| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্ম একটি অবিচ্ছেদ্য এবং প্রভাবশালী অনুষঙ্গ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান। এ দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময়ে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রের সংস্কার এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যে আলাপ চলছে, সেখানে অনেক ইসলামী দল পুনরায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় শরিয়া আইন বা ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে রাজপথের স্লোগানে পরিণত করেছে। কিন্তু আবেগ এবং জনদাবির ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা নির্মোহ সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করি, তবে একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয় কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল বা রাষ্ট্রীয় ফরমান কি কোনো দেশে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট? ইতিহাসের আয়নায় এবং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত জটিল এবং গভীর চিন্তার দাবি রাখে। শরিয়া আইনের দাবি উত্থাপনকারীদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ এবং একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আদর্শ হলো মদিনা রাষ্ট্র। তবে ইতিহাসের গভীরে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুয়তের দীর্ঘ ২৩ বছরের জীবনে মদিনা রাষ্ট্র ছিল একটি সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফসল। এটি কোনো আকস্মিক বিপ্লব বা জবরদস্তিমূলক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নবুয়তের প্রথম ১৩ বছর মক্কায় থাকাকালীন সময়ে কোনো রাষ্ট্রীয় আইন বা দণ্ডবিধি নাজিল হয়নি। সেই দীর্ঘ সময়টি ব্যয় হয়েছে মানুষের আকিদা বা বিশ্বাস সংস্কারের পেছনে। তখন ইসলামের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আত্মিক উন্নয়ন এবং চরিত্রের পরিশুদ্ধি। মানুষের হৃদয়ে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ( সাঃ) এর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং পরম স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার ভয় তথা 'তাকওয়া' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখনই তারা ঐশ্বরিক আইন মানার যোগ্য মানসিকতায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ আইন প্রয়োগের আগে সমাজকে সেই আইনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে।
মদিনায় হিজরতের পর 'মদিনা সনদ' এর মাধ্যমে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, তা ছিল ইনসাফ ও সহাবস্থানের এক অনন্য দলিল। সেখানে কেবল মুসলিমরাই ছিলেন না, বরং ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকদের সাথে নিয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠন করা হয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, শরিয়া আইনের বড় অংশ বিশেষ করে হুদুদ বা ফৌজদারি দণ্ডবিধিগুলো তখনও কার্যকর হয়নি। মদিনার সমাজব্যবস্থা যখন অভাবমুক্ত হলো, মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো যখন রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারল এবং মানুষ যখন স্বেচ্ছায় ইসলামের নৈতিক বিধানকে জীবনের শ্রেষ্ঠ পথ হিসেবে বেছে নিল, তখনই কেবলমাত্র শরিয়া আইনগুলো পূর্ণতা পেয়েছে । সুতরাং ঐতিহাসিক সত্য এই যে সমাজকে অনৈতিকতা, শোষণ ও দারিদ্র্যমুক্ত না করে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগ ইসলামের পদ্ধতি নয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এ দেশের বর্তমান আইনি কাঠামো মূলত ব্রিটিশ প্রবর্তিত আইনের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ এবং আইনসভার কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট সেকুলার পদ্ধতিতে অভ্যস্ত। এই বিশাল ও জটিল কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সেখানে শরিয়া ভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে এক বা দুই রাষ্ট্র পরিচালনার মেয়াদে মোটেও সম্ভব নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সমষ্টি।
এছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পদ্ধতিতে বহুমুখী মতাদর্শের মানুষের সহাবস্থান বিদ্যমান। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের বিশাল অংশের ঐকমত্য বা ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো মৌলিক পরিবর্তন টেকসই হয় না। ইসলামী দলগুলো যদি নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায়ও আসে তবুও তাদের বিদ্যমান সংবিধান এবং অগণিত আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। বর্তমানের বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা বা 'গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেম' পুরোপুরি সুদের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। একটি একক দেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে রাতারাতি শরিয়াভিত্তিক পদ্ধতি চালু করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল প্রস্তুত করা, যা বর্তমানের কোনো ইসলামী দলের রাজনৈতিক ইশতেহারে পূর্ণাঙ্গভাবে দৃশ্যমান নয় আর দৃশ্যমান হলেও সম্ভব নয়। শরিয়া আইনের মূল দর্শন হলো মানুষের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা দেওয়া। অথচ বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ঘুষ, দুর্নীতি, ভেজাল, কালোবাজারি আর চারিত্রিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। যেখানে মানুষ সামান্য বৈষয়িক স্বার্থের জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয়, সেখানে কেবল আইনের ভয় দেখিয়ে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। ইসলামের ইতিহাসে দেখা গেছে, খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর শাসনামলে যখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, তখন তিনি চুরির অপরাধে শরিয়া নির্ধারিত দণ্ড স্থগিত করেছিলেন। এর পেছনে যুক্তি ছিল রাষ্ট্র যখন নাগরিকের অন্ন, বস্ত্রের সংস্থান করতে পারে না, তখন কঠোর আইন প্রয়োগ করা ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব দূরীকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সাম্য আনয়নই হওয়া উচিত ইসলামী দলগুলোর প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা। জনগণের পেটে ক্ষুধা রেখে বা সামাজিক নিরাপত্তার অভাব রেখে শরিয়া আইনের স্লোগান দেওয়া ইসলামের মূল স্পিরিটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইসলামী দলগুলো যদি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার সুযোগ পায়, তবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে একটি 'ন্যায় ও ইনসাফের রাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠা করা । এর অর্থ হলো দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। জামায়াতে ইসলামী বা অন্য যেকোনো ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য প্রথম কাজ হওয়া উচিত মানুষের মাঝে 'তাজকিয়া' বা আত্মশুদ্ধির ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা। রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের চ্যালেঞ্জ হলো তারা কি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই করবে নাকি মানুষ গড়ার আন্দোলন করবে? যদি তারা জনগণকে নৈতিকভাবে শিক্ষিত করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এমন এক ব্যবস্থার প্রবর্তন করে যেখানে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে বিচার পায় এবং শোষণ থেকে মুক্তি পায় তবেই সেটি হবে সত্যিকারের ইসলামের অভিমুখে যাত্রা। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শরিয়া আইনের দাবিটি যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই রাতারাতি এই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। ইসলামের মূল আদর্শ হলো মানুষের হৃদয় জয় করা, জবরদস্তি নয়। মদিনার সেই রাষ্ট্রটি ছিল বছরের পর বছর ত্যাগের ফসল। তাই বর্তমানের ইসলামিক দলগুলোর উচিত হবে স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতির বাইরে গিয়ে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের বাস্তবসম্মত রূপরেখা দেওয়া। যখন এ দেশের মানুষ ইসলামকে কেবল আনুষ্ঠানিক ধর্ম হিসেবে নয়, বরং জীবনের শ্রেষ্ঠ সমাধান হিসেবে গ্রহণ করবে এবং তাদের চরিত্রে নবী করিম (সাঃ) এর সুন্নাহর প্রতিফলন ঘটবে, তখনই একটি ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে ওঠা সম্ভব হবে। পরিশেষে বলা যায়, শরিয়া আইন কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থা নয় যা ওপর থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া যায়। এটি হলো একটি আদর্শিক ও নৈতিক সমাজব্যবস্থার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত আগে 'মানুষের উন্নয়ন' এবং 'সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা', তারপর 'আইনের প্রয়োগ'। যদি ইসলামী দলগুলো ইনসাফ ভিত্তিক শাসন কায়েম করতে পারে, তবেই তারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে । সমাজ যখন শিক্ষিত, অভাবমুক্ত এবং নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে, তখন শরিয়া আইনের সৌন্দর্য মানুষ নিজে থেকেই অনুভব করবে। সুতরাং, ক্ষমতার মসনদ নয়, বরং মানুষের হৃদয় এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনই হওয়া উচিত যেকোনো ইসলামী রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
©somewhere in net ltd.
১|
১৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪১
মেঠোপথ২৩ বলেছেন: আমাদের দেশে নতুন কোন আইনের দরকার নাই। প্রচলিত যেই আইন আছে সেটার সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন কেবল দরকার।