| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পরিবারটি ছিল তিন জনের। মা, আর তার দুই মেয়ে, জমজ মেয়ে। জমজ হলেও তাদের মধ্যে একটা বিশেষ অমিল ছিল- অবশ্যই তাদের মায়ের কাছে নয়, আর সবার কাছে। তাদের একজন ছিল ফর্সা, আরেক জন ছিল কাল, যদিও সবাই বলত একটু চাপা রঙের।আর দশটি স্বাভাবিক পরিবারের মত হলেও বিধাতার অসীম আশীর্বাদে কি যেন একটা বেতিক্রম ছিল এই পরিবারের। তা হল ভালোবাসার এক অফুরন্ত আধার ছিল দুই বোনের মাঝে। এই অফুরন্ত ভালোবাসার মায়াতেই নাকি অন্য কোন কিছুর টানেই হোক, দুই বোন ছিল সদা প্রফুল্ল, একজনের ছায়া ছিল আরেক জন। তাদের এই মিলের প্রভাবেই যেন- তারা ছিল জমজ। জন্মগত কারনে নয়। যাই হোক, দিন কেটে যাচ্ছিল- দুই বোনের দুষ্টুমি আর প্রেমের সাথে সাথে তাদের মায়ের স্নেহের এক বিচিত্র ভালোবাসার ছবিই ভাসতো সবার চোখে। সময়ের স্রোতে, স্নেহ, প্রেম আর ভালোবাসারমধ্য দিয়ে কখন যে যৌবনের মায়ায় দুই বোন বাঁধা পড়ল, তা মা টেরই পেল না। তবে এতে মায়েরই বা আর কি দোষ, মায়ের কাছে মেয়ে তো মেয়েই থাকে, বড় হোক আর ছোট- আদরের দুলালী সর্বদা আদরের দুলালীই থাকবে। এটাই জগতের নিয়ম।
সেই নিয়মের সাথে মিল রাখতেই যেন, যে চোখগুলো আগে দেখত দুইটা ছোট্ট নিষ্পাপ ফুল, সেই চোখের দৃষ্টিতেই এখন ফুলদুটি নিষ্পাপ থেকে হয়ে উঠল তরতাজা পূর্ণযৌবনা – যাদের আগে শুধু নিস্পাপ চোখের দৃষ্টিতে খুজে পাওয়া যেত, তাদেরই আজ এই জগত ঘ্রাণের মধ্য দিয়ে পায়, অনুভব করে মনের ভিতরের সেইখান থেকে, যেখানে কামনার স্রোত আছড়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত। এই বিপরীতের মধ্য দিয়েই সব কিছুই নিজের নিয়মে এগিয়ে চলে। এটাই হয়ে আসছে, হয়ত ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।
জমজ দুই বোনের গায়ের রঙ আলাদা হওয়া সত্তেও তাদের মনের রঙ ছিল একই রকম। তাদের নিজেদের চোখে তারা ছিল একে অপরের প্রতিচ্ছবি।তাদের বিদ্যা-বুদ্বি, গুণ ছিল সমানে সমান। তাদের মধ্যে কিছু অমিল যে ছিল না- তা নয়, নিজ নিজ পছন্দ-অপছন্দও ছিল। কিন্তুএকে অপরের দুঃখে যেমন কাঁদত তেমনই এক জনের খুশিতে আরেকজনও খুশি হত। এমনই ছিল তাদের সম্পর্ক। হয়ত তাদের মায়ের সমান আর পক্ষপাতিত্বহীন ভালোবাসাই তাদের মধ্যে কোন ভিভেদ তৈরি হতে দেয় নি।
কিন্তু কথায় বলে, স্বর্গ সুখ ইন্দ্রের জন্যও চিরস্থায়ী নয়, সেক্ষেত্রে মর্তের মানুষের সুখ যে বৈশাখের সূর্যের মতই হবে- তা তো সহজেই অনুমেয়। এইপরিবারের সুখও যেন হারিয়ে যেতে বসল বাইরের জগতের অযাচিত হস্তক্ষেপে। দুই বোনই একই সাথে যৌবন প্রাপ্ত হলেও, সমাজে সাদাটি যেন কালো জনের চেয়ে একটু বেশীই নজর কাড়ল। তার ঠোঁটের মুচকি হাসি, চোখের নজর। এল চুল- সবই যেন পাগল করে দিত সবাইকে। তার খবর ছড়িয়ে পড়ত সবখানে, সে কি করল, কি পড়ল, কি গাইল সবই ছিল- মানুষগুলোর প্রথম আগ্রহের বিষয়। এই প্রথম বিদ্যা-বুদ্বি, গুণ যেন বাইরের রূপের কাছে হেরে গেল। তাদের ভিতরের মিলগুলো যেন মানুষগুলো এক নিমষেই মিথ্যে বানিয়ে দিল। দুই বোন একই মায়ের সন্তান হয়েও মানুষের কাছে দুই ভাবে পরিচিত হল। যে মা কোনদিন তার মেয়েদের কোন পার্থক্য করেনি, সমান ভাবে আগলে রেখেছিল, বিকশিত করেছিল তার ছায়াতে- তারই প্রতিবেশী লোকগুলো তাদেরই ভিতর থেকে আলাদা করে দিতে চাইল। একজনের কষ্টে সারা সমাজ কাঁদে, আরেক জনের দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করতেও যেন তারা লজ্জা পায়। একজনের জন্য তারা সমুদ্র মন্থন করতে পারে, বহুদূর হাঁটতে পারে, নিজেদের অনুভুতি প্রকাশ করে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিতে পারে, তারাই যেন কালো মেয়ের ব্যাপারে মুখের ভাষা, শরীরের শক্তি, মনের আগ্রহ আকুলতা সব হারিয়ে ফেলে।
তাদের (বোনদের) মধেকার মিলগুলো যেন ভিনদেশি ভাষায় লিখা কবিতায় পরিনত হয় এই মানুষদের কাছে। যেই দুই বোন একই সাথে থেকেছে পাশাপাশি বহুবছর, যাদের চিন্তা চেতনা ছিল প্রায় একি রকম, তাদেরই বাইরের রূপের পার্থক্য নিয়ে তাদের মুখোমুখি দাড় করানোর এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠল সবাই। বলতে লাগল, সাদা যদি কালর সাথে থাকে, তবে সেও কালো হয়ে যাবে। তাদের ভেতরের গুণ যে একই, তাই তাদের ভুলিয়ে দেবার চেষ্টায় মেতে উঠল সবাই। বাইরের রূপ, বারেই প্রকাশই তাদের কাছে মুখ্য হয়ে উঠল। প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল এই বোনের মাঝে ফাটল ধরানর। তাদের মায়ের অসহায়ের মত দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকল না।
এখন আপনাদের কাছে একটা প্রশ্ন করতে চাই- আপনারা এই গল্পের কি রকম শেষ দেখতে চান? উত্তরে প্রগতিশীলেরা হয়ত বলবেন, অবশ্যই তাদের মধ্যে মিল দেখতে চাই, রূপ নয়, মানুষের গুণ আসল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত- ব্লা ব্লা ব্লা।
এখন আপনাদের প্রতি আমার শেষ প্রশ্ন- তাহলে সনাতন ধর্মের উপর, হিন্দু মানুষগুলোর উপর চলা অত্যাচার কি আপনাদের চোখে পরে না? ইসলাম ধর্মের, মুসলমানদের উপর পৃথিবীর যেখানেই অত্যাচার হোক, আপনারা তো চুপ থাকেন না, তখন তো আপনাদের প্রতিবাদের ভাষা গায়েব হয় না, তখন তো আপনাদের এর প্রতিবাদ করতে লজ্জা লাগে না। যদি ভালো কিছু হয়, তাহলে সবাইকে বলেন, যদি খারাপ কিছু হয় – তাও বলেন। তাহলে আমাদের হিন্দুদের উপর চলা ধ্বংসযজ্ঞআপনাদের মনের কি কোন প্রভাব ফেলে না? মনের, বিবেকের কোথাও কি কোন অনুভুতি তৈরি করতে পারে না?
সনাতন আর ইসলাম- দুইটি ধর্মই শান্তি, অহিংসার কথা বলে, ভিতরে খুজলে তাদের মধ্যে মানবতার বানীর কোন অভাব পাবেন না- তাহলে এতো ঘৃণা কেন- হিন্দু ধর্মের প্রতি? বাইরের প্রকাশ (ধর্ম পালন পদ্ধতি) নিয়ে কেন এই দুই ধর্মের মধ্যে, এর অনুসারী মানুষগুলোর মধ্যে ভিভেদ তৈরি করতে উঠে পরে লেগেছেন? ইসলাম কি সনাতনের সাথে সহবস্থান করতে পারে না? বাংলাদেশের (মা) দুই মেয়ে সনাতন আর ইসলাম ধর্ম(কালো আর সাদা) মাঝে ভিভেদের দেয়াল তুলতে, তাদের মাঝে নির্লজ্জ দূরত্ব তৈরি করতে আপনারা এতো উঠেপড়ে লেগেছেন কেন? কখনো কি বেদ আর কুরআন পাশাপাশি রেখে এদের মানবতার কথা, এদের শান্তির কথার মিল দেখেছেন? শুধু আচার-আচরনের অমিলগুলো, যেগুলো বাইরের রূপ সদৃশ- এসবকে কেন এত বড় করে তুলছেন? কেন ধর্ম বলতে তা পালন করার পদ্ধতি বুঝেন, কেন এঁদের বলা মর্ম কথা বুঝেন না? কেন আপনারা এটা সিদ্ধ করতে চাচ্ছেন যে, একসাথে থাকলে সনাতনের প্রভাবে ইসলাম নষ্ট হয়ে যাবে, ইসলামের আদর্শ স্বকীয়তা হারিয়ে যাবে? যে দুই ধর্ম বহুকাল ধরে দুই বোনের মত পাশাপাশি থেকে এসেছে, কেনতাদের আলাদা করতে চান এখন?
মানুষ নিজের স্বার্থে কতদূর নীচ হতে পারে তা আমরা জানি। নিজের স্বার্থ, লোভ, কামনা বাসনা চরিথারত করতে, নিজের অতিপরিচিত প্রতিবেশীদেরও ক্ষতি করতে ছাড়ে না। তবে বলাই বাহুল্য, এ ক্ষেত্রে হিন্দুরাই সবসময় প্রধান পছন্দ থাকে। স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশে হিন্দু ছিল ২৩ ভাগ, এখন ৮ ভাগ। সম্পত্তি ছিল ৩৬-৪৬% এখন, কে জানে, আছেই নাকি কিছু? তা গবেষণার বিষয়।
স্বাধীনতার পরে ১৯৯০,১৯৯৩,২০০১,২০১২,২০১৩ এ সবচেয়ে বড় সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিমাসেই কমপক্ষে একটি করে মন্দির নয়ত হিন্দুর ঘরবাড়ি জ্বালান হয়েছে। এই স্বাধীন দেশ, যার মূলনীতিই ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়া, এখানে এখন পর্যন্ত হিন্দুর উপর সাম্প্রদায়িক হামলার শাস্তির ঘটনানগণ্য। এমনকি, গণমাধ্যমও এগুলো প্রচারে অনীহা বোধ করে, বড়জোর ভিতরের পাতায় ছোট্ট করে ছাপায়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর ক্ষেত্রে মুসলমানদের অংশগ্রহণও নগণ্য। তারা ব্যস্ত মধ্যপ্রাচ্চে মার্কিন হামলা নিয়ে। এদেশের দুই ধর্মকে আলাদা করার জন্য, ধর্মের নামে দুর্বল মানুষকে লুট করায় ব্যস্ত।
অন্যায় যে সহে, আর যে করে- তাদের দুজনকেই ঘৃণা করার শিক্ষা আমরা পেয়েছি ছোটবেলাতেই। সময় শুধু মানার। এক মায়ের পেটের দুই জমজ বোনের মতই থাকতে দিনসনাতন আর ইসলাম ধর্মকে, সাথে তাদের অনুসারীদের।
©somewhere in net ltd.