| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এই ছবি রাহুল আর আরোহীর ভালবাসার গল্প। এই ছবি অন্তমিলহীন। আরও একশোটা হিন্দি ছবির সঙ্গে এই ছবির হাজারও অংশে সাযুজ্যতার ভার রয়েছে। ছবির এগারোটা গানের মধ্যে 'তুম হি হো' সমেত কয়েকটা গান ছাড়া মনে মনে অন্য কোনও গান গুনগুন করে ওঠার অবকাশ খুব কম। তবুও শ্রমিক দিবসের ছুটিতে মাল্টিপ্লেক্সে ভিড় চোখে পড়ার মতো। দুই তরুণের চিরপরিচিত এক ভালবাসার আখ্যানের অংশীদার করার জন্যে আবারও প্রযোজক মহেশ ভট্ট আর পরিচালক মোহিত সুরি সচেষ্ট। গানের ঝর্ণাধারায় দুই প্রেমিক-প্রেমিকার এই তথাকথিত জার্নি দেখতে বসে আবারও দর্শকের মনে পড়ে যেতে বাধ্য সত্তরের দশকের অমিতাভ বচ্চনের ‘অভিমান’-এর কথা। কিম্বা ১৯৯০ সালের মহেশ ভট্টের পরিচালনায় রাহুল রায় আর অনু আগরওয়ালকে নিয়ে সেই সময়কার ‘আশিকির’ পথ চলার কথা। যদিও এই দুটি ছবি থেকে নিজেকে স্বতন্ত্র রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে ‘আশিকি-টু’। বারবার তার আখ্যানে ঘুরে ফিরে আসছে একই পথের মোহ, আলঙ্কারিক উদ্ধৃতি, চেনা পরিচিত ছকে হাঁটার প্রাণান্তকর প্রয়াস। আর ততবার আধুনিক চিত্রায়ণের মোড়কে দুই হাতে দৃশ্যজাল বুনতে বুনতে পারম্পরিক ছায়াছবির ক্লিশেগুলোকেই অনন্যসুলভ অলঙ্করণে ভরিয়ে তুলেছেন পরিচালক এবং তার সঙ্গে লেখক শগুফতা রফিক। ‘আশিকি-টু’ আসলে এমন দুই তরুণের গল্প যারা নিজেরাই যে পথের সূচনা করে সেই পথের শেষটা কোথায় জানে না। স্বপ্নের মায়াজাল বুনতে বুনতে যে মায়াময় জগৎ তাদের সামনে প্রলোভন দেখায় তারা সেই ফাঁদের শিকার হয়। তাই রাহুল একজন বিখ্যাত গায়ক হওয়া স্বত্ত্বেও জীবনের যে অবসাদ, তার দিনযাপনের যে চরিত্রভঙ্গী, মদের নেশার ঘোরে থাকার তার যে দম্ভ তাকে শেষ পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায় আত্মহননের দিকে। মাঝে সে শুধু পায় আরোহীকে একঝাঁক পাগলা হাওয়ার মতো। যে মেয়েটাকে সঙ্গে করে, আঁকড়ে ধরে এক তরুণ গায়ক একটু একটু করে বেঁচে থাকার আশ্বাস পায়, আরোহীকে সে ফিরিয়ে দিতে চায় তার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলিকে। সাকার করে আরোহীর গায়ক হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু কোথাও হারিয়ে যেতে থাকে তরুণ সম্ভাবনাময় গায়ক রাহুল। শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায় সত্যি সত্যি একদিন। কিন্তু বেঁচে থাকে আরোহীর মধ্যে। আরোহী কোথাও তার নিজের জীবনে অগ্নি সাক্ষী রেখে বিয়ে না করা রাহুলকে বাঁচিয়ে রাখে। ঠিক এখানেই আশ্চর্য বিস্ময়কর এক সঙ্কেত বহন করে ছবিটি নিজের অজান্তেই। রাহুল কিম্বা আরোহী কেউ কাউকে বিয়ের জন্যে একবারও বলে না। দুজনের সংসার, ঘর বাঁধার বাসনা তাদের কখনও ঠেলে দেয় না এক প্রতিষ্ঠানের দিকে। সেটা কি তাদের উর্ধশ্বাসে কেরিয়ারের পেছনে দৌড়ানোর ফল? নাকি প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার করার তীব্র বাসনা? যদিও সেই বার্তার কোনও সঙ্কেতের দিকে একবারও চোখ ফেরান না অসাবধানী পরিচালক। তবু নতুন করে রাহুলের সঙ্গে জীবনের প্রথম ঘর সাজানোর সময় মায়ের প্রশ্নের উত্তরে আরোহীকে বলতে হয় এখন থেকে রাহুলই তার জীবনে সব। সমাজ সংস্কার যাই বলুক না কেন। তাই সামাজিক সব বিধিনিষেধের বাইরে গিয়েও রাহুলকে মেনে নেয় ছাপোষা মধ্যবিত্ত মরাঠি পরিবারের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা আরোহী। মেনে নেয় রাহুলের সব অবসাদ। এক ছেলের হেরে যাওয়ার গল্প বলতে বসে, বিস্বাদে হারিয়ে যাওয়া শিল্পীর গান শোনাতে গিয়ে যতবার এক সঙ্গে থাকার চেষ্টা করে দুজনে, ততবার বাধা আসে। যতবার রাহুল নেশা ছাড়তে চায় ততবার আখ্যান সূচনা করে তীব্র জটিলতা। আর সেই পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব সাজাতে গিয়ে তার আলঙ্কারিক দৃশ্য বুনতে বুনতে এগোতে থাকে ছবিটি। মাঝ পথে একই বিষয়ের সাযুজ্য বড় শ্লথ করে তোলে ছবিটিকে। ক্লান্ত করে তোলে একই পরশের রিক্ততা। গান আশিকি-টু’র সম্পদ হতে পারত। রাগে, অভিমানে, অবসাদে, ভালবাসায় গানকেই সম্বল করতে চায় একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা দুই তরুণ। কিন্তু কোথাও এখন যেন একশো বছরের শিকড়বাকড়ের ভারতীয় চলচ্চিত্রের অলিতে-গলিতে হারিয়ে যাচ্ছে গানের সেই সুবর্ণ সময়। এই ছবিতে তিনজন সঙ্গীত পরিচালক। মিঠুন, জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, অঙ্কিত তিওয়ারি। তবুও মিউজিকাল হয়ে উঠতে পারল কি আশিকি-টু? সেই নিক্তি মাপতে পারবেন কেবলমাত্র আপনারাই। হ্যাঁ দর্শকরাই। পরিচালক মোহিত সুরির আট নম্বর, নায়ক আদিত্য রায় কপূরের চার নম্বর আর নায়িকা শ্রদ্ধা কপূরের তিন নম্বর ছবি ‘আশিকি-টু’ তাই নতুন কোনও আশা জোগাতে পারে না দর্শকের মনে। কোনও জোরালো বার্তা, নতুন চমক নেই। নেই তারুণ্যের জ্বলে ওঠার বিস্ফোরক মুহূর্ত! ছবিতে কাউকে সিগারেট খেতে দেখা যায় না। কিন্তু রাহুল পিপে পিপে মদ খায়। দেখতে দেখতে মনে হয়েছিল, ‘মদ ছাড়ানোর এবং জীবনের পথে ফিরে আসার’ কোনও বার্তা হয়তো থাকবে এই ছবির হাড়ে মজ্জায়। কিন্তু সেখানেও নেই কোনও প্রচলিত চমক। এক বালুকাবেলায় সূর্যাস্ত আর বৃষ্টির পটভূমিতে আরোহীর নিজের ভালবাসা রাহুলের স্মৃতিচারণায় শেষ হয় বারো কোটি টাকায় নির্মিত দু ঘন্টা কুড়ি মিনিটের আশিকি-টু। অন্তমিলহীন ভালবাসার গানের রেশ তাই ভাল করে মনের মণিকোঠায় প্রবেশ করার আগেই হল থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।
©somewhere in net ltd.