন্মানের সাথে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে কিভাবে যে স্ত্রী স্বামীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে সংসার করার চেষ্টা করছে, আল্লাহ তাকে প্রহার করতে বলতে পারেন?
কুরআনের নির্দেশ যে কোন পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ সমাধান দেয়। কুরআনের বাণী বিশেষ কোন গোত্র, সমাজ, পরিবার কিংবা মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়, বরং যে কোন পরিস্থিতিতে, যে কোন সমাজ, সংস্কৃতি, যুগের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। তাই ৪:৩৪ এর প্রচলিত অনুবাদ যদি যে কোন সময়ে, যে কোন দেশে, যে কোন সংস্কৃতিতে সবার জন্য প্রযোজ্য না হয়, তবে ধরে নিতে হবে আমরাই তার ভুল উপলব্ধি করেছি, আল্লাহ ভুল করেন নি।
৪:৩৪ যে স্ত্রীদেরকে প্রহার করতে বলে না বরং আলাদা করে দিতে বলে তার সমর্থনে ঠিক এর পরের আয়াতটি ৪:৩৫ দেখুনঃ
“আর যদি তোমরা তাদের দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তাহলে পুরুষের পক্ষ/পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী এবং স্ত্রীর পক্ষ/পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত কর। যদি তারা উভয়ে (মধ্যস্থতাকারী) মিটমাট করতে চায়, তাহলে আল্লাহ তাদের দুজনের মধ্যে মিটমাটের ব্যবস্থা করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সবকিছু সম্পর্কে অবগত।” (৪:৩৫)
স্বামী যদি স্ত্রীকে প্রহার করেই সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে কি দরকার এত কষ্ট করে দুই পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী এনে সালিস করার? স্ত্রীদেরকে প্রহার করে বশ করিয়ে রাখলেই তো হল। প্রহার করার পড়ে অভিভাবক ডেকে এনে মধ্যস্থতা করা যুক্তিযুক্ত, নাকি প্রহার করার আগে অভিভাবক ডেকে এনে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করা উচিত?
লক্ষ্য করুন ৪:৩৪ এর প্রেক্ষাপটটা কি? স্ত্রী স্বামীর সাথে একমত নয়। স্ত্রী প্রকাশ্য অন্যায় করেছে। স্বামী তাকে সংশোধন করার জন্য মুখে বলেছে। তাতে কাজ হয়নি। তারপর বিছানা/ঘর আলাদা করে দিয়েছে। তাতেও কাজ হয় নি। স্ত্রীর অবস্থা নিচের যে কোন একটিঃ
১) স্ত্রী নিজেকে সঠিক মনে করে এবং স্বামীকে ভুল মনে করে।
২) স্ত্রী ইচ্ছাকৃত ভাবে জেনে শুনে অন্যায় করছে কারণ
ক) স্ত্রী বিশেষ কোন উদ্দেশ্যে স্বামীর বিরুদ্ধাচারন করতে চায়, বা
খ) স্ত্রী চারিত্রিকভাবে খারাপ।
৪:৩৪ এ ن ش ز নুসুজ ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা, বিরোধিতা, বিদ্রোহচারণ। এই পরিস্থিতিতে স্বামী যদি স্ত্রীকে প্রহার করে, তবে কি কোন শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে? বরং তা শারীরিক সংঘাতের দিকে যেতে পারে।
এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে কেন ৪:৩৪ আয়াতে দা-রা-বা অর্থ ‘প্রহার’ না হয়ে ‘আলাদা করা’ হবে? নিচে বেশ কয়েকটি যুক্তি দেখানো হল অনেকগুলো সাম্প্রতিক অনুবাদ অনুযায়ীঃ
১) যে ১১টি আয়াতে দা-রা-বা অর্থ আঘাত/প্রহার করা হতে পারে তাদের মধ্যে একমাত্র এই আয়াতে দা-রা-বা এর পর ‘কিভাবে’ বা ‘কোথায়’ আঘাত করতে হবে তা বলা নেই। একমাত্র ৪:৩৪ ব্যতিক্রম হতে পারে না।
২) এই ১১টি আয়াত বাদে বাকি কমপক্ষে ৩০টি আয়াতে দা-রা-বা অর্থ ‘প্রহার’ সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। এমনকি সেই সব আয়াতেও, যেখানে ‘দা-রা-বা’ অন্যান্য শব্দের সাথে যুক্ত হয়ে বাক্যাংশ গঠন করে না।
৩) দা-রা-বা এর সর্বাধিক ব্যবহার ‘দৃষ্টান্ত দেওয়া’ যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আল্লাহ মানুষকে কোন কিছু উপলব্ধি করানোর জন্য ব্যবহার করেছেন। এই অর্থটিও স্ত্রীকে আলাদা করে দেওয়া সমর্থন করে কারণ আলাদা হয়ে যাওয়াটা স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের জন্য একটি ‘দৃষ্টান্তমূলক’ কাজ।
৪) শুধু দা-রা-বা শব্দটি যে দুটি আয়াতে এসেছে, যেগুলোতে দা-রা-বা অন্য কোন শব্দের সাথে (যেমন আ’ন, আ’লা, মাছালা) যুক্ত হয়ে কোন বাক্যাংশ গঠন করেনি, সেগুলোর প্রত্যেকটিতে দা-রা-বা অর্থ ‘আলাদা করা’ যথার্থ হয়, ‘প্রহার করা’ সঠিক হয় না।
৫) ৪:৩৪-৩৫ এই দুটি আয়াতে যে ধারাবাহিকতা রয়েছে তা ‘প্রহার’ অর্থ করলে ভেঙ্গে যায়। বরং প্রথমে সাবধান করা, তারপর বিছানা আলাদা করা, তারপর দৃষ্টান্তমূলক কিছু করা/আলাদা হয়ে যাওয়া, অভিভাবক ডেকে সালিশের চেষ্টা করা এবং সবশেষে তালাক দেওয়া – এই ধারাবাহিকতা ঠিক রাখে।
৬) স্ত্রীদেরকে প্রহার করা ২:২৩১ এবং ৬৬:৩-৫ সমর্থন করে না।
৭) যে কোন যোগ্যতার স্বামী তাদের স্ত্রীদেরকে প্রহার করলে সবসময় শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে না। স্বামী সবসময় স্ত্রী থেকে সঠিক হতে পারে না। এছাড়াও অনেক পরিস্থিতিতে স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করলে তা গুরুতর শারীরিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে। সবসময় শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে তা আল্লাহর বাণী হতে পারেনা।
৮) কোন সহিহ হাদিসে কোথাও আমাদের বিশ্বনবী (সঃ) কে তার কোন স্ত্রীকে প্রহার করতে জানা যায় নি, যেখানে তার স্ত্রীরা অন্তত একবার হলেও তার বিরুদ্ধে কাজ করেছিল, যা কুরআনে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে প্রমাণ হয় যে মুসলমানদের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য নজীর নবি (সঃ) রেখে যাননি স্ত্রীদের প্রহার করার ব্যাপারে।
৪:৩৪-৩৫ আয়াত দুটি থেকে স্বামীর দায়িত্বের পর্যায়গুলো পরিস্কার হয়। যখন স্বামী, স্ত্রীর কাছ থেকে প্রকাশ্য অন্যায়/নীতিবিগর্হিত কাজের ভয় করবে, তখনঃ
১) তাদেরকে বোঝাতে হবে, যদি তাতে না হয়
২) তাদেরকে বিছানায় আলাদা করে দিতে হবে, যদি তাতে না হয়
৩) তাদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে কিছু সময়ের জন্য, যদি তাতে না হয়
৪) দুই পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী এনে সালিশের ব্যবস্থা করতে হবে, যদি তাতে না হয়
৫) তালাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে কুরআনে নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে।
শুধু এ পর্যন্তই নয়, বিছানায় ত্যাগ করার নির্দেশটি দেওয়া হয়েছে পুরুষকে, নারীকে নয়। এর অর্থ পুরুষ অন্য বিছানায়/ঘরে চলে যাবে, নারী তার আগের নির্ধারিত বিছানায়/ঘরে থাকবে। কুরআনের বাণী যে কতটা শান্তি প্রিয় এবং নারীর নিরাপত্তার প্রতি কতখানি গুরুত্ব দেয়, তা আবারও প্রমাণিত হয়।
এখানে আরেকটি লক্ষণীয় ব্যপার হল ৪:৩৪ আয়াতের প্রেক্ষাপট হচ্ছে যখন স্বামী স্ত্রীর কাছ থেকে কোন প্রকাশ্য অন্যায়ের ভয় করে। অর্থাৎ স্ত্রী যে অন্যায় করেছে তা এখনও প্রমাণিত হয় নি, বা স্ত্রীর অন্যায় করাটা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। স্বামী যদি স্ত্রীর অন্যায় করার ভয় থেকে তাকে বোঝানোর এবং বিছানা আলাদা করে দেবার পরও মিটমাট করতে না পেরে স্ত্রীকে প্রহার করা শুরু করে, তবে তা অত্যন্ত অযৌক্তিক। তাই প্রচলিত অনুবাদগুলো যে ব্যপক ভাবে মধ্যযুগীয় আরব সংস্কৃতি এবং পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত তা পরিস্কার বোঝা যায়।
সবশেষে বলবো, আনুগত্য প্রকাশের জন্য, একজন মুসলিম স্ত্রীর উচিত তার স্বামীকে মান্য করা যদি না তার স্বামী তাকে ইসলামের শিক্ষা বিরুদ্ধ কোন কিছু করতে জোর না করে। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতামতের পার্থক্য দেখা দিবে, তাদের উচিত একসাথে বসে নিজেদের মধ্যকার উদ্বেগগুলো নিয়ে আলোচনা করা এবং সমাধানের চেষ্টা করা। কারন ছাড়া তৃতীয়পক্ষ ডেকে এনে বিষয়কে আরও ঘোলা করা উচিত নয়। সমস্যাসঙ্কুল বিষয় সুন্দর ভাবেও সমাধান করা যেতে পারে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি। পুরুষরা হল অভিভাবক, স্ত্রীদের অধিষ্ঠাতা নয়। পুরুষরা তাদের পরিবারকে সমর্থন দেওয়ার জন্য দায়বদ্ধ এবং তারা এর জন্য প্রচুর পরিমাণে পুরস্কৃত হয়ে থাকে।
কোনভাবেই স্ত্রীরা স্বামীদের অধস্তন নয়। নারী এবং পুরুষদের অবস্থা সমান। ইসলামের আইন অনুযায়ী দুজনেরই সমান দায়িত্ব এবং কর্তব্য আছে।
কুরআনের শিক্ষা হল ভালবাসা, সহনশীলতা, সমান আচরণ, ন্যায়বিচার, সমদর্শিতা, শান্তি এবং শ্রদ্ধার। এটা হল, যেমন তোমরা বল, একটি সুন্দর কিতাব, কিন্তু তার জন্য এটাকে সঠিকভাবে বুঝতে হবে, সঠিক শব্দ বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
এটা আমাদের সকলের কর্তব্য ইসলামের চিত্রকে সঠিক ভাবে তুলে ধরা যেটা মিডিয়াতে খারাপভাবে উপস্থাপন করা হয়। ইন্টারনেটকে ব্যবহার করুন ইসলামের উপলব্ধি বাড়ানোর জন্য। আপনাদের সহকর্মী এবং বন্ধুদের সাথে আলোচনায় ব্যস্ত থাকুন। আপনার ধর্মের একজন ভালো সংবাদবাহক হউন। নিজের ব্যবহার দ্বারা অন্যদের কাছে ইসলামকে তুলে ধরুন। দুনিয়াকে বুঝতে দিন যে ইসলাম নারীদের সম্মান এবং তাদের অধিকারের কদর করে।
সূত্রঃ
কুরআনের অনুবাদঃ আব্দেল হালিম, লালেহ বখতিয়ার, শাব্বির আহমেদ, ডঃ মুনির মুনশী, ডঃ কামাল ওমর, বিলাল মুহাম্মাদ, মুহাম্মাদ আহমেদ – সামিরা, ইদিপ ইয়ুক্সেল এবং প্রগ্রেসিভ মুসলিম সংগঠন।
Book: Wife Beating in Islam, Quran Strikes Back
Quran434.com
Blog.Omaralzabir.com
onislam.net
©somewhere in net ltd.