| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পলায়নের মধ্য দিয়েই কি বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটেছে নাকি ফ্যাসিবাদ কেবল তার চেনা মুখোশ খুলে নতুন মুখোশ পরছে, দল বদলাচ্ছে, বয়ান বদলাচ্ছে? এই প্রশ্নটি আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে জরুরি, সবচেয়ে গভীর এবং সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ ৫ আগস্ট ২০২৪ এ শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ দোসরদের ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ থেকে পলায়নের ঘটনা যতটা দৃশ্যমান , তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এর অন্তর্নিহিত বাস্তবতা ফ্যাসিবাদ কোনো একক ব্যক্তি বা একটি দলের নাম নয়। ফ্যাসিবাদ হলো একটি মানসিকতা, একটি ক্ষমতার কাঠামো, একটি সুবিধাভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে নিজের রং বদলায়, ভাষা বদলায়, আশ্রয় বদলায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের সাধারণত মানুষের দীর্ঘ পনেরো বছরের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, কোনো হঠাৎ উত্তেজনার ফল নয়। বছরের পর বছর ধরে গুম, খুন, মিথ্যা মামলা, নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, ভোটাধিকার ধ্বংস,মহা দূর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যখন মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল, তখন রাজপথ হয়ে উঠেছিল শেষ আশ্রয়। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল বাঁচার তাগিদে, মর্যাদা ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। সেই আন্দোলন কেবল একটি সরকার উৎখাতের সংগ্রাম ছিল না এটি ছিল একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক রায়।
এই আন্দোলনে মানুষ জীবন দিয়েছে এই বিশ্বাস নিয়ে যে, এই রাষ্ট্র আর কোনো ব্যক্তির ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার যন্ত্র হবে না। রাষ্ট্র আর কোনো দলের ক্যাডার বাহিনীতে পরিণত হবে না। আইন আর ক্ষমতাবানদের ঢাল হবে না। কিন্তু অভ্যুত্থানের কয়েক মাসের মধ্যেই যে রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে আসছে, তা সেই বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে সাংঘর্ষিক। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন, তার অনেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বিদেশে পালিয়েছেন এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে সত্য হলো, আওয়ামী লীগের বহু প্রভাবশালী নেতা-কর্মী, যারা এতদিন আত্মগোপনে ছিল, তারা আবার প্রকাশ্যে আসছে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে, ভিন্ন বয়ানে, ভিন্ন ভিন্ন দলের ছায়াতলে। আজ প্রশ্ন উঠছে এই মানুষগুলো কি সত্যিই ফ্যাসিবাদী রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসেছে? নাকি তারা কেবল নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে দল ও পরিচয় বদলাচ্ছে? বাস্তবতা বলছে, এটি আদর্শিক রূপান্তর নয়, এটি নিছক আত্মরক্ষামূলক কৌশল। দেখা যাচ্ছে, এই ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ কেউ বিএনপির ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে, কেউ জামায়াতে ইসলামীতে, কেউ চরমোনাই পীর সাহেবের ইসলামী আন্দোলনে। তারা নতুন নতুন বয়ান তৈরি করছে নিজেদের অতীত আড়াল করার বয়ান, নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার বয়ান, কিংবা অতীতের অপরাধকে " পরিস্থিতির শিকার " হিসেবে উপস্থাপনের বয়ান। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়েই এই ব্যক্তিরা বিএনপির দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অবস্থানের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এটি নিছক রাজনৈতিক দখলদারিত্ব নয় বরং এটি আগের সেই ফ্যাসিবাদী আচরণেরই পুনরাবৃত্তি। শুধু ব্যানার বদলেছে, আচরণ বদলায়নি। ক্ষমতার নেশা, দখলদারির প্রবণতা এবং সহিংসতার সংস্কৃতি রয়ে গেছে একই জায়গায়।
এই বাস্তবতায় শরীয়তপুরের এক আওয়ামী লীগ নেতার বিএনপিতে যোগ দিয়ে “মুজিব কোট আয়রন করে তুলে রাখার” মন্তব্যটি নিছক কোনো রসিকতা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সুবিধাবাদের এক ভয়াবহ প্রতীক। এই উপমার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় এই শ্রেণির রাজনীতিকদের কাছে আদর্শ কোনো বিষয় নয় রাজনীতি হলো ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সম্ভাবনায় বিনিয়োগ। আজ তারা বিএনপির ছায়ায়, কাল পরিস্থিতি বদলালে আবার পুরোনো পরিচয়ে ফিরে যেতে প্রস্তুত। এই মানসিকতাই ফ্যাসিবাদের মূল শক্তি। কারণ ফ্যাসিবাদ কখনো আদর্শ দিয়ে টিকে থাকে না টিকে থাকে সুযোগ দিয়ে, আপস দিয়ে এবং নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে। এই প্রেক্ষাপটেই “আওয়ামী লীগ যা, বিএনপি তা-ই” এই ধরনের বক্তব্য জনপরিসরে জায়গা করে নিচ্ছে। এই বক্তব্য পুরোপুরি সত্য না হলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক আপসই এই ধারণাকে শক্তিশালী করছে। যখন ফ্যাসিবাদের দোসর আর ফ্যাসিবাদবিরোধী একই কাতারে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের চোখে রাজনীতির পার্থক্য মুছে যায়। রাজনীতি তখন আর মুক্তির হাতিয়ার থাকে না হয়ে ওঠে ক্ষমতার একটি নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা, যেখানে আদর্শ, ত্যাগ ও নৈতিকতার কোনো মূল্য নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক বক্তব্য এই বাস্তবতাকে আরও নগ্নভাবে সামনে এনেছে। একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিএনপির স্থানীয় নেত্রী যিনি অতীতে বিএনপির মনোনয়নে একাধিকবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন বলে দাবী করছেন তাঁকে বলতে শোনা যায়, “বিএনপিকে ভোট দিলে দশ বছর পর হলেও আবার শেখ হাসিনা ফিরে আসবে।” এই বক্তব্য নিছক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয় এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস। এর মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো হচ্ছে ফ্যাসিবাদ অনিবার্য, পরিবর্তন সাময়িক, প্রতিরোধ অর্থহীন। এই ভাষা ফ্যাসিবাদেরই ভাষা। কারণ ফ্যাসিবাদ সবসময় চায় মানুষ বিশ্বাস করুক, তাদের কোনো বিকল্প নেই, তাদের সংগ্রাম বৃথা। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের সাধারন মানুষ দেখিয়েছে যদি ঐক্য থাকে, যদি ভয়কে জয় করা যায়, তাহলে সবচেয়ে শক্তিশালী ফ্যাসিবাদও টিকে থাকতে পারে না। সেই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থা বদলানো। কিন্তু আজ যখন সেই ব্যবস্থারই লোকজন নতুন রূপে পুনর্বাসিত হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে আমরা কি সত্যিই কিছু শিখেছি? নাকি ইতিহাসের একই ভুল আবারও করতে চলেছি?
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে ঘটছে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নীরব সম্মতিতে, কোথাও কোথাও সক্রিয় সহযোগিতায়। বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামের মতো বড় দল যাদের লাখো তৃণমূল কর্মী পনেরো বছর ধরে গুম, হত্যা, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছে সেই দলগুলোর ভেতরেই আজ জায়গা করে নিচ্ছে আওয়ামী লীগের সাবেক দোসররা। নির্বাচনে জেতার অঙ্ক কষতে গিয়ে দলীয় নেতৃত্ব মনে করছে, যে কোনো মূল্যে ই হউক নির্বাচনে জিততেই হবে। এই যুক্তিই হলো ফ্যাসিবাদের যুক্তি।
রাজনীতিতে নৈতিকতা কোনো বিলাসিতা নয় এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। যখন নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার পথ খোঁজা হয়, তখন সেই ক্ষমতা অনিবার্যভাবে আবার দমন-পীড়নের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যারা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করে ক্ষমতায় যেতে চায়, তারা শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদেরই পুনরুত্থান ঘটায়।
তাহলে বড় রাজনৈতিক দলগুলো কেন এই আত্মঘাতী পথে হাঁটছে? এর একটি কারণ হলো দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নে সৃষ্ট নেতৃত্ব সংকট এবং নিলজ্জ ক্ষমতার লোভ । বহু ত্যাগী নেতা নিঃশেষ হয়ে গেছে, অনেকে রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছে, অনেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে আবার কাউকে সম্পদ ও ক্ষমতার লোভ আঁকড়ে ধরেছে। সেই থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো সহজ পথ বেছে নিচ্ছে প্রভাবশালী কিন্তু নীতিহীন লোকদের গ্রহণ করা। কিন্তু এই শর্টকাট রাজনীতি ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকট তৈরি করবে। আরেকটি বড় কারণ হলো রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো কার্যকর জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি। আওয়ামী আমলে সংঘটিত গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অধিকাংশ অপরাধী এখনো বিচারের আওতার বাইরে। ফলে তারা মনে করছে দল বদল করলেই সব দায় শেষ। এই দায় শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয় এটি রাষ্ট্রেরও। যদি সত্যিই ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হয়, তবে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে। জুলাই আন্দোলনের শহীদরা কোনো নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য জীবন দেয়নি। তারা জীবন দিয়েছে যেন আর কোনো নাগরিক রাষ্ট্রের হাতে নির্যাতিত না হয়, রাষ্ট্রে মানবাধিকার বাকস্বাধীনতা ফিরে আসে,যেন ভোটাধিকার একটি অর্থবহ অধিকার হয়, যেন রাজনীতি মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে আনে। সেই আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান দেখাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন হতে হবে।
আজ এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের। এই আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল তারাই। তাদের চোখ এড়ালে চলবে না কে সত্যিকারের পরিবর্তনের পক্ষে, আর কে কেবল সময়ের সুযোগ নিচ্ছে। প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা এবং নৈতিক অবস্থান নেওয়াই পারে নতুন বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান থেকে রক্ষা করতে। ফ্যাসিবাদ একদিনে আসে না, একদিনে যায়ও না। তাকে নির্মূল করতে হলে শুধু শাসক পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন দরকার। যদি সেই পরিবর্তনের পথে আবার পুরোনো দোসরদেরই জায়গা করে দেওয়া হয়, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। কারণ ইতিহাস খুব স্পষ্টভাবে মনে রাখে কে লড়েছিল মুক্তির জন্য, আর কে সুবিধার জন্য মুখোশ বদলেছিল।
©somewhere in net ltd.