| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার প্রতিটি নাগরিকের জান ও মালের সুরক্ষার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং আইনের নিরঙ্কুশ শাসন। রাষ্ট্র যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সকল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ, সেখানে একটি দীর্ঘ সময় ধরে জোরপূর্বক গুম বাংলাদেশে রাজনৈতিক দমন ও রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগের এক ভয়াবহ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ ও গুমের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। আর এই গুমই শেখ হাসিনার সরকারকে এক ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট দানবে পরিণত করেছিল। শেখ হাসিনা ও তার সরকারের মতের বাইরে গেলেই যে কোনো ব্যক্তিকেই হতে হতো গুমের শিকার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী বা সাধারণ নাগরিক যে ই হোন না কেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে নাগরিকদের গুম করার সুনির্দিষ্ট যথেষ্ট প্রমাণ ইতোমধ্যে আমাদের রাষ্ট্রের হাতে আছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে গুমের ঘটনা যত বৃদ্ধি পেয়েছে, শাসনব্যবস্থা তত বেশি কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হয়েছে। মত ভিন্নতা ও রাজনৈতিক বিরোধিতা স্তব্ধ করতে গুমকে একটি নিয়মতান্ত্রিক হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হয়েছিল বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকারের শাসনামলে । তবে চব্বিশের জুলাই- আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জনঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানের যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছে, সেখানে নতুন করে গুমের আতঙ্ক দেশের বিবেকবান মানুষকে আবারো চরমভাবে শঙ্কিত ও আতংকিত করেছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, জোরপূর্বক গুম কেবল কোনো একক ব্যক্তির গুম হওয়া বা নিখোঁজ থাকা নয়, এটি সমগ্র সমাজ তথা রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক দীর্ঘস্থায়ী " মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস " । বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী কায়ো ফার্নান্দেজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যখন কোনো রাষ্ট্র নিয়মতান্ত্রিকভাবে গুমকে দমনপীড়নের হাতিয়ার বানায়, তখন সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, নাগরিক প্রতিবাদ ও রাষ্ট্রের কাছে অধিকার চাওয়ার সাহসকে একেবারেই পঙ্গু করে দেয়। আবার ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের " অ্যানোমি " বা নিয়মহীনতা তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিজেরাই আইন অমান্য করে মানুষকে গুম করে এবং রাষ্ট্র অপরাধীদের দায়মুক্তি দেয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ফলে সমাজে গভীর সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি চরম অনাস্থা তৈরি হয়। সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম চেম্বলিসের ভাষায় এটি এক ভয়াবহ " রাষ্ট্রীয় অপরাধ " যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিচারহীনতা ছড়িয়ে দেয়।
শেখ হাসিনা শাসনের ১৫ বছরে গুমের ভয়াবহতা এবং তার কাঠামোগত রূপ নির্ণয়ে "গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি" এর প্রতিবেদনটি এক ঐতিহাসিক দলিল। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন এই কমিশনের “আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: এ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনোসিস অফ এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ” শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, ওই সময়ে গুমের মোট সংখ্যা আনুমানিক ৬,০০০ এর কাছাকাছি পৌঁছায়। কমিশনে জমা পড়া ১,৯১৩টি লিখিত অভিযোগের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১,৫৬৯টি ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রত্যক্ষভাবে "জোরপূর্বক গুম" হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্তত ২৮৭ জনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে এবং ২৫১ জন আজও স্থায়ীভাবে নিখোঁজ। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এর পূর্ববর্তী তথ্যে ৬০০ এর বেশি ঘটনার হিসাব থাকলেও রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ, গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন ও স্বজনদের বক্তব্যের পর বাস্তব সংখ্যাটি বহু গুণে বৃদ্ধি পায়।
পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আনুমানিক ৬১% ছিলেন সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষ। দলভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রায় ৭৫% জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী, ২২% বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাকর্মী এবং ৩% অন্যান্য বা রাজনীতিমুক্ত সাধারণ নাগরিক। তবে যারা স্থায়ীভাবে নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন, সেই নির্মমতার হিসেবে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের হার সর্বোচ্চ প্রায় ৬৮%, যার মধ্যে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর চৌধুরী আলমের মতো শীর্ষ নেতারাও অন্তর্ভুক্ত। ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ও অপূরণীয় ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, যা দেড় দশক ধরে তাদের পরিবার ও পুরো জাতিকে বেদনাহত করে রেখেছে। নির্বাচনী বছর এবং বিরোধী আন্দোলন দমন করতেই গুমের হার তীব্রভাবে বাড়নো হত। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পূর্বে ২০১৩ সালে ১২৮ জন এবং ২০১৪ সালে ৯৫ জন গুম হন। একইভাবে ২০১৬ সালে ২১৫ জন, ২০১৭ সালে ১৯৪ জন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের বছর ১৯২ জন গুমের শিকার হন।
এসব ঘটনা বাস্তবায়নে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), ডিজিএফআই, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। ডিজিএফআই ও র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইং পরিচালিত গোপন বন্দিশালা যা জনমনে "আয়নাঘর" নামে পরিচিত ছিল, সেখানে বছরের পর বছর বিচারবহির্ভূতভাবে মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। শেখ হাসিনার পতনের পর দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে আসেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেম (আরমান), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বহিষ্কৃত) আবদুল্লাহিল আমান আযমী এবং ডেনমার্ক প্রবাসী আইনজীবী মারুফ জামানসহ বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ আট-নয় বছর পর আয়নাঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে তাদের ফেরা প্রমাণ করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কীভাবে একজন স্বাধীন নাগরিকের জীবনকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার নির্মম ষড়যন্ত্র চালানো হয়েছিল। বহু ভুক্তভোগীকে হত্যার পর লাশ গুম করতে বরিশালের বলেশ্বর নদী, ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সীগঞ্জ এলাকা ব্যবহার করা হয়। অনেককে কোনো আইনি প্রক্রিয়া না মেনেই অবৈধভাবে ভারতে পাচার করার তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, যাকে গুম করার পর ভারতে ফেলে আসা হয়েছিল, এবং জামায়াত নেতা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলার সাফাই সাক্ষী সুখরঞ্জন বালি।
আওয়ামী লীগ শাসনের পতনের পরও আইনি সংস্কারের সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী উদ্যোগ না থাকা এবং পুরোনো আইনি কাঠামোয় ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বিচারহীনতাকে দীর্ঘায়িত করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জারি করা " গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ " এবং " মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ " পরবর্তীতে স্থায়ী আইনি সুরক্ষা হিসেবে সংসদে রূপ না দিয়ে স্থগিত বা কার্যকারিতা হারাতে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপে সরকারের পূর্বানুমতির পুরোনো বিতর্কিত বিধানটি বহাল রয়ে গেছে। নতুন অনুমোদন পাওয়া " গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন " এর খসড়ায় দায়মুক্তি সহায়ক বিভিন্ন ধারা ও সরকারের পূর্বানুমতির বিধান বহাল রাখায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ( টিআইবি), অধিকার, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক দল তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তভার পুনরায় পুলিশের হাতে রাখার সিদ্ধান্ত মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন সংস্থাগত ক্ষমতাকে খর্ব করে এবং তদন্তের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আইনি কাঠামোর এই শিথিলতার কুফল আবারো নতুন করে ভোগ করতে যাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি বাগেরহাটের মোংলার জয়মণি এলাকা থেকে সাদা পোশাক ও কোস্ট গার্ডের পোশাকে থাকা সদস্যরা তুলে নেয় ৩০ বছর বয়সী দরিদ্র জেলে ও মোটরসাইকেল চালক মিরাজ শেখকে। মিরাজ শেখের ঘটনাটি নিয়ে ইতোমধ্যে দেশি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একে গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের "প্রথম জোরপূর্বক গুম" বলে উল্লেখ করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের সদস্যদের তথ্যমতে ১০ই এপ্রিল মোংলার জয়মণি এলাকা থেকে সাদা পোশাক ও কোস্ট গার্ডের পোশাকে থাকা সদস্যরা মিরাজকে তুলে জয়মণি পন্টুনে ও পরবর্তীতে স্পিডবোটে হাড়বাড়িয়া ক্যাম্পে নিয়ে যান। শুরুতে কোস্ট গার্ডের স্থানীয় কর্মকর্তা (সিসি) ফোনে মিরাজকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও পরে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয় বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানান মিরাজের পরিবারের সদস্যরা। মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম জানান, ঘটনার সময় উপস্থিত কোস্ট গার্ড ও সাদা পোশাকধারী সদস্যরা তাকে কালো কাঁচের একটি ঘরে ঢোকায় এবং পরে স্পিডবোটে নিয়ে যায়। বোন লিজা ইসলামের ভাষ্যমতে, তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় মিরাজের মোটরসাইকেলটি এক ব্যবসায়ীর দোকানে রেখে যান কোস্ট গার্ড সদস্যরা, যা পরে তারাই আবার নিয়ে যান।
এ ঘটনায় মোংলা থানায় জিডি ও সংবাদ সম্মেলন করা হলেও কোস্ট গার্ডের মোংলা পশ্চিম জোন এ অভিযোগ অস্বীকার করে। এইচআরডব্লিউ জানায়, মিরাজের সন্ধান চেয়ে রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আদেশের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ওই জেলেকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ২৪ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সালে সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে আটক করতে হলে আটককারীকে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে, আটকের সুনির্দিষ্ট কারণ ও বর্তমান অবস্থান পরিবারকে জানাতে হবে। মিরাজের ক্ষেত্রে এসব বিধানের মারাত্মক লঙ্ঘন ঘটেছে।
এদিকে আদালতের নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর করার দাবি জানিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। এখনকার এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে সত্যিকারের সংস্কার ছাড়া এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে এই ধরনের চর্চা গেঁথে গেছে।’ তিনি আরও যুক্ত করেন, ‘নতুন সরকারের উচিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করা। মানবাধিকার কমিশনের ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করা এবং গুমের ঘটনা তদন্তে তাদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া। পুলিশের ওপর গুমের তদন্তভার ছেড়ে দিলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না। মিরাজের সন্ধান চাইতে গিয়ে পরিবারটি চরম নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়; মিরাজের স্ত্রী, মা ও বোনকে উল্টো সন্ত্রাসী ও নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার করে ২৭ দিন জেলে রাখা হয়। অন্যদিকে কোস্ট গার্ড ঘটনাটিকে অপপ্রচার দাবি করলেও উদ্ধার হওয়া তথ্যপ্রমাণ ভিন্ন চিত্র দেয়। তুলে নেওয়ার সময় মিরাজের কাছে থাকা চাবি দিয়েই ঘটনার ১১ দিন পর রাত চারটায় তাঁর মোটরসাইকেলটি কোস্ট গার্ডের পরিচয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া মিরাজের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বরের লোকেশন ট্র্যাকিং করলে প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হতে পারে। একটি অবুঝ সন্তান, অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা, মা, স্ত্রী ও বোনের আকুতি আজ দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার সামনে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজ নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া, ভয় দেখানো বা অন্যায়ভাবে আটক রাখা নয়। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার হতে পারে, কিন্তু রাতের আঁধারে তুলে নেওয়া বা জোরপূর্বক গুম করা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বাংলাদেশকে চিরতরে ফ্যাসিবাদমুক্ত ও একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে গুমের এই ভয়াবহ সংস্কৃতিকে স্থায়ীভাবে উপড়ে ফেলতে হবে। রাষ্ট্রীয় ও আইনি দায়মুক্তির সব পথ বন্ধ করে উচ্চ আদালতের নির্দেশানুযায়ী মিরাজ শেখকে অবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন ও অবাধ তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে। বিচারহীনতার অবসান না ঘটলে চব্বিশের নতুন স্বাধীনতার মূল চেতনা অধরাই থেকে যাবে।
©somewhere in net ltd.